জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে সম্পত্তি হেবা করার শরয়ী হুকুম প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসার জওয়াব

Mufti Abdul Malek

Date

Author

Blog Duration

15–22 minutes

মুহাম্মাদ আবদুল মালেক- আমীরুত তালীম (শিক্ষা বিভাগীয় প্রধান) মুশরিফ, উচ্চতর উলুমুল হাদীস অনুবাদ রইস, রচনা ও গবেষণা বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক, মাসিক আলকাউসার খতীব, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ

مركز الدعوة الإسلامية داكا MARKAZUDDAWAH ALISLAMIA DHAKA মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা

محمد عبد المالك أمين شؤون التعليم مشرف دار التخصص في علوم الحديث الشريف رئيس دار التصنيف وتحقيق التراث المشرف العام لمجلة الكوثر الشهرية الخطيب بمسجد بيت المكرم — الجامع الوطني

Date : ১৬/০৮/১৪৪৭ — ০৫/০২/২০২৬


بسم الله الرحمن الرحيم

মুহতারাম,

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

الحمد لله، وسلام على عباده الذين اصطفى، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله، آخر أنبيائه وخاتم رسله، صلى الله عليه وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:

‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে সম্পত্তি হেবা করার শরয়ী হুকুম প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা’ শীর্ষক আপনার প্রেরিত প্রশ্নপত্র আমাদের হস্তগত হয়েছে। উক্ত প্রশ্নপত্রে জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে হেবা প্রবর্তন বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, এমনটি করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ, নাকি অবৈধ? কিন্তু এখানে মূলত যা হয়েছে তা হলো— মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের একটি নির্দিষ্ট দফার প্রতি অন্যায্য সমালোচনা করা হয়েছে এবং উক্ত দফাটিকে বৈষম্যমূলক ও বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার অনুপযোগী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ অজুহাত দাঁড় করিয়ে আসাবাকে কুরআন ও সুন্নাহ প্রদত্ত তার হক থেকে বঞ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। আর এ উদ্দেশ্যে উক্ত হেবাকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। তাহলে তো এখানে মূল প্রশ্ন এটাই হওয়া উচিত— মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সংশ্লিষ্ট দফাটি কি আদৌ এমন যে, তার সমালোচনা করা যায় বা সেটির বিষয়ে পুনর্বিবেচনা বা পুনর্নিরীক্ষণ করা যায়? এ বিষয়ে কিন্তু প্রশ্ন করা হয়নি। অথচ প্রথমেই আমাদেরকে এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে।

এর উত্তর হলো—

মুসলিম উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনের স্পষ্ট নির্দেশ, মৃত ব্যক্তির সন্তানদের মধ্যে যদি পুত্র না থাকে; কেবল কন্যা থাকে, তাহলে কন্যা একজন হলে সে মৃত ব্যক্তির পুরো সম্পদের অর্ধেক পাবে আর কন্যা একাধিক হলে দুই তৃতীয়াংশ পাবে। অবশিষ্ট সম্পদ আসহাবুল ফারায়েয (কুরআন মাজীদে যে সকল ওয়ারিসের অংশ নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তাদেরকে আসহাবুল ফারায়েয বলে)-এর অন্য কেউ থাকলে বা তাদেরকে তাদের প্রাপ্য অংশ প্রদান করার পরও যদি অবশিষ্ট থাকে তাহলে তা আসাবা পাবে। এ আইনটি শরীয়তের একটি অপরিবর্তনীয় অকাট্য ফরয বিধান। এটি কোন মুজতাহিদের ইজতিহাদ নির্ভর সিদ্ধান্ত নয়, বা কোন শাসকের তৈরিকৃত আইনও নয়। তাই

এটি এমন মানব রচিত আইন নয়, যা সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। আর না এতে কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা আদালতের পুনর্নিরীক্ষণের কোন এখতিয়ার আছে। এক্ষেত্রে শাসকের দায়িত্ব হলো কেবলমাত্র আল্লাহ তাআলার দেয়া নির্ধারিত বিধান কার্যকর করা। তার দায়িত্ব ব্যাস এতটুকুই।

আল্লাহ তাআলা আল্লামুল গুয়ূব। গায়েবের সকল বিষয়ে তিনি সমাক অবগত। প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ও অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সকল বিষয়ে সর্বব্যাপী ইলম একমাত্র তাঁরই আছে। সমস্ত গায়েব তিনি জানেন। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর বান্দাদের অবস্থা কখন কেমন থাকবে, মানবসমাজে কখন কী পরিবর্তন আসবে— সব তিনি জানেন। সকল ধরনের হেকমত ও মাসলাহাত, যৌক্তিকতা, সুবিবেচনা, জনকল্যাণ ও মঙ্গলজনক স্বার্থও আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে ভালোভাবে জানেন। ইরশাদ হয়েছে—

أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ

অর্থাৎ যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি জানবেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সমাক জ্ঞাত। —সূরা মুলক (৬৭) : ১৪

এ কারণেই আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে নির্ধারিত কোন বিধানকে হেকমত ও মাসলাহাতের নাম বা বাহানা দিয়ে অথবা সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের অজুহাত তুলে পুনর্নিরীক্ষণযোগ্য ও সংশোধনযোগ্য মনে করা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও কুফর। আর যদি তাতে কোন পরিবর্তন করা হয় বা এর কোন বিকল্প প্রবর্তন করা হয়, তাহলে তো সেটি আরো ভয়াবহ কুফর।

পুনর্নিরীক্ষণ এবং সংশোধন প্রযোজ্য হয় মানবরচিত আইনসমূহের ক্ষেত্রে। আর পরিবেশ-পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত হতে পারে কেবল ঐসকল বিধান, যেগুলোর বুনিয়াদ পরিবেশ-পরিস্থিতির উপর স্থাপিত। কিন্তু যেসব বিধানগুলোর ভিত্তি পরিবেশ-পরিস্থিতির উপর নয়; বরং সেগুলো কুরআন-হাদীসে আল্লাহ তাআলা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট, সেগুলোতে নযরে সানী তথা পুনর্নিরীক্ষণের কোন অবকাশ নেই এবং এগুলোর বিকল্প তালাশ করারও কোন বৈধতা নেই।


আলোচিত মাসআলায় আল্লাহ তাআলা কন্যাদের প্রাপ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একজন হলে অর্ধেক এবং দুই বা ততোধিক হলে দুই তৃতীয়াংশ। অবশিষ্ট সম্পদ পাবে ‘আসাবা’। আসাবা না থাকলে অন্য আয়াত وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَىٰ بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ (৮ : ৭৫)-এ বর্ণিত বিধান মোতাবেক অবশিষ্ট সম্পদ নির্ধারিত নিয়মে কন্যাদের কাছে ফিরে আসবে।

এরশাদ হয়েছে—

يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ فَإِنْ كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ

অনুবাদ: আল্লাহ তাআলা তোমাদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে তাকীদপূর্ণ নির্দেশ দিচ্ছেন যে, পুরুষের অংশ দুই নারীর অংশের সমান। সন্তান যদি দুই এর অধিক মেয়ে হয় তাহলে মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছে তার দুই তৃতীয়াংশ পাবে। আর যদি একজন মেয়ে হয় তাহলে সে পাবে অর্ধেক। —সূরা নিসা (৪) : ১১

এ আয়াতের অর্থ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটিই বুঝেছেন এবং তাঁর উম্মতকেও এটিই শিখিয়েছেন যে, এক বা একাধিক কন্যার সাথে পুত্র না থাকলে কন্যাদের অংশ নেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ আসাবারা পাবে। এ কারণে এ কথা বলা যায় না যে, কুরআন অবশিষ্ট সম্পত্তির বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করেছে; বরং কুরআন কারীম অবশিষ্ট সম্পদ আসাবাকে প্রদান করতে বলেছে।

এ আয়াত যে সকল ঘটনার প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হয়েছে, তার মধ্যে একটি ঘটনা হলো সাদ বিন রবী রাযি. এর ঘটনা। ঘটনাটি হযরত জাবের রাযি. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। হযরত জাবের রাযি. বলেন, সাদ বিন রবী রা.-এর স্ত্রী তাঁর দুই কন্যাসন্তানসহ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে আরয করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এরা দুজন সাদ বিন রবী-এর কন্যা। তাদের বাবা আপনার সাথে উহুদ যুদ্ধে শরীক হয়ে শহীদ হয়েছেন। তাদের চাচা (মৃতের ভাই) সমস্ত সম্পদ নিয়ে নিয়েছেন। তাই তাদের জন্য কোন সম্পদ থাকেনি। তাদের বিবাহ-শাদীর জন্যও তাদের কাছে কিছু সম্পদ থাকা প্রয়োজন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন—

يَقْضِي اللهُ فِي ذَلِكَ.

আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে ফয়সালা প্রদান করবেন।

অতঃপর মিরাস সংক্রান্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের চাচাকে ডাকেন এবং এরশাদ করেন, সাদ-এর দুই কন্যাকে দুই তৃতীয়াংশ দাও, তাদের মাকে এক অষ্টমাংশ দাও। এরপর অবশিষ্ট সম্পদ তোমার। —মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৪৭৯৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২৮৯১; জামে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৯২

এ হাদীস থেকে জানা গেল, এ আয়াতে نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দুই বা দুইয়ের অধিক; তিন বা তিনের অধিক নয়। এবং এও জানা গেল কন্যাদের অংশের পর অবশিষ্ট সম্পদের বিধান সম্পর্কে কুরআন নীরব নয়; বরং কুরআনে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। আয়াত থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটিই বুঝেছেন এবং এটিকে আল্লাহ তাআলার ফয়সালা বলেছেন।

উপরোক্ত হাদীসে মিরাস সংক্রান্ত আয়াতের শানে নুযূল, আয়াতের অর্থ এবং বাস্তব প্রয়োগের বিবরণ এসেছে। অপর হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাস বণ্টনের স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন নীতি বয়ান করেছেন—

أَقْسِمُوا الْمَالَ بَيْنَ أَهْلِ الْفَرَائِضِ عَلَى كِتَابِ اللهِ، فَمَا تَرَكَتِ الْفَرَائِضُ فَلِأَوْلَى رَجُلٍ ذَكَرٍ

অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী নির্ধারিত অংশীদারদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন করো। অতঃপর নির্ধারিত অংশগুলো দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা (মৃতের) নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের প্রাপ্য হবে। —সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬১৫/৪

মনে রাখা দরকার, মিরাস কীভাবে বণ্টন করা হবে, তা আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে ওয়ারিস দুঃস্থ-গরীব হওয়া বা আসাবা মৃত ব্যক্তির সন্তান-সন্ততির খোঁজ-খবর ও ভরণপোষণ নেয়া— এগুলোর কোনটিকেই মিরাস বণ্টনের ক্ষেত্রে মূলনীতি বানানো হয়নি; বরং আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, মৃত ব্যক্তি ও তার সন্তান-সন্ততির পক্ষে কে বেশি উপকারী, তা তোমরা জানো না; আল্লাহ তাআলা জানেন। ওয়ারিশগণের অংশ বর্ণনা করার সময় আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا

অনুবাদ: তোমরা আসলে জানো না, তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে উপকার সাধনের দিক থেকে তোমাদের নিকটতম। (এসব) আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। —সূরা নিসা (৪) : ১১

আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, এ বণ্টননীতি রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত, যিনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। তাই এখানে নিজ থেকে হেকমত-মাসলাহাতের বাহানা দিয়ে বিকল্প খোঁজার কোনো অবকাশ নেই।

আল্লাহ তাআলা মীরাসের বিধান বর্ণনা করে ইরশাদ করেন—

وَصِيَّةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَلِيمٌ ۝ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ۝ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُهِينٌ

অনুবাদ: (এসব) আল্লাহর হুকুম। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত, সহনশীল। এসব আল্লাহর (স্থিরকৃত) সীমা। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, তিনি তাকে এমন উদ্যানসমূহে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে নহর প্রবাহিত হবে। তারা সর্বদা তাতে থাকবে। আর এটা মহা সাফল্য। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে এবং তাঁর (স্থিরকৃত) সীমা লঙ্ঘন করবে, তিনি তাকে দাখিল করবেন জাহান্নামে, যাতে সে সর্বদা থাকবে এবং তার জন্য আছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। —সূরা নিসা (৪) : ১২-১৩

সূরা নিসার শেষে মিরাস সংক্রান্ত আরো কিছু বিধান বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَنْ تَضِلُّوا وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

অনুবাদ: আল্লাহ তোমাদের কাছে স্পষ্টরূপে বর্ণনা করছেন, যাতে তোমরা পথভ্রষ্ট না হও। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞাত। —সূরা নিসা (৪) : ১৭৬

বোঝা গেল, আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস ও সুন্নাহয় স্পষ্টভাষায় মিরাস বণ্টনের যে বিধি-বিধান প্রদান করেছেন, সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া গোমরাহী। এসব বিধি-বিধানে হস্তক্ষেপ করা আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কারো অধিকার নেই। হস্তক্ষেপ করা আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করা, যার পরিণতি জাহান্নাম। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেয়া বিধি-বিধান মেনে নেয়ার মধ্যেই সফলতা এবং এর পুরস্কার হলো জান্নাত।

এখানে এ বিষয়টিও উল্লেখ করা সমীচীন যে, প্রথমত কুরআনে বর্ণিত দ্ব্যর্থহীন বিধানের মধ্যে হেকমতের বাহানা দিয়ে তাতে রদ বদল করার চিন্তা করাটাই হারাম। কিন্তু প্রশ্নপত্রে উল্লেখকৃত প্রস্তাবে যে হেকমতের বাহানা বানানো হয়েছে, সে হেকমতটিই খোদ কুরআন পরিপন্থী। কারণ আহকামুল হাকিমীন আল্লাহ যখন নিজেই মৃত ব্যক্তির কিছু সম্পদ তার নিজ থেকে বের করে আসাবাকে দিতে চাচ্ছেন, তখন এতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার তো কারো নেই!

তদুপরি এ কথাটিও সঠিক নয় যে, আসাবা মৃতের কন্যার ভরণপোষণ দেয় না; বরং শরীয়তের বিধান হলো, প্রয়োজনের সময় সক্ষম ওয়ারিসের উপর গরীব মুরিসের (যার উত্তরাধিকার সে পাবে) ভরণপোষণ দেয়া আবশ্যক। কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে—

وَعَلَى الْوَارِثِ مِثْلُ ذَٰلِكَ

অনুবাদ: অনুরূপ দায়িত্ব ওয়ারিসের উপরও রয়েছে। —সূরা বাকারা (২) : ২৩৩

শাসকদের দায়িত্ব, জনগণকে আল্লাহ তাআলার দেয়া বিধি-বিধানের উপর পরিচালিত করা, এটা নয় যে, আল্লাহ তাআলার বান্দাদের উপর আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে নিজেদের বানানো বিধান জারি করবে!

প্রশ্নপত্রে উল্লেখকৃত প্রস্তাবের শরয়ী বিধান

প্রশ্নপত্রে উল্লেখকৃত প্রস্তাবের শরয়ী বিধান হলো—

১. এ ধরনের হেবার হুকুম যা-ই হোক না কেন, যেহেতু এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত মিরাস বণ্টননীতিকে এড়িয়ে যাওয়া, তাই এ ধরনের হেবা স্পষ্ট হারাম। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে—

مَنْ قَطَعَ مِيرَاثًا فَرَضَهُ اللهُ قَطَعَ اللهُ مِيرَاثَهُ مِنَ الْجَنَّةِ

অনুবাদ: যে ব্যক্তি আল্লাহ নির্ধারিত কারো উত্তরাধিকার বাতিল করে— এমন কোন উত্তরাধিকার বাতিল করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের উত্তরাধিকার বাতিল করে দেন। —সুনানে সাঈদ বিন মানসূর, পৃ. ১১৮, হাদীস ২৮৫; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, খ. ১৬, পৃ. ২১৫, বর্ণনা ৩১৭৬৮

হযরত সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযি.-এর প্রসিদ্ধ ঘটনা রয়েছে। তিনি তো আসাবাকে বঞ্চিত করতে চাননি এবং নিজের কন্যার জন্য পুরো সম্পদ নিশ্চিত করতেও চাননি। তিনি একবার অসুস্থ অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিজের একটি ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমার তো কেবল একটি কন্যা। আমি কি আমার সম্পদের দুই তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক আল্লাহ তাআলার রাস্তায় সদকা করে দিব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, না। শুধু এক তৃতীয়াংশ সদকা করতে পারো। এক তৃতীয়াংশও বেশি। —সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৩৪৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬২৮/৫

সে সময় সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযি. এর ওয়ারিশগণের মধ্যে তার ভাই আমের বিন আবী ওয়াক্কাস এবং তার একাধিক ভাতিজা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এক তৃতীয়াংশের বেশি পরিমাণ সদকা করে ওয়ারিশগণের (আসহাবুল ফুরূয ও আসাবা) মিরাস কমানোর অনুমতি দেননি। নির্ধারিত হিস্যাদার ওয়ারিশগণকে পুরো সম্পদ দিয়ে আসাবাকে বঞ্চিত করার অনুমতি দেয়া তো দূরের কথা, উল্লিখিত ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযি.-কে স্পষ্টভাবে বলেছেন—

إِنَّكَ أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ، خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ. وَإِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ اللهِ إِلَّا أُجِرْتَ بِهَا، حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فِي امْرَأَتِكَ.

অর্থ: তুমি যদি তোমার উত্তরাধিকারীদের সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাও, তা এর থেকে উত্তম যে তুমি তাদের এমন অবস্থায় রেখে যাবে যে তারা মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়াবে। আর তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় যে ব্যয়ই করবে— তার জন্য তোমাকে প্রতিদান দেওয়া হবে; এমনকি যা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও— সেটিও। (মুয়াত্তা মালেক, হাদীস ২৮২৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৪৪০ ও ১৫২৮; সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৩৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬২৮/৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৮৬৪; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৩৬২৬; জামে তিরমিযী, হাদীস ২১১৬; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২৭০৮)

২. দ্বিতীয় কথা হলো, নিজের জীবদ্দশায় এভাবে হেবা করা যে, হেবাকারীর মৃত্যুর পর তা কার্যকর হবে— এটির নাম যদিও হেবা, কিন্তু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিবেচনায় এটি হচ্ছে অসিয়ত। অথচ ওয়ারিশগণের জন্য অসিয়ত করা শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম এবং বাতিল। অর্থাৎ কেউ যদি এ হারামে লিপ্ত হয়, তবুও তা ধর্তব্য নয়। তবে হ্যাঁ, যদি অন্যান্য ওয়ারিশ প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং তারা স্বেচ্ছায় খুশি মনে উক্ত অসিয়ত বাস্তবায়ন করে দেয় তাহলে ভিন্ন কথা।

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে—

إِنَّ اللهَ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ، أَلَا لَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ.

অনুবাদ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করেছেন। অতএব কোন উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই। —জামে তিরমিযী, হাদীস ২১১৭; কিফায়াতুল মুগতাযী, খ. ১১, পৃ. ৪১০

হাদীস ও ফিকহের অনেক ইমাম স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এ হাদীসে যে বিধান দেয়া হয়েছে, তা ইসলামী শরীয়তের মুজমা আলাইহি (ইজমাসম্মত) বিধান। এবং এ বিধান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত। অতএব এটি একটি সাধারণ কোন সহীহ হাদীস নয়; বরং মুতাওয়াতির হাদীস, যা প্রত্যাখ্যান করা মানে কুরআনের হুকুমকে প্রত্যাখ্যান করা।

জামে তিরমিযীর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন—

إِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ وَالْمَرْأَةُ بِطَاعَةِ اللهِ سِتِّينَ سَنَةً ثُمَّ يَحْضُرُهُمَا الْمَوْتُ فَيُضَارَّانِ فِي الْوَصِيَّةِ فَتَجِبُ لَهُمَا النَّارُ.

অর্থাৎ, কোন পুরুষ ও কোন নারী আল্লাহর আনুগত্যে ষাট বছর পর্যন্ত নেক আমল করে। অতঃপর যখন তাদের মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন তারা অসিয়তের মাধ্যমে উত্তরাধিকারের ক্ষতিসাধন করে; ফলে তাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায়। —জামে তিরমিযী, হাদীস ২১১৭

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় হাদীস ভাষ্যকারগণ বলেন—

أَيْ: بِوِصَالِهَا لِلْوَارِثِ بِسَبَبِ الْوَصِيَّةِ لِلْأَجْنَبِيِّ أَكْثَرَ مِنَ الثُّلُثِ، أَوْ بِأَنْ يَهَبَ جَمِيعَ مَالِهِ لِوَاحِدٍ مِنَ الْوَرَثَةِ، كَيْ لَا يَرِثَ آخَرُ مِنْ مَالِهِ شَيْئًا

উত্তরাধিকারীর ক্ষতিসাধন করার অর্থ হলো, যেমন উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করার জন্য অপরের জন্য এক তৃতীয়াংশের বেশি অসিয়ত করে যাওয়া, বা ওয়ারিশদের মধ্যে একজন ওয়ারিশকে সকল সম্পত্তি হেবা করে যাওয়া, যেন অপর ওয়ারিশ সম্পত্তি না পায়। —শরহুল মাসাবীহ, ইমাম ইবনুল মালাক, খ. ৩, পৃ. ৫৩৪

ইসলামী শরীয়তের শিক্ষা হলো, অসিয়তকারী যদি কোন গলদ কাজ করে, তাহলে তা সংশোধন করে দেয়া। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, হেবার নাম ব্যবহার করে গলদ অসিয়তের রাস্তা খোলা হচ্ছে।

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে—

فَمَنْ بَدَّلَهُ بَعْدَمَا سَمِعَهُ فَإِنَّمَا إِثْمُهُ عَلَى الَّذِينَ يُبَدِّلُونَهُ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ۝ فَمَنْ خَافَ مِنْ مُوصٍ جَنَفًا أَوْ إِثْمًا فَأَصْلَحَ بَيْنَهُمْ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ

যে ব্যক্তি সে অসিয়ত শোনার পর তাতে কোন রদ-বদল করবে, তার গুনাহ তাদের উপরই বর্তাবে, যারা তাতে রদ-বদল করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ (সবকিছু) শোনেন ও জানেন। হ্যাঁ, কারো যদি আশঙ্কা হয়, অসিয়তকারী অন্যায় পক্ষপাতিত্ব বা গুনাহের কাজ করেছে আর সে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়, তবে তার কোন গুনাহ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। —সূরা বাকারা (২) : ১৮১ ও ১৮২

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন,

الْحَيْفُ فِي الْوَصِيَّةِ وَالْإِضْرَارُ فِيهَا مِنَ الْكَبَائِرِ

অর্থাৎ অসিয়তের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা এবং অসিয়তের দ্বারা ক্ষতিসাধন করা কবিরা গুনাহসমূহের অন্তর্ভুক্ত। (আস সুনানুল কুবরা, ইমাম বায়হাকী রহ., হাদীস ১২৭১৩; সুনানে সাঈদ বিন মানসূর, হাদীস ৩৭৩)

মোটকথা, উত্তরাধিকারীর ক্ষতিসাধন করার জন্য হেবার নামে নির্দিষ্ট হিস্যাদার ওয়ারিশ বা আসাবা ওয়ারিশ— কারো জন্য অসিয়ত করা সম্পূর্ণ হারাম। এবং এ ধরনের হেবা প্রবর্তন করার জন্য আইন প্রণয়ন করার অর্থ হলো, আহকামুল হাকিমীনের হুকুম ও মহান আল্লাহ তাআলার শরীয়তের মোকাবেলায় নতুন শরীয়ত দাঁড় করানো, যা কখনো কোন মুসলিমের ব্যাপারে চিন্তা করা যায় না।


৩. তৃতীয় কথা হলো, হেবা সহীহ হওয়ার জন্য (হেবা কার্যকর হওয়ার জন্য তো বটেই) হেবাগ্রহীতার কাছে হেবাকৃত সম্পত্তি হস্তান্তর করা ও আয় ভোগের অধিকার অর্পণ করা জরুরি। হেবাগ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করা না হলে সে হেবাকৃত সম্পদের মালিক হয় না। হেবাগ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করার পূর্বে যদি হেবাকারী মারা যায়, তাহলে এ সম্পদ হেবাগ্রহীতার হবে না; বরং হেবাকারী মাইয়েতের সকল ওয়ারিস নিজ নিজ অংশ অনুপাতে এ সম্পদে শরীক হবে।

এটিও ইসলামী শরীয়তের এমন একটি মাসআলা, যেখানে ইসলামের চারো খলীফায়ে রাশেদ

একমত। আর হেবা কার্যকর হওয়ার জন্য হেবাগ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করা জরুরী হওয়ার মাসআলা তো স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে প্রমাণিত।

হাদীসে এসেছে—

عَنْ أُمِّ كُلْثُومٍ بِنْتِ أَبِي سَلَمَةَ قَالَتْ: لَمَّا تَزَوَّجَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أُمَّ سَلَمَةَ، قَالَ لَهَا: إِنِّي قَدْ أَهْدَيْتُ إِلَى النَّجَاشِيِّ حُلَّةً وَأَوَاقِيَ مِنْ مِسْكٍ، وَلَا أَرَى النَّجَاشِيَّ إِلَّا قَدْ مَاتَ، وَلَا أَرَى هَدِيَّتِي إِلَّا مَرْدُودَةً عَلَيَّ، فَإِنْ رُدَّتْ عَلَيَّ فَهِيَ لَكِ. قَالَ: وَكَانَ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ، وَرُدَّتْ عَلَيْهِ هَدِيَّتُهُ، فَأَعْطَى كُلَّ امْرَأَةٍ مِنْ نِسَائِهِ أُوقِيَّةَ مِسْكٍ، وَأَعْطَى أُمَّ سَلَمَةَ بَقِيَّةَ الْمِسْكِ وَالْحُلَّةَ.

অর্থাৎ উম্মে কুলসুম বিনতে আবু সালামা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন উম্মে সালামা রা.-কে বিবাহ করেন, তখন তিনি তাকে বললেন—আমি নাজাশীর নিকট একটি পোশাক ও কয়েক উকিয়া মেশক (বিশেষ সুগন্ধি) উপহার পাঠিয়েছি। তবে আমার ধারণা, নাজাশী ইতোমধ্যে ইন্তিকাল করেছেন এবং আমার উপহারটি আমার কাছেই প্রত্যাবর্তিত হবে। যদি তা আমার নিকট ফেরত আসে, তবে তা তোমার জন্য।

বর্ণনাকারী বলেন, বিষয়টি ঠিক তেমনই ঘটেছিল, যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন। তাঁর উপহারটি তাঁর নিকট ফেরত আসে। অতঃপর তিনি তাঁর স্ত্রীগণের প্রত্যেককে এক উকিয়া করে মেশক প্রদান করেন এবং উম্মে সালামা রা.-কে অবশিষ্ট মেশক ও সেই পোশাকটি প্রদান করেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৭২৭৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং ৫১১৪)

ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এ হাদীসের সনদকে হাসান বলেছেন। (ফাতহুল বারী, খ. ৫, পৃ. ২৬৩)

এ হাদীস থেকে বোঝা গেল, উক্ত হেবার ক্ষেত্রে নাজাশী যেহেতু উপহার সামগ্রী কবযা করতে পারেননি, তাই এ হেবা সম্পন্ন হয়নি। এ কারণে তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ফেরত এসেছে। হেবা সম্পন্ন হয়ে থাকলে তা ফেরত আসতো না বা নবীজীও তা গ্রহণ করতেন না।

৪. চতুর্থ কথা হলো, পূর্বের যমানাতেও কিছু লোকের মাঝে এমন রেওয়াজ ছিল যে, সে যার কোন সন্তানকে সম্পদ হেবা করে হেবাকৃত সম্পদ নিজের কাছে আটকে রাখত। এরপর তার সন্তান যদি

আগে মারা যেত, তখন সে বলত, এগুলো তো আমার সম্পদ; আমার হাতে আছে। আমি তো কাউকে দিয়ে দেইনি। আর যদি সন্তানের আগে তার মারা যাওয়ার সময় হয়ে যেত তখন বলত, এ সম্পদ তো আমার ছেলেকে, আমি তো তাকে আগেই দিয়ে দিয়েছি। যেহেতু এটি হেবার নামে অস্পষ্টতা ছিল, শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি গলদ রেওয়াজ ছিল, তাই আমীরুল মুমিনীন ওমর বিন খাত্তাব রাযি. সে সকল লোকদের এ গলদ কাজের প্রতিবাদ করেন এবং তাদেরকে শরীয়তের এ বিধান জানিয়ে সতর্ক করেন—

مَا بَالُ أَحَدِكُمْ يَنْحَلُ وَلَدَهُ صَدَقَةً لَا يَحُوزُهَا وَلَا يَقْسِمُهَا، يَقُولُ: إِنْ مَاتَ كَانَتْ لَهُ، وَإِنْ مِتُّ رَجَعَتْ إِلَيَّ. وَأَيْمُ اللهِ لَا يَنْحَلُ رَجُلٌ وَلَدَهُ نَحْلَةً لَمْ يَحُزْهَا وَلَدُهُ ثُمَّ يَمُوتُ إِلَّا صَارَتْ مِيرَاثًا لِلْوَرَثَةِ

অর্থাৎ তোমাদের কারো কী হলো যে, সে তার সন্তানকে দান (হেবা) হিসেবে কোন সম্পত্তি দেয়, অথচ তা তার দখলে দেয় না; সে বলে, আমি যদি মারা যাই, তবে এটি তার হবে, আর সে যদি মারা যায়, তবে তা আমার কাছে ফিরে আসবে। আল্লাহর কসম! কোন ব্যক্তি যদি তার সন্তানকে এমন কোন দান (হেবা) করে, যা সে দখলে দেয়নি, অতঃপর সে মারা যায়, তবে সেই সম্পত্তি অবশ্যই ওয়ারিশদের জন্য মিরাসে পরিণত হবে। —কিতাবুল আসল, ইমাম মুহাম্মাদ রাহ., খ. ৩, পৃ. ৩৬৩; মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদীস ২৭৮৪

৫. পঞ্চম কথা হলো—

হেবাচুক্তিতে হেবাকারীর মৃত্যুর পর হেবা কার্যকর হওয়ার শর্ত যুক্ত করা হলে ফুকাহায়ে কেরামের দৃষ্টিতে সে হেবা বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য। কারণ হেবা করাই হয় নগদ মালিক বানানোর জন্য। মৃত্যুর পর মালিক বানানোর সুরত তো হেবা নয়; বরং সেটা হলো অসিয়ত; হেবা নয়। এ কারণে যে কজন ফকীহ এ শর্তযুক্ত হেবাকে গ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন, তাদের কাছেও এ হেবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার অর্থ হলো, যদি কবযা সম্পন্ন হয়ে যায় তাহলে তাৎক্ষণিক তা কার্যকর হবে।

হেবাকারীর মৃত্যুর পর হেবাগ্রহীতা মালিক হবেন, এখন মালিক হবেন না— এমন নয়। এ ধরনের হেবা গ্রহণযোগ্য হবে কিন্তু ফিলহাল হেবাগ্রহীতার জন্য মালিকানা সাব্যস্ত হবে না— এমন কথা কোন ফকীহ বলেননি এবং কেউ বলতে পারেনও না। ফাতাওয়ায়ে শামী, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীসহ ফিকহ-ফাতাওয়ার মৌলিক ও আরো প্রাচীন গ্রন্থাদি ছাড়াও উসমানী খেলাফতের বিধিবদ্ধ আইন “মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়াহ” এবং এর ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহেও এ মাসআলা রয়েছে।

জওয়াবের সারাংশ

জওয়াবের সারকথা হলো, মুসলিম উত্তরাধিকার সংক্রান্ত উক্ত আইন যেহেতু কুরআন ও হাদীসে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বর্ণিত এবং উম্মতের উলামায়ে কেরামের ইজমা সম্মত আইন, তাই এতে কোন ধরনের সংশোধন ও পরিবর্তনের ন্যূনতম কোন অবকাশ নেই। তদুপরি এর জন্য যে প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছে, সেটিও ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি বাতিল প্রস্তাব। কারণ হাকীকতের বিচারে এটি হলো ওয়ারিশদের জন্য অসিয়ত, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে বাতিল।

যদি হাকীকত ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দিকে না তাকিয়ে কেবল নামের ভিত্তিতেই এটিকে হেবা আখ্যায়িত করা হয়, এরপর যদি কবযা না হয়ে থাকে তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে মেয়ে একা এ সম্পত্তির মালিক হবে না; বরং উক্ত সম্পদ মিরাস বণ্টননীতি অনুযায়ী ওয়ারিশগণের মাঝে বণ্টন করা হবে। আর যদি কবযা হয়ে থাকে তাহলে কবযা সম্পন্ন হওয়া মাত্রই তাৎক্ষণিকভাবে সম্পত্তি হেবাকারীর মালিকানা থেকে বের হয়ে মেয়ের মালিকানায় চলে যাবে। তখনতো হেবাগ্রহীতা মেয়ের হেবাকারীর জীবদ্দশায় এ সম্পদ ভোগ করার অধিকার পাবেন না।

শরীয়তের দৃষ্টিতে এমন কথা বাতিল এবং স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধির আলোকেও এমন কথা বলা যায় না। কারণ এটি সম্পূর্ণরূপে স্ববিরোধিতা। ইসলামী শরীয়ত এমন স্ববিরোধিতার কথা বলতেই পারে না। মানব রচিত কোন আইন, যার কাছে নিজের আত্মসম্মানবোধ আছে, সেও নিজের জন্য এ ধরনের স্ববিরোধিতা বরদাশত করবে না।

প্রশ্নের শরয়ী সমাধান পেশ করার পর সূরা নিসার ১১৫ নং আয়াতখানা বান্দাসহ সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয়া মুনাসিব মনে হচ্ছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَىٰ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا

যে কেউ রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তার নিকট সরল পথ প্রকাশ হওয়ার পরও যদি মুসলিমদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি ওকে সেদিকেই ছেড়ে দেব, যা সে অবলম্বন করেছে (অর্থাৎ ওর অবলম্বন করা পথে চলতে দেব) এবং ওকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল। —সূরা নিসা (৪) : ১১৫

هٰذَا، وَصَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلَى نَبِيِّهِ خَاتَمِ النَّبِيِّينَ مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ، وَالْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *