[Monthly Neyamat, october, 2017]

চলতি বছরটা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য রীতিমতো বিপর্যয়কর। দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হলে দেশেবাসী ভালো থাকে কী করে?…

বিপদটা মূলত মানুষের- আমাদের। ফসলহানী-হাওরবিপর্যয়-বন্যা একটার পর একটা আঘাতে দেশের অর্থনীতি প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। মেরুদ- তো গেছেই, বেশিরভাগ দেশবাসীর এখন কিডনি বিকল হওয়ার জোগাড়।

কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে বরাবরই বৃষ্টি আমাদের জন্য অনন্য নেয়ামত। তবে জ্বরের মুখে মিষ্টি যেমন, মাত্রা বেশি হয়ে গেলে নেয়ামতও অভিশাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আগাম ও রেকর্ড গড়া বৃষ্টি বাংলাদেশের জন্য এবার অভিশাপ হয়েই দেখা দিয়েছে। সাথে দেশের প্রশাসনিক দুর্নীতি আর বন্ধুরাষ্ট্রের খামখেয়ালী যোগ হয়ে পরিস্থিতিকে করে তুলেছে ভয়াবহ।

আমাদের বড় প্রায় সব নদীর উজানে ভারতের বাঁধ দেওয়া শেষ। প্রতিবারের মতো এবারো তারা বৃষ্টির সব পানি নিজেরাই কাজে লাগাতে চেয়েছিলো। ভরা পেটে কতো আর গেলা যায়? সইতে না পেরে একসময় বমি করার মতো হঠাৎ সবগুলো বাঁধের গেট খুলে দিলো। আটানব্বইয়ের পর প্রায় বিশ বছরের ব্যবধানে আবার ডুবলো দেশের উত্তরাঞ্চল।

আগাম বৃষ্টি ও হাওরবিপর্যয়ে বিপন্ন মানুষগুলো ঘুরে দাঁড়াবার আগেই আরো বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে একেবারে দিশেহারা হয়ে গেলো।

দেশে এমন বৈরি বাস্তবতা আর পবিত্র হজ্ব-কুরবানির মাহাত্ম সামনে রেখে গত ২৫ আগস্ট নতুন একটা খবর আমাদের চমকে দিলো। আরসা (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরাকান রোহিঙ্গা মুক্তিবাহিনী) নামের একটা সংগঠন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৩০টি পুলিশ চৌকি এবং একটি সেনাছাউনিতে হামলা চালিয়েছে। খুন করেছে মিয়ানমারের ১২জন নিরাপত্তারক্ষীকে, পাল্টা আক্রমণে নিহত হয়েছে ওদের ৫৯জন মতান্তরে ৭৭জন সদস্য।

গত কয়েক বছর ধরে ফিলিস্তিনের মুসলমানদের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো রাখাইনের (সাবেক আরাকান) রোহিঙ্গারা। ১২-১৩ এবং বিশেষত ১৫ সালে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় ও সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের শিকার হয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলো।

এখন রোহিঙ্গাদের তরফ থেকে এমন আক্রমণের পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় বৌদ্ধসন্ত্রাসীদের দিক থেকে কেমনতর প্রতিআক্রমণটা আসবে- সে আশংকাটাই আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুললো। অবশ্য সময়ও লাগে নি। রাত পেরুতে না পেরুতেই দুঃসংবাদগুলো আসতে শুরু করলো। এবার আর গতানুগতিক সেনাতল্লাশী বা সেনাবাহিনীর আশ্রয়ে উগ্র বৌদ্ধরা নয়, রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী প্রকাশ্য অভিযানে নামলো। সুযোগ পেয়ে স্থানীয় বৌদ্ধসন্ত্রাসীরাও নব উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়লো।

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে অসহায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে ওরা মেতে উঠলো নারকীয় তা-বে।

ভয়াবহতার টুকরো খতিয়ান

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ও এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সূত্র বলছে- রাখাইনে প্রথম তিন সপ্তাহেই হত্যা করা হয়েছে প্রায় পাঁচশত রোহিঙ্গা মুসলিমকে। যাদের লাশেরও তেমন হদিস পাওয়া যায় নি। অবশ্য স্থানীয়দের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে- নিহতের সংখ্যা কম করে হলেও হাজার ছাড়িয়েছে। আর শুধু খুন নয়, কেটে টুকরো টুকরো করে বেশিরভাগ লাশই ওরা আগুনে পুড়িয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পথে নাফ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১২০টি লাশ, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। ১৭৭টি রোহিঙ্গাগ্রাম কাঁচাপাকা ঘরসহ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছে। অর্ধেক বা আংশিক জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে আরো প্রায় ৫০টি গ্রাম। শত শত রোহিঙ্গা নারীকে নিষ্ঠুরভাবে ‘লাঞ্চিত-অপদস্থ’ করা হয়েছে। ওরা এমনকি বয়ষ্ক রোহিঙ্গা এবং শিশুদেরও খুন-নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই দেয় নি।

সবগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই অভিযানকে সরাসরি এথনিক ক্লিন্সিং বা জাতিগত নিধন বলতে বাধ্য হয়েছে। জীবন বাঁচিয়ে কোনোরকমে পালিয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক। গায়ের পোশাক বা সামান্য গহনা ছাড়া তেমন কিছুই কেউ নিয়ে আসতে পারে নি। আড়াইশ গ্রামের প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক সব হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক কোনো মিডিয়াকেই অনেকদিন হলো রাখাইনের ধারেকাছেও ঘেষতে দেয়া হচ্ছে না।

আকাশ থেকে পাওয়া স্যাটেলাইটচিত্রের সাহায্য নিয়ে এই অভিযানকে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্মরণকালের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

চূড়ান্ত অভিযানে কোনো সামরিক বাহিনী যেমন শত্রু এলাকার সবকিছু ধ্বংস করে, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য- মিয়ানমারের এই তথাকথিত ক্লিয়ারেন্স অপারেশনেও একই তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। রোহিঙ্গা সাক্ষে উঠে এসেছে- কোনো গ্রামে হামলা চালাবার আগে সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধরা মিলে পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে ফাঁকা গুলি ছুঁড়তো। ভয়ে মানুষ পালাতে শুরু করলে নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে ওরা গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করতো। এরপর পুরো গ্রামে আগুন লাগিয়ে দিতো।

অতীতে, বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে রোহিঙ্গা নির্যাতন মিয়ানমারে স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এতোটা ভয়াবহতা কখনো দেখা যায় নি।

যে কারণে মাত্র দু’ সপ্তাহে মোট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের মতো নাগরিক সব ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।

আরসার প্রতিষ্ঠা ও প্রত্যাশা

ঘটনার সূত্রপাত যাদের হাত হয়ে- সেই আরসাকে নিয়েই এখন চলছে সবচে বেশি জল্পনা-কল্পনা। আরসা কী, কারা আছে আরসার পেছনে, কেনো তারা এমন সময় হামলা করলো যখন দীর্ঘ এক বছরের গবেষণা শেষে কফি আনান কমিশন মাত্রই তাদের সুপারিশনামা পেশ করেছে?

স্মরণকালের ভয়াবহতম অভিযান শুরু করার আগে মিয়ানমার সরকার জানিয়েছে- আরসা ইসলামী জঙ্গিবাদীগোষ্ঠীর যোগসাজশে এই হামলা চালিয়েছে। সুতরাং যে কোনো মূল্যে রাষ্ট্র থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল করার উদ্যোগ তারা নেবে। সুযোগ লুফে নিয়ে তৎক্ষণাৎ ভারত-চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশীদ্বয় মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে। ভারতের আচরণ তো ছিলো পুরোই নির্লজ্জরকম। পরে রাশিয়াও একই কথা বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হুঁশিয়ার করেছে। জাতিসংঘ এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র লম্বা সময় পর্যন্ত নীরব থেকেছে একই অজুহাতে।

তবে এতো আলোচনা যাদের ঘিরে- সেই আরসা বা আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির মজবুত কোনো ভিত বা বড়রকমের তৎপরতার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। দুটো ভিডিও বার্তা, টুকরো কয়েকটা ইন্টারভিউ- সাকুল্যে এই হলো আরসার অস্তিত্বের এভিডেন্স।

বিভিন্ন সূত্রে যেটুকু নিশ্চিত হওয়া যায়- ২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই আরসার জন্ম। যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রীয় হয়রানি ও সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়ে এলেও ২০১২ সালে সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় স্থানীয় বৌদ্ধদের হাতে নির্মম নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের মুখে পড়ে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় এক লাখ মানুষ তখন বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।

আরসার সূত্র জানাচ্ছে- দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এমন প্রেক্ষাপটেই আরসার জন্ম। পাকিস্তান শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেয়া সৌদিপ্রবাসী রোহিঙ্গা নাগরিক আতাউল্লাহ আবু আমের জুনুনী এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। আতাউল্লাহর পরিবার জুলুমের শিকার হয়ে আরাকান থেকে পাকিস্তান পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। একসময় সৌদিআরবে গিয়ে ভাগ্য ফেরান আতাউল্লাহ। ইসলামী শিক্ষায় নিজেকে শিক্ষিত করেন।

সৌদিতে দেড় লাখ রোহিঙ্গা অভিবাসীর মধ্যে শিক্ষা-যোগ্যতা-অর্থবিত্তে নিজেকে তিনি বেশ ভালো অবস্থানে উন্নীত করেন। ইমামও ছিলেন। ২০১২ সালে রোহিঙ্গাগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা তাকে ভাবিয়ে তোলে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে পাকিস্তান হয়ে তিনি মিয়নমারে ফেরেন। পাকিস্তান-আফগানিস্তানের বিভিন্ন সশস্ত্রগোষ্ঠীর কাছে তিনি অর্থের বিনিময়ে প্রশিক্ষণগ্রহণ ও অস্ত্রের যোগান চেয়েছেন বলে খবর বেরুলেও সেসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় নি।

রাখাইনে ফিরে তিনি রোহিঙ্গা যুবকদের সংগঠিত করে ঘরোয়া অস্ত্রে তাদের প্রশিক্ষিত করে তোলেন। আরসার প্রথম অস্তিত্বে আসার খবর বের হয় গতবছরের (২০১৬ সাল) অক্টোবরে। রাখাইনের মংডুর শহরতলীর তিনটি পুলিশ ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে নয়জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে আরসা। ছুরি আর লাঠিসোটা নিয়ে মাত্র কয়েক ডজন লোক অতর্কিত হামলা চালিয়ে ওদের হত্যা করতে সক্ষম হয়।

অক্টোবর মাসেরই শেষ দিকে আরসাপ্রধান আতাউল্লাহ জুনুনী ১৮ মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় এই হামলার দায় স্বীকার করেন এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংস উসকানীকে সেজন্য দায়ী করেন।

তিনি বলেন- ‘ ৭৫ বছর ধরে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-অত্যাচার চালিয়ে এসেছে। এ কারণেই ৯ অক্টোবর আমরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছি। আমরা এ বার্তাই দিতে চেয়েছি- আমাদের ওপর হামলা যদি বন্ধ না হয়- তাহলে আত্মরক্ষার অধিকার আমাদের অবশ্যই আছে।’

নয়জন নিরাপত্তারক্ষীকে হত্যা করে আরসা তাদের কাছে থাকা হালকা ধরনের কিছু অস্ত্রও লুট করতে সক্ষম হয়। এখনও পর্যন্ত আরসার অস্ত্রশক্তির সক্ষমতা হিসেবে এটুকুই সামনে এসেছে। আরসার এই হামলার জেরে রাখাইনের মুসলিমগ্রামগুলো ঘিরে ব্যাপক তল্লাশি ও নির্যাতন চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে সরব হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার চাপে সু চি সরকার রাখাইন রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানকল্পে এডভায়জরি কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ গবেষণা শেষে সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে কমিশন মাত্রই তাদের সুপারিশনামা পেশ করেছে। এর মধ্যেই আরসার এই হামলার খবর বেরুলো।

অপারেশন ক্লিয়ারেন্সের নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী স্থানীয় বৌদ্ধদের নিয়ে শুরু করলো স্মরণকালের ভয়াবহ এক অভিযান। যে অভিযানের জেরে ইতোমধ্যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছেন সহ¯্রাধিক রোহিঙ্গা নাগরিক। বর্বরতার শিকার হয়েছেন অজ¯্র রোহিঙ্গা নারী। প্রা

য় পৌনে পাঁচশ (৪৭১টি) রোহিঙ্গাগ্রামের মধ্যে আড়াইশ গ্রাম ভেঙে-পুড়িয়ে উজাড় করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় এখনও (সেপ্টেম্বরের শেষদিক পর্যন্ত) কালো ধুয়ার কু-লি উঠতে দেখা যাচ্ছে বলে খবর বেরুচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক।

অতীত-বর্তমান মিলিয়ে প্রায় অর্ধেক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীরই অবস্থান এখন বাংলাদেশে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ন্যাশনাল কলেজের অধ্যাপক জাকারি আবুজা এই হামলার মূল্যায়ন করতে গিয়ে এক লেখায় বলেছেন- ‘৭৭ জন বিদ্রোহীর প্রাণের বিনিময়ে ১২জন পুলিশের জীবন- একে কোনোভাবেই রণকৌশলের জায়গা থেকে জয় বলা যাবে না। তবে কৌশলগত জায়গায় আরসার জয় হয়েছে।’ এদিকে পনের দিনের মাথায় আরসা একতরফাভাবে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও মিয়ানমার তাতে সাড়া দেয় নি। সহিংসতা ও সেনাঅভিযান পুরোদমে চলছে।

হামলার প্রেক্ষাপট নিয়ে আরসা অবশ্য বলছে ভিন্ন কথা। অরসানেতা আতাউল্লাহ জুনুনীর মুখপাত্র আব্দুল্লাহ এশিয়া টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন- ‘গত অক্টোবরে শুরু হওয়া সেনাভিযান একদিনের জন্যও বন্ধ হয় নি।

মিডিয়া ও মানবাধিকারসংস্থাগুলোর প্রবেশ বন্ধ রেখে রোহিঙ্গাগ্রামগুলোতে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েছে সেনাবাহিনী। যুবকদের ধরে ধরে খুন করেছে। যুবতী নারীদের উঠিয়ে নিয়ে গেছে। ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি কফি আনান মিয়ানমারে অবস্থানকালীনই এক গ্রামের ২৫ জন রোহিঙ্গা যুবককে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

এমন ভয়াবহ প্রেক্ষাপটে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়েই আমরা হামলার সিদ্ধান্ত নিই। কারণ আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিলো না। আমাদের এ হামলা ছিলো আত্মরক্ষামূলক। রোহিঙ্গা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’ আরসার দাবি- তারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী ১০ লাখ রোহিঙ্গার নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকারের জন্য লড়ছে।

তাদের মূলনীতি- রক্ষা করা, উদ্ধার করা ও প্রতিরোধ গড়া। আরসা নিজেকে যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তকমা থেকে দূরে রাখার দাবি জানায়। এর আগে চলতি বছরের আগস্টে আরসাপ্রধান আতাউল্লাহ বলেন- ‘মানুষের মতো বেঁচে থাকার জন্য আত্মরক্ষার্থে বৈধভাবে লড়াই করার অধিকার আমাদের রয়েছে। আরসা তিন বছর ধরে রয়েছে, কিন্তু রাখাইনের কোনো মানুষ বা রোহিঙ্গাদের সম্পদের কোনোরকম ক্ষতি আমরা করি নি।’

২৫ আগস্ট আরসার হামলার খবর বেরুনোর পরপরই মিয়ানমার সরকার জোরেশোরে প্রচার শুরু করে- আরসা ইসলামী জঙ্গী সংগঠন। আন্তর্জাতিক জঙ্গিসংগঠনগুলোর সাথে মিলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ওরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। প্রতিবেশী কিছু দেশসহ বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোও এই তথ্য বিশ্বাস করতে শুরু করে। অবশ্য আরসার মুখপাত্র দ্রুতই সে অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন।

আরসা বলছে- তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জিহাদ নয়। বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। ময়িানমাররে মধ্যইে রোহঙ্গিাদরে নাগরকিত্ব এবং মৌলকি অধকিারগুলো নশ্চিতি করাই তাদরে উদ্দশ্যে। সংগঠনরে প্রধান নতোর মুখপাত্র আবদুল্লাহ বলনে- ‘আরসা র্ধমভত্তিকি নয়, জাতগিত অধকিারভত্তিকি সংগঠন। আব্দুল্লাহ বলেন- ‘মুসলমান বলেই আরসার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জিহাদী তৎপরতার সম্পর্ক আছে বা তারা আমাদের খেয়ে ফেলতে পারবে এমন দাবি ঠিক নয়।

মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে রোহিঙ্গাদের পুনর্বহাল করতে হবে। যতোদিন আমাদের দাবি না মানা হবে, ততোদিন আমাদের লড়াই চলবে। মিয়ানমার সরকার নিয়মিতভাবে আরসাকে বাঙালী সন্ত্রাসবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে। ২৭ এ আগস্ট সংগঠনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেআইনি ঘোষণা করে মিয়ানমার।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আরসার আহ্বান- ‘আরসাকে সন্ত্রাসবাদী ভাবা কিংবা মিয়ানমার সরকারের ফাঁদে পড়া থেকে সতর্ক থাকুন।’

মিয়ানমারের সেনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বৌদ্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর ধারাবাহিক নির্যাতনে রোহিঙ্গারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিন্ন দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। মূলত ১৯৭০ এর দশক থেকে রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে শুরু করে। গত ৪৫ বছরে দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, পাকিস্তান, ভারত ইত্যাদি দেশে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়।

রাষ্ট্রের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় রোহিঙ্গাদের টুটি চেপে ধরা হয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা, চলাফেরা এমনকি মৌলিক অধিকারও সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের পড়াশোনার অধিকার নেই। চলাফেরা নিজ শহর মংডু পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। এর বাইরে কোথাও ওরা যেতে পারে না। ভোটাধিকার নেই। নাগরিকত্বও কেড়ে নেয়া হয়েছে। সন্তান নেয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে বাধ্যবাধকতা।

এছাড়া পুরো দেশের অধিবাসীদের মনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সন্দেহের মনোভাব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ভীতিকর অবস্থায় বিদ্রোহী হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে কি? কেনো সাধারণ হাতে তৈরি অস্ত্র নিয়ে বিশ্বের ক্ষমতাধর ও আধুনিক একটি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য হলো রোহিঙ্গারা? রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামের একজন নেতা এ প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন- ‘ভেড়ার মতো মার খেয়ে মরার চেয়ে তাদের কাছে যুদ্ধ করে মরে যাওয়াও অনেক ভালো।’ সূত্র- আল জাজিরা, বিবিসি, উইকিপিডিয়া।

আরসার হামলা বনাম মিয়ানমারের ষড়যন্ত্র

আরসার অস্তিত্ব এবং হামলার খবরে অসত্যের কিছু নেই। আরসা আছে, হামলাও তারা চালিয়েছে। তবে নানাকারণে ঘুরেফিরে প্রশ্নটা উঠছে- এই হামলার মূল বেনিফিশিয়ারি কারা? কে বেশি উপকৃত হলো- আরসা না মিয়ানমার? একটা জায়গায় হয়তো আরসার সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়াসহ বিশ্ববাসীর কাছে রোহিঙ্গাদের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা গেছে। উন্মোচিত হয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কদর্য রূপ। কিন্তু আর সব বিচারেই এগিয়ে রয়েছে মিয়ানমার সরকার, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়। এবারকার হামলার পর যেভাবে, যতোটা তড়িৎ গতিতে মিয়ানমারের বর্বর সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করেছে ও চালিয়ে গেছে, বিশ্লেষকরা বলতে বাধ্য হচ্ছেন- পূর্বপরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ছাড়া এমন অভিযান সম্ভব নয়। একেকটা গ্রামকে চারদিক দিয়ে ঘিরে সব অধিবাসীকে হত্যা ও ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার মতো উন্মত্তরূপ এর আগে কখনো তারা দেখায় নি।

হামলার ধরন দেখে রোহিঙ্গারা যে যেভাবে পেরেছে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ছুটেছে। শুধু তল্লাশি বা আরসার সদস্যদের পাকড়াও করা উদ্দেশ্য থাকলে এমনতর হামলা হতেই পারে না। একদিকে এমন হামলা অন্যদিকে বাংলাদেশ সীমান্তের দিক থেকে পাহারা শিথিল করে, বলা ভালো কার্যত উঠিয়ে দিয়ে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসতে সুযোগ করে দেয়ার ঘটনায় নানারকম হিসেব সামনে এসেছে।

ভারতসহ শক্তিধর দেশগুলোর ওমন নজিরবিহীনভাবে মিয়ানমারের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা সে হিসেবগুলোকে আরো ডালপালা ছড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে।

মিয়ানমার দশকের পর দশক সেনাশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ঠ হয়েছে। এখন গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলেও কে না জানে- নিয়ন্ত্রণ মূলত সেনাবাহিনীর হাতেই। বছরের পর বছর ধরে জনকল্যাণের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় খাত, অস্ত্র-গোলাবারুদ ও নিজেদের আখের গোছানোর পেছনেই রাষ্ট্রের বেশিরভাগ অর্থ ব্যয় করেছে সেনাবাহিনী। রাষ্ট্রের বড় সব ব্যবসায়ের সুযোগ সেনাবাহিনীর আশীর্বাদপ্রাপ্ত কয়েকটামাত্র পরিবারের হাতে।

আন্তর্জাতিক অবরোধ তুলে নেয়ার প্রেক্ষাপটে এখন আবার প্রতিবেশী শক্তিধর রাষ্ট্রসহ পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোর সাথে করা বিভিন্ন বাণিজ্য ও অন্যান্য চুক্তির ক্ষেত্রেও জনকল্যাণচিন্তার তেমন প্রতিফলন নেই। মিয়ানমারের নাগরিকদের মনে তাই ক্ষোভের শেষ নেই। এমন পরিস্থিতিতে জাতিগত বিরোধসহ এমন একটা পরিস্থিতি মিয়ানমারের দরকার, যাতে জনগণের মনোযোগ তাদের মৌলিক দাবিদাওয়া থেকে সরিয়ে ধর্ম বা জাতিগত বিষয়ে ডুবিয়ে রাখা যায়।

রাখাইনরাজ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা মিয়ানমারের চাওয়া অনেকটাই মিটিয়ে চলেছে। সব বিরোধ ভুলে পুরো জাতি এখন এক প্লাটফর্মে এসে দাঁড়িয়েছে।
রোহিঙ্গা বিতাড়নের আরেকটা বড় কারণ অর্থনৈতিক বিবেচনা।

২০১১ সালের পর মিয়ানমার সরকার চীন-ভারতসহ বেশ ক’টি বড় রাষ্ট্রের সাথে অনেকগুলো দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তি করেছে। রাখাইন স্টেটকে অর্থনৈতিক জোন হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্তও বেশ আগেই নেয়া হয়ে গেছে।

আবাসন, শিল্পপার্ক, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তিও ইতোমধ্যে পাশ করা হয়ে গেছে। তাছাড়া রাখাইন অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনার খবরও চাউর হয়েছে। সীমান্তযোগাযোগের প্রশ্নেও রাখাইনের অবস্থান অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আর এই সব বিবেচনায় মিয়ানমারের সবচে’ বেশি যেটা দরকার সেটা হলো জমি। যে কোনো মূল্যে জমি তাদের চায়-ই। এই মুহূর্তে যুগ যুগ ধরে চলে আসা রোহিঙ্গা ইস্যুটাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তারা কী করে হাতছাড়া করে?

২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক হামলার পর থেকে এবারকার হামলার আগ পর্যন্তই সেনাবাহিনী ৩১ লাখ একর জমির দখল নিয়েছে, যে জমির পুরোটাজুড়েই ছিলো রোহিঙ্গাদের বাস। এবারের নৃশংস হামলায় উজার হওয়া আরো ২৫০ শত রোহিঙ্গা গ্রাম এবং তাদের ফসলি জমিজমাও যে সরকারি ভূমিদখলের আওতায় চলে যাবে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। ঠিক এই কারণেই তাৎক্ষণিকভাবে ভারত-চীন নিজেদের মধ্যে প্রবল বিরোধ থাকার পরও একযোগে মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে। নীরব ভূমিকা নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া তো নির্লজ্জভঙ্গিতে সহিংসতার বিষয়টিই উড়িয়ে দিয়েছে।

কফি আনান কমিশনের সুপারিশ প্রদানের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক যে চাপ মিয়ানমারের ওপর আসছিলো- সেই চাপ আলোর মুখ দেখার আগেই ওরা রোহিঙ্গা গ্রামগুলো উজার করে নিলো। রোহিঙ্গারা কবে রাখাইনে ফিরবে বা আদৌ ফিরতে পারবে কিনা কোনো নিশ্চয়তা নেই। যদি ফিরেও, এটুকু নিশ্চিত- নিজেদের গ্রাম ও ভিটে-মাটি ওরা আর ফিরে পাচ্ছে না। রাখাইনের বস্তিসদৃশ আর সব অস্থায়ী শিবিরের মতোই নতুন কোনো শিবিরে হয়তো ওদের ঠাঁই হবে। আরসার এই হামলার ঘটনা তাহলে কাকে বেশি উপকৃত করলো? একটা হামলার পর আরসার বিপ্লবী সদস্যরা গা ঢাকা দিয়েই বা রইলো কোথায়?

এদিকে কক্সবাজার এলাকার জেলেদের বরাতেও চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য এসেছে। গত পাঁচ বছরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পারাপারের সাথে ওরাই প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এবারও প্রায় ৮০০ নৌকা রোহিঙ্গাদের পারাপার করেছে। নৌকার মাঝিরা বলছে- রাখাইনে কিছু একটা ঘটছে বা ঘটবে এটা আমরা সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক থেকেই টের পাচ্ছিলাম। নাফ নদীতে মিয়ারমার সীমান্তরক্ষীদের টহল বড়ই কড়া। প্রায়ই ভুলে ওদের সীমানায় ঢুকে পড়া কোনো না কোনো নৌকাকে ওরা আটকে জরিমানা আদায় করতো।

তবে সেপ্টেম্বররের পর থেকে পরিস্থিতি শিথিল হতে থাকে। রাখাইনরাজ্যের জেলেরাও বাংলাদেশের জেলেদের নানারকম ইঙ্গিত দিতে থাকে। ফলে আগেভাগেই খবর পেয়ে যায় বাংলাদেশের মাঝি ও নৌকার মালিকেরা। উড়ো খবর আর মিয়ানমার টহলবাহিনীর ছাড় পেয়ে ওরা নৌকা নিয়ে সরাসরি রাখাইনে ঢুকে পড়ে। পারাপার শুরু করে রোহিঙ্গাদের।

প্রশ্ন হলো- আরসার হামলার খবর আগে থেকে না জানলে বা পূর্ব প্রস্তুতি না থাকলে এটা কীভাবে রটলো? আরসার হামলার ঘটনাকে একতরফাভাবে কেবল রোহিঙ্গাদের স্বাধিকার আন্দোলনের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়াটা এই বিবেচনায় একটু কঠিনই। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমরকৌশল সম্পর্কে কোনোরকম ধারণা না রাখা এসব বীর সেনানীরা বুঝতেই পারে না- নিজেদের অজান্তে বা একগুয়েমিতে মূলত কাদের উপকার তারা করে চলেছে? ‘ভুল পথে’ নিজেদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে গিয়ে ওরা মূলত কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে?

কঠোর গোয়েন্দা জাল বিস্তার করে রাষ্ট্রের প্রতিটি অংশের মতো প্রায় প্রতিজন নাগরিকের ভাবনা ও পথচলার খবরও আধুনিক রাষ্ট্রগুলো আজকাল রাখে। হামলা বা সন্ত্রাসবাদের সব ঘটনা যে সরকার বা সেনা ও গোয়েন্দাসংস্থার অগোচরে হয় না বা হতে পারে না, এই সত্যও তো অনেক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং আরসার এই হামলার ঘটনা যে তেমনই কোনো ট্র্যাপ নয় কে বলতে পারে? ২৫ আগস্টের খবরের পূর্বাপর বিবেচনা বরং সে আশংকাকেই সত্যি করে তোলে। অবশ্য সবসময় সব বিবেচনা অর্থবহও হয় না।

প্রবল বৈপরিত্য সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের হামাসও তো কখনো কখনো আগ বাড়িয়ে ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে জড়ায়। এক্ষেত্রেও সেরকম কিছু হতেই পারে। আরসার সামনে অন্য বিকল্প হয়তো ছিলো না, তবু স্বীকার করতেই হবে- এই হামলা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামনে এসেছে আশীর্বাদ হয়ে। এরচে’ ভালো সুযোগ আর হয়তো হতে পারতো না। এক ঢিলে ওরা দুটো নয় তিনটি পাখি শিকার করতে সক্ষম হয়েছে- রোহিঙ্গা বিতাড়ন, ভূমিদখল এবং ইসলামী জঙ্গিবাদের ঢোল বাজিয়ে বড় রাষ্ট্রগুলোর অনুকম্পা লাভ। দেশের ভেতরে জাতীয় ঐক্য বা নিজেদের রাজনৈতিক লাভালাভের ব্যাপার তো রইলোই।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কে কোন পথে

মুসলিম ইস্যুতে জাতিসংঘের ভূমিকা বরাবরই দায়সারা গোছের। মিয়ানমার সরকার ইসলামী জঙ্গিবাদের প্রসঙ্গ সামনে আনায় এবার তো যেনো চোখ বন্ধ রেখেই পার পেতে চেয়েছিলো। তুরস্কের তৎক্ষণাৎ সরব হওয়ার পর আন্তর্জাতিক কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা যখন জাতিসংঘের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যর্থতার অভিযোগ তুললো, মান বাঁচাতে দ্রুত তৎপরতা দেখাতে শুরু করলো সংস্থাটি। মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রধানগণ বিবৃতি দিতে শুরু করলেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত হাইকমিশন মিয়ানমারের আক্রমণকে জাতিগত নিধন হিসেবে স্বীকৃতি দিলো। নারী ও শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ক অঙ্গসংস্থা ইউনিসেফ রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে শুরু করলো। এরপর অবশ্য মোটের ওপর ভালোই সরব থেকেছে জাতিসংঘ। যুক্তরাজ্য ও সুইডেনের আমন্ত্রণে প্রথম বৈঠকের পর এক মাসের ব্যবধানে আরো দু’বার সদস্য রাষ্ট্রদের নিয়ে বৈঠক করেছে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা পরিষদ।

এক দশক পর সদস্য রাষ্ট্রগুলো প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিবৃতি দিতে সম্মত হয়েছে। অক্টোবরেই আবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশন থাকায় বাংলাদেশ সরকারসহ অনেকগুলো রাষ্ট্রই মিয়ানমারের গণহত্যা নিয়ে সরব হয়েছে। মিয়ানমার সরকারের জন্য এটা বেশ বড় একটা চাপ সৃষ্টি করেছে। বিরূপ পরিস্থিতি এড়াতে সু চি অধিবেশনে অংশগ্রহণ বর্জন করলেও দীর্ঘ নিরবতা ভেঙে বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন। যদিও তার সে বিবৃতি প্রশংসার চেয়ে নিন্দাই কুড়িয়েছে বেশি। সেনাবাহিনীর অপকর্ম ঢাকতে নিজের ইমেজকে তিনি ডুবিয়ে দিয়েছেন। কিংবা কে জানে- তার চাওয়াটাও হয়তো এমনই ছিলো।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচে’ কার্যকর, পজিটিভ ও তাৎক্ষণিক ভূমিকা রেখেছে এরদোগানের তুরস্ক। নির্লজ্জ ভূমিকা নিয়েছে ভারত-চীন-রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলো। ইরান ছাড়া আরব রাষ্ট্রগুলো বিশেষত সৌদি আরবের ভূমিকাও ছিলো প্রশ্নবদ্ধি। অবিলম্বে অভিযান বন্ধের আহ্বানসহ কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বিশ্ববাসীর নজর ঘোরাতে ফার্স্টলেডিকে বাংলাদেশে প্রেরণসহ প্রথমদিকের বড় ত্রাণের চালানও তুরস্কই পাঠিয়েছে।

বিপরীতে প্রথম দিকে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র-চীন দর্শকের ভূমিকা নিলেও ভারত প্রকাশ্যে মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে মিয়ানমার গিয়ে সমর্থন জানিয়ে এসেছেন।

ভারতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়গ্রহণের পথ রুদ্ধ করেছেন। একদিকে চাকমা-হাজংসহ এক লাখ আদিবাসীকে ভারতের নাগরিকত্ব প্রদানের ঘোষণা এসেছে, অন্যদিকে বিভিন্ন সময় ভারতে আশ্রয় নেওয়া চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গাকে ভারত থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন বিবৃতি ও তৎপরতায় রোহিঙ্গাইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকায় ভারতের নাখোশ মনোভাবও গোপন থাকছে না।

নিজের স্বার্থের বাইরে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে চীন রবরাবরই নীরব ভূমিকা নিয়ে থাকে। রোহিঙ্গাইস্যুতে এবার বড় ব্যতিক্রম দেখা গেলো। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণহত্যার ব্যাপারটি সরাসরি পাশ কাটিয়ে বললেন- শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে মিয়ানমারের উদ্যোগকে তারা সমর্থন করছেন। ট্রাম্পের নতুন আমেরিকা আগের মুখোশ এখন আর ব্যবহার করছে না। গণহত্যা ও রোহিঙ্গা বিতাড়নের মূল সময় প্রথম দু সপ্তাহ পুরোই নীরব থেকেছে যুক্তরাষ্ট্র।

কী হচ্ছে, কেনো হচ্ছে, কারা কী করছে- পুরোই ড্যাম কেয়ার। এটা সরাসরি সমর্থনেরই অংশ। দু সপ্তাহ পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ট্রাম্প সরকারের কয়েকজন মুখপাত্রকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন ভূমিকায় স্বাভাবিক বিবেচনায় ধরেই নেয়া হচ্ছিলো রাশিয়া বিপরীত বক্তব্য হাজির করবে। হলো উল্টোটা। হামলা শুরুর তিন সপ্তাহের মাথায় এসে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাকারভ প্রথমবারের মতো জানালেন- ‘তার সরকার মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপের ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে আগেভাগেই সতর্ক করছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাদের সমস্যা তাদেরকেই সমাধান করতে দেওয়া উচিত।’ হায় সেলুকাস! বিশ্ববাসী অবাক চোখে প্রত্যক্ষ করলো- সবরকম বিরোধ, সবরকম রাজনীতি, সবরকম কূটনৈতিক হিসেব ভেঙে দিয়ে বিশ্বের সব পরাশক্তি নিপীড়ক রাষ্ট্রের পাশে এসে দাঁড়ালো। অবশ্য তথাকথিত এসব বিরোধ ও প্রতিযোগিতার মানে যদি হয় ধাঁধাঁ, পেছনের কারণ যদি হয় ‘স্বার্থ’- একপক্ষে দাঁড়ানোটা তখন আর দৃষ্টিকটু কিছু নয়। পুঁজিবাদ এখানেই মহান।

চীন হলো মিয়ানমারের প্রধানতম ব্যবসায়ীক পার্টনার। প্রায় একই অবস্থান ভারতেরও।

দুই রাষ্ট্রই নানারকম বাণিজ্যিক প্রকল্প চালাচ্ছে ও শুরু করছে মিয়ানমারে। মিয়ানমারের বাজেটের বড় একটা অংশ ব্যয় হয় সামরিক খাত ও অস্ত্র কেনায়। যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া-জাপান ও ইসরাইলের অস্ত্রসহ অন্যসব ভারি শিল্পের ব্যবসার বড় একটা বাজার মিয়ানমার। ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় ভারত-চীনের জন্য মিয়ানমারকে কব্জায় রাখা যদি হয় অপরিহার্য, রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা উইনিং ফ্যাক্টর।

সুতরাং যে কোনো বিবেচনাতেই কারো পক্ষে যদি যেতেই হয়, সেটা তো মিয়ানমারই হওয়ার কথা। হলোও তা-ই। পুঁজিবাদী স্বার্থের সামনে ন্যায় ও মানবিকতার প্রশ্ন তো নস্যিই। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তি ও স্থিতিশীলতার শ্লোগানে মুখর বিশ্ববাসীর চোখের সামনে একটা জাতি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে- কারো পরোয়া করার দরকার পড়লো না। মুসলমানের রক্ত তো এমনিতেই লাল নেই আর, রোহিঙ্গাইস্যুতে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর এবারকার ভূমিকা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো- তাদের প্রাণ আর ইজ্জতের মূল্য বলতেও কিছু থাকছে না আর।

অবশ্য ব্যতিক্রম যে নেই সেটা বলার সুযোগ কমই। সুইডেন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানিসহ সবাই মোটামুটি সরব হয়েছে। নিন্দাপ্রস্তাব ও নির্যাতন বন্ধসহ নানামুখি আহ্বানের ধারা তো কমবেশ সবার তরফে শুরু থেকেই চলমান। তবে বিশ্ববাসী কোনো একটা ইস্যুতে একাট্টা হলে সেটার তাৎক্ষণিক সমাধান আসবে না এটা আমরা মানতে পারি না।

এখানেই তাদের প্রতিক্রিয়া ফলাফল শূন্য, অর্থহীন ও প্রতীকী হিসেবে আখ্যায়িত হতে বাধ্য। দিনশেষে জয়টা দৃশ্যত পুঁজিবাদেরই, নিজেদের স্বার্থই যেখানে সব। এটাই আজকের আধুনিক পুঁজিবাদের স্বরূপ।…

Leave a comment