ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের স্বীকৃতি

রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের অর্জন ও স্বীকৃতি

জাতিসংঘের সদস্যপদ

পর্যবেক্ষক স্ট্যাটাস: এই মর্যাদা অনুযায়ী ফিলিস্তিন জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র নয়। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, আঞ্চলিক সংস্থা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রতিনিধি পাঠাতে পারবে। ফিলিস্তিন জাতিসংঘের সভায় বা বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। তবে কোনো প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দিতে পারবে না।

পর্যবেক্ষক সত্তা: ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে পর্যবেক্ষক সত্তা (অবজার্ভার এনটিটি) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে দেশটি এখন অভ্যন্তরীণ ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে যৌথ কিংবা এককভাবে জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে। তবে ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়ার অধিকার রাখে না।
পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র (অবজারভার স্টেট): জাতিসংঘে একমাত্র অসদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র আছে ভ্যাটিকান সিটি। ২০০৪ সালের এক প্রস্তাবে এ মর্যাদার ক্ষমতা ব্যাখ্যা করা হয়, যা বর্তমানে ফিলিস্তিন যে মর্যাদা ভোগ করছে তার চেয়ে আলাদা কিছু নয়। কিন্তু ফিলিস্তিনের সঙ্গে ভ্যাটিকানের মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে- জাতিসংঘের কোনো সদস্যরাষ্ট্রের সঙ্গে ভ্যাটিকানের কোনো সভা বা কর্মকা-ের প্রস্তাব বা বিবরণী সরাসরি অন্য সদস্যরাষ্ট্রের কাছে সরকারি নথি হিসেবে পাঠাতে পারে ভ্যাটিকান কর্তৃপক্ষ। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের এ ধরনের সুযোগ নেই।

সর্বশেষ: ফিলিস্তিনকে পূর্ণ সদস্যপদ দেয়ায় জাতিসঙ্ঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোকে বার্ষিক ছয় কোটি ডলার তহবিল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ইউনেস্কোর বার্ষিক বাজেটের একপঞ্চমাংশ। অথচ সদস্যপদ দেয়া বিষয়ে ইউনেস্কোতে ভোটাভুটিতে ১৭৩টি দেশের মধ্যে ফিলিস্তিনের পক্ষে ১০৭ ভোট ও বিপক্ষে মাত্র ১৪ ভোট পড়ে আর ৫২টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জার্মানি সদস্যপদের বিরোধিতা করে ভোট দেয়। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের দাবির সমর্থনে ভোট দেয় ব্রাজিল, চীন, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে ব্রিটেন থাকে নিরপেক্ষ অবস্থানে। ভোটের প্রশ্নে এই অবস্থানকে নিরপেক্ষ বলা গেলেও এটা যে মূলত ইসরাইলকেই ভোট দেওয়া তা বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয় কারো।

ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের স্বীকৃতি

ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের স্বীকৃতি

২৯ নভেম্বর ২০১২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বীকৃতি মেলে। ১৯৩ সদস্য বিশিষ্ট এই বিশ্ব সংস্থার ১৩৮টি রাষ্ট্র ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির পক্ষে ভোট দেয়। নয়টি রাষ্ট্র বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ৪১টি রাষ্ট্র ভোটদানে বিরত থাকে। ফল ঘোষণার পরপরই সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের পেছনে ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়ানো হয়। ভোটগ্রহণের সময় ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। ফল ঘোষণার পর ফিলিস্তিনিরা বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠেন। এ সময় তারা আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তোলেন। এখন জাতিসংঘের নন-মেম্বার স্টেট এর মর্যাদা পাবে ফিলিস্তিন। এটা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি পৃথিবীর বৃহত্তম সংস্থাটির পরোক্ষ স্বীকৃতি। পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুসালেম ও গাজা উপত্যকা নিয়ে গঠিত ফিলিস্তিন এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সদস্য হতে পারবে।

ফিলিস্তিনের এই বিজয়কে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ দুটো দেশ ফিলিস্তিনের স্বীকৃতির ঘোর বিরোধিতা করেছে।

ভোটগ্রহণের পর জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, ‘আমার অবস্থান সবসময়ই ছিলো সংগতিপূর্ণ। আমি বিশ্বাস করি- ফিলিস্তিনিদের একটি নিজস্ব রাষ্ট্রের আইনসংগত অধিকার আছে। ইসরাইলেরও আছে প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করার অধিকার।’ দীর্ঘ ৬৫ বছরের ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ থেকে এখন পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে ফিলিস্তিন। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভেঙ্গে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করা হয়। সূত্র : আল জাজিরা ও এপি।

জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র

অতীতে বহুবার জাতিসংঘে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে ভেস্তে গেলেও, এবার দেশটি নিজেই চিন্তা করছে এতে স্বাক্ষরের। মূলত, ২০১৪ সালে ইসরাইলের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের সময় এক প্রচারাভিযানে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর একটি মন্তব্যই এর অন্যতম কারণ। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে কট্টরপন্থী ভোট লাভের সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে নিজের প্রধানমন্ত্রিত্বে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে না বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন নেতানিয়াহু! এ নিয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। নির্বাচনে জয়লাভের পর আগের অবস্থান থেকে সরে এসে দুই রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে কমপক্ষে তিনবার নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। তবে এবার তার মন্তব্যে কিছুতেই গলতে রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্র। আগের মন্তব্যটিই তার চূড়ান্ত মনোভাব হিসেবে ধরে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ খবর দিয়েছে সিএনএন।

শনিবার (২২/৩/২০১৫) হাফিংটন পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, আমরা তার কথাটি ধরে নিয়েছি, যখন তিনি বলেছিলেন তার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে অন্তত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে না। ওই অঞ্চলে আমরা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখতে চাই না। এটি নিশ্চিত করতে বাকি যেসব বিকল্প উপায় রয়েছে, সেসব ভেবে দেখছি আমরা। সাধারণত, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের পর বিজয়ীকে সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করে অভিনন্দন জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে নেতানিয়াহুকে অভিনন্দন জানাতে দুই দিন সময় নিয়েছেন ওবামা। ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতিদান সম্পর্কিত জাতিসংঘের প্রস্তাবটিতে স্বাক্ষরের কথা চিন্তাভাবনা করছে।

জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের স্বীকৃতির তাৎপর্য

 palestine-actual-territoryপ্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও জাতিসংঘে শুভবোধের জয় হয়েছে । সাধারণ পরিষদে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনকে বাধ্যতামূলকভাবে বিভক্ত করার ঠিক ৬৫ বছরের মাথায় এ ঘটনা ঘটলো। এতোদিন পর্যন্ত ফিলিস্তিন জাতিসংঘে ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক সত্তা’র মর্যাদা ভোগ করতো, এবার তা ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’-এর মর্যাদায় উন্নীত হলো।

বিপক্ষে ভোট দেওয়া ও ভোট না-দেয়া সদস্যরা দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে থাকা শান্তি আলোচনা শুরুর উপর গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তটি শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা বিঘিœত করবে বলে কথা ছড়াতে শুরু করেছে। শান্তি আলোচনা কেনো বন্ধ হয়ে আছে, সে ব্যাপারে কিন্তু কিছু বলা হচ্ছে না। স্মর্তব্য, নানান নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল কর্তৃক অবৈধ বসতবিস্তারকে কেন্দ্র করে ২০১০ সাল থেকে আলোচনা বন্ধ আছে।

বিরোধীরা আরো বলতে চাইছেন, এই স্বীকৃতির কোনো গুরুত্ব নেই। আসলে গুরুত্ব আছে। জাতিসংঘে গৃহীত সিদ্ধান্তের বিশাল গুরুত্ব আছে। প্রথম কথা হচ্ছে, এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনের নামের সঙ্গে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি যুক্ত করেছে। আর এর ফলে সাধারণ পরিষদে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার অধিকার না পেলেও ফিলিস্তিন এখন থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগ দিতে পারবে। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টও অন্তর্ভুক্ত। ধরে নেওয়া যায়, এটাই ইসরাইল ও ইসরাইলের বন্ধুদের চিন্তার বিষয়। উল্লেখ্য, একবার আইসিসির সদস্য হয়ে গেলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা যায় কি না তা তদন্তের জন্য সংস্থাটির প্রতি অনুরোধ জানাতে পারবে ফিলিস্তিন।

পশ্চিম তীর ও গাজায় ২০০৮-০৯ ও ২০১২ সালে ইসরাইলি সামরিক তৎপরতাকে এই তদন্তের আওতায় আনা সম্ভব হতে পারে। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০৮ সালের শেষ থেকে ২০০৯ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত গাজায় নারকীয় হত্যাকা-, সম্পদহানি ঘটানোর অব্যবহিত পরে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের তদন্ত করার জন্য আইসিসির প্রতি অনুরোধ জানিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলো ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। আইসিসির বক্তব্য হচ্ছে, জাতিসংঘ বা আইসিসির সদস্যরা ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে তাদের কিছু করার উপায় নেই। এবার সে বাধা অতিক্রম হলো। ইসরাইলের জন্য এটা বিরাট এক সমস্যা।

সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্ব আছে। আরো একবার প্রমাণিত হলো, আজকাল আর বিশ্বের অধিকাংশ দেশ প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদামাফিক যেকোনো ইস্যুতেই ‘জি হুজুর’ নীতি অনুসরণ করছে না। এটি স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বরাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে দোরগোড়ায় এনে দিয়েছে, এটা কোনোভাবেই বলা চলে না। তবে সিদ্ধান্তটির মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মুখে যে কিছুটা ঝামা ঘষা হয়ে গেছে, তা বলাই বাহুল্য। এ ছাড়া আশা করা যায়- সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের পরে, উগ্র জাতীয়তাবাদী ও মৌলবাদী আগুন বাড়িয়ে ভোট জেতার যে কায়দা ইসরাইলের ক্ষমতাসীনেরা অনুশীলন করছে, তাতে ভাটা পড়বে। ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি ও দাদাগিরির দিন আর থাকছে না ইসরাইলি নেতাদের জন্য। আর এসবের পুরো ও প্রত্যক্ষ সুবিধা ভোগ করবে এতোদিনের বঞ্চিত ফিলিস্তিন।

ফিলিস্তিনের পাশে বাংলাদেশ

palestine bangladesh friendship

অন্যায়-অবিচার, জুলুম-খুন আর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়তে বিভিন্ন সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দাঁড়িয়েছেন ফিলিস্তিনের পাশে। জাপানিজ রেড আর্মি কিংবা আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির মত বেশ কিছু সংগঠন ও গেরিলা গোষ্ঠীর সদস্যরা ধর্ম-বর্ণ ভুলে লড়েছিলেন ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের পক্ষে। এসব সংগঠন এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের অবদান নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক বই, তৈরী হয়েছে ডকুমেন্টারি। কিন্তু বাংলাদেশের বেশ কয়েক হাজার যুবকের কাহিনী কীভাবে যেনো চাপা পড়ে গেছে কালের আবর্তে। তাদের ব্যাপারে কোন আরব-অনারব ঐতিহাসিক কিংবা সাংবাদিক অনুসন্ধানমূলক কোনো পদক্ষেপ হাতে নেন নি আজ পর্যন্ত। ফলে এ প্রজন্মের ফিলিস্তিনীরা তো বটেই এমনকি বাংলাদেশীরাও জানেন না বীর বাংলাদেশীদের এই গৌরবময় ইতিহাস। তখনকার চরম গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনী স্বাধীনতাকামীদের সাথে অস্ত্র হাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই থেকে শুরু করে অস্ত্র-রসদ বহন এমনকি পাহারার কাজও করেছিলেন বহু বাংলাদেশী যুবক। প্রায় ৮ হাজার বাংলাদেশী যুবক সেসময় প্যালেস্টাইনিয়ান লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার হয়ে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন।

ফিলিস্তিনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেকটা জন্মের পর থেকেই। গোঁয়ার এবং অত্যাচারী পাকিস্তানি শাসকদের সাথে ধারাবাহিক রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং একের পর এক নিপীড়ন এবং বঞ্চণামূলক পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ এ টানা নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীন হয়ে যাওয়াটা মুসলিম বিশ্ব সহজভাবে নেয় নি এবং প্রথমদিকে আরবরা স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতেও অনীহা প্রকাশ করে ।

স্বাধীনতার স্থপতি এবং তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এই অচলাবস্থা কাটানোর উদ্যোগ নেন। এরই অংশ হিসেবে ওআইসিসহ আরব দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে মনযোগ দেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর সাহসী ও আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ব্যাপারে আরবদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যেতে থাকে। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে আরব-ইসরাইল যুদ্ধে মিশর-সিরিয়া-ফিলিস্তিন অক্ষের প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকাশ্য সমর্থন ঘোষলা করলেন, যুদ্ধে আরবদের সেবা ও সহযোগিতা দেওয়ার জন্য তিনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি মেডিকেল টিম এবং ত্রাণ সামগ্রীও পাঠান।
আরব-ইসরাইল যুদ্ধের কিছু দিন পর সে বছরেই আলজিয়ার্সে ন্যাম সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রের মর্যাদা পায় বাংলাদেশ। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে যোগ দেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং সেই সম্মেলনে ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাতের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায়ও মিলিত হন। সেটাই ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে সর্বপ্রথম ফিলিস্তিনী কোনো সংগঠনের অতি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। ১৯৭৪ সালে আরব রাষ্ট্রগুলো পাকিস্তানকে চাপ দিতে থাকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার জন্য। পাকিস্তান এক পর্যায়ে স্বীকৃতি দিতে বাধ্যও হয়।

এরই মধ্যে বাংলাদেশের দরজা উম্মুক্ত করা হয় ফিলিস্তিনের জন্য এবং ঢাকায় ইয়াসির আরাফাতের পিএলও কে বঙ্গবন্ধু সরকার আমন্ত্রণ জানায় অফিস খোলার জন্য। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকায় পিএলও নেতা এবং কূটনীতিকরা আসেন এবং ফিলিস্তিনের প্রথম কোনো দপ্তর খোলা হয় । এসময় বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় এবং কূটনৈতিক প্রোগ্রামে ফিলিস্তিনের কূটনৈতিকদের প্রায়ই অংশ নিতে দেখা যেতো বলে জানা যায়। ১৯৭৬ সালে ঢাকার আমেরিকান এ্যাম্বেসির পাঠানো এক বার্তার সূত্রে এ তথ্য ফাঁস করে উইকিলিকস।

মুসিলম রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিন এবং তার জনগণের প্রতি সবসময়ই বাংলাদেশের মানুষের সহানুভূতি-ভালোবাসা ছিলো অফুরান। এ সম্পর্কের আরেক মাইলফলক উম্মোচিত হয় ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে। এসময় ফিলিস্তিনীদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন জানিয়ে তা স্মরণীয় করে রাখতে সরকার প্রকাশ করে একটি স্মারক ডাকটিকিট, যেখানে একজন ফিলিস্তিনী যোদ্ধাকে দেখা যায় অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো এবং তার পেছনে কাঁটাতারে ঘেরা মসজিদুল আক্বসা। এই ডাকটিকিটে ইংরেজিতে লেখা ছিলো- ‘আমরা বীর ফিলিস্তিনী স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের স্যালুট জানাই।’

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে প্রথমবারের মত বাংলাদেশ সফরে আসেন পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাত। মুসলিম বিশ্বে খুব কম সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া বাংলাদেশী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজে উপস্থিত থেকে লাল গালিচা সংবর্ধনা জানান ফিলিস্তিনি এই নেতাকে। ফিলিস্তিন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ-ভালোবাসা এবং উৎকণ্ঠা দেখে অভিভূত হন ইয়াসির আরাফাত। রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্রীয় বড় সব কর্মকর্তারা তাকে যথাযথ সম্মান জানান এবং সমাদর করেন।

১৯৮৮ সালে ইউএস লাইব্রেরী অফ কংগ্রেসের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত তার দ্বিতীয় বারের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ সরকার তাকে জানান যে এদেশের প্রায় ৮ হাজার যুবক স্বেচ্ছায় ফিলিস্তিনের জন্য লড়াই করছেন। এছাড়া এই রিপোর্টে আরো জানানো হয়, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের বেশ কিছু নেতা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অধীনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ।

আজকের দিনে এরকম ডকুমেন্টস খুঁজে পাওয়া খুবই মুশকিল যেখানে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে, ঠিক কতজন বাংলাদেশি লেবাবনে সেইসময় ফিলিস্তিনিদের সাথে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন, কতজন শহীদ হয়েছিলেন কিংবা তারা কোন ইউনিটের সাথে ছিলেন । মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় পত্রিকা আল-আখবার বৈরুতে এ বিষয়ে বাংলাদেশ এ্যাম্বেসির সাথে যোগাযোগ করলে এ্যাম্বেসির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে এরকম ইতিহাস বা ঘটনা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের দলিলে থাকলেও খুব বিস্তারিত বা বলার মত পর্যাপ্ত তথ্য তাদের কাছে নেই। বৈরুতের ফিলিস্তিন এ্যাম্বেসিও এ বিষয়ে খুব বেশি বলতে পারে নি কারণ, লেবাননে আগ্রাসনের সময় তাদের দপ্তরে হামলা চালিয়ে ইসরাইল সব কাগজপত্র পুড়িয়ে দেয়। সুতরাং এ সংক্রান্ত কোন দলিল থেকে থাকলেও তা নষ্ট হয়ে গেছে।

ফিলিস্তিনের তৎকালীন নেতাদের স্মৃতিতে কি আছে বাংলাদেশের সেসব দুঃসাহসী তরুণদের কথা? অনেকের মনেই হয়তো এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকে ভুলে গেলেও সবাই যে ভুলে গেছেন তা কিন্তু নয়। অনেকেই মনে রেখেছেন। লেবাননে ফাতাহর সেক্রেটারী এবং তৎকালীন পিএলও নেতা ফাতহি আবু আল আরাদাতের কথায় যার প্রমাণ মেলে।

তার কথা খানিকটা এমনই-

‘তারা সংখ্যায় ছিলেন প্রায় এক থেকে দেড় হাজারের মত। এমনও ব্যাটালিয়ন ছিল আমাদের যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিলেন বাংলাদেশী। তবে তাদের বেশিরভাগই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন ফ্রন্টে বিভিন্ন গ্রুপের সাথে কাজ করেছেন। আমার মনে পড়ে তারা ছিলেন খুবই সুশৃঙ্খল এবং অদম্য। যখন ইসরাইল লেবাননে হামলা করলো তখন বেশ কিছু বাংলাদেশী যুবক ইসরাইলীদের হাতে ধরা পড়েন। তারা ইসরাইলী সেনাদেরকে বলতো, ‘চখঙ, ওংৎধবষর ঘড়’! এমনকি প্রচন্ড নির্যাতন করার পরও এমন কথা বলতেন। অন্য সকল যোদ্ধাদের সাথে তাদের সুসম্পর্ক ছিলো এবং ফিলিস্তিনের মুক্তির ব্যাপারে তাদের দৃঢ় আশা এবং বিশ্বাস ছিলো।’

যদিও সেই সময়ে ফাতাহ অর্থাৎ পিএলওই ছিলো ফিলিস্তিনী মুক্তি আন্দোলনের প্রধান গ্রুপ। তাই বিদেশী যোদ্ধাদের বেশিরভাগই তাদের সাথে কাজ করতেন। এছাড়া আরো ছোটখাটো কিছু গ্রুপ ছিলো যারা ফাতাহর কমান্ডের বাইরে লড়াই করতো। এরকমই কিছুটা বামপন্থী আদর্শের একটা গ্রুপ- চঋখচ । এই গ্রুপটা তাদের মূল দল চঋখচ থেকে পৃথক হয়ে যায় আদর্শগত বিরোধের কারণে এবং তারা সিরিয়ার বামপন্থী সরকার থেকে সমর্থন পেতো।

চঋখচ’র তৎকালীন একজন কমান্ডার জিয়াদ হাম্মো বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেকেই চঋখচ-এঈ’র সাথে ছিলেন। তাদের মিলিটারি ট্যালেন্ট ছিলো চমৎকার। তবে বেশিরভাগ সময়ই তারা সেবা দেওয়ার কাজ করতেন, যেমন অস্ত্র-গুলি বহন কিংবা যোদ্ধাদের জন্য রসদ সরবরাহ। অফিস/ঘাঁটি পাহারাতেও তারা আমাদের সাথে কাজ করতেন। কখনও সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নিতে চাইলে তারা ফিল্ডে চলে যেতেন। আমি তাদের মধ্য থেকে এখনও ২/৩ জনকে পরিষ্কার মনে করতে পারি। একজন বেকাতে আমাদের ঘাঁটি পাহারা দিতেন, আরেকজন বাবলেকে। তারা কেউ কেউ চমৎকার আরবীও বলতে পারতেন। এজন্য মানুষ ভুলেই গিয়েছিলো তারা বাংলাদেশি।’

১৯৮২ সালে লেবাননে জাতিসংঘের বাহিনী মোতায়েন হবার পর তারা লেবানন ছাড়া শুরু করেন। অনেকেই শহীদ হয়ে যান যুদ্ধে, অনেকে ইসরাইলের হাতে আটক হয়ে অনেকদিন পর ছাড়া পান। কেউ কেউ লেবাননেই বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত হয়ে বাকি জীবনটা সেখানে কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এখনও বৈরুতের কোন গলিতে খুঁজলে হয়তো কোনো কোনো বাংলাদেশি বৃদ্ধকে পাওয়াও যেতে পারে, আর সাথে পাওয়া যেতে পারে চাপা পড়ে যাওয়া এক ইতিহাস।
দক্ষিণ লেবাননের শাতিলা রিফিউজি ক্যাম্পের অদূরেই একটা কবরস্থান। ১৯৭০ থেকে শহীদ হয়ে আসা ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগ্রামের শহীদদের সমাধি এখানে। একটু খুঁজলেই কিছু বিদেশী ব্যক্তির কবর চোখে পড়ে। বেশ কিছু লেবানিজ, সিরিয়ান, তিউনিশিয়ান, ইরাকী বা দু একজন কুর্দি ও রাশিয়ান শহীদের কবরের মধ্যে হঠাৎ চোখ আটকে যায় ‘বাংলাদেশ’ নামের একটি কবর ফলকে।

বাংলাদেশি সে শহীদের নাম কামাল মুস্তাফা আলী। কামাল মুস্তাফা আলী কে, তার বাড়ি বাংলাদেশের কোথায় কিংবা তার জন্ম কবে এর কিছুই কবর ফলকে লেখা নেই । শুধু নাম, দেশ, শহীদ হবার স্থান-সময় এবং পবিত্র কুরআনুল কারিমের একটি আয়াত সেখানে লেখা আছে-
يُرْزَقُونَ رَبِّهِمْ عِنْدَ أَحْيَاءٌ بَلْ أَمْوَاتاً اللهِ سَبِيلِ فِى قُتِلُواْ الَّذِينَ تَحْسَبَنَّ وَلاَ

‘আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়, তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না; বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত।’ (সূরা আল-ইমরান, আয়াত- ১৬৯)

কামাল মুস্তাফা আলী শাহাদাত বরণ করেন ১৯৮২’র ২২ জুলাই এক দুঃসাহসী লড়াইয়ের সময়। দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়া এলাকায় অবস্থিত হিগ রক দূর্গে ইসরাইলিদের হাতে তিনি শহীদ হন। সুপ্রাচীন এই দূর্গটি ইবধঁভড়ৎঃ ঈধংঃষব নামেও পরিচিত। অবস্থানগতভাবে এই দূর্গটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে এই দূর্গে বহু রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে হাজার বছর ধরে। সেই ক্রুসেডার এবং সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর সময়ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক লড়াই এবং সংঘাতের সাক্ষী এই দূর্গ। ১৯৭৬ সাল থেকে এই দূর্গটি ফিলিস্তিনিরা নিয়ন্ত্রণ করতো এবং ইসরাইল সীমান্তে লড়াইয়ের জন্য এটি একটি মজবুত ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

১৯৮২ সালের ৬ জুন লেবানন আক্রমণ করে ইসরাইল এবং বৈরুতে ঢোকার পথে তাদের প্রথম দফা টার্গেট ছিলো হিগ রক ক্যাসল। ইসরাইলের সুতীব্র স্থল এবং বিমান হামলার ভয়াবহতার মুখেও টানা ২ দিন এই দূর্গের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন ফিলিস্তিনিরা। কঠিন প্রতিরোধের মুখে দূর্গের পতন ঘটানোর জন্য ইসরাইলকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। কামাল মুস্তাফা আলী সেই মহান সৈনিকদেরই একজন, যারা শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্ত করার জন্য লড়েছিলেন এবং শেষ রক্তবিন্দুটিও ইসলামের শত্রুদের মোকাবেলায় ঢেলে দিয়েছিলেন।

আর এভাবেই প্রত্যক্ষভাবে ফিলিস্তিনের সাথে জড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের নাম। শুরু থেকে নিয়ে আজও বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের পাশেই আছে। ভ্রাতৃত্বের পূর্ণ মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে। থাকবে চিরকাল, ইনশাআল্লাহ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.