গত রোববার জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’। বিধানটা সহজ ভাষায় এমন— সম্পত্তি দান করে দেওয়ার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। ইংরেজিতে যাকে বলা হচ্ছে ইউসোফ্রাক্ট, আমাদের এখানে চালু হয়ে যাচ্ছে ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে দান’ নামে।
পরদিন সোমবার (7/9/2026) আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা— এই আইন যুগান্তকারী, প্রগতিশীল, এবং শরিয়াহর কোনো কিছুকেই ‘টাচ’ করেনি। বিরোধিতাকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘আইনটা ভালো করে পড়েন, ভালো করে বোঝেন।’
সাক্ষাৎকারটা আমি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। কয়েকবার। এবং পড়ার পর মনে হয়েছে— মন্ত্রী মহোদয় যে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন, সেগুলো আসল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্নটা তাঁকে কেউ করেনি, তিনিও নিজে থেকে সেদিকে যাননি।
সেই প্রশ্নটাই আজকের লেখা।
আলোচনাটা যেখান থেকে শুরু হওয়া উচিত ছিলো
পুরো বিতর্কটা সাজানো হয়েছে এভাবে— ‘জীবনস্বত্ব রেখে হেবা করা কি শরীয়তে বৈধ, নাকি অবৈধ?’
কিন্তু এখানে মূলত যা হয়েছে তা হলো, মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের একটি নির্দিষ্ট দফার প্রতি অন্যায্য সমালোচনা করা হয়েছে। দফাটিকে বলা হচ্ছে বৈষম্যমূলক, বলা হচ্ছে বর্তমান সমাজব্যবস্থার অনুপযোগী। এই অজুহাত দাঁড় করিয়ে আসাবাকে কুরআন ও সুন্নাহ প্রদত্ত তার হক থেকে বঞ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে। আর এ উদ্দেশ্যেই ‘জীবনস্বত্ব রেখে দান’-কে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করা হচ্ছে।
তাহলে তো মূল প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিলো— মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সংশ্লিষ্ট দফাটি কি আদৌ এমন যে, তার সমালোচনা করা যায়? তার বিষয়ে পুনর্বিবেচনা বা পুনর্নিরীক্ষণ করা যায়?
এ প্রশ্নটা কেউ করেনি। অথচ সবার আগে এর উত্তর জানা দরকার।
দফাটা আসলে কার তৈরি
মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের স্পষ্ট নির্দেশ— মৃত ব্যক্তির সন্তানদের মধ্যে যদি পুত্র না থাকে, কেবল কন্যা থাকে, তাহলে কন্যা একজন হলে সে পুরো সম্পদের অর্ধেক পাবে, একাধিক হলে দুই তৃতীয়াংশ। অবশিষ্ট সম্পদ পাবে আসাবা।
এটি কোনো মুজতাহিদের ইজতিহাদনির্ভর সিদ্ধান্ত নয়। কোনো শাসকের তৈরিকৃত আইনও নয়। এটি কুরআনে সরাসরি বর্ণিত—
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ فَإِنْ كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ
‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে তাকীদপূর্ণ নির্দেশ দিচ্ছেন… সন্তান যদি দুইয়ের অধিক মেয়ে হয় তাহলে মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছে তার দুই তৃতীয়াংশ পাবে। আর যদি একজন মেয়ে হয় তাহলে সে পাবে অর্ধেক।’ —সূরা নিসা (৪) : ১১
এখানে একটা কথা খুব জোর দিয়ে বলা দরকার। প্রায়ই শোনা যায়, ‘কন্যাদের অংশের পর অবশিষ্ট সম্পদ নিয়ে কুরআন তো চুপ, তাই এখানে আইন করার জায়গা আছে।’
কথাটা ঠিক নয়। কুরআন চুপ নয়।
এ আয়াত যেসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে, তার একটি হলো সাদ বিন রবী রাযি.-এর ঘটনা। হযরত জাবের রাযি. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত— উহুদে শহীদ সাদ বিন রবী রা.-এর স্ত্রী তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বলেন, এদের চাচা সমস্ত সম্পদ নিয়ে নিয়েছেন, মেয়েদের জন্য কিছুই থাকেনি। নবীজী বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে ফয়সালা দেবেন।’ এরপর মিরাসের আয়াতগুলো নাযিল হয়। তখন নবীজী চাচাকে ডেকে বললেন— সাদের দুই কন্যাকে দুই তৃতীয়াংশ দাও, তাদের মাকে এক অষ্টমাংশ দাও, এরপর অবশিষ্ট সম্পদ তোমার। (মুসনাদে আহমদ ১৪৭৯৮; আবু দাউদ ২৮৯১; তিরমিযী ২০৯২)
অর্থাৎ অবশিষ্ট সম্পদের ফয়সালা স্বয়ং নবীজী দিয়ে গেছেন, এবং সেটাকে ‘আল্লাহর ফয়সালা’ বলেই দিয়েছেন। আরেক হাদীসে নীতিটা আরো দ্ব্যর্থহীন—
أَقْسِمُوا الْمَالَ بَيْنَ أَهْلِ الْفَرَائِضِ عَلَى كِتَابِ اللهِ، فَمَا تَرَكَتِ الْفَرَائِضُ فَلِأَوْلَى رَجُلٍ ذَكَرٍ
‘আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী নির্ধারিত অংশীদারদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন করো। নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা মৃতের নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের প্রাপ্য।’ —সহীহ মুসলিম ১৬১৫/৪
এই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা করুন— এটি কি এমন কোনো মানবরচিত আইন, যা সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে বদলে যেতে পারে? কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা আদালতের কি এতে পুনর্নিরীক্ষণের এখতিয়ার আছে?
শাসকের দায়িত্ব এখানে একটাই— আল্লাহ তাআলার দেয়া নির্ধারিত বিধান কার্যকর করা। ব্যাস, এতটুকুই।
‘হেকমত’ নামের বাহানা
মন্ত্রী মহোদয়ের যুক্তির কেন্দ্রে আছে একটা বাস্তব সমস্যা। তিনি বলেছেন, ‘আমরা দেখছি এই সমাজে বাবা-মা অসহায় হয়ে যাচ্ছেন শেষ বয়সে।’ উদাহরণ দিয়েছেন এক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেলের, যার মৃত্যুর সপ্তাহখানেক পর সন্তানেরা মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলো।
এই ব্যথাটা আমি অস্বীকার করছি না। ঘটনাগুলো সত্য, এবং লজ্জার।
কিন্তু এখানেই মূল ভুলটা। কুরআনে বর্ণিত দ্ব্যর্থহীন বিধানের মধ্যে হেকমতের বাহানা দিয়ে রদবদল করার চিন্তা করাটাই হারাম। আর এই আইনে যে হেকমতের বাহানা বানানো হয়েছে, সে হেকমতটিই খোদ কুরআন পরিপন্থী।
কারণ আহকামুল হাকিমীন আল্লাহ যখন নিজেই মৃত ব্যক্তির কিছু সম্পদ তার হাত থেকে বের করে আসাবাকে দিতে চাচ্ছেন, তখন এতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার তো কারো নেই।
আমরা কি ভুলে যাচ্ছি— কোনটা কল্যাণকর, সেটা আমরা ঠিক করি না?
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
‘যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি জানবেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সমাক জ্ঞাত।’ —সূরা মুলক (৬৭) : ১৪
মিরাসের অংশ বর্ণনা করার ঠিক পরেই আল্লাহ তাআলা যেন এই তর্কটাই আগে থেকে বন্ধ করে দিয়েছেন—
آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا
‘তোমরা আসলে জানো না, তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে উপকার সাধনের দিক থেকে তোমাদের নিকটতম। এসব আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ —সূরা নিসা (৪) : ১১
কে বেশি উপকারী, কে কম— এই হিসাব করার দায়িত্ব আমাদের দেয়া হয়নি। ওয়ারিস দুঃস্থ কি সচ্ছল, কে খোঁজখবর নেয় আর কে নেয় না— এগুলোর কোনোটিকেই মিরাস বণ্টনের মূলনীতি বানানো হয়নি।
পুনর্নিরীক্ষণ ও সংশোধন প্রযোজ্য হয় মানবরচিত আইনের ক্ষেত্রে। পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে বদলাতে পারে কেবল সেসব বিধান, যেগুলোর বুনিয়াদই পরিবেশ-পরিস্থিতির উপর দাঁড়ানো। কিন্তু যেগুলো কুরআন-হাদীসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট, সেগুলোতে নযরে সানীর কোনো অবকাশ নেই— এবং সেগুলোর বিকল্প তালাশ করারও কোনো বৈধতা নেই।
আর ‘আসাবা তো কিছুই করে না’ কথাটাও সত্য নয়
আইনের পক্ষে আরেকটা কথা বেশ চালু হয়েছে— ভাই-ভাতিজারা তো মেয়ের বা বৃদ্ধ মায়ের কোনো দায়িত্ব নেয় না, তাহলে সম্পত্তি কেনো পাবে?
শরীয়তের বিধান কিন্তু ঠিক উল্টোটা বলে। প্রয়োজনের সময় সক্ষম ওয়ারিসের উপর গরীব মুরিসের— অর্থাৎ যার উত্তরাধিকার সে পাবে, তার— ভরণপোষণ দেয়া আবশ্যক।
وَعَلَى الْوَارِثِ مِثْلُ ذَٰلِكَ
‘অনুরূপ দায়িত্ব ওয়ারিসের উপরও রয়েছে।’ —সূরা বাকারা (২) : ২৩৩
তার মানে দায়িত্বটা ইসলাম আগেই আরোপ করে রেখেছে। সমাজ সেটা মানছে না— এটা সমাজের ব্যর্থতা, বিধানের ত্রুটি নয়। রোগ ধরা পড়েছে একজায়গায়, আর অস্ত্রোপচার হচ্ছে সম্পূর্ণ অন্য অঙ্গে।
শাসকের দায়িত্ব জনগণকে আল্লাহর দেয়া বিধানের উপর পরিচালিত করা— এটা নয় যে, আল্লাহর বান্দাদের উপর আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে নিজেদের বানানো বিধান জারি করা।
‘১২২(এ)-এর চার ধারা’ কি সত্যিই ঢাল
মন্ত্রী মহোদয় বারবার একটি ধারার দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘হেবার ওপর শর্ত বসানো যাবে না। আমিও বলছি, হেবার ওপর শর্ত বসানো যাবে না। সে কারণে আমি হেবাকে আনটাচ রাখছি। এটা ইসলামিক ল— আমি সেখানে হাত দিইনি।’
সাক্ষাৎকারে আরো বলেছেন, নতুন এই ব্যবস্থার নাম হবে ‘দান’, ইংরেজিতে ‘গিফট’, এবং হেবা আগের মতোই থাকবে।
প্রশ্নটা হলো— নাম আলাদা রাখলেই কি বাস্তবতা আলাদা হয়ে যায়?
শরীয়ত নাম দেখে হুকুম দেয় না, দেখে হাকীকত ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। নিজের জীবদ্দশায় এমনভাবে সম্পদ হস্তান্তর করা, যা কার্যকর হবে দাতার মৃত্যুর পর— এটির নাম যা-ই হোক, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিবেচনায় এটি হচ্ছে অসিয়ত।
আর ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম এবং বাতিল।
إِنَّ اللهَ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ، أَلَا لَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে দিয়েছেন। অতএব কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই।’ —জামে তিরমিযী ২১১৭
হাদীস ও ফিকহের ইমামগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন, এ হাদীসের বিধান ইজমাসম্মত। এটি সাধারণ কোনো সহীহ হাদীস নয়; বরং মুতাওয়াতির হাদীস— যা প্রত্যাখ্যান করা মানে কুরআনের হুকুমকেই প্রত্যাখ্যান করা।
তিরমিযীর আরেক হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোনো পুরুষ বা নারী ষাট বছর আল্লাহর আনুগত্যে আমল করে, অতঃপর মৃত্যুর সময় অসিয়তের মাধ্যমে উত্তরাধিকারীর ক্ষতিসাধন করে— ফলে তাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায়। (তিরমিযী ২১১৭)
আর এই ‘ক্ষতিসাধন’ বলতে কী বোঝায়? হাদীস-ভাষ্যকারগণ ব্যাখ্যায় লিখেছেন— যেমন উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করার জন্য অপরের জন্য এক তৃতীয়াংশের বেশি অসিয়ত করে যাওয়া, বা ওয়ারিশদের মধ্যে একজনকে সকল সম্পত্তি হেবা করে যাওয়া, যেন অপর ওয়ারিশ কিছুই না পায়। (শরহুল মাসাবীহ, ইমাম ইবনুল মালাক, খ. ৩, পৃ. ৫৩৪)
পড়ে দেখুন লাইনটা। এই আইনের সম্ভাব্য সবচে বড় ব্যবহারটার হুবহু বর্ণনা কয়েকশ বছর আগেই লিখে রাখা আছে।
সাংবাদিক যখন সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন— বাবা সব সম্পত্তি এক সন্তানকে দিয়ে দিলে অন্য সন্তানদের কী হবে? মন্ত্রীর জবাব, ‘সেটা তো হেবাতেও আছে।’
কিন্তু এটা তো জবাব নয়। কেউ যদি হেবার মাধ্যমেও ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার নিয়ত করে, সেটাও শরীয়তে অন্যায়। ইসলামী শরীয়তের শিক্ষা হলো, অসিয়তকারী কোনো গলদ কাজ করলে তা সংশোধন করে দেয়া। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, হেবার নাম ব্যবহার করে গলদ অসিয়তের রাস্তা উল্টো খুলে দেয়া হচ্ছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেছেন, অসিয়তের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা এবং অসিয়তের দ্বারা ক্ষতিসাধন করা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। (সুনানুল কুবরা, বায়হাকী ১২৭১৩; সুনানে সাঈদ বিন মানসূর ৩৭৩)
যে জায়গায় আইনটা নিজেই নিজের সাথে বিরোধে জড়ায়
এবার সাক্ষাৎকারের সবচে গুরুত্বপূর্ণ দুটো লাইন পাশাপাশি রাখি।
প্রশ্ন ছিলো— বাবা বাড়ি ছেলেকে দান করলেন, কিন্তু নিজে ব্যবহার করবেন। আইনগত মালিক কে? মন্ত্রীর উত্তর: ‘ছেলে। যে মুহূর্তে দান করে দেওয়া হলো, সেই মুহূর্ত থেকে ছেলে মালিক।’
পরের প্রশ্ন— দাতা কি সম্পত্তি বিক্রি বা বন্ধক করতে পারবেন? উত্তর: ‘পারবেন না। উনি শুধু ভোগ করতে পারবেন। এখানেই হেবার সঙ্গে পার্থক্যের জায়গাটা।’
অর্থাৎ ছেলে মালিক, কিন্তু ভোগ করতে পারবে না। বাবা ভোগ করবেন, কিন্তু মালিক নন।
শরীয়তে হেবা সহীহ হওয়ার জন্য— কার্যকর হওয়ার জন্য তো বটেই— হেবাগ্রহীতার কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করা এবং আয় ভোগের অধিকার অর্পণ করা জরুরি। হস্তান্তর না হলে গ্রহীতা মালিকই হয় না। হস্তান্তরের আগে দাতা মারা গেলে সম্পদ গ্রহীতার হবে না; বরং মাইয়েতের সকল ওয়ারিস নিজ নিজ অংশ অনুপাতে সেই সম্পদে শরীক হবেন।
এটি এমন মাসআলা, যেখানে ইসলামের চার খলীফায়ে রাশেদ একমত। আর কবযার শর্তটা স্বয়ং হাদীস থেকে প্রমাণিত।
উম্মে কুলসুম বিনতে আবু সালামা রা. বর্ণনা করেন— নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালামা রা.-কে বিয়ের পর বললেন, তিনি নাজাশীর কাছে একটি পোশাক ও কয়েক উকিয়া মেশক উপহার পাঠিয়েছেন; তাঁর ধারণা নাজাশী ইন্তেকাল করেছেন এবং উপহার ফেরত আসবে— ফেরত এলে সেটা উম্মে সালামার। বাস্তবে তা-ই হলো, উপহার ফেরত এলো, এবং নবীজী তা বণ্টন করলেন। (মুসনাদে আহমাদ ২৭২৭৬; সহীহ ইবনে হিব্বান ৫১১৪। সনদ হাসান— ফাতহুল বারী, খ. ৫, পৃ. ২৬৩)
এখান থেকেই বোঝা যায়— নাজাশী যেহেতু উপহার কবযা করতে পারেননি, তাই হেবা সম্পন্নই হয়নি। হেবা সম্পন্ন হয়ে থাকলে তা ফেরত আসতো না, নবীজীও তা গ্রহণ করতেন না।
আর ইতিহাস বলছে, ঠিক এই কারবারটা নতুন নয়। পূর্বের যমানাতেও কিছু লোকের মাঝে রেওয়াজ ছিলো— সন্তানকে সম্পদ ‘হেবা’ করে সেটা নিজের হাতেই আটকে রাখা। সন্তান আগে মারা গেলে বলতো, এগুলো তো আমারই, আমার হাতেই আছে। আর নিজের মৃত্যু ঘনালে বলতো, এ তো ছেলেকে দিয়েই দিয়েছি।
আমীরুল মুমিনীন ওমর বিন খাত্তাব রাযি. এই গলদ রেওয়াজের প্রতিবাদ করে বলেছিলেন—
مَا بَالُ أَحَدِكُمْ يَنْحَلُ وَلَدَهُ نِحْلَةً لَا يَحُوزُهَا وَلَا يَقْسِمُهَا… وَأَيْمُ اللهِ لَا يَنْحَلُ رَجُلٌ وَلَدَهُ نِحْلَةً لَمْ يَحُزْهَا وَلَدُهُ ثُمَّ يَمُوتُ إِلَّا صَارَتْ مِيرَاثًا لِلْوَرَثَةِ
‘তোমাদের কারো কী হলো যে, সে সন্তানকে দান হিসেবে সম্পত্তি দেয়, অথচ তা তার দখলে দেয় না… আল্লাহর কসম! কেউ যদি সন্তানকে এমন দান করে যা সে দখলে দেয়নি, অতঃপর মারা যায়, তবে সেই সম্পত্তি অবশ্যই ওয়ারিশদের জন্য মিরাসে পরিণত হবে।’ (কিতাবুল আসল, ইমাম মুহাম্মাদ রাহ., খ. ৩, পৃ. ৩৬৩; মুয়াত্তা মালেক ২৭৮৪)
চৌদ্দশ বছর আগে যেটাকে খলীফা গলদ বলে বন্ধ করে দিয়েছিলেন, ২০২৬ সালে সেটাকেই আমরা ‘যুগান্তকারী আইন’ নাম দিয়ে ফিরিয়ে আনছি।
আর ফুকাহায়ে কেরামের অবস্থানটাও পরিষ্কার। হেবাচুক্তিতে দাতার মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার শর্ত যুক্ত করা হলে সে হেবা বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য— কারণ হেবা করাই হয় নগদ মালিক বানানোর জন্য। মৃত্যুর পর মালিক বানানোর সুরত তো হেবা নয়, সেটা অসিয়ত। যে কজন ফকীহ শর্তযুক্ত হেবাকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন, তাঁদের কাছেও এর অর্থ— কবযা সম্পন্ন হলে তাৎক্ষণিক কার্যকর হবে। ‘গ্রহণযোগ্য হবে, কিন্তু ফিলহাল মালিকানা সাব্যস্ত হবে না’— এমন কথা কোনো ফকীহ বলেননি, কেউ বলতেও পারেন না। ফাতাওয়ায়ে শামী, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীসহ ফিকহের মৌলিক গ্রন্থাদি, এমনকি উসমানী খেলাফতের বিধিবদ্ধ আইন ‘মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়াহ’-তেও এ মাসআলা আছে।
রেফারেন্সের রাজনীতি
মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, তাঁরা মালয়েশিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, ইউএই, প্রিভি কাউন্সিল, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ও পাকিস্তানের আদালতের রেফারেন্স দিয়েছেন।
কথা হলো, শরীয়তের মাসআলায় দলিল হয় কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস। কোন দেশে কী আইন চালু আছে— এটা তথ্য হতে পারে, দলিল নয়। কোনো মুসলিম দেশের সংসদে কিছু পাস হলেই সেটা শরয়ী প্রমাণ হয়ে যায় না। আর ১৯২২ সালের প্রিভি কাউন্সিল তো ঔপনিবেশিক আদালত— মুসলিম উত্তরাধিকারের ফয়সালার জন্য সেটাকে কর্তৃপক্ষ মানার কোনো কারণ নেই।
তিনি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের নজিরও টেনেছেন— নাতি-নাতনির উত্তরাধিকার, তিন তালাক, হিল্লা বিয়ে। কিন্তু ওই সংশোধনীগুলো নিয়ে আলেমসমাজের আপত্তি তখনো ছিলো, আজও আছে। আগের একটি বিতর্কিত হস্তক্ষেপ আরেকটি নতুন হস্তক্ষেপের বৈধতা তৈরি করে না। ভুলের পুনরাবৃত্তি ভুলকে শুদ্ধ বানায় না।
আর একটা কথা— সাক্ষাৎকারেই তিনি স্বীকার করেছেন, ‘আমরা ইনফরমালি কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি।’ যে আইন সরাসরি ফরায়েযের বিধানকে স্পর্শ করছে, সেটা পাসের আগে দেশের ফিকহ বোর্ড, বড় দারুল ইফতাগুলো, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা মুফতিয়ানে কেরামের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরামর্শ কেনো হলো না— এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু সাক্ষাৎকারে নেই।
উদ্দেশ্য ভালো হলেই কি যথেষ্ট
সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযি.-এর প্রসিদ্ধ ঘটনাটা এখানে খুব প্রাসঙ্গিক।
তিনি আসাবাকে বঞ্চিত করতে চাননি, নিজের একমাত্র কন্যার জন্য পুরো সম্পদ নিশ্চিত করতেও চাননি। অসুস্থ অবস্থায় তিনি শুধু জানতে চেয়েছিলেন— তাঁর তো একটিই কন্যা, তিনি কি সম্পদের দুই তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দিতে পারেন? নবীজী বললেন, না। এক তৃতীয়াংশ, এবং এক তৃতীয়াংশও বেশি। (সহীহ বুখারী; সহীহ মুসলিম ১৬২৮/৫)
খেয়াল করুন— এটি ছিলো আল্লাহর রাস্তায় সদকা করার ইচ্ছা। উদ্দেশ্যের দিক থেকে এর চেয়ে পবিত্র নিয়ত আর কী হতে পারে? তবু ওয়ারিশদের অংশ কমে যাবে বলে নবীজী অনুমতি দেননি। সে সময় তাঁর ওয়ারিশদের মধ্যে ছিলেন ভাই আমের বিন আবী ওয়াক্কাস এবং একাধিক ভাতিজা— অর্থাৎ ঠিক সেই আসাবাই, যাদের বঞ্চিত করার ব্যবস্থা আজ আইন করে বানানো হচ্ছে।
নবীজী তাঁকে বলেছিলেন—
إِنَّكَ أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ، خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ
‘তুমি যদি তোমার উত্তরাধিকারীদের সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাও, তা এর চেয়ে উত্তম যে তুমি তাদের এমন অবস্থায় রেখে যাবে যে তারা মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়াবে।’ (বুখারী, মুসলিম ১৬২৮/৫; মুয়াত্তা মালেক ২৮২৪; আবু দাউদ ২৮৬৪; নাসাঈ ৩৬২৬; তিরমিযী ২১১৬; ইবনে মাজাহ ২৭০৮)
সৎ উদ্দেশ্য শরীয়তের সীমা মুছে দেয় না। উদ্দেশ্য যত মহৎই হোক, পথ যদি আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে— তাহলে সেটা সমাধান নয়।
مَنْ قَطَعَ مِيرَاثًا فَرَضَهُ اللهُ قَطَعَ اللهُ مِيرَاثَهُ مِنَ الْجَنَّةِ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার বাতিল করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের উত্তরাধিকার বাতিল করে দেন।’ (সুনানে সাঈদ বিন মানসূর, পৃ. ১১৮, হাদীস ২৮৫; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, খ. ১৬, পৃ. ২১৫)
সমস্যাটা তাহলে সমাধান হবে কীভাবে
এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া অসততা হবে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অসহায়ত্ব বাস্তব, এবং এর সমাধান দরকার।
কিন্তু সমাধান মিরাসের বিধান কাটাছেঁড়া করে নয়।
এক, ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, ওই আইনে বাবা-মাকে আদালতে যেতে হয় বলে সেটা কাজে লাগে না। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নতুন আইনেও ছেলে ভোগাধিকার না দিলে বাবাকে জেলা জজের কাছে পিটিশন করতে হবে— এটা তিনি নিজেই বলেছেন। তাহলে আদালতে যাওয়ার সমস্যাটা তো রয়েই গেলো, শুধু ঠিকানা বদলালো।
দুই, প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবস্থা— বৃদ্ধ নাগরিকদের জন্য দ্রুত প্রতিকারের সেল, স্থানীয় সালিশি কাঠামো, উত্তরাধিকার সনদ প্রক্রিয়ার সরলীকরণ। এসবের কোনোটিতেই ফরায়েযে হাত দিতে হয় না।
তিন, সবচে জরুরি কাজটা আইনের নয়— দাওয়াতের। বাবা-মাকে বের করে দেওয়া একটা আইনি ফাঁকফোকরের সমস্যা নয়, এটা ঈমান ও আখলাকের সংকট। মসজিদ, মাদরাসা, খুতবা, পাঠ্যক্রম— এই জায়গাগুলোতেই কাজটা করতে হবে। যে সন্তান আখেরাতের হিসাব বিশ্বাস করে, সে বাবাকে রাস্তায় নামায় না। আর যে করে না, সে ইউসোফ্রাক্টের কাগজ দেখেও থামবে না।
শেষ কথা
জওয়াবের সারকথা এটুকুই— মুসলিম উত্তরাধিকার সংক্রান্ত এই বিধান যেহেতু কুরআন ও হাদীসে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বর্ণিত এবং উম্মতের উলামায়ে কেরামের ইজমাসম্মত, তাই এতে কোনো ধরনের সংশোধন ও পরিবর্তনের ন্যূনতম অবকাশ নেই।
আর যে প্রস্তাব হাজির করা হয়েছে, সেটিও শরীয়তের দৃষ্টিতে বাতিল। কারণ হাকীকতের বিচারে এটি ওয়ারিশদের জন্য অসিয়ত। আর যদি নাম দেখে একে ‘দান’ বলা হয়, তাহলেও— কবযা না হলে গ্রহীতা মালিক হবেন না, সম্পদ ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টিত হবে; আর কবযা হয়ে গেলে সম্পত্তি তখনই দাতার মালিকানা থেকে বেরিয়ে যাবে, তখন দাতার জীবদ্দশায় ভোগের প্রশ্নই আসে না।
দুইদিকেই আইনটা নিজের সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলামী শরীয়ত এমন স্ববিরোধিতার কথা বলতেই পারে না। মানবরচিত যে আইনের নিজের প্রতি সামান্য আত্মসম্মানবোধ আছে, সেও নিজের জন্য এ ধরনের স্ববিরোধিতা বরদাশত করবে না।
মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, ভবিষ্যতে ‘প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডে’ সমস্যা দেখা দিলে দেখা যাবে। আমি বলবো, প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডে যাওয়ার আগেই সমস্যাটা ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন সংশোধনের সুযোগ আছে, পরে থাকবে না।
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَىٰ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
‘যে কেউ রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে— তার কাছে সরল পথ স্পষ্ট হওয়ার পরও— এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে সেদিকেই ছেড়ে দেবো যা সে অবলম্বন করেছে, এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল।’ —সূরা নিসা (৪) : ১১৫
আয়াতটা কারো বিরুদ্ধে ছুঁড়ে দেয়ার জন্য নয়। নিজেসহ আমাদের সবার জন্যই স্মরণ।
এখন প্রশ্নটা আমাদের সবার সামনে— আইনপ্রণেতারা কি আরেকবার বসতে রাজি আছেন? আর আলেমসমাজ ও শিক্ষিত তরুণরা কি বিষয়টা যথাযথভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারবেন?
নোট: এই লেখাটি মুফতি মুহাম্মাদ আবদুল মালেক সাহেবের (আমীরুত তালীম, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা; খতীব, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ) সম্প্রতি প্রকাশিত বিস্তারিত ফতোয়ার আলোকে লেখা। দলিল, রেফারেন্স ও যুক্তির কাঠামো তাঁরই; উপস্থাপনা ও প্রাসঙ্গিক সংযোজন লেখকের। মূল ফতোয়াটি পড়তে পারেন এখানে…


Leave a Reply