পাশ্চাত্যে ইসলামের জাগরণ-১ (ফ্রান্স পর্ব )

৭১১ খৃষ্টাব্দ থেকে নিয়ে ২০১৫- হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ফ্রান্সে ইসলামের ঐতিহাসিক অভিযাত্রা এবং শার্লি এবদো ও সাম্প্রতিক প্যারিস হামলার আদ্যোপান্ত নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের এক অসামান্য প্রয়াস- “কোন পথে ইউরোপের ইসলাম?”

শাকিল আদনান
আলেম। লেখক। সম্পাদক।

ইসলামের পবিত্র বীজ গর্ভে ধারণ করেই উন্নতি ও সাফল্যের পথে হাঁটছে আজকের পাশ্চাত্য। একদিন এই পাশ্চাত্য থেকেই উড়বে ইসলামের বিজয়ী পতাকা।
-বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসী রহ.

[বদলে যাওয়া তুরস্কের স্বপ্নদ্রষ্টা, কালজয়ী আলেম]

লেখকের নিবেদন

পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। দম ফেলার আগেই পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট। প্রযুক্তিজগতে নিত্যনতুন বিপ্লব ঘটিয়ে মানুষ একদিকে জীবনকে গতিময় করছে, সেই মানুষই আবার যখন-তখন রাজনৈতিক খেলার অসহায় পুতুল হচ্ছে। চারপাশে একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে এবং কী ঘটলো কেনো ঘটলো ঠিকভাবে বুঝতে পারার আগেই নতুন ঘটনার খবর চলে আসছে। প্রতিটি ঘটনা এতোটা আকস্মিক ও লোমহর্ষক, পেছনের কারণগুলো নিয়ে স্থির কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না। কখনো আসা গেলেও সেটা বহাল থাকছে না। রাতে একরকম ভাবনা নিয়ে ঘুমুতে গেলে সকালের নতুন কোনো খবরে পুরো ভাবনার মোড় ঘুরে যাচেছ। ‘ঘটনার ঘনঘটা’ শব্দবন্ধ দিয়েও ব্যাপারটার ঠিকঠাক ব্যাখ্যা বোধ হয় সম্ভব নয়। মানসিক এই অস্থিরতা আজকাল সবখানে ছড়িয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক দিনযাপনটাই হয়ে ওঠছে অসম্ভব।

বড় আশংকার ব্যাপার- নিয়ন্ত্রণের লাগামটা কারো হাতে থাকছে না। না ব্যক্তি, না রাষ্ট্র- কারো কাছে কোনো সমাধান নেই। অনুমানটুকুও নেই- কী ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে আসছে দিনগুলোতে। সবাই আমরা শান্তি চাই, স্বস্তি চাই- কিন্তু ব্যক্তি ও সমাজভেদে চাওয়ার মাত্রা আর ধরনগুলো এতো ব্যতিক্রম, পাওয়ার তীব্রতা এতো জিঘাংসামূলক যে, শেষ পর্যন্ত মানুষ আমাদের জীবনেরই কোনো মূল্য থাকছে না।

লোভ আর ক্ষমতার রাজনীতি বিশ্বকে আজ আস্ত একটা অগ্নিকুণ্ড বানিয়ে ছেড়েছে।

আমাদের চারপাশে অস্বাভাবিক যা ঘটে, সবকিছুর পেছনে সাধারণত মানুষেরই হাত থাকে। এই অপরাধী হয়তো আমার পরিচিত, হয়তো নয়। হয়তো সে আমার দেশের, হয়তো অন্যদেশের। হতে পারে সে আমার ধর্মের কিংবা অন্য কোনো ধর্মের। যে হোক, যেখানের হোক বা যে ধর্মেরই হোক- আল্টিমেটলি একজন মানুষই তো। খুন-গুম-ব্যভিচারের মতো জঘন্যতম অপরাধ যা পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত ঘটছে, ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের সাধ্য নেই সেগুলো বন্ধ করার বা থামিয়ে দেওয়ার। সরাসরি এগুলো হয়তো আমাদের দায়িত্বও নয়- কিন্তু চাইলেই কি এসবের প্রভাব আমরা এড়াতে পারি? মহান আল্লাহ যে জীবন আমাদের দিয়েছেন- ঠিক পথে সে জীবনকে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে নেওয়াই আমাদের কাজ। এই ‘ঠিক পথে’ কথাটা মূল দায়িত্বের সাথে আরো অনেকগুলো দায়িত্বের ভাবনা সামনে নিয়ে আসে।

আমাদেরকে তাই শুধু নিজের কথা ভাবলে চলে না, প্রতিবেশীদেরও ভাবনায় শামিল করতে হয়। মুসলিম ভাইবোনদের স্বার্থচিন্তা মাথায় রাখতে হয়। একজন মানুষ তখনই ঠিকঠাকভাবে এসব করে এবং পারে- জীবন আর চারপাশের জগৎ নিয়ে তার জানাশোনাটা যখন ব্যালেন্সড হয়। প্রচুর না হলেও পর্যাপ্ত হয়। পরিস্থিতি বিচারে যখন তার সত্যিকার একটা দেমাগ তৈরি হয়। পৃথিবীজুড়ে গবেষণা, লেখালেখি বা বলাবলির এই যে চর্চা, উদ্দেশ্য তো এই একটিই।

ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনা একটার পর একটা ঘটতে থাকবে, মিডিয়ার কাঁধে চড়ে খবরের ধারাও অব্যাহত থাকবে; সেগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু ছাঁচে ফেলো। সহজ করে ভাবো, সমাধান খোঁজো এবং ঠিক করো নিজের কর্মপদ্ধতি। তাহলেই দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হবে। স্বস্তিদায়ক হবে জীবনচলার পথ।

বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর আজকের যে দুর্দশাগ্রস্ত ও জর্জরিত হাল, আশাবাদী হওয়ার প্রত্যক্ষ বা দৃশ্যমান কোনো কারণ তো নেই। বড় স্বস্তির বিষয়- গন্তব্যটা আমরা জানি। আমাদের শাশ্বত পথনির্দেশক কুরআন এবং হাদীসে উম্মাহর জয়-পরাজয় আর উত্থান-পতন নিয়ে সবিস্তার বিবরণ বিদ্যমান। আজকের পরাজিত ও অধঃপতিত হালতের পর সময় তো কেবল উত্থানের। কখন, কোত্থেকে বা কীভাবে সেটা শুরু হবে- এইটুকু শুধু জানা নেই। আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসার পাশাপাশি প্রচেষ্টাটা তাই আরো ব্যাপক এবং চিন্তার ক্ষেত্রটা আরো প্রসারিত করা দরকার।

আরবের পবিত্র ভূমি না পশ্চিমের দিকভ্রান্ত সমাজ- কোত্থেকে উম্মাহর এ জয়যাত্রা শুরু হবে বা ইতোমধ্যে হয়েও গেছে কিনা কে বলতে পারে! উপেক্ষা বা একপেশে ভাবনার পরিবর্তে এখন তাই সচেতনতা এবং ভালোবাসার বিস্তার ঘটানো দরকার। আবেগের জায়গা থেকে বেরিয়ে নির্মোহ মূল্যায়নে যাওয়া দরকার। এসব ভাবনা থেকেই এই মুহূর্তের পাশ্চাত্যকে একটু বিশদভাবে জানার প্রচেষ্টাটি শুরু করেছিলাম। হতাশ হয়ে লক্ষ করলাম- এ নিয়ে তেমন কাজই হয়নি আমাদের। টুকটাক যা-ও হয় বা হচ্ছে- আবেগ, মিথ আর একপ্রকার ঘৃণার মিশেলে সেগুলো এতোটাই গোলমেলে- সিদ্ধান্তে যাবার কোনো সুযোগই নেই। আজকের এই জটাজটিল বিশ্বে এককথায় সমাধান করা বা সিদ্ধান্তে যাওয়ার মানসিকতা তো রীতিমতো আত্মঘাতি। পড়ার টেবিল ছাপিয়ে একসময় লেখার কাজ শুরু হলো, বন্ধুবর ওয়ালিউল্লাহ আব্দুল জলিলের সৌজন্যে এসময় এগিয়ে এলো জামেয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকার গবেষণাধর্মী ম্যাগাজিন নেয়ামত। ধারাবাহিকভাবে বেশকিছু লেখা মাসিক নেয়ামতে প্রকাশিত হলো।

এরপরের কৃতিত্ব পাঠকবর্গের। তাদের চাওয়া এবং অব্যাহত প্রেরণাতেই প্রচেষ্টাটি এখনো চালু রয়েছে। ইনশাআল্লাহ থাকবে। শার্লি এবদোয় হামলার প্রেক্ষাপটে লেখাটা শুরু হওয়ায় প্রথমে ফ্রান্স নিয়ে আলোচনা এসেছে। সাত পর্বের সে আলোচনা পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। বই করার তাগাদাটাও তখন থেকেই শুরু। বছর না পেরুতেই এরপর প্যারিসের রহস্যময় সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে ত্বরান্বিত হয় বই প্রকাশের দাবি। অধমও তাই দেরি না করে মোটামুটি একটা ফরম্যাট দাঁড় করিয়ে আপনাদের করকমলে পেশ করার প্রয়াস পেলাম। বাহুল্য ও দীর্ঘসূত্রিতা এড়িয়ে এই আলোচনায় কেবল মৌলিক বিষয়গুলো তুলে আনার চেষ্টা করেছি। তবু শুধু ফ্রান্সের প্রেক্ষাপটে করা আলোচনা দিয়েই আস্ত এই বই দাঁড়িয়ে গেছে। শিরোনামের ইউরোপ বলতে এখানে বিশেষভাবে ফ্রান্সকে বিবেচনায় রেখে বইটি পাঠের আহ্বান থাকলো।

ফ্রান্সের মুসলিম সমাজ, ফ্রান্সে ইসলামের প্রায় তেরশ’ বছরের ঐতিহাসিক অভিযাত্রা এবং আজকের বাস্তবতার পাশাপাশি শার্লি এবদো ও সাম্প্রতিক প্যারিস হামলা নিয়ে সবিস্তার আলোচনা এই বইয়ে স্থান পেয়েছে। শেষদিকে প্রখ্যাত কুরআন গবেষক ডা. মরিস বুকাইলির দুর্লভ একটি সাক্ষাৎকারসহ ফ্রান্সেরই ক’জন নওমুসলিমের আত্মকাহিনী যুক্ত হয়েছে।

লেখালেখি আদতে সহজ না কঠিন, এ নিয়ে তর্ক হতেই পারে। কারো বেলায় লেখালেখিকে যেমন খুব সাধারণ একটা ব্যাপার মনে হয়, কারো বেলায় আবার ভাবাই যায় না। চাইলেই কি আর কিছু লিখে ফেলা যায়! তবে তর্ক-বিতর্কের প্রসঙ্গ এড়িয়ে এটুকু অন্তত বলাই যায়- কল্পনার রাজ্য ছেড়ে লেখা যতোটা বাস্তবভিত্তিক হয়, চারপাশের প্রকৃতি বা তাত্ত্বিক বিষয়াদির বাইরে লেখা যতোটা জীবনঘনিষ্ঠ হয় কিংবা মহান আল্লাহর অবাক সৃষ্টি মানুষই যখন উপজীব্য হয়ে ওঠে; লেখালেখিটা তখন সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ভিন্ন দেশ, অচেনা পরিবেশ, অনভ্যস্ত সংস্কৃতির মানুষ আর তাদের জীবনধারা নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো বেশি সত্যি।

‘কোন পথে ইউরোপের ইসলাম’- শিরোনামের বক্ষমান বইটির কাজ করতে গিয়ে বরাবর আমাকে এই জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ইউরোপ- শুধু ইউরোপ কেনো পুরো পশ্চিমা বিশ্ব নিয়েই আমাদের সমাজে মিথের দারুণ ছড়াছড়ি, বিশেষত ইসলাম বা মুসলিম সমাজকেন্দ্রিক ভাবাভাবি তো পুরোই আবেগনির্ভর। এমন বৈরী বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ইন্টারনেটের মতো বিভ্রান্তিকর তথ্যজালের চ্যালেঞ্জ ডিঙিয়ে প্রকৃত সত্য তুলে আনার কাজটা তো জটিলই হবার কথা। নিজের যৎ সামান্য জ্ঞান, উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা; অজ¯্র ওয়েবসাইট এবং সবশেষে ইউরোপেরই ক’জন নওমুসলিম ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে যাওয়া অভিবাসীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে কাজটা চালিয়ে যেতে হয়েছে। এ পর্যন্ত যেটুকু করা গেলো, আল্লাহ পাকের অশেষ মেহেরবানি ছাড়া কিছুতেই তা সম্ভবপর ছিলো না। প্রশংসা সব মহান সে মালিকের।

মাসিক ম্যাগাজিন ‘নতুন ডাক’ -’র মতো আমার প্রায় সব কাজই তরুণদের উদ্দেশ্যে করা। এদেশের ঘুমন্ত তারুণ্যের প্রতিই আমার সকল নিবেদন। এই বইয়ের কাজ করতে গিয়েও বিবেচনাটা হয়তো এড়াতে পারি নি। বইটিকে তাই চূড়ান্ত কোনো গবেষণাকর্ম হিসেবে গ্রহণ না করে বরং পাশ্চাত্য বিষয়ক আপনার নিজস্ব জানাশোনা এবং ভাবাভাবির সহযোগী একটি গ্রন্থণা হিসেবে বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ থাকলো। কাজের শুরুতেই দুটো বিষয়কে একপ্রকার মূলনীতি হিসেবে স্থির করে নিয়েছিলাম- আবেগের জায়গা থেকে বেরিয়ে ও যথাসাধ্য বিভ্রান্তি এড়িয়ে প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরা এবং নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা থেকে বিরত থাকা। সচেতনভাবেই নীতিটা মেনে চলার চেষ্টা করেছি- কোথাও ব্যত্যয় ঘটলে নিঃসন্দেহে তা আমারই ব্যর্থতা।

আবেগের জায়গা থেকে বেরুতে না পারলে কোনো কাজেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। দৃশ্যমান লড়াইয়ের বাইরেও ভেতরগত যে লড়াইটা পাশ্চাত্যে আমাদের মুসলিম ভাই-বোনেরা করে যাচ্ছেন, সেটা তো বিশেষ কোনো এলাকা বা সময়ে সীমবদ্ধ নয়। লড়াই সবখানের। প্রতিমুহূর্তের।

তাদের মধ্যে প্রবহমান ¯্রােতে গা ভাসানোর নজির যেমন আছে, সবধরনের নোংরামি আর বৈরিতা ঠেলে সামনে এগিয়ে চলার লোকেরও অভাব নেই। অবজ্ঞায় চোখ ফেরানো বা সহমর্মিতায় গলে পড়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের সংগ্রামের ভাষাটা পড়তে পারা। প্রাথমিক দায়িত্ব হিসেবে এখানে আমি তাই নির্মোহ বাস্তবতাটাই তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট, বৈরী মত ও পথের ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য হুবহু তুলে ধরতেও কার্পণ্য করি নি শুধু এই ভাবনায়। আরোপিত সিদ্ধান্ত সব সম্ভাবনাকে শুরুতেই দাফন করে দিতে পারে, অগ্রসর ভাবনা এবং রুচিবোধের এই জায়গাটার প্রতিও যথাযথ সম্মান বজায় রাখতে চেয়েছি। কতোটুকু পারলাম, সেই বিবেচনা এখন আপনাদের হাতে।

বই প্রকাশের এই মুহূর্তে স্মরণ করছি আমার সব বন্ধু-সুহৃদদের, প্রতিনিয়ত যাদের সাথে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। ভেতরের একটা তাড়না থেকেই দিনমান এসব ভাবনায় আমরা মেতে থাকি। প্রত্যাশায় দোষ কী- কোনো একদিন সত্যিই হয়তো কাঙ্খিত পথের দিশা পেয়ে যাবো। স্বপ্নময় সে যাত্রার অপেক্ষায় একটা জীবন তো কাটিয়েই দেয়া যায়- প্রত্যয়ীদের হারাবার যে কিছু নেই!
-শাকিল আদনান
নয়ানগর, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
২৬/১২/১৫ইং

সময় এবং আমাদের উপলব্ধি

Sakil books

নিয়ম বা সাধারণ বাস্তবতা বলে আজকাল আর কিছু নেই পৃথিবীতে। সবই কেমন এলোমেলো, সবই কেমন অস্বাভাবিক। প্রযুক্তির খামখেয়ালি প্রয়োগের পাশাপাশি প্রকৃতিও এখন নিয়মিত ভাঙছে তার চিরকালীন শৃঙ্খলার কোড। আমরা তাই শীতকালে হঠাৎ গরমে ঘামি আর গ্রীষ্মে কাঁপি হঠাৎ নামা বৃষ্টিতে। সাগর-নদী এখন শুধু আর ধুয়ে-মুছে নয় ভাসিয়েও দিয়ে যায়, ফাটা-চৌচির বক্ষ নিয়ে হাহাকার ছড়িয়ে চলে জনপদের পর জনপদে। সবমিলিয়ে অন্ধকার টানেলের মধ্য দিয়ে অজানা এক গন্তব্যের পথে অমাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছে। মানবজাতির এই ক্রান্তিকাল কবে শেষ হবে বা আদৌ শেষ হবে কিনা অনুমান করা মুশকিল। নিজের প্রয়োজন আর একটু ভালোর জন্য দশজনের ক্ষতি করা যদি ভুল না মনে হয়- এই দুঃসময় তাহলে কাটবে না। কারো ভোগ, কারো ভোগান্তি- এমন অমানবিক নিয়মেই চলছে-চালিত হচ্ছে আজকের পৃথিবী।

নিজের ভালো অন্যের ক্ষতি বা কারো ভোগ কারো ভোগান্তি- এই কথাটা যতো সহজে বলে ফেলা গেলো ব্যাপার কি ততো সহজেই শেষ হচ্ছে? ব্যক্তি, সমাজ, দেশ কিংবা বিশ্ব সবক্ষেত্রেই এই কথাগুলোর সমান প্রয়োগ হতে পারে। একটা সময় ছিলো- যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা কিংবা প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতায় মানুষের ভাবাভাবি কেবল প্রবিবেশীদের মধ্যেই সীমিত ছিলো। সময় বদলালো। প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটার সাথে সাথে মানুষের ভাবনার সীমাও বিস্তৃত হলো। আগে যে দশজনের কথা ভাবতো, এখন ভাবছে হাজারজনের কথা। আগে যে একজনকে ঠকাতো, এখন ঠকাচ্ছে হাজারজনকে। একই ব্যাপার সমাজ এবং রাষ্ট্রের বেলায়ও, কিছু পরিভাষাই বদলায় কেবল। নয়তো- সুসভ্য ও সর্বাধুনিকের তকমা আঁটা উন্নততর এই বিশ্বেই মানবতা বা সাম্যের মতো ব্যাপারগুলোর স্থান কোথায়? বড় রাষ্ট্রগুলো শক্তি এবং আখের গোছানোর প্রতিযোগিতায় প্রথমে নিজেদের মধ্যে লড়াই করেছে। একসময় সেটা ছড়িয়ে দিয়েছে উন্নয়নশীল বা তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও।

খেলাটা বিশ্বময় ছড়িয়ে গেলেও হিসেব অনুযায়ী খেলোয়াড় আর সুবিধাভোগী থেকে গেছে তারাই। ধর্ম ব্যাপারটাই বা এখান থেকে বাদ থাকবে কেনো? একসময় ধর্মও এলো অবধারিতভাবে। আর কিছু বুঝতে পারার আগেই ইসলাম একক প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসেবে দাঁড়িয়ে গেলো পৃথিবীর তাবৎ ধর্মমতের বিরুদ্ধে। সংক্ষেপে- এ-ই হলো গোটা বিশ শতকের চূড়ান্ত খতিয়ান।

একবিংশ শতাব্দীটা মুসলিম জাতির জন্য যখন ঘোর অমানিশা নিয়ে হাজির হলো, বহু বর্ণের আড়ালে মূলত এক ধর্মের অনুসারী বাকি বিশ্ব তখন প্রস্তুতি নিলো আপাত অদৃশ্য সে শত্রুর বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের। ইসলাম এখানে তাই আর শাশ্বত জীবনবিধান বা ধর্মও নয়, কেবল উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের নাম। মুসলিম জাতি সন্ত্রাসী। মুসলিম রাষ্ট্রগুলো সা¤্রাজ্যবাদী মোড়লদের নানারকম দরকারি-অদরকারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার উর্বর ক্ষেত্র। আর মুসলমানদের অর্থ-সম্পদ নিজেদের ভাত-কাপড়ের মৌলিক অধিকার, সেবা, নিরাপত্তা বা উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য নয়, কেবল যেনো ভিনদেশী অস্ত্র আমদানির কড়কড়ে ডলার।

ইসলামের ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীটা যদি সূর্যাস্তের শেষ প্রহর হয়, সন্দেহ নেই একবিংশ শতাব্দীর শুরুটাই তাহলে অমাবশ্যার ঘোর লাগা সন্ধ্যার চেয়েও আঁধারে ঢাকা। একজন মুসলিম হিসেবে আমার-আপনার ভাবনা, অবস্থান সেক্ষেত্রে কোথায়; পদক্ষেপই-বা কী – একবার ভেবেছেন?

কেনো ইউরোপের আলোচনা?

মুসলিম উম্মাহর সাম্প্রতিক বিষয়-আশয় নিয়ে আলোচনার প্রথমদিকে ইউরোপকে নিয়ে আসাটাই প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। উম্মাহ নিয়ে আমাদের ভাবাভাবিটা সাধারণ কয়েকটি ফরম্যাটে বিন্যস্ত। একদিকে উপমহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য, অন্যদিকে নির্যাতনের শিকার ও যুদ্ধাক্রান্ত মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ এবং এর বাইরে ন্যাটোভুক্ত ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলো। বিশেষ কারণ ছাড়া এই বিন্যাসকে অবশ্য উপেক্ষা করারও উপায় নেই। ইউরোপ-আমেরিকার প্রায় এক হয়ে যাওয়া এই মিলটা যে বিবেচনায়, সেটা ঠিক থেকেও সাম্প্রতিক নানা কারণে ইউরোপ আলোচনায় উঠে এসেছে একদম স্বতন্ত্রভাবে।

ঝিমিয়ে পড়া আরব বসন্ত থেকে দুরন্ত আইএস, জেগে উঠতে থাকা তুরষ্ক থেকে ইউক্রেন হয়ে রাশিয়া, সাপ্তাহিক ব্যাঙ্গ ম্যাগাজিন শার্লি এবদোয় দুই মুসলিম সহোদরের হামলা থেকে নিয়ে পরবর্তী কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ এবং সবশেষে এই নভেম্বরে প্যারিসের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ইউরোপকে সামনে নিয়ে এসেছে সম্পূর্ণ আলাদা মহিমায়। মুসলিম হালচাল নিয়ে এই মুহূর্তের ব্যবচ্ছেদে তাই ইউরোপেরই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। আমরাও তাই ইউরোপের আলোচনাটাই প্রথমে নিয়ে এলাম।

ইউরোপীয় তরুণদের ভাবনা

সেদিন ইউরোপের মুসলিম জনগোষ্ঠীর এক পরিসংখ্যান ঘাটতে গিয়ে বিশেষ একটি মন্তব্য পেলাম। পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান হার দেখে বিরক্ত এনোনিমাস ছদ্মনামের খৃষ্টান যুবক চমৎকার ভাষায় একটা দাবি তুলে ধরেছে। তার কথা- ‘মুসলিমরা পশ্চিমা সমাজে বসবাসের উপযুক্ত নয়।’ অনেক কারণের মধ্যে তার কাছে মূল কারণ হলো- সাংস্কৃতিক বৈষম্য। ‘পশ্চিমারা ‘ফ্রি মাইন্ড এন্ড ওপেন লাইফ’- তথা উদার মন ও উন্মুক্তধারার জীবনযাপনে অভ্যস্ত। (উদারতা, খোলামেলা কিংবা উন্মুক্ত শব্দ দিয়ে তো আর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা যায় না, বাস্তবতাটা অনুমান করে নিন…)। মুসলিমেরা ঠিক এর বিপরীত। গোঁড়া। মসজিদে মসজিদে ছোটে, দাড়ি রাখে, বোরকা পরে। প্রতিবেশী কারো সাথে বন্ধুত্ব করে না, মেশে না । প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথে কথা বলে না, এমনকি ফিরেও তাকায় না। সুতরাং পশ্চিমে মুসলিমদের অভিবাসন তো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। যারা আছে তারা হয়তো এখানকার নিয়মে অভ্যস্ত হবে, নয়তো কোনো মুসলিমদেশে চলে যাবে।’ তার ভাষায়- ‘কেনোই-বা সেটা করা হবে না- মুসলিমরা যেমন পশ্চিমে এসে দাড়ি রাখে, বোরকা পরে এবং নিজেদের ধর্মীয় গোঁড়ামি পুরোপুরি ফলো করতে চায়, আপনারা কি কল্পনা করতে পারেন যে কোনো মুসলিমদেশে বা সাধারণ মুসলিম কমিউনিটিতে গিয়ে পশ্চিমের কোনো লোক চার্চে দৌড়াবে, হাফপ্যান্ট পরবে কিংবা পশ্চিমের কোনো নারী বিকিনি পরে ঘুরবে আর মুসলিমরা চুপচাপ বসে থাকবে? আপনি নিরাপদ থাকতে পারবেন? সুতরাং তারা যেটা পারবে না সেটা আমাদের কেনো করতে হবে?’…

আরো অনেক কমেন্টের মধ্যে এটিকেই আমি কোট করলাম কারণ, এটাই বেশিরভাগ পশ্চিমা তরুণ-তরুণীর মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করছে। সেই পরিসংখ্যানে ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনসংখ্যার পাশাপাশি ইউরোপের কোন্ দেশের মানুষেরা মুসলিমদের কেমন দৃষ্টিতে দেখে তারও একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। গড় হিসেবে ৩০-৪০% ইউরোপিয়ান মুসলিম অভিবাসনকে মোটেও ভালো চোখে দেখে না। অনেক মন্তব্যকারীর আপত্তি এখানেই। তাদের মতে বেশিরভাগ এবং প্রায় সবাই মুসলিম অভিবাসন অপছন্দ করে। ক’দিন আগে পুরনো সে রিপোর্টে একজন তো আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করে বসেছেন- ‘শার্লি এবদোতে হামলার পরও কি গবেষকগণ মনে করেন যে মাত্র ৩০-৪০% ইউরোপিয়ান মুসলিমদের অপছন্দ করে?…সেটা কিছুতেই সত্য নয় এবং প্রায় সবাই এখন মুসলিমদের অপছন্দ শুধু নয়, ঘৃণা করে।’

এগুলো সব ইউরোপীয়দেরই মন্তব্য, আপনি তাই চাইলেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা দুয়েকজন ব্যতিক্রম হতেই পারে বলে এসবকে উপেক্ষা করতে পারেন না। তাদের কেউ কেউ অবশ্য কিছুটা নমনীয়। তবে তাদের সংখ্যা প্রত্যাশিতভাবেই অপ্রতুল। খুব অপ্রতুল। এর বাইরে সাধারণ অনেকেই ইসলাম এবং মুসলিম ইস্যুটিকে নিজেদের স্বাভাবিক জীবন চলার পথে ¯্রফে একটা ঝামেলা মনে করে। উটকো ঝামেলা।

বিশেষ একটি পরিসংখ্যান

দীন ওবাইদুল্লাহ। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ পরিচিত মুখ, নাট্যকার ও কমেডিয়ান। কিছুদিন আগে ডেইলি বীস্টের এক কলামে এই মুসলিম টিভি-ব্যক্তিত্ব শিরোনাম করেছেন- ‘সকল সন্ত্রাসীই কি মুসলিম?…ব্যাপার কিন্তু এখানেই শেষ নয়’… প্রশ্নে শিরোনাম করে তিনি আলোচনা শুরু করেছেন পাঠকদের প্রতি আরও একটি প্রশ্ন রেখে। ‘যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে সংঘটিত কতো পার্সেন্ট সন্ত্রাসী হামলা মুসলিমদের দ্বারা হয়েছে?… মনে করার চেষ্টা করুন। থেমে যাবেন না, আরেকবার ভাবুন। আরো ভাবুন। ‘সকল মুসলিম সন্ত্রাসী নয়, তবে সব সন্ত্রাসীই মুসলিম’ এই কথাটা আপনি কতোবার শুনেছেন অনুমান করতে পারেন? এই সেদিন ফক্স নিউজের এক সাংবাদিক আমাকেও এটি জিজ্ঞেস করলেন। যাক সেটা হয়তো অন্য ব্যাপার। তবে এ প্রশ্নের পরই একটি সম্পূরক প্রশ্ন আসে- আমরা কেনো খৃষ্টান, বৌদ্ধ, জায়নবাদী বা ইহুদি সন্ত্রাসী দেখতে পাই না?

স্বীকার করতেই হবে- এখানে কিছু মানুষ আছে, যারা ইসলামের নামে সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে। তার ভাষায়- আমরা মুসলিমরা কিছুতেই মনে করি না যে এটা ইসলামের জন্য হচ্ছে বা তাতে ইসলামের কোনো পার্ট আছে। সেখানে যা আছে তা একান্তই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত কোনো স্বার্থসিদ্ধি বা এজেন্ডা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা। তবে আমরা এটুকু স্বীকার করি যে, হ্যাঁ- ধর্মের বিচারে তারা মুসলিমই।

যাই হোক, এই তথ্য বা আমার কথার ধরনে আপনি অবাক হতে পারেন। ভাবার জন্য প্রয়োজনে একটু বিরতি দিয়ে নিন। আমি এই ফাঁকে একটা তথ্য দিচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে যেসব সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে এর সাথে জড়িতরা মুসলিম নয়। আপনি এ বিষয়ে সজাগ না হলে সেটা আপনার ভুল নয়। এজন্য আপনি বরং মিডিয়াকে দায়ী করতে পারেন। (মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রতিদ্বন্দ্বী এবং আলাসকা অঙ্গরাজ্যের ৯ম গভর্নর) সারাহ পলিনের সাথে এক্ষেত্রে আমিও একমত যে, ‘মূলধারার মিডিয়াগুলো কর্তব্য পালনের চেয়ে আসলে বিশেষ কিছু ব্যক্তি বা শ্রেণীর লেহন-চোষণেই বেশি ব্যস্ত।’

এখানে আগ্রহীদের জন্য কিছু পরিসংখ্যান আছে। ইউরোপ দিয়েই শুরু করি। গত পাঁচ বছরে ইউরোপে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলাগুলোতে মুসলিমদের জড়িত থাকার পার্সেন্টেজ কতো?… সেটা আপনি যা অনুমান করছেন তারচেয়েও কম- মাত্র দুই পার্সেন্ট। শুধু ২০১৩ সালে ইউরোপে ১৫২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে মাত্র দুটো ছিলো ধর্মের দ্বারা প্ররোচিত। অন্যান্য সব হামলার সাথে জড়িতরা প্রায় সবাই স্থানীয় কোনো না কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সদস্য। আছে নানান মতবাদের এবং ধর্মের দলও। তবে দিনশেষে নাম কিনা সব ইসলামের!’…

এরপর তিনি সেই পুরনো পথেই হেঁটেছেন। বিভিন্নরকম তথ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন মুসলিম সন্ত্রাস মূলত সমস্যা নয়, সমস্যা অন্যকোথাও। ইসলামী সন্ত্রাস মিডিয়ার বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছু নয়। এবং বিশ্বজুড়ে খৃষ্টান, বৌদ্ধ এবং জায়নবাদী বা ইহুদি সন্ত্রাসী গ্রুপের তালিকা ও তথ্য তুলে ধরে দেখাতে চেয়েছেন মুসলিমদের চেয়ে ওরা পিছিয়ে নয়, ঢের এগিয়ে। তবুও তাদের নিয়ে কোথাও কোনো কথা নেই। দীন ওবাইদুল্লাহর কলাম থেকে প্রথম অংশটা এখানে তুলে ধরার উদ্দেশ্য তার কথা আর উপস্থাপনার ধরনটা লক্ষ্য করা। সাথে সাথে আপনি মুসলিম ইস্যু নিয়ে পশ্চিমাদের চিন্তাধারার মৌলিক দিক সম্পর্কেও ভালো একটা ধারণা পেয়ে যাবেন।

ইউরোপীয় মুসলিমদের প্রকৃত অবস্থা

বেশ কিছুদিন আগে ইউরএকটিভডটকমে মানবাধিকারকর্মী এবং আলোচক এলসা রায় সাহসী একটি কলাম লিখেছেন। শিরোনাম করেছেন- ‘এখনই সময় ইউরোপে ইসলামভীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার’। তাঁর সূচনাটা দেখুন-

একটি দেশের কথা কল্পনা করুন- যেখানে মুসলিম নারীরা রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার অধিকার রাখেন না, রাস্তায় প্রহারের শিকার হন। যেখানে দাড়িওয়ালা মুসলিম পুরুষেরা মেট্রো রেলে সিট নিতে গেলে অপমানিত হন। এমন একটি দেশের কথা কল্পনা করুন- যেখানে প্রতি সপ্তাহে গড়ে একটি করে মসজিদ ভাঙা হচ্ছে, প্রতি মাসে মুসলিম মৃতদের কবর গুড়িয়ে দেয়ার খবর বেরুচ্ছে। এবার কল্পনা করুন, অন্যকোথাও নয় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ঘটনাগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলোরই কোনো-না-কোনোটাতে ঘটছে। ২০১৩ সালে শুধু ফ্রান্সেই ইসলামোফোবিক ৬৯১ টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যেটি আগের বছরের তুলনায় ৪৭% বেশি। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে মুসলিম নারীরাই ভিকটিম হয়েছেন প্রায় ৭৮% ঘটনায়। যুক্তরাজ্যের মেট্্েরাপলিটন পুলিস ২০১৩ সালে তাদের কাছে মুসলিম নাগরিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মোট ৫০০টি হয়রানি ও নির্যাতনমূলক ঘটনার রেকর্ড জমা পড়ার কথা জানিয়েছে।

এলসার ভাষায়- পরিস্থিতি এখনই জটিল রূপ ধারণ করেছে এবং সেটা উত্তোরোত্তর বেড়েই চলেছে। এখানে ইউরোপজুড়ে কোনো জরিপ নয় শুধুমাত্র বিভিন্ন জায়গায় জমা পড়া অভিযোগগুলোর সমন্বয় করা হয়েছে মাত্র। রাজনৈতিকভাবেও এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্চ নেই বা হয়নি। ২০০৯ সালে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের ‘মৌলিক অধিকার এজেন্সি’ একটি রিপোর্ট পেশ করেছিলো যাতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘটা বৈষম্য ও হয়রানিমূলক আচরণের একটা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখা যায় সেসময়ই প্রতি তিনজন মুসলিমের একজন জানিয়েছেন তারা ডিসক্রিমিনেশন বা বৈষম্যের শিকার। সন্দেহ নেই এখনকার চিত্র তার চেয়ে ভয়াবহ। ২০১৪ সালটি ছিলো ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর নির্বাচনের বছর।

এসময় ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী মনোভাব আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। নির্বাচনের কৌশল হিসেবে কেউ যেমন মুসলিম ভোটার টানার জন্য একপ্রকার করুণার আশ্রয় নিয়েছেন তেমনি ডানপন্থী অনেক নেতাই বিশেষত তরুণদের ভোট আকর্ষণের জন্য সরাসরি মুসলিম অভিবাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। সবমিলিয়ে ইউরোপে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতি অতীতের যে কোনো সময়ের সীমা ছাড়িয়েছে।…

তিনটি বক্তব্য একটি হিসেব

উপরিউক্ত তিনটি বক্তব্যই স্বতন্ত্র দৃষ্টিকোণ তুলে ধরার দাবি রাখে, সুতো বা শেকড় যদিও একটাই। খুবই সতর্কতার সাথে এই তিনটি বক্তব্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যার প্রতিটিই বেশ পুরনো। অন্তত এই জানুয়ারিতে ফ্রান্সের সাপ্তাহিক ব্যাঙ্গ ম্যাগাজিন শার্লি এবদোর অফিসে দুই মুসলিম সহোদরের হামলার আগের তো অবশ্যই। পত্রিকা অফিসের ১১ জন সাংবাদিক এবং শপিংমলে অপর এক হামলায় আরো ৫ জনসহ মোট ১৬ জন ইউরোপীয় নাগরিক নিহত হবার পর পরিস্থিতি কী দাঁড়িয়েছে কিংবা মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপঘেষা কয়েকটি আফ্রিকান রাষ্ট্রে সম্প্রতি আইএসের ব্যানারে নানারকম কা- তাতে কতোটা হাওয়া দিচ্ছে সেটি অনুমান করা মুশকিল নয়। তবে সেসবকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তথ্যে তথ্যে পৃষ্ঠা ভরে ফেলা সহজ হলেও তাতে মূল ব্যাপারটাকেই এড়ানো হবে। বিশেষ পরিস্থিতির বিবরণ কখনো মূল বা সার্বিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটাতে পারে না।

আমাদের উদ্দেশ্য সমাধান করা নয়, সেটা সম্ভবও নয়। ঘটনার পূর্বাপর বিবেচনায় প্রকৃত যে চিত্র সামনে আসে সেটা এড়িয়ে গেলে তো অন্যায়ই করা হবে। নীতির প্রতি যেমন, স্থানীয় মুসলিমদের প্রতি আরো বেশি। তাই বিশেষ বা কেবল আজকালের অবস্থার বদলে আমরা এখানে সামগ্রিক বাস্তবতার দিকেই ফোকাস করতে চাচ্ছি।

এই মুহূর্তে ইউরোপীয় মুসলিমরা কেমন আছেন, কোন দিকে মোড় নিচ্ছে সেখানকার সার্বিক পরিস্থিতি সেটা জানা দরকার। তবে নিঃসন্দেহে তা বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে সবমিলিয়ে প্রায় ত্রিশটি রাষ্ট্র আছে। বিগত তিন-চার দশকে স্থানীয় মুসলিম, মুসলিম অভিবাসী, সাথে নতুন করে ইসলাম গ্রহণ করা ইউরোপীয় মিলিয়ে দ্রুতই বাড়ছে ইউরোপের মুসলিম জনসংখ্যা। ইউরোপভুক্ত জেগে ওঠতে থাকা তুরষ্ক এক্ষেত্রে নতুন আশার সঞ্চার করছে। সেইসাথে পুরনো তরবারিতে শান দিয়ে খেলা শুরুর ডেডলাইন ঘোষণা আগেভাগেই দিয়ে রেখেছে খৃষ্টান সাম্রাজ্যবাদও। ব্যাপারটাতে তাই আবেগের কোনো জায়গা নেই।

শার্লি এবদোয় হামলার ঘটনা এবং সম্প্রতি ইউরোপীয় মুসলিম তরুণ এমনকি তরুণীদেরও আইএসে যোগদানের ব্যাপারগুলো কেবল নবীজীর সা. অপমানের প্রতিশোধ, জিহাদী ভাবধারা বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে আটকে থাকছে না। উসকে দিচ্ছে আরো নানান ব্যাপারও, যার শেষটায় আপাতদৃষ্টিতে ইসলাম আর মুসলিমদের জন্য ভালো কিছু নেই। সামনের আলোচনায় আমরা সেদিকেই ফোকাস করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। ফ্রান্স দিয়েই শুরু হবে আমাদের আলোচনা।

বিস্ময়কর বাস্তবতা

একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার। বাকস্বাধীনতা, সমানাধিকার, অস্ত্রমুক্ত শান্তিময় বিশ্ব ইত্যাদি আরো যেসব শ্লোগান পশ্চিমা মিডিয়া, বিভিন্ন সংস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নিত্য ব্যবহার করে, সেগুলো বিশ্ববাসীকে মুলো দেখানো ব্যাপার ছাড়া কিছু নয়।

ভাবতে অবাক লাগে- ১৯৯৯ সালেই প্রতি ৩৪ মিনিটে একটি খুন, প্রতি ৬ মিনিটে একটি ‘বলপূর্বক’ ধর্ষণ, প্রতি ৩৩ মিনিটে একটি শারীরিক নিগ্রহ এবং প্রতি ২২ মিনিটে একেকটি সহিংস অপরাধ সংঘটনের মতো ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় দুরাবস্থার পরিসংখ্যান মাথায় নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার সাহস দেখিয়েছে। এখন পর্যন্ত তারা খুবরকম সফলও।

আর এসব ক্ষেত্রে তাদের প্রধান এবং এখন পর্যন্ত বিকল্পহীন সহযোগী আজকের ইউরোপ।

‘স্টপ ইসলাম’: ঔদ্ধত্য না মূর্খতা?

ইউরোপে ইসলাম ও মুসলমান

চল্লিশ ফুট চওড়া রাস্তাটি সরলরেখার মতো সোজা সামনে এগিয়েছে। পেছনে ডান-বাম দিক থেকে আরো দুটো রাস্তা এসে এই চত্বরেই মিলিত হয়েছে। স্বচ্ছ স্ফটিকের মৎস্যকন্যাসদৃশ বিশাল এক নারীমূর্তি চত্বরটিকে এনে দিয়েছে বিশেষ মহিমা। শহরের ব্যস্ততম এ চত্বর মাড়াতে প্যারিসবাসীকে প্রায়দিনই বেশ ক’মিনিট সময় খরচ করতে হয়। আজ অবশ্য রাস্তায় তেমন গাড়ি নেই। পূর্বদিকের বড় রাস্তাটি তো পুরোই ফাকা। গাড়ির বদলে এখানে আজ কিছু মানুষ জড়ো হয়েছেন। চত্বরকে পেছনে রেখে বিশাল এক মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছে। জাতীয় কোনো দিবস বা উৎসব হলে এখানে মাঝে-মধ্যে মঞ্চ তৈরি করা হয়। এলাকাবাসী একত্র হয়ে আনন্দ-উল্লাস করেন, নেচে-গেয়ে উদযাপন করেন বিশেষ সে দিবস বা উৎসব। আজকের দিনটি অবশ্য কোনো জাতীয় দিবস নয়, উৎসবের বিশেষ কোনো উপলক্ষও নেই। তবু এখানে মঞ্চ স্থাপন, শ’ তিনেক মানুষের জটলা এবং মিডিয়ার বাড়াবাড়ি উপস্থিতি সাধারণ পথচারীদের কৌতূহলী করে তোলে। উচ্চ ভলিউমে তুমুল উত্তেজনা ছড়ানো বক্তৃতা শোনার জন্য তারাও একপাশে জড়ো হন। বিশাল মঞ্চের ডান পাশে মাইক্রোফোন হাতে বক্তব্য দিচ্ছেন মধ্যবয়সী এক লোক। মঞ্চের পেছনেই সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে শোকের কালো বর্ণে ছাপা বিশাল এক ব্যানার। তাতে অস্বাভাবিক বড় বোল্ড অক্ষরে লেখা- ‘স্টপ ইসলাম’। স্টপ ইসলাম- ইসলামকে থামিয়ে দাও! ব্যানারের দু’ পাশে ও নিচে ছোট অক্ষরে আরো কী সব লেখা, দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না। আশপাশে তাকিয়ে উপস্থিত শ্রোতাদের প্রায় সবার গায়ে একইরকম টি-শার্ট দেখা গেলো। সাদা টি-শার্টের সামনে পেছনে লাল রঙে ক্রস চিহ্নিত মসজিদের ছবি।

বক্তার কথাগুলোও এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কণ্ঠে সমান উত্তেজনা ধরে রেখে ক্ষোভ আর ঘৃণাভরে তিনি বলে যাচ্ছেন- …‘আমাদের শান্তিময় সমাজে যাবতীয় বিশৃঙ্খলা, অশান্তি আর সন্ত্রাসের জন্য এই ইসলামই দায়ী। সুতরাং আজ এ মুহূর্ত থেকেই ইসলামের গতিকে চূড়ান্তভাবে থামিয়ে দিতে হবে। আর কোনো মসজিদ নির্মাণ চলবে না। কার্যক্রম সীমিত করে বড়জোড় ঐতিহ্য হিসেবে কয়েকটা মসজিদ রেখে বাকিসব ধ্বংস করে দিতে হবে। সন্ত্রাসের আখড়া ধ্বংস করে সে স্থানে নির্মাণ করা হবে শান্তির প্রতীক প্রভু যিশুখৃষ্টের ক্রুশচিহ্নিত চার্চ। আমাদের সমাজ ও কালচারের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে যারা বসবাস করতে পারবে কেবল সেরকম মডারেট মুসলিমদেরই আমরা এদেশে থাকার অনুমতি দেবো। আর কোনো সন্ত্রাসী যেনো এই জনপদে আশ্রয় না পায় বা জন্ম না নিতে পারে সেটা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য’।… কিছু পথচারী অবাক হন। অমন অবাক তারা আর কখনো হন নি। ক’মিনিটের দেখা এবং শোনা বিষয়গুলো তাদের বিমূঢ় করে দেয়। ভয়ে বুক কাঁপে।

কী আশ্চর্য- আল্লাহর যমিনে দাঁড়িয়ে, আল্লাহর রিযিকে বেড়ে উঠে, আল্লাহর দেয়া আলো-হাওয়ায় বেঁচে থেকে মানুষ নামের এই দুর্বল জীবগুলো কিনা আল্লাহর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করছে!…খবর- পেগিডা নামে পরিচিতি পাওয়া একটি সংগঠন শার্লি এবদোয় হামলার ঘটনার আগে-পরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এমন অজ¯্র সমাবেশ-মানববন্ধনের আয়োজন করেছে। অনলাইনে তৎপরতার পাশাপাশি এখনো সুযোগ পেলেই পথসভা আয়োজনের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। ফ্রান্স, বিশেষত জার্মানিতেই তাদের দৌরাত্ম তুলনামূলক বেশি।

ইতিহাসের পথে…

৭১১ খৃষ্টাব্দ। বিজিত হলো স্বপ্ন আর গৌরবের দেশ- স্পেন। আফ্রিকা হয়ে ইউরোপের এই পূর্ব অংশে ইসলামের ঝা-া ওড়াতে মুসলিম বীরদের লড়াই চালিয়ে যেতে হলো চার যুগেরও বেশি সময়। কালিমার পতাকাবাহী মুজাহিদদের জন্য মরক্কোর ‘জিব্রাল্টার’ প্রণালী যেমন স্পেনের পথ সুগম করেছিলো, স্পেন খুলে দিলো পুরো ইউরোপের দরজা। এই বিজয়ের প্রধান সিপাহসালার মুসা বিন নুসাইর (তারেক বিন যিয়াদ ছিলেন তার অধীনস্থ কমান্ডার) এবার ফ্রান্সের দিকে দৃষ্টি দিলেন। সামনে আপাতত একটাই বাধা- স্পেন-ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী পির‌্যানিস পর্বতমালা। তবে- ইতিহাস স্পেনবিজয়ী এই বীর মুজাহিদের নামের পাশে আর কোনো সাফল্য লিখে রাখার সুযোগ পায় নি। অপর কালজয়ী মুসলিম সেনানী তারেক বিন যিয়াদের বীরত্বপূর্ণ সহযোগিতায় স্পেনবিজয়টাই তার জীবনের সেরা এবং শেষ সাফল্য হয়ে রইলো। অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অচেনা সংস্কৃতির নতুন একটা দেশকে গুছিয়ে তোলার গুরুদায়িত্ব সামলে গভর্নর থাকার বছর দুয়েকের মধ্যে নতুনভাবে বিশেষ কিছু করা তার পক্ষে আর সম্ভব হয়নি।

৭২১ সালে স্পেনের নতুন গভর্নর হয়ে এলেন আরবের আরেক বীর- আবদুর রহমান আল গাফিকি। দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই ফ্রান্স হয়ে সেন্ট্রাল ইউরোপে কালিমার দাওয়াত ছড়িয়ে দেয়াকে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিলেন। এক বছরের মাথায় ৭২২ খৃষ্টবর্ষেই তিনি পির‌্যানিস পর্বতমালা মাড়িয়ে ফ্রান্সে ঢুকে পড়লেন। অল্প সময়ে ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঞ্চল দখল করে নিলেন। তবে উমাইয়া খিলাফাতের ঘন ঘন গভর্নর বদলানোর ধারায় দু’বছরের মধ্যে তিনিও এখানকার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেলেন। সময় যেতে থাকলো, বছরে বছরে নতুন গভর্নরেরা এসে অভিযান অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলেন। ইউরোপের বিভিন্ন রাজ্যের সম্মিলিত বাহিনীর পাশাপাশি এসময় তাদেরকে কঠিনতম মোকাবেলার সম্মুখীন হতে হচ্ছিলো ফ্র্যাঙ্কস বা ফিরিঙ্গি বাহিনীর। যুদ্ধেরই অংশ হিসেবে জয়-পরাজয়, সামনে-পেছনে করে দশ বছরের মাথায় ৩২২ সালের অক্টোবরে দুই পক্ষ মুখোমুখি হলো চূড়ান্ত লড়াইয়ের। ঘটনাক্রমে তখন আব্দুর রহমান আল ঘাফিকিই ছিলেন পুনর্বার নিয়োগ পাওয়া গভর্নর ও সিপাহসালার। টানা আট দিনের লড়াইয়ে এক অসম যুদ্ধে চার্লস মার্টেলের নেতৃত্বে ফিরিঙ্গি বাহিনীর কাছে পরাজিত হলো আবদুর রহমানের মুসলিম বাহিনী।

প্রায় চার লাখ সৈন্য নিয়ে নিজেদের পরিবেশে, পাহাড়ি অঞ্চলের আড়ালসহ অন্যসকল সামরিক সুবিধা নিয়ে ফিরিঙ্গিরা লড়াই চালিয়ে গেলো মাত্র ৫০ হাজারের (কিছু সূত্রে ত্রিশ হাজার বা তারও কম) সংখ্যার, রসদ ও পেছনের সাহায্য না পাওয়া কেবল ঈমানের বলে বলীয়ান মুসলিম বাহিনীর সাথে এবং এড়াতে পারলো পরাজয়। ইউরোপকে ফেলে রেখে শহীদ আবদুর রহমানের লাশ কাঁধে পিছু হটতে বাধ্য হলো ছোট্ট সংখ্যার মুসলিম মুজাহিদীন। এর আগে-পরে নানাসময় ফ্রান্সে বহু অভিযান পরিচালিত হয়েছে, তবে ওয়্যার অব টুওয়ারস বা মা’রেকাতু বিলাতিশ শুহাদা খ্যাত এই অভিযানটাই ফ্রান্সসহ পশ্চিম ইউরোপের বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রথম ও শেষ উল্লেখযোগ্য অভিযান। ব্যতিক্রম ছাড়া এরপরের পাঁচ-সাত শ’ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়- স্পেন-পর্তুগালসহ আশপাশের বিজিত অঞ্চলগুলোর অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন আর সাজ-সজ্জা বৃদ্ধির প্রতি সৌখিন-শিল্পপ্রিয় মুসলিমদের যতো মনোযোগ, ততোটাই অনীহা ফ্রান্স হয়ে সেন্ট্রাল ইউরোপে ইসলামের বিজয় অভিযান পরিচালনায়।

ফিরিঙ্গি বাহিনি, সম্মিলিত কুফরি শক্তি, নিজেদের দুর্বলতা কিংবা একান্তই আল্লাহ পাকের ইচ্ছা- কারণ যাই হোক, স্পেন-ফ্রান্সের সীমান্তঘেষা পির‌্যানিস পর্বতমালা ইসলামের ইতিহাসে আজও অলঙ্ঘনীয় একটা দেয়াল হয়েই রয়ে গেলো।

ফ্রান্সে ইসলামের সূচনা

ফ্রান্সে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে বিজয় হিসেবে বা সে বিজয়কে নির্দিষ্ট একটা সময়ের ফ্রেমে দেখানো মুশকিল। স্পেন বিজয়ের বছর ৭১১ সালকেই ফ্রান্সে ইসলাম প্রবেশের বর্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সে হিসেবে ৭৩২ পর্যন্ত মোট ২১ বছরের সময়কালটাই ফ্রান্সে ইসলামের অগ্রযাত্রা, বিজয় বা প্রভাব সৃষ্টিকারী যুগ। অবশ্য ৭৩২-এ পরাজয়ের পরও উকবা বিন হাজ্জাজের দৃঢ়তায় ৭৫৯ পর্যন্ত ফ্রান্সের সেপটিম্যানিয়া রাজ্যটি স্পেনের মুসলমানদের অধীনেই বড় একটি প্রদেশ ছিলো। নবম খৃষ্টশতকের শুরুর দিকে আরো কিছু অভিযানের সুবাদে ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী কিছু শহর ইসলামের ছায়াতলে আসে। তবে মাত্র অর্ধশতাব্দীর ব্যবধানে ৯৭৫ সালে তাও হাতছাড়া হয়ে যায়। দশম শতকজুড়েও কিছু কিছু অভিযান পরিচালিত হয়, তবে সেগুলো তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। এরপরের ৫শ’ বছরের স্পেন শাসনকালে ইউরোপের এ অংশে আর কোনো বড় অভিযান বা সাফল্যের খোঁজ পাওয়া যায় না।

১৪৯২ সালে ফার্দিন্যান্ড এবং ইসাবেলার কাছে গ্রানাডা হস্তান্তরে বাধ্য হওয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপে ইসলামের বিজয়ী অবস্থানের দিন প্রায় শেষ হয়ে আসে। এসময় অবশিষ্ট ছিলো কেবল ১৩-১৪ শতকে জয় করা পূর্ব এবং দক্ষিণপূর্ব ইউরোপের কিছু অংশ, যা বিশ্বমানচিত্রে আজ বলকান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জাতির দেশ স্পেন দখল করার মাত্র সোয়াশ বছরের মধ্যে ফার্দিন্যান্ড-ইসাবেলা জুটি দেশটিকে মুসলিমশূন্য করতে সক্ষম হয়। (কেমন করে সেটা সম্ভব হয়েছিলো- ইতিহাস হয়তো অনেকেরই জানা।

নয়তো কেবল অনুমান করে নিন- হত্যা-দেশান্তর এবং মুসলিম বেশ ও নাম পরিবর্তনে কেমন নিপীড়ন চলেছিলো দু’দিন আগেও রাজত্ব করা রাষ্ট্রের প্রধান ও বৃহত্তম এই নাগরিকসমাজের ওপর)। ৮শ’ বছরের বাসস্থান এবং গৌরবের মুসলিম পরিচয় হারিয়ে স্পেনের মুসলিমেরা আশ্রয় ও জীবিকার খোঁজে অজানার পথে পা বাড়াতে বাধ্য হন। মরিসকো নামে পৃথিবীর বুকে তাদের নতুন পরিচয় দাঁড়ায় ঘর-বাড়ি-ভূমিহীন অসহায় অভিবাসী।

ফ্রান্সের মুসলিম সম্প্রদায়

৫০-৬০ হাজারের বড় একদল মুসলিম এসময় পাশের দেশ ফ্রান্সেও আশ্রয় নেন। স্পেনের মুসলিমদের এই অভিবাসনের মধ্য দিয়েই ১৬ শতক থেকে ফ্রান্সে মুসলিম জনগোষ্ঠীর নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ৭১১ থেকে শুরু হয়ে ৭৩২ পর্যন্ত বিজয়কাল, ৭৫৯ পর্যন্ত বিশেষ একটি প্রদেশ এবং নবম শতকের কয়েক যুগ, এরপর বিজিত অঞ্চল আর না থাকলেও সবসময়ই ফ্রান্সে কমবেশি মুসলিম উপস্থিতি ছিলো। ১৬ শতকে এসে অভিবাসী আগমনের মধ্য দিয়ে যা নতুন মাত্রা পেলো। এরপরের কয়েক শতকজুড়ে শ্রমিক হিসেবে বিশেষত আফ্রিকান মুসলিমেরা ফ্রান্সে পাড়ি জমান। স্থানীয়, অভিবাসী এবং নতুনভাবে ইসলাম গ্রহণ করা নারী-পুরুষ মিলিয়ে ফ্রান্সে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে থাকে, বিশ শতকে এসে যা ব্যাপক রূপ গ্রহণ করে। মুসলিম জাতি বিশেষত নেতৃবৃন্দের উদাসীনতার সুযোগে ১৮-১৯ শতকের পুরো সময়টা ছিলো ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের চূড়ান্ত উত্থানকাল।

নেপোলিয়নের মতো নেতা পেয়ে ফ্রান্সও তখন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হয়ে ওঠে। ব্যাপক চাপে থাকা ফ্রান্সের মুসলিম সম্প্রদায়কে এ সময়টাতে কেবল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করে যেতে হয়েছে। বিশ শতকের শুরুভাগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির সাথে সাথে উসমানীয় মুসলিম শাসনেরও সূর্যাস্ত ঘটে। সালটি ছিলো ১৯২১। ইসলামের সূচনাকাল থেকে নিয়ে এই প্রথম বিশ্বের কোথাও ইসলাম বা মুসলিম জাতি একক বিজয়ী শক্তি হিসেবে আর টিকে রইলো না। জটিল-কঠিন পৃথিবীর বুকে এটি এমনই এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা, আমরা এখন শুধু যার অনুমানটুকু করার চেষ্টা করতে পারি।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যার আরব-এশিয়ার অঞ্চলগুলো মোটামুটি একটা অবস্থানে থাকলেও ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের মুসলিমদের অবস্থা তখন ছিলো যাচ্ছেতাই।

রাষ্ট্র হিসেবে ফ্রান্স

পৃথিবীর প্রাচীনতম এক দেশ ফ্রান্স। এ দেশে মানুষের বসবাসের ইতিহাস প্রায় ১৮ লক্ষ বছরের পুরনো। অবস্থানগত দিক দিয়ে ইউরোপ তো বটেই গোটা বিশ্বেই ফ্রান্স গুরুত্বপূর্ণ এক জায়গা দখল করে আছে। খৃষ্টপূর্ব অব্দের সেল্টিক রাজা গল থেকে নিয়ে মধ্য যুগের বিখ্যাত রোমান শাসনাধীনে থাকার মধ্য দিয়ে ফ্রান্স সভ্যতা ও উন্নতিতে আধুনিক বিশ্বের যে কোনো রাষ্ট্র থেকে বহুগুণ এগিয়ে যায়। ম্যাডিটেরিনিয়ান সাগর থেকে ইংলিশ চ্যানেল হয়ে দক্ষিণ সাগর এবং অপর দিকে রাইন নদী হয়ে আটলান্টিক মহাসাগর- ফ্রান্স এর মধ্যে প্রায় দু’ লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ মাইলের বিশাল এক দেশ।

২৭ টি প্রশাসনিক রিজিওনে বিভক্ত, গণতান্ত্রিক এবং সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এ দেশে বর্তমানে শহর গ্রাম মিলিয়ে প্রায় ৭ কোটি মানুষ বাস করছেন। মধ্যযুগের রোমান শাসনের পর বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যকার লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত হলেও এরপর খুব দ্রুত গুছিয়ে ওঠার সুযোগ পায় ফ্রান্স।

বিশেষ করে ১৩৩৭-১৪৫৩ পর্যন্ত শত বর্ষের টানা লড়াই শেষে আশপাশের যে কোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্রের আগেই ফ্রান্সে জাতিগত ঐক্য প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে শুধু ভৌগোলিক দিক থেকে বড় নয়, সবচে প্রভাবশালী দেশ হিসেবেও নিজেকে গড়ে তোলে ফ্রান্স। দ্রুততর হয় দেশটির উন্নয়নের ধারা। এরপর নেপোলিয়নের মতো দক্ষ এবং দূরদর্শী নেতা পাওয়ার সুবাদে শীঘ্রই ফ্রান্স পরিণত হয় বিশ্বের প্রধানতম পরাশক্তি হিসেবে। উন্নত ও শক্তিশালী অর্থনীতির পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যেও ফ্রান্স এসময় ব্যাপক সুখ্যাতি অর্জন করে। যুগে যুগে মানবাধিকার প্রশ্নে আলাদা সুনাম কুড়িয়েছে এই দেশ।

তাই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক’টি অর্থনৈতিক শক্তির একটি হতে পারার পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য এবং মানবাধিকারের রাষ্ট্র হিসেবে ফ্রান্স আজো একটা পরিচিতি ধরে রেখেছে, হোক না তা কাগজে-কলমেই!

ইউরোপের ইসলামী যুগ : মুফতী মুহাম্মদ শফীর রহ. কলমে…

তাফসিরে মাআরিফুল কুরআনের রচয়িতা মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. তার ইলমি জাওয়াহেরে বিশেষ এক প্রসঙ্গে ইউরোপের তৎকালীন বাস্তবতা তুলে ধরে লিখেন- বিজয়ী বেশে ইসলাম যখন পশ্চিমা বিশ্বে প্রবেশ করলো এবং আন্দুলুস ও পর্তুগাল তাদের শাসনাধীনে চলে এলো, তো অর্ধ শতাব্দী পেরোবার আগেই এখান থেকে প্রচলিত বারবারি ভাষা উঠে গেলো এবং এই অঞ্চল একটা সাধারণ আরব রাষ্ট্রেরই অংশ বনে গেলো। শুধু ভাষাই নয় তারা ইসলামী সংস্কৃতির অনুসারী এবং ইসলামী সভ্যতার ধারক হতে পারা নিয়ে গর্ব করে ফিরতো। আর শুধু এ দুটো রাষ্ট্রই তো নয় বরং ফ্রান্সসহ আশপাশের রাষ্ট্রগুলোতেও ভালো করেই এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিলো।

মিশরের মাজমায়ে ইলমির প্রধান শায়খ মুহাম্মদ কারদ আলী মিসরি আন্দুলুস এবং পর্তুগালে ভ্রমণকালে আশ্চর্য সব ঘটনার মুখোমুখি হন। তিনি সেখানকার অতীত ও বর্তমান হালাত নিয়ে তার সফরনামায় বলেন-

‘ইসলামের অধীনে চলে আসা ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোই শুধু নয়, চারপাশের রাষ্ট্রগুলোও ইসলামের ভাষা এবং সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলো। লাতিন, জালালাকা এবং নারফারিউনের বোদ্ধা লোকেরাও আরবী ভাষা শিখেছিলো। মুসলিমদের সংস্কৃতি এবং জীবনধারার প্রতি তারা এতোটাই প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলো যে নিজেদের ধর্মীয় রীতিনীতিকে ছেড়ে দিয়ে ইসলামের বিধিবিধান, অভ্যেস এমনকি তাদের নারীদেরও ইসলামী পর্দায় রাখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেছিলো। ’

আফসোস, আমরা কী থেকে কী হয়ে গেলাম। কোথায় ছিলাম আর এখন কোথায় এসে পৌঁছেছি। পূর্বপুরুষদের অযোগ্য সন্তানেরা কীভাবেই না মান-সম্মান ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। অন্যদের গোলামির জিঞ্জির মাথায় বেধে নিয়েছে। তাদের স্থাপিত ভিত্তির এক একটি ইট খুলে ফেলেছে। আফসোস, যারা এককালে আমাদের অনুসরণ করাকে নিজেদের জন্য গৌরবের বিষয় বলে ভাবতো আজ আমরা তাদের অনুসরণে মত্ত হয়ে পড়েছি। তাদের পছন্দ-অপছন্দ, তাদের ভাষা এখন আমাদের মুখে মুখে।

অপ্রয়োজনেও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে পারাটাকে আমরা এখন গর্বের বিষয় মনে করি। শুদ্ধ উচ্চারণ করতে না পারলেও অশুদ্ধতেই কাজ চালিয়ে যেতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করি না। আর সাহেব বাহাদুরের সাদৃশ্য ধারণ করতে পারাটা তো বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার। মেয়েদেরকে পর্দা থেকে বের করেছি। পুরুষদের বেশ-ভূষা পাল্টে দিয়েছি।

প্রথমে আমরা কেবল ভাষা এবং বেশ পরিবর্তন করেছি আর মনে মনে ভেবেছি যে, ঈমানের সম্পর্ক তো ক্বলবের সাথে। বাহ্যিক পরিবর্তনে ঈমানের কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে যে, এটাই একটা বিদ্যুতের চমক ছিলো যেটা ক্বলব এবং মগজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ইংরেজি জীবনধারা এবং খৃষ্টীয় মতবাদ আমাদের মনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে ছেড়েছে।

এক ব্যক্তি ইংলিশদের জুতো পরিধান শুরু করলো আর ভাবলো যে এই জুতো পরার কারণে আমি তো আরবদের মতো হয়ে যাই নি। পরে দেখা গেলো জুতোর সাথে সাথে সে প্যান্টও পরা শুরু করেছে। এভাবে ইসলামী পোশাক একটা একটা কমে একটা একটা করে ওদের পোশাক গায়ে ওঠতে লাগলো। একসময় দেখা গেলো যে বাহ্যিক পরিবর্তনের পর তার ভেতরেও পরিবর্তন শুরু হয়ে গেলো এবং শরীর থেকে নিয়ে তার ঘরবাড়ি এবং চারপাশেও পরিবর্তন আসা শুরু হলো। ঘরের পর্দা তার ভালো লাগে না, সুতরাং সেগুলো সরিয়ে ফেলা হলো। বসে খেতে পারে না সুতরাং দস্তরখান উঠে গেলো। নামাজের জন্য বারবার অজু করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ালো, সুতরাং নামাজও বাদ পড়তে থাকলো। মোটকথা- তার শরীর-মন এবং ঘর থেকে ইসলাম পুরোপুরি ওঠে গেলো। এভাবেই সব বদলায়, যার সূচনাটা সামান্য পোশাক বা ভাষার মাধ্যমেই ঘটে।

ইসলামী সংস্কৃতি ধ্বংসের নিষ্ঠুর খেলা…

মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. তার ইলমি জাওয়াহেরে আরো বলেন- বছরের পর বছর ধরে ব্যাপক প্রচারণা, চাপ প্রয়োগ এবং জুলুমের চূড়ান্ত করেও মুসলিম জনগণ তো বটেই, অন্যধর্মের সাধারণ মানুষদের থেকেও ইসলামী জীবনধারা বা সংস্কৃতির প্রভাব দূর করতে ব্যর্থ হয়ে খৃষ্টান রাজারা মিটিংয়ে বসলো করণীয় ঠিক করতে। আলোচনায় সমাধানের কোনো পথ স্থির করতে না পেরে বিশেষ একটি কমিশন গঠন করে দেয়া হলো। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করে কমিশন রিপোর্ট পেশ করলো- ‘মুসলিম শাসকদের তাড়াতে পারলেও আমরা তাদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কুতুবখানা, ইসলামী ভাষা- এসব তো সমাজ থেকে মিটিয়ে দিতে পারি নি। শত বছরের চর্চায় এগুলো তাদের হৃদয়ের গভীরে শেকড় গেড়ে বসেছে। তাই বাস্তব কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না।…

কমিশনের রিপোর্টকে সিরিয়াসভাবে নিয়ে যে ভয়ংকর খেলায় ইউরোপীয় খৃষ্টানরা এরপর মেতে ওঠলো, ইতিহাসে তার নজির পাওয়া খুবই কঠিন। ইসলামী ভাষা তথা আরবীর যে কোনোরকম ব্যবহার তারা নিষিদ্ধ করলো, নিজেদের সংস্কৃতি ছাড়তে রাজি হবে না এমন খাঁটি মুসলিমদের সম্পূর্ণ খালি হাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য করলো, ইসলামী পোশাক বা বাহ্যিক যে-কোনো ইসলামী বেশও নিষিদ্ধ হলো। শুধু তাই নয়- ইসলামী কুতুবখানায় সংরক্ষিত যাবতীয় পুস্তক একটি মাঠে জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে দিলো। সেগুলো শুধু ইসলামী বই ছিলো না, শত শত বছরের জ্ঞান-বিজ্ঞানের হাজারো কিতাব যেগুলোর সাথে ইসলাম বা মুসলিম জাতির আপাত দৃষ্টিতে কোনো সম্পর্কই হয়তো ছিলো না। শুধু মুসলিমদের সংরক্ষণে থাকার অপরাধে এমন পরিণতি বরণ করতে হয়েছিলো নিরীহ এসব পুস্তকেরও। আফসোসের ব্যাপার- এসব কাজে তখন নেতৃত্ব দিচ্ছিলো সদ্যই মুসলিমদের অধীনতা হারানো উন্নততর ইউরোপীয় রাষ্ট্র স্পেন।

বুদ্ধিজীবী বনাম চাটুকার

আমাদের গ্রামাঞ্চলে কথাপ্রিয় কিছু নারী চরিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। মজলিস খালি হোক বা ভরপুর, প্রসঙ্গ কাছের হোক বা দূরের- কথা তারা বলবেই। মজার ঘটনা এমন রসিয়ে রসিয়ে বলতে পারে যে শ্রোতামাত্রই নিজেকে মূল চরিত্র কল্পনা করে ওঠেন, মুহূর্তেই পুরো মজলিসে হাসি-ঠাট্টার রোল পড়ে যায়। আবার কারো নিন্দার বেলায় এমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে একেকটা দোষ বের করে আনতে থাকে যে চারপাশে হায় হায় রব শুরু হয়ে যায়। পুরুষ সমাজেও এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। শহরে বা শিক্ষিতসমাজে এই চর্চার উন্নতি বলতে কিছুটা পরোক্ষ হয়ে যাওয়া।

প্রথম কথাতেই না বলে একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলতে পারাটাই শহরের ট্র্যাডিশন। প্রশংসার ক্ষেত্রে আগে কিছু মন্দ বলে নাও, সমালোচনার ক্ষেত্রে কিছু ভালো দিক তুলে ধরে তারপর শুরু করো। কথার তখন কী যে ধার! আমাদের একজন শিক্ষক বুদ্ধিজীবী আছেন। নানা জায়গায় নিজেকে তিনি একচোখা হরিণ হিসেবে পরিচয় দেন। লেখা-জোখায় শহুরে এই ধারাটা রীতিমতো তার ট্রেডমার্ক। প্রিয় বিষয়-পছন্দের ব্যক্তির ক্ষেত্রে জরুরি হলেও নেতিবাচক বিষয়গুলো তিনি নিয়ম করেই এড়িয়ে যান। আর বিপরীত হলে হাসতে হাসতেই এমন পচানো শুরু করেন যে বেচারার গায়ের কাপড় তো বটেই চামড়া অব্দি ক্ষতবিক্ষত হবার উপক্রম হয়। আশপাশে লক্ষ্য করলে এমন অনেককেই পাওয়া যাবে, একজনের নাম এখানে আলাদা করে আর নাইবা বললাম!

নওমুসলিমদের নীরব বিপ্লব

কাঁটি করায় বাঙালির খ্যাতি প্রবাদতুল্য হলেও এর চর্চাটা অবশ্য বিশ্বজুড়েই আছে। পাশ্চাত্যে ইদানীং এই নিন্দা বা বিদ্বেষ ছড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের শহুরে স্টাইলটারই ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে। একটু বিশেষ অ্যাঙ্গেল থেকে দেখলে- নিজেদের কাজ আর শখের বাইরে এ মুহূর্তে ইসলাম ও মুসলিম ইস্যুটিই তো ওদের বা ওখানকার প্রধানতম নেতিবাচক আর ভয়জড়ানো বিষয়। আপনি পশ্চিমা বিশ্বের আজকের কোনো সাধারণ নাগরিককে জিজ্ঞেস করুন, কোনো নেতার বক্তব্য শুনুন, কোনো লেখক-বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি বা কলাম পড়ুন- দেখবেন ইসলাম আর মুসলিম ইস্যুতে তাদের কথার ধরন-উপস্থাপনা কেমন বদলে যায়। বাস্তবতা যা দাঁড়িয়েছে তাতে এখন শুরু থেকেই সরাসরি নিন্দা তো আর করা যায় না, তাই প্রথমে ভালো কিছু বলে নিয়ে তারপরই পুরনো পথে পা বাড়ায়। অথচ বছর কয়েক আগেও এটা চিন্তা করা যেতো না।

ইসলামকে টার্গেট করে গণহারে সমালোচনা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর জবাব যখন তাদের নিজেদের লোকেরাই দলে দলে ইসলামগ্রহণ করার মধ্য দিয়ে দেওয়া শুরু করলেন, পাশ্চাত্য তখন বাধ্য হলো কথার ধারা পাল্টাতে। অযৌক্তিক-মিথ্যে সমালোচনার ব্যাপারটা তো আর থামে নি, ভাখাাঁই কেবল বদলেছে। চলুক, চলতে থাকুক; ভুক্তভোগী মুসলিমরাও এখন আর পরোয়া করছেন না। ঠিক সময়ে আসমানের অবধারিত ফয়সালা তো আসবেই। ৯/১১ পরবর্তী পাশ্চাত্যে ইসলামী জাগরণে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। পশ্চিমের দেশে দেশে এখন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে লম্বা হচ্ছে নওমুসলিমদের মিছিল। তবে- ইউরোপের ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ফ্রান্সেই পরিবর্তনের হাওয়াটা সবচেয়ে গতিশীল এবং দৃশ্যমান। আমাদের আলোচনাও ফ্রান্স নিয়েই চলছিলো।

ফ্রান্সের মুসলিম জনসংখ্যা

সেক্যুলার রাষ্ট্র হওয়ায় ফ্রান্সে নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞেস করা বা স্বতন্ত্র তালিকায়ন করার আইনগত অধিকার কারো নেই। ফ্রান্সে তাই মুসলিম জনগোষ্ঠীর সরকার স্বীকৃত কোনো পরিসংখ্যানও নেই। বেসরকারি সংস্থাগুলো নানাসময় যে জরিপ চালিয়েছে তার ভিত্তিতেই মোটামুটি একটা অনুমান করে নেওয়া হয়। এসব জরিপের তথ্যগুলো আবার কেবল নওমুসলিমদের আইনী ঘোষণা এবং বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র থেকে আগত অভিবাসীদের সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ খুবই সীমিত। তাই বর্তমানে ফ্রান্সে ঠিক কতোজন বা কী পরিমাণ মুসলিম বসবাস করছেন এর সন্দেহাতীত তথ্য বা পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। ফ্রান্সের আইএনইডি (ওঘঊউ) বা আইএনএসইই (ওঘঝঊঊ)’র মতো পাবলিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা বা বিভিন্ন সামাজিক ধারাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের সাথে যুক্ত- ২০১০ সালের অক্টোবরে প্রদত্ত তাদের এক রিপোর্ট বলছে ফ্রান্সে প্রায় আড়াই মিলিয়ন বা পঁচিশ লাখ ‘ঘোষিত’ মুসলিম রয়েছেন, যাদের বয়স ১৮-৫০ এর মধ্যে।

এই আড়াই মিলিয়নের মধ্যে মাত্র ৭০ হাজার থেকে এক লাখ ১০ হাজার হলেন ফ্রান্সের ন্যাটিভ বা জন্মগত নাগরিক যারা অন্য ধর্ম থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামকে নিজেদের ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কেবল প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিক বা ভোটার সম্পর্কিত জরিপ হওয়ায় স্পষ্টতই এই হিসেব থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী মুসলিম শিশু-কিশোররা বাদ পড়েছে, ব্যতিক্রম হলেও একইভাবে বাদ পড়েছেন বা বিবেচনার বাইরে রয়ে গেছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব মুসলিমেরাও। ২০১০ সালে মুসলিমদের বাস্তব সংখ্যা তাই আরো বেশিই ছিলো।

মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র থেকে যেসব লোক নিজেরা বা যাদের বাবা-মায়েরা ফ্রান্সে অভিবাসন গ্রহণ করেছেন তাদের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ফ্রান্স সরকার অবশ্য ২০১০ সালেই তাদের আনুমানিক মুসলিম জনসংখ্যা ৫-৬ মিলিয়ন বলে উল্লেখ করেছে। এই হিসেবে সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেশি এসেছে। তবে সমন্বয়টা তারা এই বলে করে নিয়েছে যে, ৫-৬ মিলিয়নের মধ্যে মাত্র ২ মিলিয়ন মুসলিম নিজেদের ‘প্র্যাকটিসিং’ মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন- আমরা যাদের বলি ‘দীনদার’ মুসলিম, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ প্রতিনিয়ত ইসলামের সকল বিধিবিধানই যারা মেনে চলার প্রয়াস পান। সুতরাং ফ্রান্সের সরকারি সূত্রেও ২০১০ সালের ‘ঘোষিত’ বা ‘প্র্যাকটিসিং’ মুসলিম জনসংখ্যা দুই থেকে আড়াই মিলিয়নই, মোট ছিলো ৫-৬ মিলিয়ন। ২০০৭ সালের দুটো বেসরকারি জরিপ ফ্রান্সের মুসলিমদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৩% বললেও যুক্তরাষ্ট্রের একটি জরিপ অবশ্য সরাসরিই ১০% বলে উল্লেখ করেছিলো। ‘দ্য সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক’ জরিপে ফ্রেঞ্চ মুসলিমদের মোট সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৫-১০%। ‘

পিউ ফোরাম’ এর অন্য এক গবেষণা বলছে ২০১০ সালে ফ্রান্সে ৪.৭ মিলিয়ন বা প্রায় সাতচল্লিশ লাখ মুসলিম ছিলেন। এই স-ব হিসেব বা জরিপই ২০১০ সাল বা তারও পূর্বের। এরপর লাস্ট আপডেটেড বা সর্বশেষ হিসেব পাওয়া যায় ২০১৩ সালের। ২০১৪ সালের বেশ ক’টি বেসরকারি জরিপ ও গবেষণা দাবি করছে ২০১৩ সালে ফ্রান্সের মুসলিম জনসংখ্যা ছিলো প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন বা ৬৫ লাখের মতো। ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যা ৬৬ মিলিয়ন (সাড়ে ছয় কোটির বেশি) হওয়ায় এই হিসেবেও মুসলিম জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১০% এর মতো। অবশ্য ‘জান-পওল গার্ভিচ’ এর এক হিসেবমতে ২০১১ সালে ৭.৭ মিলিয়ন বা মোট জনসংখ্যার প্রয় ১১% মুসলিম থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মুসলিম জনসংখ্যায় প্রকৃত বাস্তবতা

ফ্রান্সের মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে এতো দীর্ঘ বক্তব্যে যাওয়ার ব্যাখ্যা পরে দিচ্ছি। ওপরের প্যারায় লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো- এখানকারর কোনো জরিপ বা কারো দেওয়া তথ্যই পুরোপুরি নিশ্চিত বা একশ ভাগ সত্য নয়। সবকটিতেই কিছু সহজ সূত্র বা আনুমানিক হওয়ার ব্যাপারটাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আর অনুমাননির্ভর ব্যাপারে আমরা একটু বেশি বেশি করে হিসেব ধরলেও ইউরোপ বা পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি এর ঠিক বিপরীত। এ্যাক্সেক্ট, হান্ড্রেড পার্সেন্ট তথা শতভাগ সত্যতা নিশ্চিত করতে বা এর কাছাকাছি থাকতে তারা বরং সংখ্যা কিছু কমিয়ে হিসেব করে। সুতরাং জরিপে উল্লেখিত সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা তো থেকেই যায়। আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো- মুসলিম জনসংখ্যা কমিয়ে দেখানোটাই যে তাদের একান্ত চাওয়া হবে তাতে আর সন্দেহ কি!

শুধু এই আনুমানিক হিসেব দিয়েই তো ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮ টি রাষ্ট্রের মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যায় ১ নম্বর হিসেবে উঠে এসেছে- বলা ভালো কালো তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে! জরিপগুলোকে আনুমানিক বলার কারণ পরিষ্কার- সাংবিধানিক স্বীকৃতি না থাকায় এ নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো জরিপ কখনো হয়নি। সবাই তাই ধার-করজ করেই কাজ চালিয়েছে।

আর সহজ সূত্র বলতে বুঝিয়েছি- ১৮ বছরের কম বয়স্ক- তাদের ভাষায় ‘শিশুদের’ হিসেবের বাইরে রাখা, পঞ্চাশোর্ধ্বদের গুরুত্ব না দেয়া এবং ‘ঘোষিত’ বা ‘প্র্যাকটিসিং’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে সংখ্যা কম দেখানোর প্রয়াস নেওয়া। তারা যাই বলুক- কারো শিশু থাকা, ঘোষণা দেওয়া কিংবা দীনদার হওয়ার ওপরই তো আর মুসলিম হওয়া না হওয়াটা নির্ভরশীল নয়। সুতরাং উপরে বর্ণিত সবগুলো তথ্যই যে বেশরকম অসত্য এবং বহুলাংশে কম করে দেখানো তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সংখ্যা কমানোর এতোসব প্রচেষ্টার পরও, আরো বড় লুকোচুরি খেলা হয়েছে নওমুসলিমদের তথ্য এবং রাষ্ট্রের সীমানা সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে। প্রদত্ত প্রায় সবগুলো জরিপের সূত্রই বলছে- মুসলিম জনসংখ্যার এই হিসেব মূলত মেট্রোপলিটান ফ্রান্সের। পুরো ফ্রান্সের নয়। মূল ভূখন্ড, কোরসিকা এবং আরো কিছু ছোট দ্বীপ-উপদ্বীপ নিয়ে মেট্রোপলিটান ফ্রান্স গঠিত, এর বাইরেও রিপাবলিক বা সামগ্রিক ফ্রান্সের বিশাল অংশ রয়ে গেছে। সেখানেও নিশ্চয় আরো অনেক মুসলিম আছেন যারা আপাতত এসব জরিপের আওতায় পড়েন নি। আর নওমুসলিম বিষয়ে সকল সূত্রের খবর- ফ্রান্সে ব্যাপকহারে ইসলাম গ্রহণকারী লোকের সংখ্যা বাড়ছে। কী পরিমাণে?…

শব্দের খেলায় চতুর কলামিস্ট বা কূটনীতিকরা অস্পষ্ট ইংলিশ ‘থাউযেন্টস’ (হাজার হাজার বা হাজারো) শব্দটি বলে পরিমাণ ব্যাখ্যা করতে চাইছেন। কিপ্টে সূত্রগুলো বলছে বছরে ৭-১০ হাজার। আর উচ্ছ্বসিত মুসলিমরা দাবি করছেন প্রতিবছর ৬০-৭০ হাজার ফ্রেঞ্চ নাগরিক মুসলমান হচ্ছেন। আসল সত্যটা কি? বিতর্কে এড়িয়ে সমন্বয়ের প্রাথমিক হিসেব মেলাতে গেলেও তো বাৎসরিক গড় সংখ্যাটা ২৫-৩০ হাজারের কম হয় না কোনোভাবেই। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলাম গ্রহণের সংখ্যাবৃদ্ধিতে স্থানীয় মুসলিম লিডারগণও বিস্মিত হয়ে যাচেছন। সুতরাং এতোক্ষণের আলোচনার সবগুলো বিবেচনা মাথায় নিলে নিঃসন্দেহে বলে ফেলা যায়- ফ্রান্সের মুসলিম জনসংখ্যা ৯-১০ মিলিয়ন বা কোটির কাছাকাছি হবেই, মোট জনসংখ্যার বিবেচনায় যা ১৫% কেও ছাড়িয়ে যায়! প্রকৃত সংখ্যা যাচাই ও উল্লেখ করা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা থাকাটা তাহলে অস্বাভাবিক নয় মোটেও। ফ্রান্সের সেরা ঔপন্যাসিক তো আর এমনি এমনিই তার উপন্যাসে শীঘ্রই একজন মুসলিম প্রেসিডেন্ট দেখার কল্পনা করে ওঠেন না। একজন মুসলিম স্কলার (মারওয়ান মুহাম্মদ) একরকম চ্যালেঞ্জই ছুড়ে দিয়েছেন- কে বলতে পারে যে আগামী ৩০-৪০ বছরের মধ্যে ফ্রান্স একটি মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হবে না!

ফ্রেঞ্চ পার্লামেন্টে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব

ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার প্রায় দশ শতাংশ মুসলিম হলেও ফ্রেঞ্চ পার্লামেন্টে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব নেই বললেই চলে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে আজুজ বেকাকসহ কেউ কেউ কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারি দপ্তরের দায়িত্ব পালন করলেও সেটা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে ছিলো না। মেয়াদও ছিলো খ-কালীন। জনগণের প্রতিনিধির চেয়ে তাদেরকে বরং প্রেসিডেন্ট বা দলীয় প্রধানের বিশেষ প্রতিনিধি বলাই শ্রেয়তর। বোরকা নিষিদ্ধসহ ফ্রান্সে মুসলিম ইস্যুতে রাজনীতি করার বড় রেকর্ড গত টার্মের (২০০৭-২০১২) প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজির। ব্যক্তিগতভাবে তিনি তিনজন মুসলিম বংশোদ্ভূত সদস্যকে তার কেবিনেট ও গুরত্বপূর্ণ দপ্তরে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য তারাও কিছু করেন নি বা পারেন নি, দীর্ঘদিন ধরে দলের হয়ে কাজ করা কিংবা নির্বাচনকালীন প্রচারণায় বিশেষ ভূমিকা পালনের পুরস্কার হিসেবে সারকোজি তাদেরকে সম্মানিত করেছিলেনমাত্র। তারচেয়ে বড় কথা- মরক্কো কিংবা আফ্রিকান পিতা-মাতার ঘরে জন্ম নেওয়া এই শ্রেণীটি মুসলিম পরিচয় ধারণ করলেও লালন কতোটুকু করেন তা নিয়ে মুসলিম সোসাইটিতেই প্রশ্ন আছে। অথচ তাদেরকেও যুগের পর যুগ ‘বিশ্বস্ততার’ প্রমাণ দিয়ে এটুকু অর্জন করতে হয় বা হয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন মুসলিম কমিউনিটির প্রধান বা ইমামেরা ফ্রান্স সরকারে বা প্রশাসনের কোথাও প্রাথমিক আস্থার জায়গাটুকুই এখনো খুঁজে পান নি। সেক্যুলার রাষ্ট্রের তকমাধারী ফ্রান্সের গোঁড়া সমাজ ব্যবস্থায় রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হলেও মুসলিম পরিচয়ে বা মুসলিম জনসংখ্যার পক্ষ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো প্রতিনিধিত্ব তৈরীর সুযোগ মুসলিমেরা কখনো পান নি। বর্তমান বাস্তবতা তো আরো জটিল।

ফ্রান্সে মসজিদ ও ইসলামী সংস্থা

ফ্রান্সে মসজিদ ও বিভিন্ন মুসলিম কমিউনিটির প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট ইসলামী সংস্থা প্রায় ১৫০০টি। বিভিন্ন কমিউনিটি বলতে- যুগ যুগ ধরে আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইরান-পাকিস্তানের যেসব অভিবাসী ফ্রান্সে পারি দিয়েছেন তাদের স্থানীয় প্লাটফর্মকে বোঝানো হয়েছে। আছে তাবলীগ, সালাফিজম, শিয়া ও নগণ্য সংখ্যক কাদিয়ানী মতবাদের অনুসারীও। জাতীয়ভাবে সবাই মুসলিম পরিচয়েই ফ্রান্সে বাস করেন। বিভিন্ন সময়ের জরিপে তাই সম্মিলিত তথ্যই উঠে এসেছে।

ফ্রান্সে অবশ্য ধর্মীয় পরিচয় যাচাই বা হিসেব করার সরকারি কোনো নিয়ম বা বৈধতা নেই, অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্যের সূত্র ধরেই এই জরিপগুলো করা হয়। আশির দশকের পর থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইসলামী শিক্ষা সেন্টার বা মাদরাসাও সংখ্যায় যুক্ত হয়েছে। সব মসজিদ, বিশেষত মাদরাসাগুলো যদিও ফ্রান্স সরকার কর্তৃক স্বীকৃত নয়, স্থানীয় মুসলিমেরা চেষ্টা করছেন মোটামুটি একটা সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে। তাতে ঝামেলাও বাঁধছে। প্রায়ই কোনো মাদরাসা বা অনুমোদনহীন মসজিদে তালা ঝুলিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটছে।

সম্প্রতি প্যারিস হামলার প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স সরকার ১৬০ টি ‘অনুমোদনহীন’ মসজিদ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দুঃখজনক হলেও তাদের সিস্টেমটা বেশ মজার- রাষ্ট্র নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকারের স্বীকৃতি দিচ্ছে, ধর্ম পালনের সুযোগ দিচ্ছে না। মসজিদের জন্য অনুমতি চাইতে যাবেন, মিলবে না। পরিত্যক্ত কোনো গ্যারেজ বা বাড়িতে মোটামুটি একটা ব্যবস্থা করে নামাজ পড়া শুরু করলেন, সরকার বলবে সেটা বেআইনি। কথা, যুক্তি, বিকল্প সবই আছে এর, সমাধানটাই শুধু নেই।

ফ্রান্স: বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপট

৯ ডিসেম্বর ১৯০৫। ফ্রান্সে চার্চ থেকে রাষ্ট্রের বিভাজনের আইনটি পাস হয়। বিশেষ একটি ধর্মের অধীনতা বা প্রাধান্য থেকে ফ্রান্স প্রথমবারের মতো সেক্যুলার রাষ্ট্রের পরিচিতি লাভ করে। রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার নীতি, ধর্মপালনের স্বাধীনতা এবং চার্চের সাথে সম্পৃক্ত জনগণের অধিকার ছিলো এই আইনটির মৌল বিষয়। ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বে প্রথম এবং প্রধানতম সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে এখনো ফ্রান্সের তথাকথিত যে গর্ব, এই আইনটিই হলো তার ভিত্তি। তবে- কোনো আইন যখন একই সময়ে একপক্ষের অধিকারের নিশ্চয়তা দেয় এবং অন্যপক্ষের অধিকার হরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়- সে আইন নিয়ে রাষ্ট্রের গর্ব করাটা তো তথাকথিত হতে বাধ্য। চার্চ থেকে বিভাজনের এই আইনের মাধ্যমে এখন থেকে রাষ্ট্র ফ্রান্স যেমন কোনো কাজেই চার্চের বক্তব্যের দিকে তাকিয়ে থাকবে না, চার্চও তার স্বাভাবিক কাজ পরিচালনায় রাষ্ট্রের বাধাপ্রাপ্ত হবার আশংকায় পতিত হবে না।

ফ্রন্সের ১৯৫৮ সালের সংবিধানে সরাসরি উল্লেখ আছে- ‘রাষ্ট্র ফ্রান্স কোনো ধর্মের স্বীকৃতি, বেতন-ভাতা বা কোনো প্রকার অনুদান প্রদান সংক্রান্ত কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে না।’ এর ঠিক বিপরীত অর্থ বা বাস্তবতাটা দাঁড়ায়- রাষ্ট্র কোনো চার্চ বা ধর্মের কাজে কখনো নাকও গলাবে না। উল্লেখ্য, ১৯০৫ এর আগ পর্যন্ত রোমান ক্যাথলিসিজম ছিলো ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় ধর্ম। কয়েক শতাব্দী ধরেই নানা বিষয়ে রাষ্ট্র আর চার্চের বিপরীত বিবৃতি সমাজে জটিলতা সৃষ্টি করে আসছিলো। ফলে চার্চ থেকে রাষ্ট্রকে আলাদা করার জন্য সুদীর্ঘ লড়াইয়ের মাধ্যমে স্বতন্ত্র এই আইন পাস করতে হয়। তবে প্রায়োগিক অর্থে এখানে চার্চের অর্থ হবে ধর্ম। ফ্রান্সের সকল ধর্ম। এই আইনের মাধ্যমে ধর্মসমূহের দায় থেকে রাষ্ট্র যেমন মুক্ত, ধর্মগুলোও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রশ্নে সম্পূর্ণ স্বাধীন। আইন পাসের পরবর্তী প্রায় ৬-৭ দশক পর্যন্ত ছোটখাঁ নানা বিরোধ বা ঝামেলা সামনে এলেও রাষ্ট্রের আন্তরিকতা নিয়ে তেমন প্রশ্ন ওঠেনি।

৬০-৭০ দশকের মুসলিম অভিবাসনের পর থেকেই দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যেতে থাকে। বিশেষত আফ্রিকার আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া ইত্যাদি দেশ থেকে তখন বেশ বড় একদল মুসলিম কাজ ও বাসস্থানের খোঁজে ফ্রান্সে পাড়ি জমান। ধর্মপ্রাণ এসব মুসলিম ইসলামী বিধি-বিধান পালনের স্বাধীনতায় বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না। ঠোকাঠুকির শুরু হয় তখন থেকেই। নব্বইয়ের গোড়ার দিকে এসে যা শুধু ঠোকাঠুকিতে থেমে থাকেনি, বছরের পর বছর ধরে লুকিয়ে থাকা মস্ত ক্ষতটাকেই সামনে নিয়ে আসে। ইসলাম ও মুসলিম ইস্যুতে শুধু চার্চ নয়- রাষ্ট্র ফ্রান্সই খোদ প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।

ফ্রান্সে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যের সূচনা

ইউরোপে ইসলাম ও মুসলমান

ঘটনার সূত্রপাত অক্টোবর ১৯৮৯, দক্ষিণ প্যারিসে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনজন মুসলিম মেয়ে কলেজে (গ্যাব্রিয়েল হ্যাভেজ কলেজ) হাজির হলো, যথারীতি স্কার্ফে মাথা ঢেকে। তবে ক্লাসে ঢুকেই এদিন হেড মিস্ট্রেস তাদের স্কার্ফ খুলে ফেলার নির্দেশ দিলেন। রাজি না হওয়ায় তৎক্ষণাৎ তাদেরকে কলেজ থেকে বহিষ্কার ঘোষণা করা হলো। ফ্রান্সে মুসলিমদের মৌলিক অধিকার হরণ এবং ইসলামী জীবনধারা সংক্রান্ত বিতর্কের সেই প্রকাশ্য সূচনা। এরপরের কয়েক সপ্তাহ কলেজ কমিটি এবং স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক ও আলোচনার প্রেক্ষিতেও কোনো সমাধান এলো না। মুসলিমরা জানিয়ে দিলেন- ধর্মীয় স্বাধীনতা যেখানে রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত, ধর্মীয় পরিচিতি বহন করা সেখানে অন্যায় হয় কী করে? অন্যদিকে কলেজ কর্তৃপক্ষের অনড় দাবি- প্রত্যক্ষ ধর্মীয় চিহ্ন বহন করাটা চার্চ থেকে রাষ্ট্রের বিভাজনের (লাইসিটি) আইনের সাথে সাংঘর্ষিক।

সুরাহা না হওয়ায় স্টেট কাউন্সিলকে এগিয়ে আসতে হলো। এই কাউন্সিল একইসাথে ফ্রান্স সরকারের আইনি পরামর্শক এবং বিচার-আচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের ভূমিকা পালন করে থাকে। তাদের প্রাথমিক রায়ও মুসলিমদের পক্ষেই গেলো। কাউন্সিল জানালো- ‘পাবলিক স্কুলে ধর্মীয় চিহ্ন শরীরে বহন করা ফ্রান্সের সেক্যুলার আইনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।’ তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ বা গোঁড়া ফ্রেঞ্চ সোসাইটি তা মেনে নেয়নি। দেন-দরবার চলতেই থাকলো। পরের মাস ডিসেম্বরে মন্ত্রিসভার এক মিটিংয়ে আলাপ-আলোচনার পর তারা দায়িত্বটা শিক্ষকদের ওপর ছেড়ে দিলেন। কেস বাই কেস বা ঘটনা ও পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে শিক্ষকরাই সিদ্ধান্ত নেবেন কোনটা রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় পড়বে আর কোনটা পড়বে না এবং সে প্রেক্ষিতেই তারা মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের ট্রিট করবেন। এই সিদ্ধান্ত আপাত দৃষ্টিতে চমকপ্রদ মনে হলেও বাস্তব বিবেচনায় ছিলো রীতিমতো ভয়াবহ।

মন্ত্রিসভা বিষয়টির সুরাহা না করে এর সাথে বরং পলিটিক্স জুড়ে দিলো। ফ্রেঞ্চ সোসাইটিসহ পুরো শিক্ষক সমাজ যেখানে মুসলিমদের এই অধিকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই ছিলো, মন্ত্রিপরিষদ তাদের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে প্রকারান্তরে পুরো মুসলিম কমিউনিটির বিরুদ্ধেই অবস্থান নিলো। আশংকা যে অমূলক ছিলো না সেটার বাস্তবতা এর পরপরই সামনে আসতে শুরু করলো। ঠিক একমাসের মধ্যেই পাশ্ববর্তী আরেকটি কলেজ তিনজন মুসলিম ছাত্রীকে বহিষ্কার ঘোষণা করলো। এর বাইরে নানাভাবে হয়রানি তো বাড়ছিলোই। অনন্যোপায় হয়ে মুসলিম অভিভাবকেরা এবার সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হলেন। আবারও এগিয়ে এলো মন্ত্রিপরিষদ এবং এবার তারা আরো একধাপ অগ্রসর হয়ে উপদেশের মোড়কে বিতর্ক উসকে দিলো এই বলে- ‘স্কুল-কলেজগুলো যেনো রাষ্ট্রের লাইসিটি বা সেক্যুলার আইনের প্রতিই শ্রদ্ধাশীল থাকে।’

এই শ্রদ্ধার নমুনা এরপর স্কুল-কলেজগুলোও দেখাতে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে অসংখ্য মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী এ সময় পড়াশোনা বাদ দিতে বাধ্য হয়। পড়াশোনার মতো মৌলিক অধিকার অর্জনের জন্য অনেক মুসলিম মেয়েকে নিরূপায় হয়ে স্কার্ফ-হিজাব বর্জন করতে হয়। পরিস্থিতি এতোটাই জটিল আকার ধারণ করে যে শুধু ’৯৪ তেই ১০০’র বেশি ছাত্রীকে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিলো। ইহুদি-খৃষ্টান ছাত্র-ছাত্রীরাও স্কুলে তাদের ধর্মীয় সিম্বল বহন করে, মাথায় ছোট্ট টুপি ও গলায় ক্রুশ। সেটা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি কখনো। মুসলিম মেয়েদের স্কার্ফ বা হিজাববিষয়ক এই তুমুল বিতর্কের সময়েও নয়। ‘৯৪ এর ব্যাপক উত্তেজনার একপর্যায়ে ফ্রান্সের বিজ্ঞ মন্ত্রিপরিষদ তৃতীয় এবং শেষবারের মতো এগিয়ে এলো। ধর্মীয় সিম্বলগুলোকে তারা দু’ ভাগে ভাগ করলো এবং ঘোষণা দিলো- ‘ধর্মীয় সিম্বলগুলোর মধ্যে কিছু আছে সাধারণ, ছোট প্রকৃতির বা অনাড়ম্বর- এগুলো ব্যবহারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাধা দিতে পারবে না। আর কিছু আছে খুবই আলাদা ধরনের এবং আড়ম্বরপূর্ণ- যেমন হিজাব বা স্কার্ফ- এগুলো এখন থেকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।’

এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে তারা মুসলিম মেয়েদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং অধিকার হরণের ব্যাপারটির চূড়ান্ত রূপ দিলেন। একইসাথে আগ বাড়িয়ে ইহুদি-খৃষ্টান ছাত্র-ছাত্রীদের ধর্মীয় সিম্বল বহনের অধিকারের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থনও জানিয়ে দিলেন। কারণ, ইহুদিদের ইয়ারমুক আর খৃষ্টানদের ক্রুশ সাধরণত ছোট আকৃতিরই হয়ে থাকে। মুসলিম কমিউনিটি শেষ যে আশাটা ধরে রেখেছিলেন মন্ত্রিপরিষদের এই রায় তাতে পানি ঢেলে দিলো। প্রতিবাদে কিছু মুসলিম ছাত্রী পরদিন বোরকা ও স্কার্ফ পরেই স্কুলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। আবার নেমে এলো খড়গ। একদিনে শুধু লাইস সেন্ট এক্সিপিউরি স্কুল থেকেই ২৪ জন হিজাবপরিহিত মেয়েকে বহিষ্কার করা হলো। এরপর তর্ক-বিতর্ক, সালিশ-মামলা বহুকিছুই হয়েছে, কাজের কাজটাই শুধু হয়নি।

২০০৩ এ এসে নতুন প্রেসিডেন্ট জ্যাক সিরাক (কারো কাছে- সাইরাস) স্কার্ফ ও হিজাবের সাথে সাথে ইহুদি ছাত্রদের ইয়ারমুক (মাথার তালুতে ব্যবহৃত ছোট্ট টুপিবিশেষ) এবং খৃষ্টানদের দৃশ্যমান ক্রুশ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রায়ে একপ্রকার সাম্য বা নিরপেক্ষতা আনার প্রয়াস পান। বঞ্চিত থেকে যায় কেবল মুসলিম ছেলে-মেয়েরা।

হিজাব নিষিদ্ধে ফ্রান্সই প্রথম!

এখানে ১৯৮৯-১৯৯৪ পর্যন্ত মোট ছ’ বছরের ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষেপে তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

২০০৩ এ এসে প্রেসিডেন্ট জ্যাক সিরাক যার চূড়ান্ত রূপ দেন। বিশ্বে ফ্রান্সই প্রথম রাষ্ট্র যেটি প্রথমবারের মতো মুসলিম মেয়েদের ধর্মীয় এই অধিকার হরণ করে। এ ঘটনার তাৎপর্য ব্যাখ্যায় না গিয়েও শুধু বাস্তবতাুঁকু যদি বিবেচনায় আনা হয়, তাহলেও মাথা ঘুরে যেতে বাধ্য। পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রীয় কাঠামো তো আর আমাদের মতো নয়। পুরো দেশ একটা সিস্টেমে চলে। যেসকল মুসলিম মেয়েকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এমন নয় যে পাশের আরেকটা স্কুলে গিয়ে তারা ভর্তি হতে পারবে। আর ওখানে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে রাষ্ট্রের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া। সুতরাং নব্বইয়ের পুরো দশকজুড়ে যেসব মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী স্কুল-কলেজ থেকে সরাসরি বহিষ্কৃত-বিতাড়িত বা নানা চাপে পড়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে তারা এক কথায় রাষ্ট্রের সবধরনের অধিকার থেকেই বঞ্চিত হয়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে বাচ্চাদের সাথে সম্পর্কিত এই আইনটির মাধ্যমে মূলত ফ্রান্সের প্রায় এক কোটি মুসলিমকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে। সন্তান পড়াশোনার উপযুক্ত হলে এখন মুসলিম মা-বাবাদের আগেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়- ধর্মকে পাশে ঠেলে নিজেদের সন্তানদের তারা স্কুলে পাঠাবেন, না ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রের প্রায় সকল সুবিধা ও অধিকার থেকে প্রিয় সন্তানদের বঞ্চিত করবেন।

এই আইনটি একই সাথে হিজাব নিষিদ্ধের পটভূমি তৈরি করার পাশাপাশি পুরো বিশ্বে বিশেষত পাশ্চাত্যে ইসলামী জীবনধারার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি এবং মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার হরণের একটা নজির হয়ে ওঠে। ২০১০ সালে ফ্রান্সে হিজাব নিষিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে বেলজিয়ামও হিজাব নিষিদ্ধ করে।

বিশ্বে এই দুটি দেশই পাবলিক স্পেসে জাতীয়ভাবে হিজাব নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফ্রান্সের দেখাদেখি স্পেন, রাশিয়া, ইটালি এবং সুইজারল্যান্ডের মতো প্রভাবশালী দেশও জাতীয়ভাবে না হোক লোকালভাবে অনেক প্রদেশে বা প্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ করেছে। আর এসবেরই সূত্রপাত ছিলো সেই নব্বইয়ের দশকে স্কুলে স্কার্ফ নিষিদ্ধকরণ। আফসোসের ব্যাপার এই- রাষ্ট্র হিসেবে ফ্রান্সের বেশ কয়েকটা পরিচিতির মধ্যে একটা হলো, ফ্রান্স মানবাধিকারের দেশ। একই সাথে পুরো ইউরোপের মধ্যে ফ্রান্সই মুসলিম জনসংখ্যার বিচারে সবচেয়ে এগিয়ে। অথচ এই দেশটিই তার অন্যতম বৃহৎ নাগরিক সম্প্রদায়কে তাদের মৌলিক একটি অধিকার থেকে বঞ্চিত করে বসলো। শুধু বঞ্চিতই তো করেনি, বিশ্বে সবার আগে করলো এবং অত্যন্ত রূঢ় ও অমানবিকভাবেই করলো।

মানবাধিকার লংঘনের কালো অধ্যায়

ব্যাপার শুধু এ পর্যন্ত এসে থেমে গেলেও হতো। হয়নি। একান্ত ধর্মীয় এই বিষয়ের সাথে এরপর ভোটের রাজনীতি জড়িয়ে গেলো। আর দশজন নাগরিকের মতো একজন নাগরিকের পরিচয় হারিয়ে মুসলিমরা হঠাৎ পরিচিত হয়ে ওঠলেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেলো- কে কীভাবে বিশাল জনগোষ্ঠীর এই ভোটব্যাংকটি নিজের দখলে নেবেন। সকাল-সন্ধ্যায় দিনের দুই রূপের মতো মুসলিমদের কাছে এসে তারা একপ্রকার প্রতিশ্রুতি শোনান আবার ফ্রেঞ্চ সোসাইটিতে গিয়ে শোনান অন্যরকম কেচ্ছা।

সাধারণ ফ্রেঞ্চ নাগরিকদের কাছে গেলে তারা হন খাঁটি জাতীয়তাবাদী আর মুসলিমসম্প্রদায়ের কাছে এলে হয়ে যান ত্রাতা। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ভোটব্যাংকের এই কার্ড চালাচালিতে একসময় বড় খিলাড়ি হিসেবে আবির্ভূত হন নিকোলাস সার্কোজি।

শ্রেণিবৈষম্যের লোকাল এই চর্চাকে ২০০৭ এর প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে তিনি জাতীয়পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করেন। এবং এই প্রথমবারের মতো ফ্রান্সের মুসলিমরা বুঝতে পারেন- পূর্বের বৈষম্যমূলক রায়গুলোর ক্ষেত্রেও দু’ দু’বার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রির দায়িত্ব পালন করা নতুন নির্বাচিত এই প্রেসিডেন্টের বিশাল ভূমিকা ছিলো।

দু’বার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সার্কোজি ইতোপূর্বে অর্থমন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই ফ্রান্সের অর্থনৈতকি অবস্থা খারাপ হতে থাকে। ২০০৮’র বৈশ্বিক মন্দা (সারাবিশ্বের- বিশেষত পাশ্চাত্যের শেয়ার বাজারসহ প্রায় সকল অর্থনৈতিক সেক্টরের অচিন্তনীয় ধস) মোকাবেলা করতে গিয়ে ফ্রান্সের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। সামলে উঠতে না পারায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন নিকোলাস সার্কোজি। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে- এসময় আবার তিনি পুরনো কার্ড খেলার সিদ্ধান্ত নেন।

স্কার্ফ দিয়ে শুরু হওয়া মুসলিম নারীদের পেশাক বিষয়ক বিতর্ক ততোদিনে হিজাব-বোরকা পর্যন্ত গড়িয়েছে- হঠাৎ তিনি এ নিয়ে বিতর্ক উসকে দেন। ‘ফ্রান্সে ইসলামী বোরকাকে স্বাগত জানানো হবে না’ মর্মে ঘোষণা দিয়ে জনগণের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার প্রয়াস পান। একইসাথে হিজাব-বোরকাকে তিনি বশ্যতামূলক পরিধেয় এবং পোশাকের আড়ালে জেলখানা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ফ্রান্সসহ সারা বিশ্বে এই ঘোষণা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। তবে রাষ্ট্র ফ্রান্স এটাকে প্রায় দু’দশক ধরে গলায় আটকে থাকা কাঁটা অপসারণের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। ৩২ সদস্যবিশিষ্ট শক্তিশালী একটি সংসদীয় কমিশন গঠন করা হয়, যাদের কাজ ছিলো বোরকা নিষিদ্ধের সম্ভাব্যতা যাচাই করে দ্রুত সেটা বাস্তবায়ন করা। সার্কোজির ঘোষণা এবং সংসদীয় কমিশনের তদন্ত বিষয়ক বিতর্কের মধ্যেও দেশে-বিদেশে এই খবর চাউড় হয়ে যায়- ‘বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা আড়াল করতেই সার্কোজি এই রাজনৈতিক খেলা শুরু করেছেন।’ ২৫ জানুয়ারি ২০১০, সংসদীয় কমিশন ‘স্টাডি’ শেষে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন- আজ থেকে ফ্রান্সের পাবলিক স্পেসগুলোতে ইসলামিক বোরকা নিষিদ্ধ করা হলো।

হুকুম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রায়ে একপ্রকার সাম্য আনয়ন বা বিতর্ক এড়ানোর দুর্বল প্রয়াস হিসেবে মাস্কসহ যে কোনো ফেস কভারিং পরিধেয়কেও নিষিদ্ধ করা হয়। …আধুনিক বিশ্বে প্রথমবারের মতো একটি রাষ্ট্র পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অধিকার হরণমূলক এই আইনটি পাস করলো। সৃষ্টি হলো মানবাধিকার লংঘনের কালো অধ্যায়।

কেমন আছেন ফ্রান্সের পর্দানশীন নারীরা?

hijab ban in France

আমার নিজস্ব মন্তব্য বা পারিপার্শ্বিক ব্যাখ্যার চেয়ে এক্ষেত্রে বরং একজন ফ্রেঞ্চ সাংবাদিকের রিপোর্ট হুবহু তুলে দিচ্ছি, নিজেদের কনক্লুশনে যাওয়ার আগে তাই ওদের উপলব্ধিটুকুও জেনে নিন। ২০১০ এ হিজাব নিষিদ্ধ হওয়ার এক বছরের মাথায় ২০১১ সালে এলিসন হার্ড এই রিপোর্টটি করেছিলেন।
‘ফ্রান্সের পাবলিক স্পেসে মুখাবৃত বোরকা নিষিদ্ধের এক বছর পূর্তি হলো। সরকারের ভাষায় আইনটি পাস হয়েছিলো- রাষ্ট্রের সেক্যুলার মূল্যবোধ এবং নারী অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে। বিপরীত বক্তব্য বা অভিযোগ ছিলো- ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতি এবং মুসলিমদের ঘিরে তৈরি হওয়া অসত্য ধারণা ও উপলব্ধিকে আরো পোক্ত করার প্রেক্ষিতেই এই আইনটি পাস করা হয়েছে- যা মুসলিমদের জন্য কোনোভাবে সুখকর তো নয়ই, বরং আরো বেশি বিব্রতকর। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বলছে- এই এক বছরে পুলিশ কমপক্ষে ৩৫৪ জন মুসলিম নারীকে যাত্রাপথে আটকে দিয়েছে এবং চেকিং করেছে। এর মধ্যে ২৯৯ টি অভিযোগ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ২০ জনকে ১৫০ ইউরো বা প্রায় সাড়ে বার হাজার টাকা করে জরিমানা গুনতে হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় যদিও বলছে- খুবই সতর্কতার সাথে তারা আইনটি প্রয়োগের পথে হেঁটেছেন, কিন্তু যারা প্রয়োগের শিকার হয়েছেন, বিশেষত মুসলিম নারীরা- তারা বলছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

‘নিষিদ্ধ বোরকা’ শিরোনামের ডকুমেন্টারিতে একজন মুসলিম যুবতী বলেছেন- ‘এই আইন পাসের পর আমার দু:স্বপ্নগুলো যেনো বাস্তবে রূপান্তরিত হয়ে সামনে এসে গেছে। আপনি যখন বাইরে যাবেন, আপনার পাকস্থলি ভেতরে দলা পাকাতে শুরু করবে। আপনি কেবল খুঁজতে থাকবেন- আশপাশে কোথাও পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে কি না। বাইরে থাকার পুরোটা সময় আপনাকে অপমানিত হওয়ার আতংকে ভুগতে হবে। আগের মতো এখনো আমি বাইরে যাই- তবে এই আইন ভয়টা বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যাপকমাত্রায়। ভয় দীর্ঘক্ষণের বিরক্তিকর পরিচিতি নির্ণয়ের, ভয় অপমানের, ভয় জোরপূর্বক পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়ার, ভয় অনির্দিষ্ট সময়ের বিরক্তিকর প্রশ্নবানের…।’

প্যারিসের এমন প্রায় ২০০০জন নারী, জীবনের তাগিদে যারা প্রতিদিন পুরো মুখঢাকা বোরকা পরে বের হন এই আইন তাদের জীবনকে সত্যিই বিভীষিকাময় করে তুলেছে। ফ্রান্সের সমাজবাদী এবং ডকুমেন্টারি ফিল্ম পরিচালক এক নারী (অমহঁং ফবর ঋল্কড়) এই মুসলিম মেয়েদের নিয়ে সম্প্রতি একটি ডকুমেন্টারি বানিয়েছেন। তিনি মোট ১০০ জন মুসলিম নারীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, বোরকা নিষিদ্ধের আইন পাস হওয়ার পর থেকে কেমন জটিল আকার ধারণ করেছে তাদের জীবন- সেসব অভিজ্ঞতার বর্ণনা নিয়ে। ডকুমেন্টারির পরিচালক ডি ফিঁউ বলেন- ‘আমি এমন অনেক মেয়ের সাথে মিলিত হয়েছি- পুলিশ বিষয়ক কোনো সমস্যা যাাদের নেই। তারা অনায়াসে পুলিশের সামনে দিয়ে চলে যেতে পারেন। কখনো তারা গ্রেফতারের শিকার হননি। বলা ভালো হতে হয় না। আবার এই দেশেই আপনি এমন নারীদেরও পাবেন- যারা একেকজন চারবার করেও গ্রেফতারের মুখে পড়েছেন এবং এর মধ্যে দুই থেকে তিনবারই জরিমানার শিকার হয়েছেন।’

জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি তথ্য দিয়েছেন- আইন পাস করার পর থেকে অন্তত অর্ধেক সংখ্যক মুসলিম নারী তাদের মুখ ঢাকা বোরকা পরা ছেড়েছেন। কিন্তু ডকুমেন্টরির পরিচালক ডি ফিউঁ বলতে চান- নিষিদ্ধের ফলাফল বরং উল্টোটা হয়েছে।

তার ভাষায়-‘প্রচুর নারী নিকাব পরা শুরু করেছেন অইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই এবং তারা বেশ আক্রমণাত্মক। এসব নিপীড়নমূলক আইনের কারণে কখনো কখনো তো তারা খোদ রাষ্ট্রেরও বিরোধিতা করতে চান।

মুসলিম নারীরা মনে করেন- এসবের মধ্য দিয়ে তারা মূলত প্রতিরোধ করছেন, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এটা একপ্রকার লড়াই। তারা আরো বলছেন- যতোবেশি করে আমরা অপমানিত হবো ততোবেশি করেই সত্য তথা আমাদের দীনকে আঁকরে ধরবো।’ এই আইনটি নিকাবের পক্ষের আওয়াজকে আরো জোরালো করে তুলেছে।

অন্তত ৩৫০ জন মুসলিম নারী এখন নারী স্বাধীনতা সংঘের (অসধুড়হং ড়ভ ভৎববফড়স) সদস্য, এটি একটি গ্রুপ যা দুর্ভোগের শিকার নারীদের নৈতিক এবং আইনী সহযোগিতা দিয়ে থাকে এবং বোরকা নিষিদ্ধের আইনটি প্রতিস্থাপন বা সংশোধনের জন্যও প্রচারনা চালায়। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা লাইলা সিতার বলেন- আইনটি এক আকস্মিক দুর্বিপাক। শত শত নারীকে এখন আতংক নিয়ে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। তারা তাদের মৌলিক অধিকার নিয়ে রীতিমতো হতাশ। প্রতিনিয়ত পুলিশের হাতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন অপরাধীদের মতো। মৌখিক এবং শারীরিক লাঞ্চনার ঘটনা তো এর মধ্যেই সীমা ছাড়িয়েছে। মৌখিক অপমান এবং হয়রানিগুলোকে তো এখন আমরা গণনাতেই ধরছি না। এটা এক নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পর্যবসিত হয়েছে।’

পাবলিক স্পেসে নিকাব পরে বের হওয়াটাকে আজকাল গাড়ি চালাবার সময় ফোনে কথা বলার মতো অন্যায় হিসেবে গন্য করা হচ্ছে। এক্ষেত্রেও আপনাকে কখনো শুধু সতর্ক করা হয় কিংবা কোনো সামাজিক কাজের পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় কিন্তু মুসলিম নারীরা বলছেন- পুলিশ তাদের সাথে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে। ডি ফিউঁ বলেন- পুলিশকে যদিও কেবল পরিচিতি নিশ্চিতকরণের অধিকার দেয়া হয়েছে কিন্তু তারা প্রায়শই অধিকারের বেড়া ডিঙিয়ে মুসলিম নারীদের অহেতুক দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করছে। তিনি বলেন- নারীদের কখনো চার ঘণ্টা পর্যন্তও আটকে রাখা হয়েছে এবং অনেক পুলিশ সদস্যকে দেখা গেছে যে তারা জানেই না- আইনটি কেবল পরিচয় নিশ্চিতকরণ পর্যন্তই সীমিত। আবার কখনো এমনও হয়েছে- তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজেদের পুরো পরিচিতি তুলে ধরার পরও তাদেরকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

আইন পাসের সময় বলা হয়েছিলো- বেশিরভাগ কিশোরী-নারীকে জোরপূর্বক এমন মুখঢাকা পুরো শরীরের বোরকা পরানো হয়েছে। কিন্তু নারী সংঘ এবং ডি ফিউঁ দুজনই বলছেন- মুসলিম এই নারীদের বড় একটা অংশই হয়তো অবিবাহিত বা নতুনভাবে ইসলাম গ্রহণের কারণে ডিভোর্সড। সুতরাং জোর করে বোরকা পরানোর ব্যাপারটি পুরোই বানোয়াট। জোরপূর্বক বোরকা পরাবার অভিযোগ পেলে আইনী ব্যবস্থার মুখোমুখি করার রাষ্ট্রীয় হুঁশিয়ারী দেওয়া থাকলেও বিগত এক বছরে কোনো মুসলিম নারী একটাও অভিযোগ করেন নি।

ষড়যন্ত্র যুগে যুগে

পেগিডা

১৯৬১’র জুনে ফ্রান্সের একটি দ্রুতগামী ট্রেন প্যারিসের কাছাকাছি বোমা হামলার মুখে পড়ে। ২৮ জনের মৃত্যু এবং একশ’র বেশি মানুষ তাতে আহত হয়। ফ্রান্সের অধীনে থাকা আলজেরিয়া ১৯৫৪ সাল থেকে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে আসছিলো। ঘটনাক্রমে আক্রান্ত ট্রেনটি ছিলো ফ্রান্সের এমন একটি সংস্থার মালিকানায়, যারা আলজেরিয়ার স্বাধীনতার কট্টর বিরোধী। ব্যস, দুইয়ে দুইয়ে চার এর সূত্র অনুসরণ করে এ হামলার দায় চাপিয়ে দেয়া হলো আলজেরিয়ান মুসলিম সন্ত্রাসীদের ওপর। অন্যার্থে- মুসলিমদের ওপর।

নিরাপত্তা-খাদ্য-বাসস্থানের খোঁজে আলজেরিয়াসহ আফ্রিকার বেশকিছু দেশ থেকে মুসলিমরা তখন ফ্রান্সসহ বিভিন্ন ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রে ঢোকা শুরু করেছে। এই হামলার দায় চাপানোর মাধ্যমে ফ্রান্স সরকার তার দেশে প্রথমবারের মতো মুসলিম কমিউনিটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার প্রয়াস পায়। পরের বছর ১৯৫২ তে আলজেরিয়া স্বাধীনতা অর্জন করে। তবে ষাট-সত্তুরের দশকেই ইউরোপে এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় অভিবাসনের ঘটনাটি ঘটে, মুসলিম ইস্যুটিও তখন নতুন করে ইউরোপের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উদার দাবিদার ইউরোপের রক্ষণশীল, বলা ভালো গোঁড়া মানসিকতাও তখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এক্ষেত্রে ফ্রান্সই এগিয়ে ছিলো সবচেয়ে বেশি। বাসস্থান, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এসব মৌলিক মানবাধিকার সূচকের প্রত্যেকটিতেই মুসলিম সম্প্রদায় ব্যাপকরকম বঞ্চনার শিকার হন।

সম্প্রতি স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় ফ্রান্সের মুসলিম নাগরিকদের বেকারত্ব ও ভালো চাকরির দুষ্প্রাপ্যতা বিষয়ক ভয়াবহ এক চিত্র উঠে এসেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিমদের এসব মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার পর ফ্রান্স শুরু করে দ্বিতীয় পর্যায়ের আরো ভয়াবহ ষড়যন্ত্র। স্কার্ফ-হিজাব বিতর্ক উসকে দিয়ে মুসলিম মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধে উদ্যোগী হয়। রুদ্ধ করে মুসলিম নারীদের কাজের সুযোগ। ফলে ফ্রান্সের নাগরিক হয়েও নিজেদের দেশে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির অসহায় শরণার্থীতে পরিণত হন।

ফ্রান্স উর্বর ভূমি, কিসের?

পাশ্চাত্যের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কল্যাণে তথ্যের সহজলভ্যতা যেমন সুবিদিত, সমন্বয়ের কাজটাও তেমনি মুশকিল। রসুনের একমুখিতার মতো ইসলাম আর মুসলিম বিষয়ক ওদের সব আলোচনা- হোক সেটা খবর-জরিপ-কলাম বা বক্তৃতা, শেষমেশ গিয়ে সন্ত্রাসবাদে ঠেকে। বিভিন্ন পক্ষ বা সূত্রের দাবিগুলোর মধ্যকার ব্যবধানও এতো বেশি থাকে যে, সত্যটা নির্ণয় করে ওঠা মারাত্মক কঠিন হয়ে পড়ে। ৯/১১ পরবর্তী পুরো পাশ্চাত্যের ইসলাম বিষয়ক নীতি ও অবস্থান (পক্ষের বা সহমর্মিতার নয় নিশ্চয়ই…) এক হলেও নানান কারণে ফ্রান্সে বরাবরই একটু ব্যতিক্রম অবস্থা ছিলো।

সেক্যুলার রাষ্ট্রের তকমা গায়ে সাঁটানো থাকায় নাগরিকদের ধর্মীয় অধিকার নিয়ে ফ্রান্স না পারছিলো প্রতিবেশী বা মিত্রদের গৃহীত ভূমিকা থেকে বেরিয়ে উদার হতে, না পারছিলো উপেক্ষা করতে। আগে থেকেই তুলনামূলকভাবে অধিক সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস, ভৌগোলিক দিক থেকে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর কাছাকাছি অবস্থান, হিজাব নিষিদ্ধকরণ ও মুসলিম শিশুদের ধর্মশিক্ষার দাবি বিষয়ক দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা মামলা এবং অভ্যন্তরীণ আরো বিভিন্ন কারণ বিদ্যমান থাকায় পরিবেশও বর্তমান বাস্তবতার অনুকূলেই ছিলো।

সংবিধান এবং সরকারের সাংঘর্ষিক অবস্থান, ২০০৫ এর চাপিয়ে দেওয়া রায়ট এবং সর্বশেষ শার্লি এবদো ম্যাগাজিনের অনাধিকার চর্চার ঘটনা জ্বলন্ত আগুনে কেবল ঘি-ই ঢেলেছে। সবমিলিয়ে ফ্রান্সে তাই ইসলামের নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। ফ্রান্সের সাবেক ইন্টেলিজেন্স অফিসার মি. গোডার্ডসহ অনেকেই আজকাল বলতে শুরু করেছেন- ফ্রান্স হলো ধর্ম পরিবর্তনের (হবে ইসলাম গ্রহণের!) উর্বর ভূমি।

শার্লি এবদোয় প্রাণঘাতী হামলা : অভিযোগ ও বাস্তবতা

নবীজীর সা. ব্যাঙ্গচিত্র বা কার্টুন ইস্যুটি ২০০৫ ’র শেষদিকে প্রথমবারের মতো ব্যাপক আলোচনায় আসে। আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই- ২০০৫ সালের ৩০ এ সেপ্টেম্বর ডেনমার্কের ‘জিল্যান্ড পোস্টেন’ পত্রিকায় নবীজীর সা. ১২টি ব্যাঙ্গচিত্র ছাপা হলে গোটা মুসলিম বিশ্ব ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। ৫৯ টি মুসলিম রাষ্ট্রে লাগাতার বিক্ষোভ চলেছে দিনের পর দিন। পরিস্থিতি এতোটাই জটিল আকার ধারণ করেছিলো যে, ২২টি দেশ থেকে ডেনমার্ক সরকার তার রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

ফ্রান্সসহ ইউরোপের আরো কিছু পত্রিকা এসময় জিল্যান্ড পোস্টেনের সমর্থনে নতুন করে সেসব কার্টুন প্রকাশ করলে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করে। ফ্রান্সের এক সম্পাদককে তখন চাকরিচ্যুতও হতে হয়। নবীজীর সা. অবমাননা এবং কার্টুন ইস্যুতে ডেনমার্কের সাথে তখনই প্রথম ফ্রান্সের নামও জড়িয়ে যায়।

রাজপথে বিক্ষোভ ও কূটনৈতিক প্রতিবাদের পাশাপাশি ডেনমার্কের পণ্য বর্জনের মধ্য দিয়েও সেসময় নতুন এক প্রতিবাদ জানানো হয়- বিশেষত আরব বিশ্বের পক্ষ থেকে। ডেনিশ সরকারের সূত্রমতে- কেবল সৌদি আরবের এক সপ্তাহের বর্জনের কারণেই তাদের আড়াইশ মিলিয়ন ডলারের লোকসান গুনতে হয়েছিলো। প্রতিবাদের এই দিকটাই কৌশলগতভাবে সবচেয়ে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিলো। প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে এমন ব্যাপক, নজিরবিহীন ও লাগাতার প্রতিবাদের পরও ওরা থেমে যায়নি। যেমন থাকেনি অতীতে।

ঠিক ছয় বছরের মাথায় আবার নবীজীর সা. ব্যাঙ্গচিত্র প্রকাশের খবর আসে। পত্রিকা এবার- শার্লি এবদো, দেশ- ফ্রান্স । প্রথমবার কেবল সমর্থনে থাকলেও এবার এই জঘন্য কাজে জড়িয়ে পড়ে ইউরোপের বুকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সদস্যের দেশ, শিল্প-সাহিত্য ও মানবাধিকারের দেশ হিসেবে খ্যাত ফ্রান্স নিজেই। উল্লেখ্য, ফ্রান্সের এই পত্রিকাটি সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে বিদ্রƒপাত্মক কার্টুন, রিপোর্ট এবং কৌতুক প্রকাশের জন্য বিখ্যাত।

২০১১ সালের নভেম্বর মাসে শার্লি এবদোয় রাসূলকে সা. নিয়ে কার্টুন ছাপা হয়। ২০০৫ এর ধৃষ্টতার পর আবারও বিনা উস্কানিতে কার্টুন ছাপানোয় পত্রিকাটি বিক্ষুব্ধ জনতার রোষের মুখে পড়ে, অফিসেও আগুন দেওয়া হয়। হ্যাকিংয়ের শিকার হয় পত্রিকাটির ওয়েবসাইট। আলকায়েদাসহ বেশ কিছু কট্টরপন্থী সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্পাদককে হত্যার হুমকিও আসে। এরপর ধীরে ধীরে ব্যাপারটা আড়ালে চলে যায়, জীবনের আর সব ঘটনার মতো এই প্রতিবাদের উত্তাপও একসময় কমে আসে। শার্লি এবদো নামটাই আমরা ভুলে যাই। তবে- আমরা ভুলে গেলেও কোনো কোনো পক্ষ বেশ ভালো করেই নামটা মনে রেখেছিলো। তারা কারা, কেনো বা কী ভাবনায় নামটা মনে রেখেছিলো আমরা জানতাম না। আমাদের জানার সুযোগ ঘটে ২০১৫’র জানুয়ারিতে। অকল্পনীয় এক হামলার মুখে পড়ে সম্পাদকসহ মোট ১২ জনের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে আবারও শার্লি এবদো আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে, ভয়াবহ কিছু চিত্র ও বাস্তবতা সাথে নিয়ে।

শার্লি এবদোয় কীভাবে এই হামলা?

৭ জানুয়ারি ২০১৫ সকাল, স্থানীয় সময় সাড়ে এগারটায় দু’জন সশস্ত্র মুখোশধারী ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত ব্যাঙ্গাত্মক সাপ্তাহিকী শার্লি এবদোর অফিসে ঢুকে পড়ে। তারা আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিতে দিতে ৫০টির মতো গুলি ছোড়ে। এতে মোট ১১ জন সাংবাদিক ঘটনাস্থলেই নিহত হয়, আহত হয় আরো ১১ জন। এরপর পালানোর সময় তারা একজন পুলিশ অফিসারকেও হত্যা করে। নিজেদের তারা আল কায়েদা ইয়েমেন শাখার সদস্য দাবি করে, যারা ইতোমধ্যে হামলার দায়-দায়িত্ব স্বীকারও কওে নিয়েছিলো। ক’দিন পর অন্য এক প্রদেশে এক ইহুদি সুপার শপে হামলার ঘটনায় নিহত হয় আরো পাঁচজন। ফ্রান্স সরকার একে ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংস ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং দেশজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার ঘোষণা দেয়। ভিডিও এবং উপস্থিত লোকদের সাক্ষের ভিত্তিতে পুলিশ দু’জনকে চিহ্নিত করে, তারা আপন দু’ ভাই ফ্রান্সেরই নাগরিক সাঈদ এবং শরিফ কোয়াচি।

৯ জানুয়ারি ফ্রান্স পুলিশের বিশেষ এক অভিযানে হামলায় অংশ নেওয়া দুই ভাই নিহত হন। রহস্যে মোড়ানো এ হামলার প্রকৃত কারণ ও পূর্বাপর ফলাফল ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে নিহত সাংবাদিকদের জন্য গোটা বিশ্ব সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ১১ জানুয়ারি ৪০ জন বিশ্বনেতার উপস্থিতিতে প্রায় বিশ লাখ মানুষ প্যারিসে জাতীয় ঐক্য ও সংহতিমূলক এক বিশাল সমাবেশে জড়ো হন। ফ্রান্সের অন্যান্য প্রদেশেও এ র‌্যালির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে আরো প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের জমায়েত হয়। সাম্প্রতিককালে ইউরোপের ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন ঘটনা। তবে এতোসবের পরও নিজেদের সংযত না করে পরের সপ্তাহে বরং ঘোষণা দিয়ে পুরো প্রচ্ছদে আরো বিশাল আকারের একটি কার্টুন ছাপায় শার্লি এবদো।

যে পত্রিকার সর্বোচ্চ সার্কুলেশন রেকর্ড মাত্র খাঁ হাজারের, সেই পত্রিকাটি ১৬টি ভাষায় মোট ৩০ লাখ কপি ছাপিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া হয়। প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নবীজীর সা. এমন অবমাননায় ফের বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিহত হয় নবীপ্রেমিক অন্তত ১০ জন মুসলমান। পড়–ন বিশেষভাবে চয়িত ও সম্পাদিত সে সময়ের ক’টি সংবাদ ভাষ্য।

শার্লি এবদোর ধৃষ্টতা- ১

ফরাসি ব্যাঙ্গাত্মক ম্যাগাজিন শার্লি এবদোর কভারপেজে মহানবী হজরত মুহাম্মদকে সা. নিয়ে কার্টুন ছাপানোর প্রতিবাদে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অন্তত দশজন নিহত ও অসংখ্য লোক আহত হয়েছেন। শার্লির পক্ষ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম বিশ্বের এ বিক্ষোভের নিন্দা জানিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ হয়েছে আফ্রিকার দেশ নাইজারে। যে দশজন নিহত হয়েছেন তারা সবাই নাইজারের নাগরিক। গত দুইদিন ধরে সেখানে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। প্রথম দিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর দেশটির রাজধানী নিয়ামিসহ বেশ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ হয়। এ সময় দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর জিন্দারে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত দশজন নিহত হন। আহত হন অর্ধশতাধিক। ওইদিন বিক্ষোভের পর নাইজার সরকার সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং চার মুসলিম নেতাকে আটক করে। এতে জনগণ আরও ক্ষুব্ধ হয় এবং শনিবার আবারও রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় অন্তত দুটি চার্চে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। গৌরি শহরে পররাষ্ট্রমন্ত্রির বাসভবনে হামলা চালায়। এ ছাড়া দেশটিতে অবস্থিত ফরাসি সংস্কৃতি কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে। এদিকে, নাইজারের এমন সহিংস পরিস্থিতিতে দেশটিতে অবস্থিত ফরাসি নাগরিকদের প্রতি সতর্কতা জারি করেছে ফ্রান্স। নাইজারে অবস্থানরত ফরাসি নাগরিকদের ঘরের বাইরে না যাওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালি, সেনেগাল, মৌরতানিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়াতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য- এই সব ক’টি দেশ এক সময় ফ্রান্সের অধীনে ছিল।

একই ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার পাকিস্তানে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশটির করাচি শহরে পুলিশের গুলিতে বার্তাসংস্থা এএফপির এক ফটো সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এ ছাড়া রাজধানী ইসলামাবাদেও বিক্ষোভ হয়। অন্যদিকে, বিক্ষোভ হয়েছে আফগানিস্তানে। রাজধানী কাবুলে শুক্রবার জুমার নামাজের পরপর বেশ কিছু লোক বিক্ষোভ করেছে। এ সময় তারা ফ্রান্সের পতাকায় আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ফ্রান্সবিরোধী স্লোগান দেয়। সেইসঙ্গে শার্লি এবদোর অফিসে যারা হামলা চালিয়েছে তাদের প্রশংসা করা হয়।

শার্লি এবদোর পাতায় নবী কারিমকে সা. নিয়ে কার্টুন ছাপানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে ফিলিস্তিনে। আল আকসা মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের পর রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে সেখানকার মুসলমানরা। এ সময় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় বিক্ষোভকারীরা। কারণ প্যারিসে নিহতদের শোকসভায় উপস্থিত হয়েছিলেন আব্বাস। একই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে তুরস্ক, ইয়েমেন, সুদান, জর্ডানসহ অন্যান্য আরব দেশে। তবে এসব দেশে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

এদিকে, শার্লি এবদোর ঘটনার প্রতিবাদে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে যে সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে তার নিন্দা জানিয়েছে ওয়াশিংটন। শুক্রবার করাচির ফরাসি কনস্যুলেট অফিসের বাইরে সংঘর্ষে অন্তত তিনজন লোক আহত হওয়ার পর এক বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিবৃতিতে শার্লি এবদোর পক্ষাবলম্বন করে বলা হয়েছে- ব্যাঙ্গচিত্রসহ তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে এটি তাদের সার্বজনীন অধিকার। সূত্র- বিবিসি, আলজাজিরা

শার্লি এবদোর ধৃষ্টতা- ২

ফ্রান্সের বিদ্রƒপাত্মক পত্রিকা সাপ্তাহিক শার্লি এবদোর প্রচ্ছদে মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মদকে সা. অবমাননা করে নতুন করে কার্টুন ছাপানোয় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা। নতুন করে কার্টুন প্রকাশ করায় বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। মুসলিম দেশগুলোর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এটিকে উস্কানিমূলক বলেও অভিহিত করেছেন। এবদোর চলতি সংস্করণ প্রকাশের আগে মিশরের ধর্মীয় নেতারা হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন- ইসলামের নবীকে নিয়ে যেনো আর কোনো কার্টুন ছাপা না হয়। তাদের মতে- এ নিয়ে যতো বেশি বাড়াবাড়ি করা হবে ততো বেশি ইসলামিক চরমপন্থীদের হামলার হুমকিতে পড়তে হবে। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ সিসি তার সরকারের প্রধানমন্ত্রিকে ধর্ম অবমাননাকারী পত্রিকা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দিয়ে ডিক্রি জারি করেছেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ইউরোপের ইসলামভীতি এবং মুসলিমবিরোধী কার্যকলাপ বন্ধে ব্যর্থতার জন্য পশ্চিমা নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি পবিত্র ধর্ম ইসলাম ও মুসলমানদের ব্যাপারে পশ্চাত্যের মনোভাবের নিন্দা করেন। তুরস্কের একটি আদালত এই প্রচ্ছদটিকে অপমানজনক, অপরাধমূলক ও ধর্মদ্রোহী কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই প্রচ্ছদটি যেসব ওয়েবসাইটে থাকবে সেগুলোকে ব্লক করার জন্য আদেশ দেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে শার্লি এবদে নিষিদ্ধ করেছে সেনেগাল। শার্লি এবদোর প্রচ্ছদের কার্টুনটি লিবারেশান নামে ফ্রান্সের আরেকটি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার কারণে সেই পত্রিকাটিও সেনেগালে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জর্ডানের আদ-দুস্তুর পত্রিকা লিখেছে- প্রচ্ছদে আবারো হযরত মুহাম্মদের সা. কার্টুন আঁকায় শার্লি এবদো নতুন করে প্ররোচনা দিচ্ছে। ইরানের অফিসিয়াল টিভি চ্যানেল আইআরআইএনএনও এটিকে একটি উস্কানিমূলক কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছে। নতুন এই প্রচ্ছদ হয়তো আবারো নতুন কোনো সহিংসতার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করে নিউইয়র্ক টাইমসও একটি খবর প্রকাশ করেছে।

সংবাদমাধ্যম জানায়, গত বুধবার শার্লি এবদোর প্রথম সংখ্যা প্রকাশ করা হয় এবং এর প্রচ্ছদে হজরত মুহাম্মদকে সা. অবমাননা করে আবার ব্যাঙ্গচিত্র ছাপানো হয়। নতুন সংখ্যায় মহানবীর অবমাননাকর কার্টুন ছাপানোর পর ফ্রান্সের মুসলিম সংগঠনগুলো মুসলমান সম্প্রদায়কে শান্ত থাকার আগাম আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ফরাসি মুসলমানরা সাপ্তাহিকীটির ন্যক্কারজনক তৎপরতার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ এবং নিন্দা প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে পারেন নি।

ফরাসি একজন মুসলমান বলেন- ওরা মুসলমানদের উস্কে দেওয়ার তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে, একজন মুসলমানের কাছে তার মা-বাবার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানীয় রাসূল সা., মুসলমানদের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানানো কেনো ওদের জন্য এতো কষ্টকর হয়ে উঠছে- বোঝা যাচ্ছে না। শার্লি এবদোর ঘটনায় যারপরনাই ক্ষুব্ধ আরেক ফরাসি মুসলমান বলেন- আমি কাউকেই অবমাননা করতে চাই না, কিন্তু ফ্রান্স কেনো মুসলমানদের মূল্যবোধের প্রতি সম্মান দেখাতে পারে না? এদিকে ফরাসি সাপ্তাহিকের এ হঠকারিতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্বের ধর্মীয় নেতারা এবং এ তৎপরতাকে তারা সরাসরি মুসলমানদের প্রতি অবমাননা বলে অভিহিত করেছেন।

প্যারিসের শার্লি এবদোয় প্রকাশিত সর্বশেষ কার্টুনটিতে দেখা যাচ্ছে যে, সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে শোক জানিয়ে ‘যে সুই শার্লি’ বা আমিই শার্লি লেখা একটি প্ল্যাকার্ড হাতে ইসলামের নবী দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ওপরে লেখা- ‘সব অপরাধ ক্ষমা করা হলো’। নতুন এ সংখ্যাটি ১৬টি ভাষায় ৩০ লাখ কপি ছাপানো হয়েছে। এর আগে পত্রিকাটি মাত্র ৬০ হাজার কপির মতো ছাপা হতো। সূত্র- আল-জাজিরা, সিএনএন, এএফপি।

শার্লি এবদোর ধৃষ্টতা- ৩

ইসলামকে কটাক্ষ করে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশের পর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার জন্য ইউরোপের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দায়ী করেছেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রি আহমেদ দাভুতৌলু। রোববার প্যারিসে তিনি বলেন, ইউরোপে ধর্ম ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিভেদকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটছে।

সুদূর প্যারিসে শার্লি এবদো কার্যালয় ও সুপারশপে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহতদের স্মরণে রোববার জেরুজালেম পৌরসভায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে এমন আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। হারানো স্বজন আর স্বগোত্রীয়দের সম্মান জানানোর পাশাপাশি হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান অংশগ্রহণকারীরা। তারা বলেন, ‘আশা করি, ফ্রান্সের নিরাপত্তা বাহিনী এখন আরো বেশি সজাগ হবে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আরও বেশি মনোযোগী হবে। শার্লি এবদো’র কার্যালয় ও সুপারশপে হামলার মতো ঘটনা আবার যেন না ঘটতে পারে তা তারা নিশ্চিত করবে।’

তবে ইসলামকে কটাক্ষ করে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশের পর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার জন্য ইউরোপের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রবণতাকে দায়ী করেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রি। রোববার সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানাতে আয়োজিত সংহতি সমাবেশে যোগ দিতে প্যারিসে আসেন তিনি।

তুর্কি প্রধানমন্ত্রি আহমেদ দাভুতৌলু বলেন- ‘দুঃখজনক যে, ইউরোপে সাম্প্রতিককালে ধর্ম ও বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য ও বিভেদকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়েছে। আর এটাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার উত্থানের মূল কারণ। বহু সংস্কৃতির সমাজে বিভিন্ন ধর্মের, বর্ণের মানুষ যেন ঐক্যের সঙ্গে বাস করতে পারে- শান্তির জন্য তা নিশ্চিত করতে হবে। সূত্র- বিবিসি, সিএনএন

নবীজীর (সা.) শানে বারবার কেনো এই গোস্তাখি?

তিনটি পৃথক সংবাদভাষ্য এখানে তুলে ধরলাম- পুরো ব্যাপারটা বিচারের ক্ষেত্রে নানাভাবে এটা সহায়ক হবে। এবার এ ঘটনার মূলের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক- কেনো এরা বারবার নবীজীর শানে এমন গোস্তাখি করে? কেনো বারবার এমন কার্টুন ছেপে বিশ্বকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয় বা দিতে চায়? ইসলামকে আক্রমণের এই ঘৃণ্য ধারাটি সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর সময়কাল থেকেই চলে আসছে। তার যুগেই ইহুদি-খৃষ্টানরা এক হয়ে ইসলামকে পৃথিবীর বুক থেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য ভয়ংকর সব ষড়যন্ত্র শুরু করে। আর এ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই মুসলমানদের ধর্মীয় নিদর্শন এবং মহান সব ব্যক্তিদের নিয়ে ব্যাপকভাবে উপহাস করা শুরু করে।

তাদের এসব জঘন্য আচরণে ক্ষোভে ফেটে পড়ে মুসলিম জাহান। উন্মুক্ত হয় ক্রুসেড বা সর্বাত্মক ধর্মীয় যুদ্ধের পথ। ক্রুসেডে ইতিহাসখ্যাত মুসলিম বীর সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর হাতে সম্মিলিত কুফরি শক্তির শোচনীয় পরাজয় ঘটে। তবে ওরা থেমে যায়নি বা থাকেনি। বরাবরই নানাভাবে এসব ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে।

পাকিস্তানের প্রখ্যাত কলামিস্ট ইয়াছির মুহাম্মদ খান বলেন- ক’বছর আগে খৃষ্টান চার্চের পাদরি থেকে মুসলিম হওয়া আমাদের এক ভাইয়ের একটি বই পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো। তাতে তিনি লিখছেন- ‘মুসলমানদের মহান ব্যক্তিদের অপমান করা একটি সূচিবদ্ধ ষড়যন্ত্রের অংশ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো- মুসলমানদের ঈমানী শক্তি আন্দাজ করা, মেপে দেখা- এখনো তারা কতোটা সচেতন। কতোটা টগবগে আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস।’ ক’বছর পরপরই তারা এসব ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে পরখ করার চেষ্টা করে মুসলমানরা এখনো কতোটা মুসলমান আছেন বা কতোটা বদলে গেছেন। আর এসবে ইন্ধন যোগায় ইউরোপ-আমেরিকারই কোনো-না-কোনো দেশ। যুগ যুগ ধরে প্রতি পাঁচ-সাত বছর অন্তর এই খেলার আয়োজন এরা করে আসছে। কখনো নিজেরা, কখনো সালমান রুশদী বা তসলিমার মতো ভাড়াটে মুসলিম নামধারীরা ওদের হয়ে কাজগুলো করে দেয়। তাই দুঃখ-কান্না-ক্ষোভের পাশাপাশি সচেতনতা এবং কৌশলী হওয়ারও বিকল্প নেই আজকের মুসলিম জাহানের।

শুধু আবেগ নয়, বাস্তবতাও বিবেচনা করুন

আরো কিছু কথা এখানে বলে রাখা দরকার। শার্লি এবদোয় হামলার ঘটনাটিকে কেবল নবীপ্রেমের প্রতিশোধ হিসেবে ভেবে নিলে অন্যায় হবে। আমরা জানি না- প্রকৃতপক্ষে কারা এই হামলার সাথে জড়িত। পশ্চিমা মিডিয়া আমাদের বলেছে দু’জন মুসলিম তরুণ এ হামলা চালিয়েছে- সেটা সত্য হতে পারে, নাও হতে পারে। আজকের জটিল বিশ্ববাস্তবতায় ঘটনার দৃশ্যমান কারণের চেয়েও মূল বিবেচ্য বিষয় হয়- এর দ্বারা কে কতোুঁকু লাভবান হচ্ছে। নবীজীর সা. অবমাননাকারীদের শাস্তি আমরা অবশ্যই চাই, কিন্তু শার্লির ঘটনায় যেভাবে রিএ্যাক্ট এসেছে- তাতে কেবল মুসলিম যুবকদ্বয়ের হামলার খবরে বিশ্বাস রাখা মুশকিল। তারা হামলা চালিয়েছে না তাদের দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে বিশেষ কোনো পরিকল্পনার অংশ হিসেবে- সেটা কে ঠিক করবে?

এই হামলার পর নিরাপত্তার নামে ইউরোপজুড়ে যেভাবে অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত ইউরোপের লাখো মুসলিম যেভাবে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন সেটাও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিতে হবে। শার্লি এবদোয় হামলা হওয়ার মাত্র দু সপ্তাহের ব্যবধানে তখন ফ্রান্সজুড়ে ১২৮ টি হামলার ঘটনা ঘটেছে মুসলিমদের ওপর। মসজিদগুলোও রক্ষা পায়নি। গ্রেনেড হামলা, আগুন জ্বালিয়ে দেয়া, রাস্তাঘাটে হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন, বাচ্চাদের উঠিয়ে নেওয়া বা পাসপোর্ট জব্দ করাসহ বাদ যায়নি কিছুই। শুধু জনগণ নয় প্রশাসনও জড়িয়ে পড়ে এসব ঘটনায়।

মুসলিম অভিবাসন বন্ধ এবং ইসলাম নিষিদ্ধে পেগিডার মতো বৃহৎ আন্দোলন ফ্রান্স-জার্মানি হয়ে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ইতোপূর্বে চলতে থাকা শিক্ষা, চাকরি বা ধর্ম পালনের বৈষম্য আরো বাড়ার পাশাপাশি শার্লি এবদোর ঘটনা মূলত ফ্রান্স থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টাকে সামনে নিয়ে আসে। মুসলিম নাগরিকদের সন্ত্রাসী বা সন্দেহভাজন জঙ্গি হিসেবে তুলে ধরতে পারলে পশ্চিমের অনেক লাভ। এই লাভ বা প্রয়োজনের জন্য তারা শার্লির চেয়েও বড় ঘটনা ঘটাতে পিছপা হবে না, এটা বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না। হিসেবটাও তাই সবদিক বিবেচনা করেই মেলানো প্রয়োজন। এসব দুর্ঘটনায় পশ্চিমের নিরপরাধ মানুষের প্রতি সংহতি জানানোর পাশাপাশি আমরা তাই অসহনীয় ভোগান্তির শিকার আমাদের মুসলিম ভাই-বোনের কথাও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবনায় নিতে চাই। সেটা বিবেক এবং সময়েরও দাবি।

শার্লি এবদোর ঘটনার প্রেক্ষাপটে পরিচিতি ও বিস্তৃতি পাওয়া পেগিডা অনলাইন-অফলাইনে তাদের কাজ সমানভাবেই অব্যাহত রেখেছে, অপচেষ্টা চালাচ্ছে আরো জোরদার করে ইসলাম বিদ্বেষী এই আন্দেলনকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে। সুতরাং আবেগ পাশে রেখে বাস্তবতার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতিগুলো বিবেচনা করাই কি উচিত নয়? নবীঅবমাননার প্রতিশোধ নিতে এই হামলা মুসলিম ভ্রাতৃদ্বয় যেমন করতে পারে, মুসলিমদের কোণঠাসা করতে এবং তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিবাদের ঢোল পেটানো বজায় রাখতে পশ্চিমারা নিজেরাও ঘটাতে পারে- এই সম্ভাবনা আপনি নাকচ করে দেবেন কোন যুক্তিতে?

পেগিডা: কী ও কেনো?

ইউরোপে ইসলাম ও মুসলমান pegida

পেগিডার ব্যানারে ইউরোপে মুসলিম অভিবাসন এবং ইসলাম বিদ্বেষী আন্দোলনের সূচনা হয় পূর্ব-জার্মানির স্যাক্সনি রাজ্য এবং এর রাজধানী ড্রেসডেনে। ২০১৪ সালের শেষদিকে বিশেষত সিরিয়ান শরণার্থী ইস্যুতে কিছু মানুষের বিরোধিতার সূত্র ধরে এই আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে। পরের কয়েক মাসে ফ্রান্সের শার্লি এবদোয় হামলার প্রেক্ষাপটে শরণার্থী ইস্যু থেকে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী আন্দোলনে রূপায়িত হওয়া এই পেগিডা দ্রুতই বিস্তৃতি লাভ করে। ২০১৪ ’র নভেম্বরে ফেসবুকে একটি পেইজ খোলার মাধ্যমে এই গ্রুপ তাদের অনলাইন যাত্রা শুরু করে। মাত্র এক বছরের মাথায় এই আন্দোলন এতোটাই ব্যাপকতা লাভ করেছে যে, জার্মানির রাজনৈতিক অঙ্গনে পেগিডা আজকাল রীতিমতো ডানপন্থী রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে।

পেগিডার আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসছে। শার্লি এবদোয় হামলার ঘটনার সুযোগে জার্মানির গ-ি ছাড়িয়ে এই আন্দোলন পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশপ্রেম, নিরাপত্তা আর খৃষ্টান ধর্ম রক্ষার দোহাই দিয়ে এই আন্দোলনের কর্মী-সমর্থকেরা সরাসরি ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী অপপ্রচার চালাচ্ছে। প্রকাশ্যে ‘স্টপ ইসলাম’ লেখা বিশাল সব ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে, মসজিদের ছবির ওপর লাল বর্ণে ক্রস আঁকা টি-শার্ট পরে তারা মিছিল-মিটিং এবং সমাবেশ করে বেড়ায়। তাদের বক্তব্য- যে-কোনো মূল্যে ইউরোপকে ইসলাম ও মুসলিমবিহীন করাই আমাদের উদ্দেশ্য। কাজ তো বটেই, এই আন্দোলনের নামেই রয়েছে প্রকাশ্য ইসলামবিরোধিতা।

পেগিডার অর্থ ও মতলব

কয়েকটি জার্মান আদ্যক্ষর মিলে গঠিত হয়েছে এই ‘পেগিডা’ শব্দটি, যার অর্থ- প্রতীচ্যের ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমী ইউরোপীয়বর্গ। ইংরেজিতে- ‘পেট্রিয়টিক ইউরোপিয়ানস এগেইনস্ট দ্যা ইসলামাইজেশন অফ অক্সিডেন্ট’। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে তাদের বিক্ষোভে সেম্পার অপেরা ভবনের সামনে ১৭ হাজার মানুষ যোগদান করলে এই আন্দোলন প্রথমবারের মতো ব্যাপক আলোচনায় আসে। এই পেগিডা আন্দোলনে ঠিক কারা সামিল, নিশ্চিত করে বলা সহজ নয়। বিশ্বব্যাপী ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিষয়ের পাশাপাশি বনসহ জার্মানির একাধিক শহরে সালাফি মতাদর্শীদের কার্যকলাপ থেকে শুরু করে জার্মানিতে ক্রমবর্ধমান শরণার্থীদের সংখ্যা; সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে সাধারণ নাগরিকদের সরকার ও প্রশাসন সংক্রান্ত নানা অভিযোগ-অনুযোগ।

এই সব অস্পষ্ট, আকারবিহীন ভীতি-আশঙ্কা-আকাক্সক্ষা ও হতাশা মিলে যে আন্দোলন দানা বেঁধেছে, তা একদিকে খৃষ্টান ইউরোপ এবং অন্যদিকে বহিরাগত ইসলামকে মুখোমুখি করে এক মানসিক দ্বন্দ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে। তাদের রাজনৈতিক কোনো এজেন্ডা এখনো স্পষ্ট না হলেও ইসলাম এবং মুসলিম অভিবাসনের বিরোধিতা শুরু থেকেই প্রকাশ্যভাবে চলে আসছে।

তবে বাস্তবতা বলছে- দ্বন্দ্ব যদি কোথাও প্রকট হয়ে থাকে, তবে দৃশ্যত তা জার্মান জনমানসেই: কারণ পেগিডার বিরোধিতায় ড্রেসডেন শহরেই চার হাজার মানুষ পাল্টা প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বন, কাসেল কিংবা ভুরৎসবুর্গ-এর মতো শহরে পেগিডার পক্ষে দু’শো মানুষ পথে নামলে, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ পেগিডার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। গোটা জার্মানিতে মোট ২০ হাজার, তাদের মধ্যে ১২ হাজার শুধুমাত্র মিউনিখে। গত জানুয়ারিতে পেগিডার ব্যানারে এই আন্দোলন শুরু হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই সাধারণ জার্মান নাগরিকেরা এর বিরোধিতা করে আসছেন। তাদের অভিযোগ- দেশপ্রেম আর ধর্মের নামে পেগিডা জার্মান সমাজে মূলত মৌলবাদ ও শ্রেণিবৈষম্য উসকে দিতে চাচ্ছে। সাম্প্রতিক প্যারিস হামলার প্রেক্ষাপটে পেগিডা তাদের আন্দোলন আরা জোরদার করেছে। ইসলাম, জঙ্গিবাদ কিংবা মুসলিম অভিবাসনের পাশাপাশি এখন শরণার্থী সংকটই তাদের প্রধানতম ইস্যু।

বাভারিয়া যেমন একদিকে জার্মানির সর্বাপেক্ষা রক্ষণশীল প্রদেশগুলোর মধ্যে গণ্য, অপরদিকে তা জার্মানির সমৃদ্ধতম রাজ্যগুলোর মধ্যেও পড়ে। মিউনিখ সম্ভবত জার্মানির সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী শহর। কাজেই এখানকার মানুষ দৃশ্যত ক’জন শরণার্থী এসে তাদের সমৃদ্ধিতে ভাগ বসাল, তা নিয়ে চিন্তিত হবার কারণ দেখেন না। মিউনিখের মেয়র ডিটার রাইটার জনতাকে বলেছেন- ‘আমাদের এখানে সব বর্ণ, জাতি এবং ভাষার মানুষের স্থান আছে; সব ধর্ম ও ধর্মবিশ্বাসীর জন্য স্থান আছে: যাঁরা শুক্রবার মসজিদে যান, যাঁরা শনিবার সিনাগগে যান এবং যাঁরা রবিবার গির্জায় যান অথবা যাঁরা বাড়িতে থাকতেই ভালোবাসেন- সবাই এখানে সমান মর্যাদা ও অধিকার রাখেন’।

নেতাদের দ্বিধাগ্রস্ততা : জার্মানির রাজনৈতিক মঞ্চে সাম্প্রতিকতম আবির্ভাব ‘পেগিডা’ নামধারী এক অভিবাসন বিরোধী আন্দোলন, যার সূচনা পূর্বের ড্রেসডেন শহরে। কিন্তু পেগিডা-ই যেন জার্মানদের ‘সাইলেন্ট মেজরিটি’- বা নীরব জনসাধারণকে সোচ্চার করে তুলেছে। জার্মানির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ পেগিডার পথ আন্দোলনের তাৎপর্য তথা সম্ভাবনা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন না হলেও, কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত বৈকি। জার্মানির প্রটেস্টান্ট গির্জার প্রধান হাইনরিশ বেডফোর্ড-স্ট্রোম স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘উদ্বাস্তুদের প্রতি যাতে ভালো আচরণ করা হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য খৃষ্টানদের সব কিছু করা উচিত। স্যাক্সনি রাজ্যের প্রটেস্টান্ট বিশপ ইয়োখেন বোল বলেছেন, পেগিডা সমর্থকরা ক্রিসমাস ক্যারল গেয়ে একটি খৃষ্টীয় প্রতীক ও খৃষ্টীয় প্রথার অপব্যবহার করছেন।
পেগিডা নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে মতভিন্নতাও বিদ্যমান। ফেডারাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি টোমাস দেমেজিয়ের পেগিডা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের অশুভ হিসেবে গণ্য করার বিপক্ষে। অপরদিকে সাবেক চ্যান্সেলর গেয়ারহার্ড শ্র্যোডার, যিনি এককালে স্যাক্সনির মুখ্যমন্ত্রি ছিলেন, তিনি চান- সব সাধারণ, ভদ্র-সভ্য নাগরিক যেনো পেগিডার র‌্যালিগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। পূর্ব জার্মানির টুরিঙ্গিয়া রাজ্যের সদ্যনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রি, বামদলের বোডো রামেলো বলেছেন- ‘দামি জামা-কাপড় পরা নব্য নাৎসিদের প্রতি আমাদের কিছু বলার নেই’।

আন্দোলনের ভুল প্রেক্ষাপট : ইউগভ সংস্থার সর্বাধুনিক জরিপ অনুযায়ী জার্মানির এক-তৃতীয়াংশ মানুষ পেগিডার প্রতি সহানুভূতিশীল। ওদিকে আগামী বছর জার্মানিতে আশ্রয়প্রার্থী শরণার্থীদের সংখ্যা বেড়ে দু’ লক্ষে দাঁড়াবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যদিও এর সঙ্গে ‘ইসলামীকরণের’ কোনো সম্পর্ক নেই, কেননা ২০১৫ সালজুড়ে জার্মানিতে যে সব উদ্বাস্তুরা আসছেন, তাঁদের অধিকাংশই সিরিয়া থেকে আসা খৃষ্টান। মুসলিমদের প্রবেশ বাড়ছে অতিসম্প্রতি সিরিয়ায় বিভিন্ন দেশের আক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে।

পেগিডার এখনকার প্রতিবাদ সাধারণভাবে উদ্বাস্তুদের আগমন নিয়েই, ‘জার্মানি অভিবাসনের দেশ নয়’ এই সেদিনও এ কথা বলেছেন পেগিডা নেতা লুট্স বাখমান। হয়তো আসল সত্য হলো এই- জার্মানি যে আজ রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাার্থীদের কাছে ইউরোপের সেরা দেশ এবং অভিবাসীদের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য, সেই অযাচিত সম্মানে সাধারণ জার্মানরা হয়তো কিছুটা সচকিত এবং বিড়ম্বিতও। আর এই সুযোগটা নিয়েই মাঠে নেমেছে পেগিডা।

পেগিডার ‘পক্ষে’ এক তৃতীয়াংশ জার্মান! : জার্মানিতে শুরু হওয়া ইসলামবিরোধী সমাবেশের দাবি-দাওয়াকে সমর্থন করছে এক তৃতীয়াংশের মতো জার্মান। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে জানা গেছে এ তথ্য। এদিকে শরণার্থীদের ঢল ঠেকানোর উপায় খুঁজছে বার্লিন। পেগিডার ব্যানারে হাজারো মানুষের জমায়েত পুরো জার্মানিতেই আলোড়ন তুলছে। যদিও মনে করা হয়- পেগিডা কার্যত সাবেক কমিকউনিস্ট পূর্ব জার্মানির মানসিকতাই প্রকাশ করছে, তবে জরিপে দেখা গেছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। ইসলামবিরোধী সমাবেশের দাবির সঙ্গে সম্মতি প্রদানকারীদের মধ্যে সাবেক পূর্ব এবং পশ্চিম জার্মানির প্রায় সমপরিমাণ মানুষই রয়েছে।

পোলস্টার ইউগভ-এর জরিপে জানতে চাওয়া হয়- এটা কি ভালো যে, কেউ একজন রাজনৈতিক শরণার্থী নীতির ভুলভ্রান্তি জনসমক্ষে তুলে ধরছে এবং ইসলামপন্থার বিরোধিতা করছে?- পেগিডা দৃশ্যত এই দাবিই করছে। সাবেক পূর্ব জার্মানির ৩৬ শতাংশ এবং সাবেক পশ্চিম জার্মানির ৩৩ শতাংশ মানুষ এই বক্তব্যের পক্ষে রায় দিয়েছেন। পোলস্টার মোট ১০২৫ জন জার্মানের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। এরপর সেটিকে ১৮ বছরের বেশি বয়সী জার্মান প্রতিনিধিদের মতামত হিসেবে প্রকাশ করেছে।

প্রসঙ্গত, জার্মান রাজনীতিবিদরা পেগিডাকে ডানপন্থী হিসেবে সমালোচনা করে আসছেন। তাদের মত হচ্ছে- জার্মানি কোনোভাবেই ‘ইসলামাইসড’ হচ্ছে না। জার্মান সমাজ যতোটা মনে করে তার চেয়েও অনেক কম, মানে জার্মানির মোট জনসংখ্যার মাত্র চার শতাংশ মুসলমান৷
পেগিডাকে রুখতে অনলাইন ক্যাম্পেইন : জার্মানির রাজপথে এসব প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রভাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে। ২০১৪ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ফেসবুকে সক্রিয় হওয়া পেগিডার পাতা লাইক করেছেন ৭০ হাজার মানুষ। ফেসবুকে জনপ্রিয়তার বিচারে এই সংখ্যা জার্মানির বড় রাজনৈতিক দল সিডিইউ বা এসপিডি-র চেয়ে খুব একটা কম নয়। পেগিডা এবং হোগেসা তাদের ফেসবুক পাতা ব্যবহার করে তথাকথিত ইসলামি চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হতে জার্মানদের আহ্বান জানাচ্ছে।

এদিকে, বছরকয়েক আগে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে জিম্মি ঘটনার প্রেক্ষিতে মুসলমান বিরোধী মানসিকতা যাতে বাড়তে না পারে সে উদ্দেশ্যে চালু হওয়া হ্যাশট্যাগ ‘আই’ল রাইড উইথ ইউ’ এখন জার্মানিতেও পেগিডার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। পেগিডা ওয়াচ নামক একটি গ্রুপ, যারা নব্য নাৎসি এবং পেগিডার কর্মকা-ের দিকে নজর রাখছে, তাদের ফেসবুক পাতায় এক-দেড় মাসেই ১৫ হাজারের বেশি লাইক পড়েেেছ। টুইটারে এই গ্রুপ হ্যাশট্যাগ ‘নো-পেগিডা’ ব্যবহার করে বিভিন্ন টুইটও করছে।

রাস্তায় প্রকাশ্য প্র্রতিবাদ : ইসলামবিরোধী গ্রুপগুলোর প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জার্মানিতে এখন অভিবাসীবিরোধী মনোভাব, জিনোফোবিয়া এবং উগ্র ডানপন্থীদের কর্মকা- নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। ইসলামবিরোধীদের প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রতিবাদে রাজপথেও নেমেছেন অনেকে। ড্রেসডেনে যেদিন পেগিডা সমাবেশ করছে, সেদিন তাদের বিরোধীরাও রাস্তায় নেমেছিলো- ‘ড্রেসডেন ফর অল, অল ফর ড্রেসডেন’ ব্যানার হাতে। একই সময়ে কোলনে রাস্তায় সমবেত একদল মানুষের হাতে ছিল ব্যানার ‘ইউ আর কোলন, নট নাৎসি’।

শিল্প-বাণিজ্যের নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে রাজনীতিক মহল এবং সবচেয়ে বড় কথা সাধারণ জার্মানরা পেগিডা-র অভিবাসন বিরোধী মনোভাবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে নিয়ে এ যাবৎ জার্মানিতে যে মূল্যবোধ গড়ে উঠেছে এবং বিদেশে জার্মানির যে ভাবমূর্তি সৃষ্টি হয়েছে, পেগিডা-র মতো আন্দোলন তাকে বিপন্ন করছে বলে মনে করেন বেশিরভাগ জার্মান নাগরিক।
‘অ্যান্টি নাৎসি’ নামে নতুন একটি অ্যাপও তৈরি হয়েছে, যেটি ব্যবহার করে বার্লিন এবং ব্রান্ডেনবুর্গে কখন, কোথায় পেগিডা প্রতিবাদ বিক্ষোভের আয়োজন করছে এবং কোন রাস্তা তারা ব্যবহার করছে, তা জানা যাবে। এই অ্যাপ ডানপন্থীদের বিরোধীদের জন্য বিশেষ সহায়ক, কেননা তারা এই অ্যাপ অনুযায়ী পাল্টা কর্মসূচি দিতে পারে।

ইসলামবিরোধী পেগিডার সমালোচনায় এ্যাঙ্গেলা : জার্মান চ্যান্সেলর এ্যাঙ্গেলা মার্কেল নববর্ষের বার্তায় বলেছেন, তাঁর দেশ শরণার্থীদের গ্রহণ করা অব্যাহত রাখবে। এসময় ইসলামবিরোধী পেগিডা আন্দোলনেরও সমালোচনা করেন তিনি।

জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে ম্যার্কেল বলেন, ‘যাঁদের সহায়তা প্রয়োজন জার্মানি তাঁদের সহায়তা করবে’। তিনি জানান- ২০১৪ সালে জার্মানি আশ্রয়প্রার্থীদের কাছ থেকে দুই লক্ষেরও বেশি আবেদন পেয়েছে, যেটা বিশ্বে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ২০১৪ সালই সবচেয়ে বেশি শরণার্থী দেখেছে বলেও জানান জার্মান চ্যান্সেলর। এটা গত বছরের শেষ দিকের তথ্য, ২০১৫ সালে শরণার্থী সংখ্যা বেড়েছে আরো বেশি হারে। মার্কেল সে বক্তৃতায় আরো বলেন- নির্যাতনের শিকার মা-বাবার সন্তানেরা জার্মানিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠতে পারবে, এ জন্য জার্মানি গর্ব করতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানির কয়েকটি শহরে ইসলামবিরোধী পেগিডার আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মার্কেল এর সমালোচনা করে জার্মান নাগরিকদের এ ধরনের কর্মসূচি থেকে নিজেদের দূরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন- এ ধরনের কর্মসূচি বিভিন্ন বর্ণ ও ধর্মের মানুষের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। ‘আপনারা এই আন্দোলনের আয়োজকদের অনুসরণ করবেন না। তারা শীতল হৃদয়ের অধিকারী এবং তাদের মন প্রায়ই পক্ষপাতদুষ্ট ও ঘৃণায় পূর্ণ’।

এই কেমন জীবন আমার

জানুয়ারি ২০১৫’র শার্লি এবদোয় হামলার ঘটনা নিশ্চয়ই মনে আছে আমাদের। দুই মুসলিম সহোদরের হামলায় পত্রিকাটির সম্পাদকসহ ৮ জন লেখক-সাংবাদিক নিহত হন। এর পরদিন এক ইহুদি শপে আরো একটি হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে মুসলিম ইস্যুতে আবারো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ইউরোপের পরিবেশ। ফ্রান্সের ঘটনা হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই হাওয়াটা এখানে বেশি লাগে। ইতোপূর্বে এ নিয়ে মোটামুটি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। মাত্র দু’ সপ্তাহের ব্যবধানে তখন ফ্রান্সজুড়ে ১২৮ টি হামলার ঘটনা ঘটেছে মুসলিমদের ওপর। মসজিদগুলোও রক্ষা পায়নি। গ্রেনেড হামলা, জ্বালাও-পোড়াও, রাস্তাঘাটে হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন, বাচ্চাদের উঠিয়ে নেয়া বা পাসপোর্ট জব্দ করাসহ বাদ যায়নি কিছুই। শুধু জনগণ নয় প্রশাসনও জড়িয়ে পড়ে এসব ঘটনায়। মুসলিম অভিবাসন বন্ধ এবং ইসলাম নিষিদ্ধে পেগিডার মতো বৃহৎ আন্দোলন ফ্রান্স-জার্মানি হয়ে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ইতোপূর্বে চলতে থাকা শিক্ষা, চাকরি বা ধর্ম পালনের বৈষম্য আরো বাড়ার পাশাপাশি শার্লি এবদোর ঘটনা মূলত ফ্রান্স থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টাকেই সামনে নিয়ে আসে। দায় বা দোষ যেনো সন্ত্রাসীদের নয় পুরো একটি সম্প্রদায়ের, আরো ভালো করে বললে একটি ধর্মের। ইসলামের। সুতরাং এই মুহূর্তের ফ্রান্স মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য রীতিমতো এক বধ্যভূমি। নদীভাঙনে এক রাতের ব্যবধানে অসহায় হওয়ার মতো শার্লি এবদোর একটি ঘটনা তাদের পুরো জীবনধারা এমনকি বেঁচে থাকাটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের হেফাজত করুন।

ফ্রেঞ্চ মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার

ফ্রান্সের মুসলিমদের মৌলিক অধিকারেরই যখন এই অবস্থা, তখন সহজেই অনুমেয়- ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্নে তাদের অবস্থান কী হবে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার হিসেবেই মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় সাত মিলিয়ন। অথচ মসজিদের সংখ্যা মাত্র ৯০ টি। প্রকাশ্য রাস্তায় বা পাবলিক স্পেসগুলোতে মুসলিম নারীদের হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্কুল-কলেজে মুসলিম ছেলেদের লম্বা পোশাক এবং মেয়েদের স্কার্ফ-হিজাবও নিষিদ্ধ। অথচ তাদের পড়াশোনার বিকল্প হিসেবে ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এখনো কোনোরকম স্বীকৃতি পায়নি। ফলে মৌলিক ও ধর্মীয় সব ব্যাপারেই ফ্রান্সের মুসলিম সম্প্রদায় বঞ্চিত মানবতার এক জ্বলন্ত উদাহরণে পরিণত হয়েছেন।

ফ্রান্সে বৈষম্যের বাস্তবতা

২০১২ সালে ফ্রান্সের লি ফিগারো ম্যাগাজিনে একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়। জরিপে দেখা যায়- ৬৭ ভাগ ফ্রেঞ্চ নাগরিকই বিশ্বাস করেন যে, মাগরিবি বা দক্ষিণ আফ্রিকান মুসলিমরা ফ্রেঞ্চ সোসাইটির সাথে নিজেদের খাপ থাওয়াতে পারে না তাই তারা তেমন ভালো অবস্থানেও যেতে পারে না। এখানে বড় একটা ব্যাপার এই যে, ফ্রান্স সরকার বা ফ্রান্সের জনগণ শুরু থেকেই সব মুসলিমকে অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে চান, যা মোটেই সঠিক নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যারা ফ্রান্সে বসবাস করে আসছেন বা নতুন করে যেসব ফ্রেঞ্চ নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করছেন তারাও কেনো অভিবাসীদের মতো ব্যবহার পাবেন? যাই হোক এই জরিপ প্রকাশের পর ডেভিট লাইতিন, ক্ল্যারি অ্যাডিডা এবং মারি এ্যানা ভেলফোর্ট এই তিনজন গবেষক নতুন আরেকটি জরিপ চালান। তাদের ভাষ্যটিই পড়–ন-

‘২০০৯ সাল থেকেই আমরা ফ্রান্সের মুসলিম ইস্যুটি নিয়ে গবেষণা করছিলাম। পশ্চিম ইউরোপে, ফ্রান্সই হলো সবচে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। ২০১০ সালেই যা ছিলো সাড়ে সাত মিলিয়ন। আমাদের গবেষণার উদ্দেশ্য ছিলো এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া- ফ্রান্সের চাকরির বাজারে মুসলিম নাগরিকরা কি মুসলিম হওয়ার কারণেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন? যদি এই হয়, তাহলে এই বৈষম্যগুলোর ধরন কী? গবেষণার কাজে আমরা প্রাধান্য দিলাম অভিবাসীদের। এমন দুই দল অভিবাসী- যারা একই সময়ে একই দেশ থেকে ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছেন। সেনেগালের সেই দুটো গ্রুপ ছিলো জুলাস এবং সির্রিস। একদল মুসলিম, অন্যদল খৃষ্টান। শুধু ধর্ম ছাড়া বাকি সবক্ষেত্রে তারা সমপর্যায়ের ছিলেন। এক দেশ, এক সংস্কৃতি, ৭০ এর দশকে একসাথে ফ্রান্সে পারি জমানো এবং একইরকম অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অবস্থা। এই দুই গ্রুপের তৃতীয় প্রজন্মের সিভি ঘেটে আমরা বড় রকমের বৈপরীত্য পেলাম। সমযোগ্যতা নিয়ে চাকরির বাজারে সিভি জমা দিয়ে সেনেগাল থেকে আগত খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী পরিবারের সন্তানেরা চাকরির বাজারে যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডাক পেয়েছেন, মুসলিম পরিবারের উত্তরাধিকারীরা ডাক পেয়েছেন খুবই অল্পসংখ্যক। তাদের মধ্যকার চাকরিপ্রাপ্তদের আয়ের ব্যবধানও প্রায় ১৭%। এই তথ্য থেকে সহজেই অনুমেয়- আরব বা আফ্রিকান হিসেবে নয় মুসলিম হওয়ার কারণেই তারা এসব বঞ্চণার শিকার হয়েছেন।

এখন কথা হলো- কীভাবে এই বৈষম্যের ব্যাপারটি ঘটে? আমরা অবাক হয়ে এক্ষেত্রে জরিপের তথ্যগুলো দেখলাম। বেশিরভাগ ফ্রেঞ্চ নাগরিকই বিশ্বাস করে- তাদের রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের সংস্থা বা জনগণের সাথে মুসলিমদের তেমন সংযোগ নেই, যতোটা রয়েছে তাদের নিজেদের দেশ বা সংস্কৃতির সাথে। অর্থাৎ অবিশ্বাস। দশকের পর দশক অতিক্রম করার পরও মুসলিমরা তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারে নি। আর এক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান ভূমিকা পালন করে মুসলিম নামগুলো। চাকরিদাতারা মুসলিম নাম দেখেই প্রথমে ভাবেন এই অবিশ্বাসের ব্যাপারটা, যে সমস্যায় খৃষ্টান বা অন্য ধর্মের কাউকে কখনোই পড়তে হয় না। সেই সাথে মুসলিম ইস্যুতে যতো প্রোপাগান্ডা আছে সবই সামনে চলে আসে এবং মুসলিম তরুণদের চাকরির আবেদন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ে। এভাবেই চাকরির বাজার এবং উপার্জনের প্রশ্নে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক বৈষম্য। এটি এমন এক সমস্যা- যা হাতে ধরে দেখানো যায় না আবার মেনেও নেয়া যায় না। সমাধানের সহজ কোনো বিকল্প কি আছে?

ফ্রান্স কি মুসলিম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে?

সাহাবা মস্ক। প্যারিসের সন্নিকটে অবস্থিত এই মসজিদটি ইতোমধ্যেই ফ্রান্সে ইসলাম গ্রহণের মারকায হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ৮১ ফুট দীর্ঘ মিনারসংবলিত সুদৃশ্য এই মসজিদটি ফ্রান্সে ইসলামের প্রোজ্জ্বল উপস্থিতির নিদর্শন। শার্লি এবদোয় হামলার পর ফ্রান্সসহ পুরো ইউরোপ যেমন আক্রমণাত্মকভাবে ইসলাম বিরোধিতায় মেতেছে, প্রতিক্রিয়াও হয়েছে ঠিক উল্টো। আল্লাহ পাকের ইচ্ছের বিরুদ্ধে মানুষ পেরে উঠবে কেনো। এখন সবগুলো সূত্রের খবর- শার্লি এবদোর ঘটনার পর ফ্রান্সে ইসলাম গ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ‘র‌্যাপিডলি’। র‌্যাপিডলি শব্দের তরজমা হয় ‘¯্রােতের মতো’, আমরা অন্তত ‘ব্যাপকভাবে’ তো বলতেই পারি। একটা রিপোর্টের অংশ দেখুন-‘শার্লি এবদো হামলার পর থেকে ফ্রান্সজুড়ে ইসলাম গ্রহণকারী লোকের সংখ্যা তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেড়ে গেছে। ইমামগণের রিপোর্টও সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, উল্লেখযোগ্যহারে লোকজন এখন মসজিদে আসছেন ইসলামের কালিমা পড়তে।

এক সপ্তাহ আগে আরটিএল (জঞখ) রেডিওর সাথে সাক্ষাতকার প্রদানকালে তরুণ এক নওমুসলিম বলছিলো- ‘এই ঘটনাটিই আমাকে ইসলামের কাছে যেতে ‘প্ররোচিত’ করেছে এবং এর মাধ্যমে সবার কাছে প্রমাণিত হচ্ছে যে প্রকৃত ইসলাম কখনো এসব সমর্থন করে না।’ রেডিও স্টেশনের সূত্রমতে মাত্র ক’ সপ্তাহের ব্যবধানে শুধু ‘গ্রেট মস্ক’ খ্যাত সাহাবা মসজিদ থেকেই ৪০ জন ফ্রেঞ্চ নাগরিক ইসলাম গ্রহণের সার্টিফিকেট নিয়েছেন। সময়ের বিবেচনায় বিগত বছরের তুলনায় যা প্রায় ৫০% বেশি। স্ট্রাসবার্গ এবং এবারভিলিয়ার্স শহরেও এ সময়ে ইসলাম গ্রহণের সংখ্যা গত বছরের চেয়ে ৩০% বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। লিয়ন শহরের বৃদ্ধির রেট ছিলো ২০% এর মতো।

ক’জন ইমাম বললেন বৃদ্ধির এই ধারা দেখে প্রথমদিকে তারাও বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন। প্রসঙ্গত যোগ করা যেতে পারে যে, ইসলাম গ্রহণকারী এই দলে কেবল সাধারণ তরুণ-যুবারাই নন, যুক্ত হয়েছেন ডাক্তার, স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং পুলিশ অফিসারের মতো পেশাদার লোকেরাও। ইসাবেলা ম্যাটিক নামের একজন নারী ব্যবসায়ী এবং ফিল্মমেকারও কিছুদিন আগে তার ফেসবুক একাউন্টে ইসলাম গ্রহণের খবর দিয়েছেন।’…

নানাসূত্রে এ জাতীয় খবর, বিশেষ ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ফ্রান্সের এই সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে মারওয়ান মুহাম্মদের দাবি খুব একটা অযৌক্তিক মনে হয় না। তবে কি ফ্রান্স সত্যিই মুসলিম রাষ্ট্র হতে চলেছে?

প্যারিস হামলার ভেতর-বাহির

দেশে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া দুর্বোদ্ধ জঙ্গি অপতৎপরতার জের, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি, বিচ্ছিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, স্থানীয় নির্বাচনের তোড়জোড়, দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া উল্লম্ফন এবং ক’বছর ধরে চলতে থাকা রাজনৈতিক দুরাবস্থার চাপে আমাদের এই সময়কার প্রাত্যহিক দিনযাপন এমনিতেই বিচ্ছিরি এক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। ১৫ নভেম্বর রবিবার সকালটা জটাজটিল এ পরিস্থিতির সঙ্গে আরো বড় এক দুঃসংবাদ নিয়ে হাজির হলো। পত্রিকা খুলেই দেখতে হলো- সন্ত্রাসী হামলার শিকার প্যারিস নিয়ে লাল বর্ণের পিলে চমকানো সব শিরোনাম। ‘প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা’, ‘রক্তাক্ত প্যারিস, স্তম্ভিত বিশ্ব’ ইত্যাদি হেডিংয়ের পাতাজোড়া খবর। হতাহতদের শোক আর স্মরণে, জঙ্গি দমন আর সন্ত্রাস নির্মূলের শ্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠলো পুরো বিশ্ব। প্যারিসের ঘটনায় ব্যথিত এবং মুসলিম উম্মাহর ভাবনায় শংকিত হওয়ার পাশাপাশি অবাক হয়ে আমরা তখন দেখলাম- এই শোক আর কান্না এতোটাই প্যারিসকেন্দ্রিক হয়ে উঠলো যে, দু’দিন আগে বৈরুত ও পরে মালিতে একইরকম বর্বর সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হওয়া অপর প্রায় ৮০ জনের খবর মাটিচাপা পড়ে গেলো।

ইহুদিদের হাতে ক’সপ্তাহ ধরে লাগাতার বর্বরতার শিকার হতে থাকা অসহায় ফিলিস্তিনিদের কান্নাও মিডিয়ার দৃষ্টি কাড়তে ব্যর্থ হলো। প্যারিস আক্রান্ত হবার পরপরই মধ্যরাতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে সরাসরি আইএসকে দায়ী করলেন, একদিন পেরুবার আগেই আইএস হামলার বিষয়ে নিজেদের স্বীকারোক্তিও জানিয়ে দিলো। ওলাঁদের ঘোষণার পর থেকেই ইউরোপ-আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের পক্ষ থেকে একের পর এক ঘোষণা আসতে শুরু করলো- বিশ্বকে আইএস মুক্ত করার। ব্যাপক উদ্যমে সিরিয়ায় নতুন করে হামলা শুরু করলো ফ্রান্স। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে বৈঠক করে ওঁলাদ সম্মিলিত আক্রমণের খসড়া তৈরি করলেন। ১৫ নভেম্বর তুরস্কে জি-২০ সম্মেলনে হাজির হওয়া ওবামা-পুতিন গোপন এক বৈঠকে সিরিয়ার বিষয়ে ঐক্যমত্যে পৌঁছলেন। ফ্রান্সের উদ্যোগে আইএসের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে বিশেষ প্রস্তাব পাস হলো। সিরিয়ায় হামলায় এগিয়ে এলো যুক্তরাজ্য এবং জার্মানিও। হামলার পর থেকে নিয়ে এই পর্যন্ত ঘটা বা ঘটতে থাকা সব ব্যাপারের সাথেই বিশ্ববাসী আমরা একমত পোষণ করলাম। দ্বিধাহীন সমর্থন জানালাম। কিন্তু মিডিয়ার সাধারণ কভারেজ পেতে অক্ষম হওয়া বিপরীত দিকের এই খবররগুলোও আমাদের সমানভাবে উদ্বিগ্ন করে তুললো। প্যারিস হামলার রাতেই ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী কাল প্রদেশে নিরীহ শরণার্থী শিবিরে আগুন দেয়া হলো। ফ্রান্সের বেশ ক’টি মসজিদ দুর্বৃত্তদের আক্রমণের মুখে পড়লো। কানাডার একটি মসজিদ আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হলো। দাড়ি-বোরকাসহ ইসলামের দৃশ্যমান পোশাকধারী পশ্চিমের মুসলিম সদস্যদের অনেকেই হয়রানির শিকার হতে থাকলেন।

এই ঘটনাগুলোকে আমরা বিক্ষুব্ধ জনতার ভুল বা আবেগী আচরণ হিসেবেও ধরে নিতে পারতাম, কিন্তু রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের পক্ষ থেকেও যখন একইরকম বিবৃতি আসতে থাকলো তখন তো আর সে সুযোগ থাকে না। হামলার জন্য দায়ী করা হলো আইএসকে, তারা দায় স্বীকারও করলো- অথচ বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়লেন কিনা স্থানীয় নিরপরাধ মুসলিম আর অসহায় শরণার্থীরা! বেশ ক’টি ইউরোপীয় দেশ পরদিনই নিজেদের ভাগে পড়া শরণার্থী গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালো। ফ্রান্স-বেলজিয়ামসহ ইউরোপজুড়ে শুরু হওয়া অভিযানগুলোতে মুসলিম নাগরিকদের নিগ্রহের খবর পাওয়া যেতে থাকলো। ব্রাসেলসের এক মুসলিমপ্রধান পল্লীকে জঙ্গি উৎপাদনের আখড়া হিসেবে আখ্যায়িত করা হলো। ফ্রান্স সীমান্তে হাজির হওয়া শরণার্থীরা এ সময় পড়লেন আরো বিপাকে- ‘ফ্রান্স রাখবে না আর যুক্তরাজ্য ঢুকতে দেবে না’ এমন পরিস্থিতিতে পড়ে অসহায় দিন গুজরান করতে বাধ্য হতে থাকলেন ঘটনার পর থেকেই। এদিকে প্যারিস হামলার সপ্তাহ না ঘুরতেই ফ্রান্সের পক্ষ থেকে ঘোষণা এলো প্রায় ১৬০ টি মসজিদ বন্ধ করে দেওয়ার। ক’দিন পর মিললো আরো বড় দুঃসংবাদ- হামলার ঠিক দু’সপ্তাহের মাথায় অনুষ্ঠিত হওয়া ফ্রান্সের আঞ্চলিক নির্বাচনে চরম মুসলিমবিদ্বেষী ন্যাশনাল ফ্রন্ট অভাবনীয় বিজয় অর্জন করলো। বহু বছরেও ফ্রান্সের যে কোনো ধরনের নির্বাচনে একটামাত্র আসন পেতে ব্যর্থ হওয়া ন্যাশনাল ফন্টের এই বিজয়ে একবার কল্পনা করুন- আসছে দিনগুলোতে কেমন বিপদের মুখে পড়তে চলেছেন ফ্রান্সের প্রায় এক কোটি মুসলিম। এ খবরগুলোকে আপনি কী বলবেন? বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কেবল শোক-ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ঘটে যাওয়া কিছু আবেগী ভুল? সিদ্ধান্তে যাবার আগে সিরিয়াকে নিয়ে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরজুড়ে চলা রাশিয়া ও পশ্চিমা জোটের বিতর্ক, রাশিয়ার একতরফা হামলা, সিরিয়াকে নো ফ্লাই জোন ঘোষণা এবং পশ্চিমের মুখোশ খুলে দেয়ার হুমকিটাও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া দরকার। তারও আগে চলুন প্যারিস হামলার পরবর্তী এক-দেড় সপ্তাহের ধারাবাহিক ক’টি রিপোর্টে আরো একবার চোখ বোলাই। খবরের সত্যতা এবং সূত্রগুলো সতর্কতার সাথে যাচাই করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সংবাদগুলো আংশিক সম্পাদনাসহ তুলে ধরছি। শুধু সংবাদের জন্য সংবাদ না হয়ে ভবিষ্যতেও কাজে লাগতে পারে এমন তথ্যনির্ভর রিপোর্টগুলোই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। ঘটনার ধরন, প্রতিক্রিয়া এবং ঘটনাপরবর্তী পদক্ষেপগুলোই আপনাকে অনেক কিছু বলে দেবে।

হামলার সূত্রপাত ও ভয়াবহতা

বছরের শুরুতেই উগ্রপন্থীদের গুলি ও বোমায় রক্ত ঝরেছিলো ফ্রান্সে। বছরের শেষ দিকে এসে আবারও রক্তাক্ত হলো দেশটির রাজধানী প্যারিস। শুক্রবার (১৩ নভেম্বর, ২০১৫) রাতে প্যারিসের ছয়টি স্থানে প্রায় একই সময়ে পরিচালিত হামলায় অন্তত ১২৯ জন নিহত হয়েছেন। উপর্যুপরি গুলি, বোমা ও আত্মঘাতী এসব হামলায় আহত হয়েছেন আরো অন্তত ৩৫২ জন। তাদের ৯৯ জনের অবস্থাই গুরুতর। নিহত হয়েছেন সাতজন হামলাকারীও। খবর এএফপি, গার্ডিয়ান, বিবিসি ও রয়টার্সের।

চলতি বছরেরই ৭ জানুয়ারি প্যারিসে ব্যাঙ্গ পত্রিকা শার্লি এবদো কার্যালয়ে জঙ্গি হামলায় ১১ জন নিহত হন। বলা হচ্ছে- ১৩ নভেম্বরের ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নিয়ে ফ্রান্সে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। চলতি শতাব্দীতে ইউরোপে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী হামলা। এর আগে ২০০৪ সালে মাদ্রিদে ট্রেনে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১৯১ জন। ইরাক ও সিরিয়ায় সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) অনলাইনে শুক্রবারের হামলার দায় স্বীকার করেছে। বাড়তি সতর্কতা হিসেবে প্যারিসে দেড় হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে হামলার পরপরই দেশটির সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়।

প্যারিসে স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত নয়টার দিকে কম্বোডীয় একটি পানশালায় হামলা চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে বন্দুকধারীরা। রাত প্রায় সাড়ে ১০টা পর্যন্ত একটি কনসার্ট হল, একাধিক রেস্তোরাঁ ও জাতীয় ক্রীড়া স্টেডিয়ামসহ ছয়টি স্থানে হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে বাতাক্লঁ কনসার্ট হলেই ৮৭ জন নিহত হন। চারজন একে-৪৭ বন্দুকধারী কনসার্ট হলে ঢুকে গুলি চালানো শুরু করে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বেতার উপস্থাপক পিয়ের জানাসজক বলেন- ‘বন্দুকধারীরা ঢুকেই গুলি চালানো শুরু করে। চারদিকে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। ওরা বলছিল- এটার জন্য তোমাদের প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ দায়ী। সিরিয়ায় হামলায় অংশ নেওয়া তার ঠিক হয় নি।’

বাতাক্লঁ কনসার্ট হল ছাড়া জাতীয় ক্রীড়া স্টেডিয়াম স্তাদ দো ফ্রঁস এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বুলভার্দ দো শারন, বুলভার্দ ভলতেয়ার, রু দো লা ফঁতাইন অরোয়া ও রু আলিবেয়ার এলাকায় হামলা হয়েছে।

ডিয়াম স্তাদ দো ফ্রঁসের বাইরে দুটি আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এতে চারজন নিহত হয়। ওই সময় স্টেডিয়ামে ফ্রান্স ও জার্মানির জাতীয় দলের ফুটবল খেলা চলছিল। খেলা দেখতে সেখানে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রি ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার স্টাইনমেয়ার।

ধরপাকড় : ১৪ নভেম্বর সকালে এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে বলে স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান প্যারিসের প্রসিকিউটর ফ্রাঁসোয়া মলাঁ। এদের একজনকে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের সীমান্ত থেকে আটক করা হয়। তিনি বলেন, সাতজন হামলায় অংশ নেয়। আগে হামলাকারীর সংখ্যা আট বলা হলেও তা ঠিক নয়। তিনটি সংঘবদ্ধ দল একযোগে হামলা চালায়। পরে আরো বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।

প্যারিসের পুলিশের ধারণা- হামলাকারীদের মধ্যে তিনজন ব্রাসেলস থেকে এসেছিলেন। হামলাকারীদের একজন প্যারিসের এক শহরতলির বাসিন্দা। এদিকে প্যারিসে হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পাশের দেশ বেলজিয়ামেও প্রায় কুড়ি জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ফ্রান্সজুড়ে আতঙ্ক: হামলার পর ফ্রান্সজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মেয়রের পক্ষ থেকে প্যারিসের বাসিন্দাদের ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। শনিবার নির্ধারিত সব ধরনের খেলাধুলা, জনপ্রিয় ইউ টু ব্যান্ডের কনসার্ট স্থগিত করা হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় প্যারিসে পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ আইফেল টাওয়ার।

আইএসের দায় স্বীকার : হামলার দায় স্বীকার করে একদিন পরই (১৪ নভেম্বর) শনিবার বিবৃতি দিয়েছে আইএস। বিবৃতিতে বলা হয়- আইএসের পক্ষ থেকে প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে হামলার জন্য আটজনকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিয়ে পাঠানো হয়েছিল। ফ্রান্স যত দিন তার বর্তমান নীতি বজায় রাখবে, ততদিনই প্যারিস হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকবে। অনলাইনে তারিখ উল্লেখ না করে ছাড়া এক ভিডিও ফুটেজে আইএস হুমকি দিয়ে বলেছে- তাদের যোদ্ধাদের ওপর বিমান হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের হামলা চলতে থাকবে।’

উল্লেখ্য- ইরাক ও সিরিয়ায় সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিমান হামলা চলছে। এ লড়াইয়ে অংশ নিতে সম্প্রতি পারস্য উপসাগরে একটি রণতরি পাঠানোর ঘোষণা দেন ওঁলাদ। গত সেপ্টেম্বর থেকে সিরিয়ায়ও আইএসবিরোধী হামলা শুরু করে ফ্রান্স।

প্যারিসের ৬ স্থানে হামলা

হামলার সময় হামলার স্থান হামলার ধরন ও নিহতের সংখ্যা

  • শুক্রবার- রাত ৯: ২০ স্তাদ দো ফ্রঁস (স্টেডিয়াম) আত্মঘাতী হামলায় নিহত: ৪
  • রাত ৯: ২৫ কবোজ রেস্তোরাঁ গুলিতে নিহত: ১
  • রাত ৯: ৩৮ লা বেল ইকুইপ বার গুলিতে নিহত: ১৮
  • রাত ৯: ৪৯ বাতাক্লঁ কনসার্ট হল গুলি ও বিস্ফোরণে নিহত: ৮৯
  • রাত ১০:০০ বুলভার্দ ভলতেয়ার সড়ক গুলিতে নিহত: ১২
  • রাত ১০:১০ কাসা নস্ত্রা পিৎজার দোকান গুলিতে নিহত: ৫

নিহতরা কে কোন দেশের: প্যারিসের ছয়টি স্থানে শুক্রবারের ওই হামলায় আহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন ১৪ নভেম্বর মারা গেছেন। এ নিয়ে নিহতদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৩২ জন। এঁদের মধ্যে ফরাসি ছাড়াও আছেন ১৪টি দেশের মোট ২২ জন। এসব দেশের মধ্যে বেলজিয়াম ও চিলির তিনজন করে; আলজেরিয়া, পেরু, রোমানিয়া ও তিউনিসিয়ার দু’জন করে এবং যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, মেক্সিকো, মরক্কো, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও সুইডেনের একজন করে। প্যারিসের বাতাক্লঁ কনসার্ট হলে নির্বিচারে গুলির সময় গান করছিলো মার্কিন গানের দল ইগলস অব ডেথ মেটাল। এই দলটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক নিক আলেক্সান্ডার। সেখানে নিহতদের মধ্যে তিনিও একজন।

হামলা পরবর্তী প্রতিক্রিয়া: হামলার পরপরই মধ্যরাতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ এ হামলার জন্য আইএসকে দায়ী করেন। তিনি বলেন- এ হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে দেশের বাইরে। আইএসই এ হামলা চালিয়েছে। এক্ষেত্রে ফ্রান্সের ভেতর থেকেও সহযোগিতা পেয়েছে হামলাকারীরা। ফ্রান্স এর জবাব দেবে অত্যন্ত নির্মমভাবে। এ সময় পুরো জাতিকে তিনি সন্ত্রাসের ব্যাপারে আরো সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান, ঐক্যবদ্ধ ফ্রান্সকে যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসমুক্ত করার ঘোষণা দেন। নিহতদের স্মরণে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়া এবং নতুন সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ রুখতে হামলার পরপরই ফ্রান্সের সীমান্তও বন্ধ করে দেয় হয়। ফরাসি প্রধানমন্ত্রি ম্যানুয়েল ভল্স বলেছেন- ‘আমরা এখন যুদ্ধের মধ্যে আছি। যুদ্ধের মতোই সংগঠিতভাবে আমাদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। আমরাও এর সমুচিত জবাব দেব। অবশ্যই সেটা ফ্রান্সে ও ইউরোপে; সিরিয়া এবং ইরাকেও।’

ফ্রান্সে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের দ্বিতীয় দিন ছিল (১৫ নভেম্বর) রোববার। সাপ্তাহিক ছুটির এই দিনেও বন্ধ ছিল প্যারিসের বিখ্যাত জাদুঘর ও থিয়েটারগুলো। লোকজন খুব একটা বের হয়নি ঘরের বাইরে। তবে এর মধ্যে রাস্তাঘাটে কড়া নিরাপত্তা ও জোরালো তল্লাাশি ছিলো। সেনাবাহিনী ও পুলিশের শত শত সদস্য টহল দেন রাজপথ ও মেট্রো স্টেশনগুলোতে। আর নিহতদের স্মরণে প্যারিসের নটরডেম ক্যাথিড্রালে গতকাল সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় প্রার্থনাসভার। সেখানে যোগ দেয় কয়েক হাজার মানুষ।

আইএস হামলার দায় স্বীকার করে প্যারিসে আরও হামলার হুমকি দিলেও এর কড়া জবাব দিয়েছে ফ্রান্স। আইএস ধ্বংস করতে ফ্রান্স অঙ্গীকারাবদ্ধ বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ। স্থানীয় সময় সোমবার ফ্রান্সের পার্লামেন্টে তিনি এ অঙ্গীকার করেন। ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ বলেন, জরুরি অবস্থার সময়সীমা বাড়ানোর জন্য তিনি একটি বিল পার্লামেন্টে উত্থাপন করবেন এবং সংবিধান পরিবর্তনের জন্যও অনুরোধ করবেন। ইরাক ও সিরিয়ায় ফ্রান্সের সামরিক অভিযান জোরদার করা হবে বলেও তিনি জানান।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বলেন- ‘জরুরি অবস্থা অবলম্বন করতে আমাদের একটি যথাযথ কর্মকৌশল প্রয়োজন। এ জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। অন্য যেসব পদক্ষেপ নিতে তিনি বলেছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পুলিশের আরো পাঁচ হাজার তল্লাাশি চৌকি স্থাপন, প্রতিরক্ষা বাজেটে নতুন করে কাটছাঁট না করা, ফ্রান্সের জন্য হুমকিস্বরূপ বিদেশিদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া ইত্যাদি। ওঁলাদ বলেন, আইএসের বিরুদ্ধে হামলার কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে বসবেন।

তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা আরো বাড়ানোর কথা বলেন এবং বিমানবাহী রণতরী শার্ল দ্য গল আইএসের বিরুদ্ধে অভিযানে ব্যবহারের কথা জানান। গত সোমবার (১৬ নভেম্বর) সিরিয়ার রাক্কা শহরে আইএস ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ফ্রান্সের বিমান। ফরাসি কর্মকর্তারা জানান- ১০টি বিমান থেকে ২০টি নির্দেশিত (গাইডেড) বোমা ফেলা হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া: ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানেরা ফ্রান্সকে নিরাপদ রাখতে সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গতকাল দেওয়া এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন- ‘এই হামলা আমাদের সবার বিরুদ্ধে হামলা। কঠোর সংকল্প এবং সম্ভাব্য সমস্ত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা এই হুমকি মোকাবেলা করব।’

প্যারিস হামলায় শতাধিক নিহত হওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে ফ্রান্সকে সার্বিক সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ওবামা বলেন- এটা শুধু ফ্রান্সের মানুষের ওপর হামলা নয়, এই হামলা মানবতার ওপর হামলা। এ হামলা সব জাতির ওপর হামলা। এই শোক ও বেদনার সময় আমরা ফ্রান্সের পাশে থাকবো। ফ্রান্স সরকার ও জনগণকে সার্বিক সহযোগিতা করবো।

এই হামলার নিন্দা জানিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান বলেন, নিহতদের পরিবারের জন্য আমার সমবেদনা রইলো। আশা করি আহতরা দ্রুত সেরে ওঠবেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রি ডেভিট ক্যামেরন ফ্রান্সের জনগণের সহায়তায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন। জার্মান চান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল বলেছেন- এ হামলা শুধু ফ্রান্সের জনগণের ওপর হামলা নয়, এ হামলা আমাদের সবার ওপরই হামলা। এর জন্য জবাব আমাদের সবাইকে একসঙ্গে দিতে হবে। ফ্রান্স সরকারের সঙ্গে জার্মান সরকার যোগাযোগ রাখছে। যেভাবে ফ্রান্সকে সহায়তা করা যায় আমরা করবো। পাশাপাশি সন্ত্রসীদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়বো আমরা। অন্যান্য বিশ্বনেতারাও একইভাবে সন্ত্রসীদের নিন্দা এবং ফ্রান্সের প্রতি সমবেদনার কথা জানিয়েছেন।

প্যারিস হামলায় মুসলিম নেতাদের প্রতিক্রিয়া: প্যারিস হামলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুসলিম দেশগুলোর নেতারা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান বলেছেন, একটি দেশ হিসেবে সন্ত্রাসীদের কর্মকা- সম্পর্কে আমাদের জানা আছে। আমরা এখন বুঝতে পারছি ফ্রান্স ভোগান্তির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। দেশ হিসেবে আমরা ফ্রান্সের পাশে আছি। নিহতদের পরিবারের প্রতি আমাদের সমবেদনা। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রি নাজিব রাজাক বলেছেন- সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রি নওয়াজ শরীফ বলেছেন, প্যারিসে জঘন্য ও নির্মম হত্যাকা-ের জন্য সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রি আবদেল আল জুবায়ের বলেছেন, শুক্রবারে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলা সকল নীতি, নৈতিকতা ও ধর্মের লঙ্ঘন। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেন, মানবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য আমি তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। ফ্রান্সের পাশে সন্ত্রাস দমনে ইরান রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জুকু উইদুদু বলেছেন, সন্ত্রাসবাদের মোকাবেলায় সকল আন্তর্জাতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার গুরুত্ব দিতে হবে। যাতে প্যারিস হামলার পুনরাবৃত্তি না হয়। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি বলেছেন, প্যারিসে সন্ত্রাসীদের হামলায় তারা প্রমাণ করে দিয়েছে তাদের কোন সীমানা নেই। তারা মানবতার শত্রু। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য মুসলিম দেশের নেতারাও এ সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানান।

ফরাসিদের পাশে বিশ্ববাসী :

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরোনো বন্ধু ফ্রান্সকে সমর্থন জানাতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রি জন কেরি সোমবার প্যারিস গেছেন। তিনি হামলাকারীদের মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে অভিহিত করেছেন। তুরস্কে জি-২০ সম্মেলনে হাজির হওয়া বিশ্বনেতারাও হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পারস্পরিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

ফ্রান্সবাসীর শোকের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিখ্যাত ও সুপরিচিত স্থাপনাগুলো ফরাসি পতাকার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। এর মধ্যে ছিলো লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজ, বার্লিনের ব্রান্ডেনবার্গ গেট, নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্যকেন্দ্র এবং দুবাইয়ের বুর্জ আল খলিফা। ফেসবুক, টুইটার, ইন্সট্রগ্রাম এবং ইউটিউবসহ বিখ্যাত সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ফ্রান্সের পতাকা ব্যবহার করে বিশেষভাবে শোক প্রকাশ এবং ফ্রান্সের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপনের আহ্বান জানায় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নিজেদের কোটি কোটি গ্রাহকের প্রতি। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে ফরাসি দূতাবাসসহ বিভিন্ন স্থানে ফুল দিয়ে ও মোমবাতি জ্বালিয়ে প্যারিসের নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় লাখো মানুষ।

ইউরোপজুড়ে শত শত অভিযান :

১৩ নভেম্বর শুক্রবার রাতের সন্ত্রাসে হতভম্ব প্যারিস শোকে মুহ্যমান। ফরাসিরা স্মরণ করেছে হারানো স্বজনদের। শ্রদ্ধা জানিয়েছে তাঁদের বিদেহী আত্মার প্রতি। একই সঙ্গে হামলায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে ফ্রান্সসহ ইউরোপজুড়ে চলছে শত শত অভিযান।
এরই মধ্যে তিন হামলাকারীর পরিচয় শনাক্ত করেছে ফরাসি পুলিশ। এদের একজনের বাবা ও ভাইসহ ছয় নিকটজনকে আটক করা হয়েছে। শনাক্ত হওয়া তিনজন পরস্পরের ভাই হতে পারে বলে জানিয়েছে ফরাসি গণমাধ্যম। হামলায় ব্যবহৃত একটি গাড়ি পাওয়া গেছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। এর মধ্যে ছিল কয়েকটি একে-৪৭ রাইফেল। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে- হামলাকারীদের কেউ কেউ হয়তো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, শুক্রবার রাতের আক্রমণটির পরিকল্পনা করেছিল বেলজিয়ামের একটি গ্রুপ এবং তারা ফ্রান্সের কিছু লোকের সহযোগিতা পেয়েছিল । ফরাসী প্রধানমন্ত্রি মানুয়েল ভালস আরো বলেছেন, ওই হামলা সংগঠিত হয়েছিল সিরিয়া থেকে, এবং ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে আরো আক্রমণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে জিহাদি আন্দোলনের সাথে যুক্ত লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বেলজিয়ামে এ ঘটনার ব্যাপারে সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে, ইসলামিক স্টেট এ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করার পর গতরাতে ফ্রান্সের জঙ্গীবিমানগুলো সিরিয়ার রাক্কা শহরে – যা ইসলামিক স্টেট নিয়ন্ত্রিত এলাকার রাজধানী – একাধিক স্থাপনার ওপর ২০টি বোমা ফেলেছে। খবর এএফপি ও রয়টার্সের।

কীভাবে চালানো হলো ভয়াবহ এ হামলা?

১৩ নভেম্বর শুক্রবারের হামলায় অংশ নেওয়া সাতজনের মধ্যে ছয়জন বিস্ফোরণে নিজেদের উড়িয়ে দেয়। আর একজন নিহত হয় পুলিশের গুলিতে। এতগুলো মানুষ এমন সুসংগঠিত হয়ে একসঙ্গে ছয়টি স্থানে কীভাবে হামলা চালাতে পারল- সেটাই এখন খুঁজে দেখা হচ্ছে। পুলিশ বলেছে- হামলাকারীদের কাজ দেখে মনে হয়েছে, প্রশিক্ষণ দিয়ে অনেক দিন ধরে তাদের তৈরি করা হয়েছে। এমনও হতে পারে- তারা সিরিয়ার যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ আগেই বলেছেন- দেশের বাইরে প্রস্তুতি নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ফ্রান্সের ভেতর থেকেও সহযোগিতা পেয়েছে হামলাকারীরা।

ধারণা করা হচ্ছে- হামলাকারীদের কেউ কেউ ফ্রান্সে ঢোকে আশপাশের দেশ থেকে। সেই ধারণা থেকে ইউরোপের অনেকগুলো দেশে চালানো হচ্ছে অভিযান। এরই মধ্যে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস থেকে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করেছে সে দেশের পুলিশ।
৫ নভেম্বর জার্মানির ব্যাভারিয়া এলাকায় মেশিনগান, হাতবন্দুক, বিস্ফোরক বোঝাই গাড়িসহ এক ব্যক্তিকে আটক করেছিল পুলিশ। প্যারিসে হামলার সঙ্গে ওই ব্যক্তির যোগসূত্র থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ফ্রান্সের ‘প্রতিশোধ’ হামলা এবং ধ্বংসযজ্ঞ :

প্যারিস-হামলার পর থেকে নিজ দেশে ব্যাপক অভিযানের পাশাপাশি সিরিয়াতেও ভয়ঙ্কর প্রত্যাঘাত চালিয়ে যাচ্ছে ফ্রান্স। উত্তর-মধ্য সিরিয়ার রাক্কায় আইএস গ্রুপের ‘ডি ফ্যাক্টো রাজধানীতে‘ চলছে ফরাসি বিমানবাহিনীর অব্যাহত আক্রমণ। সহযোগিতায় আছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর। প্রথম দু’দিনেই ১০টি যুদ্ধবিমান মোট ২০টি গাইডেড বোমা বর্ষণ করেছে নির্দিষ্ট টার্গেটে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডানের এয়ারবেস থেকে এই হামলা চালানো হচ্ছে। ফ্রান্সের বিমানবাহিনীর দাবি- গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আইএস বাহিনীর সেইসব ঘাঁটি যেখান থেকে পরিকল্পনা করা হয়েছিল প্যারিস-হামলার।

যদিও বিরোধী অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন- ফরাসি বিমানবাহিনী এখন পর্যন্ত ৩০টি বোমা বর্ষণ করেছে। এই হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে ফুটবল স্টেডিয়াম, জাদুঘর এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ২ লাখ মানুষের শহর রাক্কা। অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন- প্যারিসে জঙ্গিহানা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। কিন্তু ফ্রান্সেরও উচিত আরো সচেতন হয়ে বিমানহানা চালানো।

যদিও ফ্রান্স এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর জানিয়েছে- আইএস সদস্যদের বিরুদ্ধে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবে না। আমেরিকা ও ফ্রান্স দু’ দেশের প্রতিরক্ষা দফতরই আলোচনা জারি রেখে পাল্টা প্রত্যাঘাত চালাচ্ছে আইএস ঘাঁটিতে।

সিরিয়ায় হামলা শুরু করেছে যুক্তরাজ্য এবং জার্মানি :

সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটকে লক্ষ্য করে (৩ ডিসেম্বর, ২০১৫) বিমান হামলা শুরু করেছে যুক্তরাজ্য। রয়্যাল এয়ার ফোর্সের টর্নেডো বিমান প্রথমবারের মতো আইএসকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সের আইনপ্রণেতারা বুধবার এক ভোটাভুটিতে এই হামলার অনুমোদন দেন। অনুমোদন দেয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই সিরিয়ায় আক্রমণ করল দেশটির বিমানবাহিনী। অনুমোদনের পর পরই সাইপ্রাস দ্বীপের আকরোতিরি ঘাঁটি থেকে ছেড়ে গিয়েছিলো এই টর্নেডো বিমানগুলি।

বিবিসির প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রতিবেদক জনাথন বিয়েল জানিয়েছেন- টর্নেডোগুলো যখন রয়্যাল এয়ারফোর্সের ঘাঁটি ছেড়ে যায়, তখন এগুলোতে ছিল তিনটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা। বিমান দু’টি যখন ফিরে আসে, তখন সেগুলোতে আর কোনো বোমা ছিলো না। বিমান হামলার ঘটনা আজ প্রথম হলেও যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স আগে থেকেই সিরিয়ায় আইএস বিরোধী অভিযানে অংশ নেয়।

বৃটিশ সামরিক বাহিনীকে সিরিয়াতে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর অনুমতি দিয়েএকটি প্রস্তাাব পাস করে বৃটেনের সংসদ সদস্যরা। দশ ঘণ্টারও বেশি বিতর্কের পর ৩৯৭ জন এমপি ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। বিপক্ষের চাইতে তারা ১৭৪টি ভোট বেশি পান। ভোটের ফলাফল জানার সঙ্গে সঙ্গে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে ক্ষুব্ধ বিক্ষোভ দেখা যায়। অনেক বৃটিশ জনতাই এ ধরনের হামলার বিপক্ষে। এর আগে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রি ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন- বৃটেনে আইএস জিহাদিদের হামলার জন্য অপেক্ষা না করে লড়াাইটা আইএসের কাছে নিয়ে যাওয়াটাই ভালো হবে।

এদিকে, জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ জার্মানিও। জার্মান পার্লামেন্টে ভোটাভুটির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সিরিয়ায় আইএসবিরোধী লড়াইয়ে অংশ নিতে ছয়টি অনুসন্ধানী টর্নেডো বিমান ও একটি ফ্রিগেট মোতায়েনসহ সরাসরি ভূমিকা পালনের জন্য একটি প্যাকেজ অনুমোদন করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। ভোটাভুটিতে প্যাকেজটি অনুমোদনের পক্ষে ভোট পড়ে ৪৪৫টি। বিপক্ষে পড়েছে ১৪৬টি।

বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত মাসে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ১৩০ জন নিহত হওয়ার পর ফরাসি সরকারের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে জার্মানি এই ভোটাভুটির সিদ্ধান্ত নেয়। তবে জার্মানির কোনো সেনা সরাসরি ওই যুদ্ধে অংশ নেবে না। রাশিয়া পৃথকভাবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে সিরিয়ায় আইএসবিরোধী হামলা শুরু করেছে।

অভিযোগের আঙুল- প্যারিস হামলার জন্য আমেরিকা দায়ী : উইকিলিকস

প্যারিস হামলার জন্য আমেরিকা ও তার মিত্রদের অভিযুক্ত করেছে উইকিলিকস। হামলার পর এক টুইট বার্তায় উইকিলিকস বলে- বছরের পর বছর ধরে সিরিয়া ও লিবিয়ায় চরমপন্থীদের অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ দেওয়ার ফলেই প্যারিসের এই হামলা।
পরের দিন আরেক টুইট বার্তায় ওয়েবসাইটটি বলে- প্যারিস সন্ত্রাসী হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছে। ইরাক ও সিরিয়াতেও ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এই দুই মৃত্যুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যে উগ্রপন্থীদের প্রতিপালন করেছে তার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
আরেক টুইট বার্তায় উইকিলিকস বলে- প্যারিসে ইসলামি সন্ত্রাসীদের হামলায় ১২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ায় আড়াই লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। এই ব্যাপারটা তখনো মজার ছিলো না, এখন মজার না।
ওয়েবসাইটটি আরো বলে- সিরিয়া ও ইরাক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে উগ্রপন্ত্রীদের যারা অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করেছে তাদের প্রত্যেককে বিচারের আওতায় আনা উচিত।

প্যারিসে হামলার নেপথ্য নায়ক ইসরাইল : মাহাথির মোহাম্মাদ

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রি মাহাথির মোহাম্মদ ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করেছেন।
তিনি বায়তুল মোকাদ্দাস দখলদার ইসরাইলের সমালোচনা করে বলেছেন- প্যারিসে হামলার নেপথ্য নায়ক হচ্ছে ইসরাইল। ইসরাইল যেকোনো মূল্যে দখলীকৃত এলাকার ওপর আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেছেন, যতদিন পর্যন্ত ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না হবে ততদিন ইসরাইল অন্য যেকোনো উপায়ে তার লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং সন্ত্রাসী হামলা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রির বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে।

জাতিসংঘে আইএস নির্মূলের প্রস্তাব অনুমোদন

মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কয়েকগুণ বাড়ানোর একটি প্রস্তাব জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে- গেল সপ্তায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ১৩২ জন নিহতের ঘটনায় দায় স্বীকার করে আইএস। আর এরই জেরে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা এক জরুরি বৈঠকে বসে শুক্রবার ফ্রান্স প্রস্তাবিত খসড়া প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। প্যারিসের স্টেডিয়াম, কনসার্ট হল এবং বেশ কয়েকটি বার ও রেস্টুরেন্টে চালানো ওই হামলায় শতাধিক মানুষ আহত হন। ২০০৪ সালে মাদ্রিদে বোমা হামলার পর এই ঘটনাকেই ইউরোপে সংঘটিত ‘সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে।

বিবিসি জানিয়েছে- ফ্রান্সের পেশ করা এই খসড়া প্রস্তাবে জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আইএসের বিরুদ্ধে ‘প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ’ নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। তিউনিসিয়ার সুশি ও তুরস্কের আঙ্কারায় সাম্প্রতিক হামলার জন্যও আইএসকে দায়ী করেছে নিরাপত্তা পরিষদ।

প্রস্তাবে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন অংশজুড়ে আইএস ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলো’ নির্মূলে ভূমিকা রাখতে আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ‘সন্ত্রাসী হামলা দমন ও প্রতিরোধে’ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোরও তাগিদ দেয়া হয়েছে।
তবে রাশিয়া ও ফ্রান্সের বিরোধিতায় প্রস্তাবে আইএসের দখল করা অঞ্চলে স্থলসেনা পাঠানোর বিধান যুক্ত করা হয়নি। দেশদুটো মনে করে- এক্ষেত্রে ইরাক ও সিরিয়ার নিজস্ব বাহিনীই ‘যথেষ্ট’।

তিন দশকে ইউরোপে সাতটি সন্ত্রাসী হামলা

স্পেনের মাদ্রিদে ২০০৪ সালের মার্চে ট্রেনে বোমা হামলার ঘটনার পর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শুক্রবারের এই হামলাটিই ইউরোপে সবচেয়ে ভয়াবহ। ১৯৮০ সাল থেকে প্যারিস হামলার আগ পর্যন্ত ইউরোপে সংঘটিত সাতটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার তথ্য তুলে ধরা হলো।
ফ্রান্স : চলতি বছরের ৭-৯ জানুয়ারি দেশটিতে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। প্রথম দিনে দুই বন্দুকধারী ব্যাঙ্গ সাপ্তাহিক শার্লি এবদোর প্যারিস কার্যালয়ে হামলা চালায়। তাদের গুলিতে আট কার্টুনিস্ট ও সাংবাদিক এবং পুলিশের ২ কর্মকর্তাসহ ১২ জন নিহত হন। পরের দিন গুলিতে এক নারী পুলিশ সদস্য নিহত হন। ৯ জানুয়ারি এক বন্দুকধারী একটি ইহুদি বিপণিকেন্দ্রে ঢুকে চারজনকে হত্যা করে। সাঈদ এবং শরিফ কোয়াচি নামের দু’ ভাইকে এ ঘটনার জন্য প্রধানত দায়ী করা হয় এবং দু’জনই পরে নিহত হন।

নরওয়ে : আন্দ্রেস ব্রেইভিক নামের এক উগ্র খৃষ্টান ডানপন্থী ২০১১ সালের ২২ জুলাই রাজধানী অসলোর সরকারি ভবনের বাইরে বোমা হামলা চালালে আটজন নিহত হন। পরে সে ওটোয়া দ্বীপে লেবার যুব সম্মেলনে গুলি চালিয়েও ৬৯ জনকে হত্যা করে।
যুক্তরাজ্য : ২০০৫ সালের ৭ জুলাই যুক্তরাজ্যের লন্ডনে তিনটি পাতালরেল ও একটি বাস লাইনে চারটি হামলায় ৫৬ ব্যক্তি নিহত হয়। আল-কায়েদাকে এ হামলার জন্য দায়ী করা হয়।
স্পেন : ২০০৪ সালের ১১ মার্চ মাদ্রিদগামী চারটি কমিউটার ট্রেনে কয়েকটি বোমা হামলা চালানো হলে ১৯১ জন নিহত এবং প্রায় ২ হাজার ব্যক্তি আহত হয়। প্যারিস হামলার আগ পর্যন্ত এটিই ছিলো ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা।
যুক্তরাজ্য : ১৯৯৮ সালের ১৫ আগস্ট আয়ারল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের ছোট একটি শহরে ওমাঘে গাড়িবোমা হামলায় ২৯ জন নিহত হয়। পরে ওই হামলার দায় স্বীকার করে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি।
স্পেন : বার্সেলোনার একটি বিপণিকেন্দ্রের পার্কিংয়ে ১৯৮৭ সালের ১৯ জুন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইটিএর গাড়িবোমা হামলায় ২১ জন নিহত হয়।
ইতালি : ১৯৮০ সালের ২ আগস্ট একটি রেলস্টেশনের বিশ্রামাগারে বোমা বিস্ফোরণে ৮৫ জন নিহত এবং ২০০ জন আহত হয়। ওই ঘটনায় উগ্র ডানপন্থী সন্ত্রাসী দলের দুই সদস্যের যাবজ্জীবন কারাদ- হয়।

ফ্রান্সে মুসলিমবিদ্বেষী ন্যাশনাল ফ্রন্টের জয়জয়কার

জনমত জরিপের পূর্বাভাস যা দেয়া হয়েছিল ঠিক তা-ই ঘটতে যাচ্ছে। ফ্রান্সের আঞ্চলিক নির্বাচনে মুসলিমবিদ্বেষী উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট-এর জয়জয়কার হতে চলেছে। রোববার অনুষ্ঠিত ফ্রান্সের ১৩টি আঞ্চলিক নির্বাচনে মারিন লো পেনের নেতৃত্বাধীন উগ্র ডানপন্থী দলটি শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৬টিতে এগিয়ে আছে। আর ভরাডুবি হতে চলেছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দের দল সোসালিস্ট পার্টির।

অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি’র দল লে রিপাবলিক (যার সাথে আরো দু’টি দক্ষিণপন্থীয় দল) এগিয়ে আছে মাত্র ৪ অঞ্চলে। আর একটি এগিয়ে আসে কট্টর বাম একটি দল। ফ্রান্সকে ১৩টি বিভাগীয় অঞ্চলে ভাগ করে এ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে মোট প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট পরেছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম খবর দিয়েছে।

দলীয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট ভোটের ৩০ শতাংশ পেয়েছে উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট। লে রিপাবলিক পেয়েছে ২৭ শতাংশ, সোসালিস্ট ২৩ শতাংশ। পরিবেশবাদী দল হিসেবে বিবেচিত ইকোলজিস্ট পেয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং কট্টর বাম দল হিসেবে পরিচিত এসটিএল পেয়েছে ৪ শতাংশ ভোট।
ফ্রান্সের এই আঞ্চলিক নির্বাচনের ফলাফলে মোটেও বিস্মিত হননি এখানকার বিশ্লেষকরা। তারা আগেই বলেছিলেন- প্যারিসে গত মাসে সন্ত্রাসী হামলার পর উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। এর কারণ হিসেবে তারা দলটির মুসলিমবিদ্বেষী এবং অভিবাসন ঠেকাও মনোভাবকে চিহ্নিত করেছেন। প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর পরই ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেত্রী সরাসরি এই হামলার জন্য মুসলমানদের দায়ী করেছেন। তিনি আরো বলেছিলেন- কোনো অবস্থায়ই সিরিয়ার শরণার্থীদের পশ্চিমা দুনিয়ায় আশ্রয় দেয়া ঠিক হবে না।

ফ্রান্সের এই নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিলো প্যারিসে ৩০ বছর ধরে বসবাসরত মোহাম্মদ হামিদুল আলমের কাছে। ফ্রান্সে বাস করেন এমন বাংলাদেশীদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ফ্রান্সের সরকারি প্রশাসনে উচ্চপর্যায়ে রাষ্ট্রীয় অ্যাটাশে এডমিনেস্ট্রেশন পদে চাকরি করছেন।
তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন- অনেকটা সস্তা কথাবার্তা ও অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি করে লো পেনের ন্যাশনালিস্ট পার্টি আঞ্চলিক নির্বাচনে ভালো ফল করেছে। নির্বাচনের আগে তারা বলেছে- ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। তারা ক্ষমতা যেতে পারলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবেন। শুধু তাই নয়, অভিবাসন নীতি বিরোধী মনোভাবও তাদের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি বলেন- লো পেনের বাবা জ্যঁ মারি লোপেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য। ৮০ বছর বয়সী এই নেতা হরহামেশাই বলে চলেছেন তার দল ক্ষমতায় এলে ফ্রান্সকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে আনা হবে। যেসব অভিবাসী ফ্রান্সের নাগরিত্ব পেয়েছেন তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হবে। এই সবই কিন্তু সস্তা জনপ্রিয়তারই অংশ, যা এখন কাজে লাগাচ্ছে তার মেয়ে লো পেন। তবে তার এই সস্তা কথা ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কতখানি প্রভাব রাখতে সক্ষম হবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। সময়ই সেটা ঠিক করে নেবে।

তবে ন্যাশনাল ফ্রন্টের এই ভালো ফল আগামী ২০১৭ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এদিকে, বিবিসি জানায়, নির্বাচনের আগে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রি ম্যানুয়েল ভালস সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন- ভোটাররা যেনো ন্যাশনাল ফ্রন্ট নেত্রী মারিন লো পেনের ‘কৌশলের ফাঁদে’ পা না দেন।

এখন এই দলে মাথা-কামানো (স্কিন হেড) লোক দেখা যায় না তবে অশ্বেতাঙ্গ লোকও দেখা যায় না। এরা ইহুদিবিদ্বেষী কথাবার্তা বলার ব্যাপারে ঠিকই হুঁশিয়ার থাকেন। তবে ইসলামবিরোধী কথাবার্তা এ দলের নেতা-নেত্রীদের মুখে হামেশাই শোনা যায়। দলটি মনে করে- ব্যাপক অভিবাসনের কারণেই ফ্রান্সে উগ্রপন্থী ইসলামের উত্থান ঘটেছে। ফিলিপ ল্যানসেড নামের একজন ব্যবসায়ী বিবিসিকে বলছিলেন- আগে তিনি ন্যাশনাল ফ্রন্টে যোগ দেবার কথা ভাবতেই পারতেন না, কিন্তু ১৩ই নভেম্বরের আক্রমণের পর দিনই তিনি এই দলে যোগ দিয়েছেন।

ফ্রান্সের মার্সেই নগরীতে (যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা আড়াই লাখ) একটি মসজিদের ইমাম আবদুর রহমান গুল বলছেন- ন্যাশনাল ফ্রন্ট সবক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। শিক্ষা, চাকরি সবক্ষেত্রেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা- যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর পরিণতিতে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি। এখানেই একটি নির্বাচনী সভায় মারিন লো পেন ফরাসি আত্মপরিচয়ের উল্লেখ করে বলেছেন- ‘আমরা জানি আমরা কী এবং কী নই। আমরা কিছুতেই কোনো ইসলামিক জাতি নই।’

মার্সেই শহরে ফ্রন্ট ন্যাশনালের উত্থানের পর শহর যেন দু’ভাগ হয়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বিবিসির গ্যাব্রিয়েল গেটহাউসকে বলছিলেন- আমরা তাদের এলাকায় যেতে ভয় পাই, তারা এখন আমাদের এলাকায় আসতে ভয় পায়। এই ‘তারা’ ‘আমরা’ কারা?
তিনি বুঝিয়ে দেন, ‘তারা’ মানে ‘ফরাসি’ আর ‘আমরা’ মানে ‘মুসলিম’।…

ফ্রান্সে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ

ফ্রান্সে শরণার্থী শিবিরে দুর্বৃত্তদের আগুন : ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে পশ্চিমা বিশ্ব সৃষ্ট সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী আইএসের বোমা-গুলিতে ১৩২ নিহত হওয়ার অজুহাতে আইএসের কবল থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ওপর ফরাসী সন্ত্রাসীরা হামলা শুরু করেছে। হামলার পরদিন ১৪ নভেম্বরই ফ্রান্সের বন্দর নগরী কালের জঙ্গলে অবস্থিত শরণার্থী শিবিরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে শরণার্থীরা পালাতে শুরু করেছেন।
কালের ডেপুটি মেয়র ফিলিপ মিগ্নোনেট জানিয়েছেন, প্রায় দশ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা জানি না কীভাবে আগুন লেগেছে। দমকল বাহিনী আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তীব্র বাতাসের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আগুন লাগার পরপরই শরণার্থীরা পালাতে শুরু করেছেন জানালেও কালের ওই জঙ্গলে কতজন শরণার্থী অবস্থান করছিলেন তা বলতে পারেননি ডেপুটি মেয়র।
আগুনে কত সংখ্যক শরণার্থী হতাহত হয়েছে তাও বলতে পারছেন না কালের ডেপুটি মেয়র। তিনি বলছেন- ‘এখন পর্যন্ত আমরা নির্দিষ্ট করে কিছু জানতে পারি নি। কারণ আগুনের হল্কার কারণে উদ্ধারকর্মীরা এখনো ঘটনাস্থলেই ঢুকতে পারে নি। তীব্র বাতাস ও শরাণার্থী শিবিরে ব্যবহৃত বোতল ভর্তি গ্যাসের কারণে আগুনের আঁচ ভয়ানক হয়ে ওঠছে।”

দ্য কালের জঙ্গলে তৈরি করা শিবিরে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা শরার্থীরা অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ প্রত্যাশী। তাদের সঙ্গে ফরাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকবার সংঘর্ষও হয়েছে।

নিহত মুসলিম যুবককে জঙ্গি সন্দেহে বাবা-ভাই গ্রেফতার : প্যারিসে সন্ত্রাসবাদী হামলায় নিহতদের মধ্যে একজন মুসলিমকে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী দাবি করে তার বাবা ও ভাইকে গ্রেফতার করেছে ফরাসি পুলিশ।

শনিবার প্যারিস থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছোট শহর রমিলি সুর সেইন থেকে ওই ছেলেহারা মুসলিম বাবা ও তার ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাদের কারা হেফাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ। বার্তা সংস্থা এএফপি জানাচ্ছে- নিহত ২৯ বছর বয়সী ফরাসি যুবককে বাটাক্লঁ হলে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী হিসেবে সন্দেহ করে তার বাবা ও ভাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পুলিশ রমিলি সুর সেইন শহরের বাড়িতে গিয়ে নিহত যুবকের বাবার বাড়িতে তল্লাাশি চালায়। অন্যদিকে প্যারিস থেকে আট কিলোমিটার দূরে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় বনডোফল কমিউনে নিহত যুবকের ভাইয়ের বাসায়ও হানা দেয় পুলিশ। হামলার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথমবার প্যারিসে কারফিউ ও ফ্রান্সজুড়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

আগুন দেয়া হলো কানাডার মসজিদে : কানাডায় একটি মসজিদে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আগুন দেয়া হয়েছে। এ ঘটনাকে ইসলাম বিদ্বেষী তৎপরতা হিসেবে দাবি করেছেন স্থানীয় মুসলমানরা।

কানাডার কেন্দ্রীয় ওনটারির প্রদেশের পিটারবোরো নগরীর মসজিদ আস-সালামে এই আগুন দেয়া হয়েছে। নগরীর একমাত্র মসজিদটি ১৪ নভেম্বর শনিবার স্থানীয় সময় রাত ১১টার দিকে আগুন দেয়া হয়। এ ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আগুনের ঘটনায় কেউ হতাহত হয় নি কিন্তু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। মসজিদ আস-সালামে কেন আগুন দেয়া হয়েছে এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত তা বের করার জন্য তদন্ত অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।

এদিকে স্থানীয় সূত্র থেকে বলা হয়েছে, মসজিদটি মেরামতে ৮০ হাজার ডলার লাগবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এ জন্য চাঁদা এবং দান সংগ্রহ করছেন স্থানীয় মুসলমানরা।

নগরীর মেয়র এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন- বিদ্বেষের কারণে যদি মসজিদে আগুন দেয়া হয়ে থাকে তবে তার সঙ্গে কানাডার সাধারণ মানুষের কোনো যোগসূত্র নেই। প্যারিসের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পরপরই কানাডার এ মসজিদে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটলো।

শংকার কালো মেঘ

১৬০টি মসজিদ বন্ধ করছে ফ্রান্স : ফ্রান্সে চলমান জরুরি অবস্থার আওতায় প্রায় শতাধিক অনিবন্ধিত মসজিদ বন্ধ করে দেবে দেশটির সরকার। ফ্রান্সের প্রধান ইমাম হাসান আল আলায়ি এ তথ্য জানিয়েছেন।

ডিসেম্বর নাগাদ জরুরি অবস্থার আওতায় পুলিশের গোয়েন্দা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রায় ১৬০টি মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। এর মধ্যে তিনটি মসজিদ ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করলো দেশটি।

গত মঙ্গলবার প্যারিস হামলায় ব্যবহৃত একটি বন্দুকের মালিককে পূর্ব প্যারিসের একটি মসজিদ থেকে আটকের পর ওই ‘লাগনি-সুর-মারনে’ নামক মসজিদটি বন্ধ করে দেয়া হয়। মসজিদটিতে তল্লাাশি চালিয়ে কিছু ‘জিহাদি’ কাগজপত্র উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে ফ্রান্সের পুলিশ।

প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত গেনেভিলিয়ার্স শহরে এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিয়রে আরো দুটি মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে হামলার দু’দিন পরই। ফ্রান্সের প্রধান ইমাম হাসান আল আলায়ি স্থানীয় মসজিদগুলোয় ইমাম নিয়োগের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তিনটি মসজিদ বন্ধ হওয়ার ঘটনার সত্যতা তিনিও নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি তিনি জানান, ‘সামনে আরো মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। উল্লেখ্য, এর আগে শার্লি এবদোর অফিসে হামলার পর উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগ এনে ফ্রান্স থেকে ৪০ জন বিদেশী ইমাম বহিষ্কার করা হয়।

শরণার্থী গ্রহণে অস্বীকৃতি : প্যারিস হামলার পর থেকেই ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে শরণার্থী বিরোধী নতুন রব ওঠেছে। তাদের অভিযোগ- শরণার্থীদের ¯্রােতে মিশে সন্ত্রাসীরাও পশ্চিমে প্রবেশ করছে, তাই আরো শরণার্থী নিয়ে নিজেদের দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তারা ঝুঁকিতে ফেলবে না। হামলার পরপরই ফ্রান্স সরকার সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের কথা বলে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। ফ্রান্স সীমান্তে উপস্থিত হওয়া হাজারো সিরীয় শরণার্থী এতে নিদারুণ বিপাকে পড়েন। হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ড সরকার শরণার্থীদের আশ্রয় দেবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাজ্য সরাসরি কোনো ঘোষণা না দিলেও হামলার পর থেকেই শরণার্থীদের নতুন করে দেশে ঢুকতে দিচ্ছে না। ইংলিশ চ্যানেল হয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ প্রত্যাশী হাজারো শরণার্থী এখন ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী বন্দর নগরী কালে বিপর্যস্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। হামলার পরপরই তাদের তাঁবুতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশসহ বিক্ষুব্ধ জনতার সাথে বেশ ক’বার তাদের সংঘর্ষও বেঁধেছে। ফ্রান্সের মুসলিম বিদ্বেষী ন্যাশনাল ফ্রন্ট প্রধান লো পেন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন- ফ্রান্সে তিনি আর কোনো শরণার্থীকে আশ্রয় দেবেন না এবং ক্ষমতায় এলে অভিবাসীদের নাগরিকত্বও বাতিল করবেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি স্টেটের মধ্যে ২৬টিই প্যারিস হামলার প্রথম দু’দিনের মধ্যেই শরণার্থীদের আশ্রয় না দেওয়ার ব্যাপারে তাদের মত জানিয়ে দিয়েছে। এক বছর পর অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প তো যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের যেকোনো ধরনের প্রবেশ বন্ধের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে রীতিমতো হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন। তার ভাষায়- বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা মুসলিমদের মন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সুতীব্র ঘৃণায় ভরপুর। এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা এবং সেটার সুরাহা করার আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। প্যারিস হামলার জন্য তিনি সকল মুসলিমকে দায়ী করতে চান এবং যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাস ঠেকাতে তার ভাষায়- প্রধানত মুসলিমদের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং মুসলিমদের তিনি রীতিমতো তৎকালীন জার্মান নাৎসি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেঁটে দেয়া শরণার্থীদের নির্দিষ্ট কোটাকে ¯্রফে পাগলামি বলে আখ্যায়িত করেছেন। কাজাখ প্রেসিডেন্ট সরাসরি বিরোধিতা না করলেও প্যারিস হামলার পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক এক জরিপে কাজাখের ৯৪ ভাগ মানুষই শরণার্থী ইস্যুতে নেতিবাচক মত দিয়েছেন। স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রি রবার্ট ফিকো বলেন- ইউরোপে আগত শরণার্থীরা স্লোভাকিয়ায় থাকার জন্য আসছে না। এখানে তাদের ধর্মীয় কিংবা আত্মীয়তারও কোনো সূত্র নেই। তাদের বরং উচিত অন্য কোথাও চলে যাওয়া। ডেনমার্ক সরকার শরণার্থী বিরোধিতায় রীতিমতো ট্রেডমার্ক হয়ে ওঠেছে। শরণার্থীদের ডেনমার্কে প্রবেশে অনুৎসাহিত করতে তারা বিভিন্ন লেবানিজ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন পর্যন্ত দিয়েছে। বিজ্ঞাপন বাবদ এখন পর্যন্ত খরচ দাঁড়িয়েছে ৩০,০০০ হাজার ইউরো বা প্রায় ২৬ লাখ টাকা।

পশ্চিমের দেশ হিসেবে এখনো পর্যন্ত জার্মাানই শরণার্থী ইস্যুতে সবচেয়ে ইতিবাচক মত ব্যক্ত করেছে। প্যারিস হামলার সাথে শরণার্থী ইস্যুকে গুলিয়ে না ফেলতে ইউরোপের অন্যান্য দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর এ্যাঙ্গেলা মার্কেল। জার্মানির প্রেসিডেন্ট ইওয়াখিম গাউক প্যারিস হামলার এক দিনের মাথায় ঘোষণা করেন- তার দেশ শরণার্থী ইস্যুতে পূর্বের অবস্থান থেকে সরে আসবে না। জার্মান প্রেসিডেন্ট বলেন- মুক্তমন নিয়ে শরণার্থীদের গ্রহণ করার অর্থই হলো মানবতা। তাই জার্মানির মানুষকে শরণার্থীদের প্রতি সমবেদনার মনোভাব রাখার আহ্বান জানিয়েছেন গাউক। বলেছেন প্রয়োজনে শরণার্থীদের সাহায্য করার কথাও। ‘এমনটা করলে অন্যের দুঃখ লাঘব করে শান্তি বজায় রাখার মাধ্যমে সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তোলা যায়। সেজন্য যার যতটুকু সামর্থ্য, তা করা উচিত’। বহু জার্মানকে তিনি সেটা করতে দেখেছেন বলেও জানান গাউক। চারপাশের বিশ্ব দেখে ‘ভয় না পেতে’ জার্মানদের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন- বরং অন্যের চাহিদা অনুভব করে সেটা পূরণে সমাজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। হাঙ্গেরিসহ বেশ কিছু দেশ এবং অনেক ইউরোপীয় নেতা জার্মানির এই অবস্থানের নিন্দা করেছেন।

শরণার্থী বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলো দ্বিধাবিভক্ত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন লাখো শরণার্থী। তারা এখন কোনো দেশে ঢুকতে পারছেন না, কোনো দিক থেকে সহায়তা বা আশ্বাসও পাচ্ছেন না। ফলে- শিশু-বৃদ্ধদের নিয়ে রীতিমতো মানবেতর জীবন যাপনে তারা বাধ্য হচ্ছেন। অনেককেই আজকাল আশ্রয়-খাদ্য নতুবা গুলি করে মেরে ফেলার নির্মম আকুতিও প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। এদিকে, সিরিয়ায় বিভিন্ন দেশের হামলা তীব্রতর হওয়ায় হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পশ্চিমের পথে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সীমান্তে ক্রমশই দীর্ঘ হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরছাড়া অসহায় মানুষদের মিছিল।

প্যারিস হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন মোড়

প্যারিসে জঙ্গি হামলায় ১৩২ জন নিহতের ঘটনায় আটলান্টিকের ওপারের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে মনোনয়নপ্রত্যাশী ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানের প্রার্থীরা প্যারিস হামলার পর নতুন করে কর্মকৌশল ঠিক করছেন। সন্ত্রাসবাদ দমন, রাষ্ট্রীয় ও জনগণের নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শরণার্থী গ্রহণের মতো বিষয়গুলোর পাশাপাশি জঙ্গিবাদ দমনে কী করবেন, তা ঘটা করে প্রচারে ব্যস্ত প্রার্থীরা।

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আগামী বছর ১০ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্যারিস হামলার পর মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ জানিয়ে দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ওবামা ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারির শরণার্থী গ্রহণের চিন্তা নিছক কাল্পনিক। তার ভাষায়- আর যদি শরণার্থীদের আশ্রয় দিতেই হয়, তবে কেবল খৃষ্টান শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া যেতে পারে।

প্যারিস হামলার পরদিনের বিতর্কে তোপের মুখে পড়েছেন হিলারি ক্লিনটন। দলের অন্য প্রার্থী বার্নি সেন্ডারস অভিযোগ করেন- তৎকালীন সিনেটর হিসেবে হিলারি ইরাক যুদ্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ইরাক যুদ্ধের পরিণতিতেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নতুন জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান হয়েছে। জবাবে হিলারি বলেছেন- জঙ্গি উত্থান রোধে যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। এমন অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। তাদের ঠেকাতেই হবে।
ওদিকে রিপাবলিকান দলের আলোচিত প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস হামলার পর আগেভাগেই বলে রেখেছেন- সিরিয়া থেকে প্রেসিডেন্ট ওবামা যেসব শরণার্থী গ্রহণ করবেন, নির্বাচিত হলে তিনি তাদের সোজা সিরিয়ায় ফেরত পাঠাবেন।
রিপাবলিকান দলের অপর প্রার্থী জেব বুশ বলেছেন- ‘আমাদের সময় এ যুদ্ধকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। এ জঙ্গিগোষ্ঠীকে পরাজিত করার জন্য সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে।’

এদিকে, আইএসের উত্থান রোধ ও জঙ্গিবাদ দমনের কৌশল নিয়ে পরিষ্কার কোনো পরিকল্পনা নেই- এমন অভিযোগ করে হোয়াইট হাউসের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ স্মিডথ বলেছেন- প্রশাসনে বা রাজনৈতিক বিতর্কে মঞ্চে এমন একজন লোকও নেই, যিনি বলতে পারবেন- এখন কী করা উচিত। তিনি বলেন- রিপাবলিকানরা আইএস দমনে প্রশাসনের কোনো সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল নেই বলে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে দায়ী করছেন। কিন্তু রিপাবলিকান দলের কাছেও এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা বা কৌশল নেই।

প্যারিসে আবার হামলা কেনো? -ডেইলি টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণ

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে হামলায় ১৩২ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো ২০০, যার মধ্যে ৮০ জনের অবস্থা গুরুতর। তবে এই হামলা ফরাসি কর্তৃপক্ষের কাছে একেবারেই ‘অপ্রত্যাশিত’ ছিলো না। যে কোনো সময় জঙ্গি হামলা হতে পারে- এমন আশঙ্কা তাদের মধ্যে আগে থেকেই ছিলো।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ফ্রান্সে বারবার হামলার কারণ নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন করেছে। পত্রিকাটির মতে- বর্তমানে প্রতিটি পশ্চিমা দেশের রাজধানীতেই জঙ্গি হামলার আশঙ্কা আছে। তবে প্যারিসের মতো শহরে হামলার আশঙ্কা বেশি। কেনো? সহজ উত্তরটি হলো- বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন স্থানে জঙ্গিদের সঙ্গে লড়ছে ফরাসি সেনা। তবে, ইউরোপের মধ্যে সর্বাধিক মুসলমানের বাস এই ফ্রান্সেই। এখানে সমাজও বিভিন্নভাবে বিভক্ত। এ ছাড়া আরো অনেক কারণ আছে, যে জন্য জঙ্গিদের হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ফ্রান্স। এ কারণেই শার্লি এবদোতে হামলার পর ফ্রান্সের প্যারিসে আবারো এমন হামলার ঘটনা ঘটলো। প্যারিসে হামলার শিকার এক ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমকে বলেন- একজন হামলাকারী চিৎকার করে বলছিলো, ‘এটি সিরিয়ার জন্য।’ টেলিগ্রাফের মতে- ওই হামলাকারী সিরিয়ার বদলে মালি, লিবিয়া, ইরাকও বলতে পারত।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ১০ হাজার ফরাসি সেনা মোতায়েন আছে। এর মধ্যে তিন হাজার পশ্চিম আফ্রিকায়, দুই হাজার মধ্য আফ্রিকায়, সাড়ে তিন হাজার ইরাকে। মালিতে আল-কায়েদার শাখা আল-কায়েদা ইন দি ইসলামিক মাগরেবের সঙ্গেও লড়ছে ফরাসি সেনারা। এ ছাড়া ইরাকেও আছে ফরাসি সেনা। আর গত সপ্তাহে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ উপসাগরে বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে লড়তেই এই উদ্যোগ নিয়েছে ফ্রান্স।

তবে দেশের ভেতরকার কোনো কারণেও প্যারিসে হামলা হতে পারে। ফ্রান্সের মুসলমানদের আদর্শ হিসেবে কয়েকজন মুসলিম ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদকে প্রতিবেদনে দেখানো হয়। তবে দেশটিতে অধিকাংশ মুসলমানই নিজেদের স্বতন্ত্র হিসেবেই দেখেন। দেশটিতে বোরকা নিষিদ্ধ করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

পত্রিকাটির মতে- ফ্রান্সের কারাগার তরুণদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করার একটি উপযোগী স্থান। এর আগে কয়েকটি হামলায় অংশ নেওয়া অনেকেরই সন্ত্রাসবাদে দীক্ষার শুরুটা হয় ফ্রান্সের কারাগারে। একটি সূত্রের বরাত দিয়ে টেলিগ্রাফ জানায়- দেশটির কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের ৭০ শতাংশই মুসলমান। তবে সংখ্যাটি অবশ্যই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয় কারণ, ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে ফ্রান্স কোনো ব্যক্তির ধর্ম সম্পর্কে তথ্য রাখে না। যুক্তরাজ্যের কারাগারের মুসলিম বন্দির সংখ্যা মাত্র ১৪ শতাংশ, যেখানে দেশটির মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ মুসলমান। শার্লি এবদোতে হামলার পরপরই টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে ফ্রান্সের কারাগারে চরমপন্থী মতবাদ ছড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরে। তবে প্রায় এক বছর কেটে গেলেও এই ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ফ্রান্স।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী- ফ্রান্সে হামলার জন্য জঙ্গিদের অস্ত্র জোগাড়ের কাজটিও সহজ। দেশটির সঙ্গেই বেলজিয়ামের সীমান্ত। বেলজিয়াম দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সমস্যায় আছে। এ ছাড়া যে-কোনো বলকান রাষ্ট্র থেকেও ফ্রান্সে সহজে অস্ত্র পাচার করা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বলকান রাষ্ট্রগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণ মুসলিম উপস্থিতি বিদ্যমান। সব দক্ষিণপন্থী নেতা ও গোষ্ঠী, ফ্রান্সের লো পেন থেকে শুরু করে হাঙ্গেরির ওর্বান অথবা জার্মানির পেগিডা আন্দোলন, সকলেরই বক্তব্য এক- উদ্বাস্তুদের ¯্রােতে মিশে ইউরোপে আসছে সন্ত্রাসীরা। জাতিসংঘ অবশ্য এই ধারণার বিরোধিতা করেছে।

ফ্রান্সের দক্ষিণপন্থী ‘ন্যাশানাল ফ্রন্ট’ দলের নেতা মারিন লো পেন গত সোমবারেই দাবি তোলেন যে, ফ্রান্সে যাবতীয় অভিবাসী গ্রহণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। লো পেন একটি বিবৃতিতে বলেন যে, শুক্রবার প্যারিসের আক্রমণে সংশ্লিষ্ট এক সন্ত্রাসী গতমাসে গ্রিসে এসে পৌঁছায়।
হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রি ভিক্টর ওর্বান ১৬ নভেম্বর সোমবার বুদাপেস্ট সংসদে বলেন যে, উদ্বাস্তু সংকটের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘দুর্বল, অনিশ্চিত ও অক্ষম’ হয়ে পড়েছে৷ তার মতে, ইইউ-এর সদস্যদেশগুলির মধ্যে উদ্বাস্তুদের বেঁটে নেওয়ার পরিকল্পনা বেআইনি ও এর ফলে ‘ইউরোপে সন্ত্রাসবাদ ছড়াবে’৷

প্যারিস হামলা : শুধুই সন্ত্রাস না অন্যকিছুও?

পুরনো খবর ফের পড়া বেশ বিরক্তিকর। জানা বিষয়ের পুনর্পাঠ আমাদের স্বভাব-বিরোধী। সেই ঝুঁকি নিয়েও যথেষ্ট দীর্ঘ করে প্যারিস হামলার ঘটনা এবং পরবর্তী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলো সংক্ষেপে যতœসহকারে এখানে তুলে আনার চেষ্টা করলাম। হামলার পুরো বিবরণ, স্থান-ধরন-হতাহতের সংখ্যা, দোষারোপ-স্বীকারোক্তি, ফ্রান্সসহ সারা বিশ্বের সাধারণ নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর উদ্যোগ, বিশ্বনেতাদের বক্তব্য, ফ্রান্স সরকারের পদক্ষেপ, পাল্টা সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক উস্কানি, বিপরীত অভিযোগের তীর, ইউরোপের ভয়াবহ সাত হামলা, ন্যাশনাল ফ্রন্টের অভাবিত বিজয়, মুসলিম নিধনের পাঁয়তারাসংক্রান্ত রিপোর্ট এবং সবশেষে গার্ডিয়ানের বিশেষ একটি বিশ্লেষণও তুলে ধরা হয়েছে। হামলা পরবর্তী বিশ্বমিডিয়ার প্রায় পুরো রিপোর্টিংয়ের সারসংক্ষেপ এখানে চলে এসেছে বলেই মনে করছি আমি। এবার আসুন একটু ব্যবচ্ছেদে যাই। ফ্রান্সে যা ঘটলো- যে কারণে ঘটলো আর মিডিয়া যেভাবে আমাদেরকে সেগুলো দেখাতে ও বিশ্বাস করাতে চাইলো- সব কি সত্যি এমনই? হামলার ভয়াবহতা আর শোকের তীব্রতায় বিপরীত বক্তব্য নেয়ার বা সেটা বিবেচনার সুযোগ মিডিয়া হয়তো পায় নি, তাই বলে কি বিপরীত কিছু সত্যিই নেই? তৃতীয় বিশ্বের ছোট্ট এই দেশের অখ্যাত এক প্রান্তে বসে আমার-আপনার এসব বিশ্লেষণ সমস্যার কোনো সমাধান করবে না জানি- তবুও সত্যটা জানা প্রয়োজন। পর্দার আড়ালের বাস্তবতাটাও একবার যাচাই করা দরকার। এ যুগের মিডিয়ার দেয়া তথ্য ফিল্টারিং ছাড়া গ্রহণ করে নিলে আখেরে অনেক বিপদ, অন্যসব ভাবনা বা কারণ-বর্ণনাকে পাশ কাটিয়ে অন্তত এই কারণে হলেও একটা উপসংহারে তো আমাদের পৌঁছতেই হবে।

আমরা এখন কোন পৃথিবীতে বাস করছি?

১৩-২০ নভেম্বর ২০১৫, এই একটা সপ্তাহে বিশ্ববাসী সাম্প্রতিক কালের ভয়াবহতম ক’টি সন্ত্রাসী হামলার রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করলো। ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় লেবাননের বৈরুতে পৃথক দুটো বোমা হামলায় কমপক্ষে ৪৩ জন নিহত এবং বহু মানুষ জখম হলেন। ২৭ ঘণ্টার ব্যবধানে পরদিন ফ্রান্সের প্যারিসে ছ’টি স্থানে একই সময়ের হামলায় নিহত হলেন অন্তত ১৩২ ইউরোপীয়। তিন দিনের ব্যবধানে ফের দুঃসংবাদ এলো। ক্ষেত্র এবার নাইজেরিয়া। এখানেও পৃথক দুটো হামলায় ৪৪ জন মানুষ নৃশংসতার শিকার হয়ে জীবন হারালেন। দু’দিন পর আবার- এবার মালীতে নিহত হলেন আরো ৩০ জন। এদিকে ফিলিস্তিনেও এই ক’দিনের লাগাতার ইহুদি বর্বরতায় নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছেন শিশু-কিশোরীসহ দুই ডজনের মতো নিরীহ ফিলিস্তিনী। বিশ্বজুড়ে বিক্ষিপ্ত অন্যান্য ছোটখাঁ হামলা বা সাধারণ দুর্ঘটনা তো ছিলোই। মাত্র এক সপ্তাহে প্রায় তিনশ’ মানুষ অস্বাভাবিক মৃত্যুর মুখে পড়লেন, পঙ্গুত্ব বরণ করলেন অসংখ্য নারী-পুরুষ। প্রিয়জন হারানো মানুষগুলোর কষ্ট আর অসহায়ত্ব তো কোনো এ্যাঙ্গেল থেকেই হিসেবে আনা সম্ভব নয়। বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়- আমরা এখন কোন পৃথিবীতে বাস করছি?

অসহায় মৃত্যু বনাম সা¤্রাজ্যবাদী রাজনীতি

প্রতিটি মৃত্যুই কষ্টের। সেই মৃত্যুকে যদি অস্বাভাবিক বা নৃশংস শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হয়, কষ্টের মাত্রাটা এমনিতেই বেড়ে যায়। কতোটা বাড়ে?…সেটা পরিমাপ করার ক্ষমতা মানুষ আমাদের নেই। কিন্তু মৃত্যুর মতো বেদনাময় এবং আপাতনিরীহ এই ব্যাপারটার সাথেই আপনি যখন আঞ্চলিক রাজনীতি, ধর্মের লেবাস কিংবা গোষ্ঠীগত কৌলিন্যের বয়ান জুড়ে দিতে চাইবেন, কষ্ট ছাপিয়ে মনে তখন নানারকম প্রশ্ন জাগবে। প্যারিসের ঘটনা এবং পরবর্তী তৎপরতা আমাদের সে কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহের মিডিয়া কভারেজ হিসেব করেই বলা হচ্ছে- ৯/১১ ’র টুইন টাওয়ার হামলার পর প্যারিস হামলার ঘটনাই বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। কেউ কেউ তো বলছেন- প্যারিস হামলাই ফ্রান্সের ৯/১১!

এই আলোচনা আর সব বিষয় ছাড়াও বৈরুতের ৪৪ জন, নাইজেরিয়ার ৪৩ জন, মালীর ৩০ জন এবং প্রতিদিন নির্মম পরিণতির অসহায় শিকার হতে থাকা ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর খবর প্রায় মাটিচাপা দিয়ে দিয়েছে। সপ্তাহ পেরিয়েও বিশ্ব মিডিয়ার এমন দাপুটে কভারেজ ধরে বা ধরিয়ে রাখার বিষয়টিই বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। জীবন তো জীবনই, সব মানুষই সমান। সব মৃত্যুতে তাই একইরকম প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা। প্যারিসের জন্য আপনার মন ব্যথিত হলে মালী-নাইজেরিয়ার জন্য কেনো নয়? ইউরোপবাসীর মৃত্যুতে আপনার চোখে পানি এলে বৈরুত-ফিলিস্তিনের জন্য কেনো নয়? সিরিয়া, ইরাক, আফগান বা মিয়ানমারের কথা আর নাইবা ওঠালাম। প্যারিসের জন্য তো আমরাও কেঁদেছি। কিন্তু চোখের পানি শুকাবার আগেই দায়টা যখন আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হলো, ক’জন ব্যক্তির দায়ে খোদ ইসলামকেই যখন কাঠগড়ায় ওঠাবার পাঁয়তারা শুরু হলো- কষ্ট ছাপিয়ে আমাদের মনেও তখন প্রশ্ন জাগলো।

কেনো এই হামলা? কারা এই হামলা করলো? কঠোর নজরদারির আওতায় থাকা প্যারিসের ছ’টি নিরাপদতম স্থানে একই সময়ে এমন হামলা চালানো কীভাবে সম্ভব? শার্লি এবদোয় হামলার বছর না ঘুরতেই আবারও কেনো ফ্রান্সই আক্রান্ত হলো? এই হামলার পর সিরিয়ার নিরীহ শরণার্থী শিবির কেনো আক্রান্ত হলো? শোক আর সন্ত্রাসবাদের প্রশ্ন এড়িয়ে হঠাৎ কেনো শরণার্থী গ্রহণের প্রশ্নে অস্বীকৃতি এলো? ইসলাম পশ্চিমের জন্য হুমকি- প্রায় মরে যাওয়া এই প্রশ্ন আবার কেনো সামনে নিয়ে আসার অপচেষ্টা শুরু হয়ে গেলো?…

হ্যাঁ, আপনার ভাবনার সাথে এই প্রশ্নগুলোও যুক্ত করুন, হিসেব মিলতে শুরু করবে। আইএস বা জঙ্গিগোষ্ঠীর শক্তি-সামর্থ্য, নিরপরাধ মুসলিম হত্যার প্রতিশোধ কিংবা আল্লাহর সঠিক বিচারের ব্যাখ্যা দূর কি বাত, এক্ষেত্রে বরং সব সত্যের উপরের সত্য হলো- মোসাদ বা পশ্চিমের বিশেষ কোনো দেশ-সংস্থার অজ্ঞাতে কিংবা অসহযোগিতায় ইউরোপ-আমেরিকায় এমনতর হামলা চালানোর ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো জঙ্গি বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেই। শান্তি আর স্থিতিশীলতা নিয়ে যতো বাণীই আমরা ছড়াই না কেনো, আজকের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধই পৃথিবীর অনিবার্য বাস্তবতা। বড় শক্তিগুলো নিজেদের প্রয়োজনে কোথাও নিজেরা আর কোথাও স্থানীয় চাটুকার দিয়ে যুদ্ধ বাধিয়ে রাখে। রাখবেই, নইলে তাদের টিকে থাকা সম্ভব নয়। সিরিয়া, ইরাক, আফগানে নিজেদের প্রয়োজনে ওরা যেভাবে নৃশংসতা চালায়, এই ক্ষোভ কাজে লাগিয়েই আইএস বা আলকায়েদার কোনো নিবেদিত প্রাণ কর্মীকে তুলে নিয়ে গিয়ে আবার নতুন হামলার প্রেক্ষাপট তৈরি করে। প্যারিসের হামলার বেলায়ও এ আশংকাকে আপনি ছুড়ে ফেলতে পারবেন না। আশি-নব্বইয়ের তথাকথিত ‘কোল্ড ওয়ার’ বা শীতল যুদ্ধ শেষ হবার পর থেকে গত দুই দশক ধরে এ-ই তো চলে আসছে।

এখানে আইএস বা ইসলামের নামে অন্যান্য সন্ত্রাসী গ্রুপের কাজকে সমর্থন বা তাদের নির্দোষ প্রমাণ করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকায় এমন ভয়াবহ হামলা চালাবার মতো শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে ওদের মেনে নিতেও আমরা রাজি নই। যদি তা সত্যও হয়- এর দায় কেনো ইসলাম বা মুসলিম উম্মাহর ওপর আসবে? দিনশেষে কার-কেমন লাভ- এসব হামলা বিচারের প্রধানতম প্রতিপাদ্য এটিই। আরব বসন্ত থেকে নিয়ে বর্তমান সিরিয়া পর্যন্ত যা হয়েছে তাতে যে পশ্চিমাদেরই বড় হাত ছিলো, সচেতন মানুষমাত্রই জানতেন। রাশিয়া এই ক’দিন আগে সিরিয়ায় হামলা শুরু করলে বিষয়টি প্রথমবারের মতো ব্যাপক আলোচনায় আসে। ক্ষমতায় আরোহণের প্রায় এক দশক পর এই প্রথম জাতিসংঘের সাধারণ সভায় উপস্থিত হয়ে ভøাদিমির পুতিন ‘সব ফাঁস’ করার হুমকি দিলে আমজনতার মনেও সেটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। এরপর দু’ সপ্তাহ পশ্চিমের মুখে কোনো ‘রাও’ ছিলো না। আশংকাময় অপেক্ষাটা তখন থেকেই ছিলো- প্রতি বা পাল্টা আক্রমণ ঠিক কোন দিক থেকে আসে। কীভাবে আসে। দ্রুতই পাল্টা আক্রমণটা এলো, ভয়াবহভাবেই এলো।

মুখ লুকোতে প্রথমদিকে রাশিয়ার সুরে তাল মেলালেও নিজেদের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্যারিস হামলার ঘটনা পশ্চিমের জন্য মহা সুযোগ নিয়ে হাজির হলো। মহাসমারোহে এখন আবার সিরিয়ায় হামলা চালানো যাবে। ফ্রান্স ইতোমধ্যে শুরুও করে দিয়েছে। আইএস ধ্বংসে তড়িঘড়ি করে জাতিসংঘে বিশেষ প্রস্তাব পাস করানো হলো। শরণার্থীদের যে ¯্রােত পশ্চিমমুখী হয়েছিলো সেটা বন্ধ করারও অপচেষ্টা চলছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যেই নতুন তো নয়ই, আগের ভাগ হওয়া কোটা পরিমাণ শরণার্থী গ্রহণেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও আইএস এবং অভিবাসন বিরোধী বিশেষ বিল পাস হয়েছে। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার নামে পুরো ইউরোপে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ফ্রান্সে চলছে নজিরবিহীন বিশেষ অভিযান। সন্দেহ নেই- শার্লি এবদোর ধকল কাটিয়ে না উঠতেই অনির্দিষ্ট কালের জন্য আরো ভয়াবহ অনিরাপদ জীবনযাত্রার মুখোমুখি করে দেয়া হলো পশ্চিমের লাখো মুসলিমকে। বঞ্চনার অভিযোগ এড়িয়ে বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে এভাবে কোণঠাসা করে রাখার চেয়ে বড় সুখবর পশ্চিমাদের জন্য আর কী হতে পারে? একবার ভাবুন তো- দিনশেষে কার লাভের পাল্লাটা ভারি হতে যাচ্ছে?

পুতিন এবং নতুন রাশিয়া

ভøাদিমির পুতিন। রাষ্ট্রের প্রশ্ন ছাপিয়েও এই মুহূর্তে তিনিই বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট সাবেক এই কেজিবি অফিসারকে ঘিরে রহস্যের শেষ নেই। মানুষ হিসেবে তিনি পর্দার অন্তরালের বা নীরব প্রকৃতির হলেও দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাশিয়াকে বিশ্বমঞ্চের সেরা আসনটি ফিরিয়ে দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। প্রথম টার্মে ভেতরে ভেতরে কাজ চালালেও দ্বিতীয়বার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ধারা পরিবর্তন করেন। সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই নতুন রাশিয়া এখন প্রকাশ্য ভূমিকা পালন করছে। বিগত ক’বছরে আমেরিকা-ইউরোপের সম্মিলিত পশ্চিমা জোটের একচেটিয়া নাক গলানোকে রাশিয়া কেবল প্রশ্নবিদ্ধই করেনি, প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। রাশিয়ার বিবেচনা এমনকি পরামর্শ ছাড়া পশ্চিমা বিশ্ব আজকাল কোথাও নতুন করে পা ফেলছে না বা সাহস করছে না, যার সর্বশেষ নজির আইএস এবং সিরিয়া। বছর দুয়েক আগে প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করে এবং নিরাপত্তা বাড়ানোর অজুহাতে সীমান্তে সেনা সমাবেশের ব্যবস্থা করে পুতিনের উদ্ধত রাশিয়াকে পশ্চিমা জোট যখন প্রায় ঘিরে ধরতে চাইলো, পুতিন অদৃশ্য সে বৃত্তকে শুধু ভাঙলেনই না- রাশিয়ার সীমান্ত লাগোয়া ইউক্রেনের পূর্বাংশ ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার মানচিত্রে ঢুকিয়ে নিয়ে রুশ ভল্লুকের হুমকি ছুড়লেন। এরপর অবরোধ, বয়কটসহ আরো বহু কাহিনী সামনে এনে পশ্চিম বরাবরই চেষ্টা চালিয়ে গেছে পুতিনের নতুন রাশিয়ার রাশ টেনে ধরতে।

মিডিয়ার গলায় ঝুলে রাশিয়াকে কোণঠাসা করে রাখায় নিজেদের সফল প্রমাণের লাগাতার প্রচেষ্টা পশ্চিম চালিয়ে গেলেও, পত সেপ্টেম্বরে পুতিন চূড়ান্ত আঘাতটা হানলেন। মিত্র হিসেবে ইরান এবং বাশার আল আসাদের আহ্বানে সিরিয়ায় আইএস বিরোধী হামলা শুরুর পাশাপাশি সিরিয়ার আকাশকেও নো ফ্লাই জোন ঘোষণা করলেন। ইউক্রেনের পর দ্বিতীয়বার সিরিয়ায় নাক কাটা পড়লো পশ্চিমের। এই একটা পদক্ষেপে পশ্চিমা গোষ্ঠীর সব জারিজুরি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। তাবৎ পশ্চিম মিলে সবরকম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই ক’বছরে যে রাশিয়ার কিছুই করতে পারে নি, এটা প্রমাণে এরচে’ বড় সুযোগ সে মুহূর্তে আর হতে পারতো না। বিশ্ববাসীর সামনে ঝুলে থাকা কোণঠাসা হালতের মিথ্যে পর্দা সরানো, পশ্চিমা শক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের সামর্থ্য প্রমাণ, পরমাণু চুক্তির অস্বস্তিকর হালত থেকে সদ্যমুক্ত ইরানকে গুরুত্ব দিয়ে পুরনো জোটের রূপরেখা পরিবেশন এবং আইএস দিয়ে আরব বিশ্বে পশ্চিমের একক খেলা বন্ধের মতো বহু লক্ষ্য এই একটা তীর দিয়েই তিনি ভেদ করলেন। ফলে আমেরিকা-ইউরোপ-তুর্কি এবং সৌদি জোটের মধ্যপ্রাচ্য ভাগাভাগির ধারাতেই কেবল ছেদ পড়েনি, রাশিয়া-ইরান-সিরিয়া এবং চীনের মৈত্রি জোটের সাথে চলমান প্রক্সি ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধটাও সরাসরি হয়ে ওঠেছে।

বিশ্ববাসীর বিশেষত মুসলিম উম্মাহর এখন শত্রু-মিত্র যাচাই করতেও সুবিধে হবে। সময়টাই এখন এমন যে সব হিসেব মিলিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব নয়। ভালো-মন্দের সাথে মন্দের ভালোটাও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে ভাবনায় রাখতে হয়। এখানে রাষ্ট্র সৌদি-তুরস্ক বা ইরান-সিরিয়ার চেয়ে সামগ্রিক মুসলিম উম্মাহর স্বার্থটাই বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবিদার। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যে কোনো হিসেবে যেতে হলে দখলদার ইসরাইল এবং বায়তুল মুকাদ্দাস ও মজলুম ফিলিস্তিনিদের কথাও আমাদের বিবেচনায় রাখা দরকার। চোখ বন্ধ করে কোনো একপক্ষকে মেনে নেওয়ার সুযোগ যেমন নেই, গোয়ার্তুমি করে উপযুক্ত মিত্র হারাবার ঝুঁকিও নেওয়া যাবে না।

রাশিয়ার হামলা এবং অন্যান্য বাস্তবতা

সিরিয়ায় রাশিয়ার এ হামলা এবং অন্যান্য বাস্তবতা নিয়ে সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফের এই বিশ্লেষণটি দেখা যেতে পারে। ‘সিরিয়ায় রাশিয়ার উদ্দেশ্য কেবল বাশার আল-আসাদকে বাঁচানো না। আইএসকে দিয়ে বৈরী সরকার ও স্বাধীন সীমান্ত ধ্বংস করে পশ্চিমারা যে নতুন মধ্যপ্রাচ্য বানাতে চায়, তাতে রাশিয়া, চীন ও ইরানের ঘোরতর বিপদ। বিশ্বের তেলভান্ডার পশ্চিমা তেলকুবের কোম্পানিদের হাতে চলে গেলে রুশ অর্থনীতি ও চীনের উত্থান থামানো যেতে পারে। একদিকে ন্যাটো দিয়ে ঘেরাও হওয়া অবস্থা, অন্যদিকে রুশবিরোধী নতুন মধ্যপ্রাচ্য রাশিয়াকে থমকে দেবে। তাই ইউক্রেনের পর দ্বিতীয়বারের পশ্চিমাদের নাক কাটতেই হলো তাদের।

তুরস্ক চায় রাষ্ট্রহীন উত্তর সিরিয়াকে নয়া তুর্কি সালতানাতের অংশ করতে। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে ভেবে লাখো সিরীয় উদ্বাস্তু আশ্রয় দিয়ে রেখেছে তারা। পাশাপাশি দক্ষিণ তুরস্কে মার্কিন ঘাঁটি আরও বড় হয়েছে, ন্যাটোর মদদ তো আছেই। এমন সময়ে এরদোগানের বাড়া ভাতে ছাই দিলো রুশ বোমারু বিমান। পরপর তিনবার তুর্কি আকাশসীমা লঙ্ঘন করে বুঝিয়ে দিলো, সিরিয়ার দিকে নজর দিলে খবর আছে। যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে হবে তুরস্ককে। সিরিয়ার ওপর মার্কিন-তুর্কি নেতৃত্বে নো ফ্লাই জোন করার চিন্তাও বরবাদ। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে তুরস্কের কুর্দি ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সিরীয় শাখা। ইতিমধ্যে তারা সিরিয়ার ভেতরে মুক্তাঞ্চল গড়ে নিয়েছে। তুরস্কে অভিযান হলে এখন তারা সিরিয়া থেকে লড়তে পারবে।

মুখ পুড়ল ইসরায়েলেরও। সিরিয়ার পূর্ণ পতনের পরে লেবাননের প্রতিরোধ গুঁড়ানোর ইচ্ছা ছিলো তাদের। আইএস নামক ফেউকে সামনে রেখে বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যেতে চাইছিলো তারা। আর সৌদিরা তো ইয়েমেনকে তছনছ করে ইরানের ডানা ছাঁটছিলোই। মোদ্দাকথা, মধ্যপ্রাচ্যকে ভাগ-বাঁটোয়ারা করার পরিস্থিতি তৈরিই ছিলো ইসলামিক স্টেট বা আইএস লেলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য। আসল যুদ্ধে নামার আগে পুতিনকে তাই যুক্তির যুদ্ধেও নামতে হলো। বিশ্বদরবারে তিনি বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রায়ই আইসিসের হুমকির কথা বলেন। ভালো, কিন্তু কে তাদের সশস্ত্র করলো? কে এই বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করলো? কে ওই এলাকায় অস্ত্র জোগালো? সিরিয়ায় কারা যুদ্ধ করছে, তা আপনারা সত্যিই জানেন না? তাদের বেশির ভাগই ভাড়াটে যোদ্ধা। টাকার বিনিময়ে তারা লড়ে। যে বেশি দেবে, তারা তাদের হয়েই কাজ করবে। আমরা জানি- কত টাকা তাদের দেওয়া হয়েছে…যুক্তরাষ্ট্র বলে, ‘সিরিয়ার গণতান্ত্রিক সভ্য বিরোধী পক্ষকে আমাদের সাহায্য করা উচিত।’ আর তারা সাহায্য করলো, অস্ত্র দিলো এবং যোগ দিল আইসিসে। এর থেকে এক ধাপ এগিয়ে ভাবা কি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অসম্ভব? আমরা এ ধরনের কার্যকলাপ সমর্থন করি না। আমরা মনে করি, এগুলো ভুল।’
ইতিহাস এ মুহূর্তে পুতিনের পক্ষে। একদিকে মার্কিন-ইসরায়েলি-সৌদি-তুর্কি জোট, অন্যদিকে রাশিয়া-চীন-ইরান-সিরিয়া-হিজবুল্লাাহ জোট। ইরান ও হিজবুল্লাহর যোদ্ধারাও যোগ দিয়েছে আসাদের সেনাদের সঙ্গে। আসাদ বটেই দুঃশাসক, কিন্তু আসাদহীন সিরিয়ার অবস্থা হবে লিবিয়ার মতো, সেটা কারও চাওয়া হতে পারে? গাদ্দাফি হুঁশিয়ারি করেছিলেন- তাঁকে হত্যা করা হলে লিবিয়া দোজখ হবে। হয়েছেও তাই।

ক্লিনটন ও বুশ মধ্যপ্রাচ্যে ‘সভ্যতার যুদ্ধ’ আর পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলে ‘গণতন্ত্রের যুদ্ধ’ উসকে দিয়েছিলেন। ফলাফল যুদ্ধ ও জাতিগত গণহত্যায় লাখো প্রাণের অপচয়। এই দায় পশ্চিমারা এড়াতে পারে না। ইউক্রেনে এলিট বিপ্লব ঘটিয়ে রাশিয়াকে অপদস্থ করতে গেলে পুতিন রুশ ভালুকের থাবা চালালেন। ইউক্রেন থেকে কেটে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অঙ্গীভূত করলেন। সিরিয়ায়ও তারা দেখালো, তারা যা করে- ভেবেচিন্তে করে।
নতুন মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে দেখে সাবেক মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা জবিগনিউ ব্রেজেনিস্কি সামাল সামাল আওয়াজ তুলছেন। বৈশ্বিক মার্কিন আধিপত্য কায়েমে ইসলামি মৌলবাদীদের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহারের বুদ্ধিটা তাঁরই। এ জন্য তাঁকে বলা হয় জঙ্গিবাদের গডফাদার। পলিটিকো ম্যাগাজিনে তিনি লিখেছেন যে সিরিয়ায় মার্কিন ‘অ্যাসেটে’ রুশ হামলা চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র যেনো রাশিয়াকে প্রতিশোধের হুমকি দেয়। গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা পরিভাষায় ‘অ্যাসেট’ বলা হয় অন্য দেশে সক্রিয় এজেন্টদের। এ এক দারুণ লুকোচুরি খেলা।’…

এই লেখকের রাশিয়াপ্রীতি সুবিদিত, সে প্রসঙ্গ এড়িয়েও বেশ কিছু সত্য উদ্ধৃত অংশ থেকে আমরা পেতে পারি। সৌদি-তুরস্ক বা ইরান এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকলেও কেউ যে তারা নাটের গুরু নয় সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। শংকার ব্যাপারও সেটাই। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর নাম ব্যবহার করে, ক্ষেত্রবিশেষ সহযোগিতা নিয়ে আরেকটা মুসলিম রাষ্ট্র ধ্বংস করা হচ্ছে, ভালো ফল কী করে আশা করা যেতে পারে। এই ষড়যন্ত্র ঠেকাতে না পারলেও অন্তত এড়ানোর সাহস ও সক্ষমতা অর্জন না করলে আজকের মধ্যপ্রাচ্য যে আরেকটা কামালীয় তুরস্কের পথে এগুবে না- সেরকম নিশ্চয়তা কে দিতে পারে?

প্যারিস হামলায় ইউরোপ-আমেরিকার লাভ-ক্ষতি

সময় বদলেছে। কিছুই আর আগের মতো নেই। সবকিছুর সাথে পাল্লা দিয়ে জটিল রাজনীতিও জটিলতর হয়েছে। রাজনীতির খেলায় আগে প্রতিপক্ষ মরতো, এখন স্বপক্ষের লোকেরাও মরে। সবকিছুতেই এখন সবার কেবল জয় দরকার। কে মরলো, কতোজন মরলো সে হিসেবের কারো সময় নেই। দেশের সীমানায় সে জয়ের নাম ক্ষমতা হলে, আন্তর্জাতিক পরিম-লে অবশ্যই তা আধিপত্য। সিরিয়ায় রাশিয়ার হামলার প্রেক্ষাপটে পশ্চিমের সব পরিকল্পনা যখন মাঠে মারা যেতে বসলো, এতোদিনের সাজানো মঞ্চ, মিথ্যে অভিনয়, মানবতা-গণতন্ত্রের মায়াবি বয়ান সব যখন নিজের জনগণের কাছেই মার খেতে শুরু করলো, প্যারিস হামলা পশ্চিমের জন্য যেনো মহা আশির্বাদ হয়ে এলো।

মাঝের এক-দেড় মাসের স্থবিরতা কাটিয়ে উঠে মহা সমারোহে পশ্চিম আবার সিরিয়া নিয়ে তৎপরতা শুরু করেছে। পুতিনের অভিযোগ, আইএস ঘিরে সৃষ্টি হওয়া কোণঠাসা পরিস্থিতি মোটামুটি মাটিচাপা দেয়া গেছে। অতিরিক্ত সুবিধে হিসেবে পশ্চিমমুখি শরণার্থীদের মিছিল থামানো এবং নির্দ্বিধায় স্থানীয় মুসলিমদের গতিময় অগ্রযাত্রা স্তব্ধ করার প্রয়াসও নেয়া যাচ্ছে। পশ্চিমের মানুষ মানেই এলিট শ্রেণীর সদস্য, সাদা চামড়ার মতো তাদের রক্তের মূল্যও আর সবার চাইতে বেশি- মিডিয়ার গলায় চড়ে প্যারিস হামলা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেয়া এই শোক আর আহাজারির রেশ তো বহুকাল পশ্চিমের এই কৌলিন্যের ঢোল বাজিয়ে যাবেই। আর ক’টার হিসেব দরকার বলুন! লাভের এই বৃহৎ ফিরিস্তির সামনে মাত্র কয়েক ডজন নাগরিক হারানোর ক্ষতিটুকু কী-ই-বা এমন গুরুত্ব রাখে?…

ফ্রান্সই কেনো জঙ্গিদের প্রথম পছন্দ?

হামলার জন্য ফ্রান্সই কেনো বারবার জঙ্গিদের প্রথম পছন্দ? পছন্দ কারণ ফ্রান্স ইউরোপের একমাত্র দেশ যেখানে গিয়ে এক হাজার বছর আগে ইসলামের জয়যাত্রা থেমে গিয়েছিলো। ফ্রান্সই ইউরোপের একমাত্র দেশ- নিরাপত্তা এবং সমাজ কাঠামোয় সবচেয়ে জটিল হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম জনসংখ্যা এবং নওমুসলিম বৃদ্ধির ধারায় অন্য সব দেশ থেকে এগিয়ে। এতোটাই এগিয়ে যে মুসলিমরাই দাবি করছেন- আগামী ৪-৫ দশকের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ফ্রান্স মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ এক হাজার বছরের ব্যবধানে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই আবার এই ফ্রান্স থেকেই ইসলামের জয়যাত্রা শুরু হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সুতরাং মুসলিমদের অপ্রতিরোধ্য গতি থামাতে এমন কিছু ঘটনা-দুর্ঘটনা ফ্রান্সের আজ খুব দরকার। আফসোস শুধু এই- রাজনীতির এসব নোংরা খেলায় আল্লাহর নিরীহ কিছু বান্দাকে সবসময় বলি বানানো হয় এবং আরো অসংখ্য মাসুম বান্দা তাতে বিব্রত অবস্থায় পড়েন। অসচেতন মুসলিমরা অন্যদের ভুলকে নিজেদের ঘাড়ে চাপিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগেন। ইসলামকে ভুল বোঝেন। দূরে সরে যান শাশ্বত দীনের রাজপথ থেকে।

কোন পথে ফ্রান্সের ইসলাম?

বৈষম্য, বঞ্চনা আর নির্যাতনের আলোচনা করতে গিয়ে কেবল হতাশার কথাই বলে যাচ্ছি। আশার আলো কি সত্যিই কোথাও নেই? আছে এবং জোড়ালোভাবেই আছে। আমার বিবেচনায় চলমান শতাব্দীটি নিপীড়নের শিকার হবার মধ্য দিয়েই ইসলামের শক্তি অর্জনের সময়। মানুষ টিপ্পনি কাটছে, আমার পরোয়া নেই। গালি দিচ্ছে, আমার পরোয়া নেই। মারতে আসছে, আমার পরোয়া নেই। নিজের কাজ নিয়ে আমি বিভোর। নিজের পথে একনিষ্ঠ মনে আমি আগুয়ান। মানুষ, পরিবেশ কোনোটাই সেখানে বিবেচ্য নয়, নয় বাধাও। ফ্রান্সের মুসলিমরাও এখন এমন অবস্থার মধ্য দিয়েই যাচ্ছেন। বৈষম্য, প্রতিকূলতা এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ নির্যাতনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও ইসলাম এবং নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে তারা বিন্দুমাত্র নমনীয় নন।

হিজাব পরিহিত একজন নারীকে যখন হিজাব খুলে চলতে হয় কিংবা একজন দাড়িওয়ালা মুসলিমকে প্রতিনিয়ত বক্রদৃষ্টির মুখে পড়তে হয়- এই কষ্ট অন্য কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কিন্তু ফ্রান্সের নারী মুসলিমরা হার না মেনে লড়াই করে যাচ্ছেন। পহেলা ফেব্রুয়ারি বিশ্ব হিজাব দিবস নামে দারুণ এক আন্দোলনও গড়ে উঠেছে। প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ই-কমার্সসহ নানাভাবে তারা নিজেদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের বিকল্প ব্যবস্থা করে নিচ্ছেন। দলে দলে মূলধারার ফ্রেঞ্চ নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করছেন। সবমিলিয়ে উজ্জ্বল এক ভবিষ্যতের পথেই এগিয়ে যাচ্ছে ফ্রান্সের মুসলমান। ফ্রান্সের ইসলাম।

ভবিষ্যদ্বাণী না বিতর্ক উসকে দেয়া?

মিশেল হুয়েলবেক। ফ্রান্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। সম্প্রতি সুমিশন- ইংরেজিতে সাবমিশন নামে একটি উপন্যাস প্রকাশ করেছেন। এই বইয়ে ২০২২ সালে একজন মুসলিম প্রেসিডেন্টের অধীনে তিনি নতুন এক ফ্রান্সের কল্পিত চিত্র এঁকেছেন। বলা বাহুল্য- স্পষ্টভাবে বারবার তিনি অস্বীকার করলেও এই বইয়ের বিরুদ্ধে সাহিত্যের নামে সূক্ষ্মভাবে ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা চালানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। কারণ, বইটিতে তিনি এমন এক ফ্রান্স দেখাতে চেয়েছেন, যেখানে নারীদের চাকরি করার সুযোগ নেই। ফলে পুরুষদের বেকারত্ব কমে গেছে। নারীরা রাস্তাঘাটে হিজাব পরে ঘুরছেন। সন্ত্রাসও কমে গেছে। ইত্যাদি ইত্যাদি। বইয়ের তথ্য যে কোনো দিক থেকেই ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে। আমাদের কথা সেটা নয়। কথা হলো- দেশের সবচে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক কখন, কোন পরিস্থিতিতে ঠিক দশ বছরের মাথায় একজন মুসলিম প্রেসিডেন্টের কল্পনা করতে পারেন? জনপ্রিয়তা-ব্যবসায় কিংবা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছাড়াও অন্য কোনো কারণই কি সেখানে বিবেচ্য হতে পারে না? পারে, তবে যেটা পারে সেটা ফ্রান্সসহ পশ্চিমের কেউ উচ্চারণ করতে চায় না। সাহস পায় না।

পশ্চিমের এই ভ-ামির প্রেক্ষাপটে আমরা কি ধরে নেবো- ফ্রান্স সরকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা এবং নতুনভাবে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকা ফ্রেঞ্চ নাগরিকদের তথ্য নিয়ে যে লুকোচুরি খেলছে তা মিথ্যে? তবে কি ধরে নেবো- সাংবিধানিকভাবে সেক্যুলার রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়েও যেভাবে মুসলিমদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে তাতে খোদ ফ্রান্সের নাগরিকদেরই সায় নেই? তবে কি ধরে নেবো- যে হারে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চাকরি এবং ধর্ম পালনের স্বাধীনতার প্রশ্নে মুসলিমদের বঞ্চিত করা হচ্ছে তাতে অতিষ্ঠ হয়ে বেশিরভাগ ফ্রেঞ্চ নাগরিকই ইসলামের প্রশ্নে এবং মুসলিম ইস্যুতে সরকারের বিরোধী হয়ে ওঠছেন? এসব উপলব্ধির কোনো একটাও যদি সত্য হয় তাহলে মানতেই হবে- ফ্রান্সের বদলে যাওয়ার খুব দেরি নেই। সত্যিকার অর্থেই সেখানে মুসলিম প্রেসিডেন্ট দেখতে পাওয়াটাও খুব অস্বাভাবিক হবে না। স্থানীয় মুসলিম স্কলারগণও বলে ফেলছেন- আশ্চর্য কি, আগামী ৪০ বছরের মধ্যে ফ্রান্স সত্যিই একটি মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে!

নতুন ভোরের পথ চেয়ে…

শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হলেও ফ্রান্সের রাষ্ট্র কাঠামোটা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের আর পাঁচটা দেশের মতো নয়। যথেষ্ট রক্ষণশীল। বলা ভালো গোঁড়া প্রকৃতির। তাই ফ্রান্সের মুসলিমরাও শুরু থেকেই ধর্মীয় পরিচয় ছাপিয়ে রাষ্ট্রের একজন হয় ওঠার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ফ্রান্স কখনো তা মেনে নেয়নি। দশকের পর দশক ধরে তারা শরণার্থী বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবেই মুসলিমদের ট্রিট করে এসেছে। রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের বিশ্বাস করতে না পারে তাহলে তো ভুগতেই হয়। ভবিষ্যতই বলে দেবে কী ভোগান্তি ফ্রান্সের কপালে লেখা আছে। আমরা শুধু বলতে পারি- মানুষ মাত্রেরই কিছু চাহিদা আছে। প্রতিজন নাগরিকই রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান সুযোগ পাবার অধিকার রাখেন। সেক্যুলার আর মানবাধিকার রাষ্ট্রের তকমাধারী ফ্রান্স যদি এসবের পরোয়া না করে তাহলে ভোগান্তির খুব দেরি নেই।

কারণ সব কষ্ট স্বীকার করেই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে ফ্রান্সের মুসলিম সম্প্রদায় নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন। সুতরাং তাদের আর হারাবার কিছু নেই। এখন তারা শক্তি অর্জন করছেন। ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন। তাদের দাবি ধীরে ধীরে গণদাবিতে পরিণত হচ্ছে।

শার্লি এবদো এবং সাম্প্রতিক প্যারিস হামলার পরও মূল সমাজ থেকে তাদের বিন্দুমাত্র বিচ্ছিন্ন করা যায়নি, সম্পর্ক বরং আরো মজবুত হচ্ছে। জনগণও খেলাটা ধরে ফেলছেন। সুতরাং এখন চাইলেই আর রাজনীতির দাবা চালা যাবে না। ফ্রান্স সরকারের উচিত হবে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে সমঝোতায় আসা। সবাইকে নিয়ে নিজেদের নতুন চলার পথ ঠিক করা। এককালের অভিবাসী মুসলিমেরাই যে আধুনিক ও উন্নত ফ্রান্স গড়ে তোলার মূল কারিগর সেটা ভুলে গেলে চলবে কেনো। এককালের পরাশক্তি ফ্রান্স যদি এইটুকুও না পারে তো কে নিশ্চয়তা দিতে পারে- হাওয়ার বাঘ একসময় সত্যি জাদুকরকেই খেয়ে ফেলবে না!