Categories
মুফতি আমিনী রহ.

তিতাসতীরের বিস্ময় বালক মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.: অনন্য জীবনের কথামালা

জ্যাম আর কুয়াশার বিড়ম্বনা কাটিয়ে আমাদের বহনকারী বাসটি অবশেষে বি.বাড়িয়ায় পৌঁছলো। পৌষের নিস্তেজ সূর্য ততোক্ষণে পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। রাজধানী থেকে শতকিলো দূরের এই ঝটিকা সফরে বরাদ্দ তিন ঘন্টার বদলে আমাদের সময় দিতে হলো ছ’ঘন্টা! যাত্রাশুরুর বিড়ম্বনা বুঝাতে এককালে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিলো নয়টার ট্রেন কয়টায় ছাড়ে। আজকাল বাস-রিক্সায় উঠে ঢাকাবাসী আমাদের জপতে হয় শঙ্কা ও হতাশার তাসবিহমালা-নয়টার গাড়ি কয়টায় পৌঁছবে!

বাস ছেড়ে সঙ্গী আল আমিনকে নিয়ে দ্রুত অটো ধরলাম। লক্ষ্য এবার আমিনপুর। জেলা সদরের আওতাভুক্ত একটি ওয়ার্ড হলেও আহামরি কিছু নয়। খুবই সিম্পল। আমি বরং বলবো, রূপসী বাংলার চিরায়ত রূপ ছেড়ে শহুর হয়ে উঠার যন্ত্রণাকাতর বাংলাদেশের অসংখ্য গ্রামের একটি এই আমিনপুর। তবে অন্যরকম ব্যাপারটা টের পেতে শুরু করলাম একটু পর থেকেই। পৌষের ঠান্ডা বাতাসকে পাশ কাটিয়ে স্নিগ্ধ একটা আবহ আমার ভেতরকার বালককে জাগিয়ে তুললো মুহূর্তেই।

আন্দাজের ভরে পাশে বসা একজনকে জিজ্ঞেস করে বসলাম, এদিকে কাছে কোথাও নদী আছে?…

হ্যাঁ, আছে তো! দু’ পাশের ফসলি জমির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, বর্ষায় এগুলোও বেশ কিছুদিন নদীর পেটে চলে যায়। ধারণা সত্যি হওয়ার পুলক নিয়ে আমি আবারো তাকে জিজ্ঞেস করলাম,

কী নাম নদীর?…

জবাবে যা শুনলাম, আমার জন্য তা চমকাবার মতোই ব্যাপার হলো। বলে কি লোকটা! এখানে একটু যোগ করি, আমি বড় হয়েছি দেশের বিখ্যাত-দীর্ঘতম নদী ব্রহ্মপুত্রের তীরে। আমার পুরোটা শৈশব ও বাল্যকাল কেটেছে ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিতালী করে। নদীর আবহাওয়া ও চরিত্র আমার অস্তিত্বের শেকড়েগাঁথা। লোকটির কাছে নদীর নাম শুনে তাই মুহূর্তেই হারিয়ে গেলাম উনবিংশ শতাব্দীর সেই চল্লিশের দশকে।

নদীর নাম তিতাস। তিতাস?…হ্যাঁ তিতাস! চমৎকার নদীটির চমৎকার এ নাম অনেক কবি সাহিত্যিকই নানাভাবে তাদের লেখায় এনেছেন। তবে তাদের সবার চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে থাকবেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম এ ঔপন্যাসিক তার প্রিয় তিতাসকে বিখ্যাত করে গেছেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটি লিখে। জেলেজীবন আর গ্রামীণ পটভূমির এ উপন্যাসটি বর্তমানে আমাদের কলেজ পর্যায়ের অবশ্যপাঠ্য সহযোগী বই।

কিন্তু কি আশ্চর্য, কলকাতায় মাসিক মোহাম্মদির অফিসে বসে অদ্বৈত যখন লিখছেন-‘তিতাস একটি নদীর নাম। কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙ্গে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়, রাতের চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়ে ঘুম পাড়াইতে বসে’।…ঠিক সে সময়টাতেই তিতাসের অপর প্রান্তে জন্ম নেয় একটি শিশু।

নাম তার ফজলুল হক। বাবা-মা আদর করে ডাকেন ‘ফজলু’। রূপ-রঙের বাহার নেই, শরীর-স্বাস্থ্যের চমক নেই। নিতান্তই সাধারণ এক পল্লীবালক। নদীতীরের আর দশটি ছেলের মতোই চঞ্চল, বাউণ্ডুলে আর খেলাপাগল সে ছেলেটাই একসময় বদলে যেতে শুরু করলো। সোনার কাঠি-রুপার কাঠির ছোঁয়ায় জেগে উঠার মতোই সে জেগে ওঠলো প্রবল সম্ভাবনা নিয়ে।

এরপর পুরো জীবনজুড়েই সৃষ্টি করে গেলো একের পর এক ইতিহাস। সে ইতিহাস সংগ্রামের, বিজয়ের। ইতিহাস ধারাবদলের। খেলাপাগল দুরন্ত মনকে পাঠে নিমগ্ন করে, ফুল-পাখির সৌন্দর্যভাবনাকে ধর্মতত্ত্বের গভীরে ডুবিয়ে দিয়ে, নদীর বৈরি স্রোতের বিপরীতে লড়াই করার উদ্দাম সাহসকে নেতৃত্বের গুণে রূপান্তর করে সে যা করলো, গোটা উপমহাদেশের মানুষের মতো এই তিতাসকেও তা মনে রাখতে হবে অনন্তকাল।

নদীর প্রসঙ্গটি আমি এতো বিশাল করে টেনে আনছি এ কারণে যে, আমাদের গ্রামীণ জীবনে নদীর প্রভাব অনেক। নদী কেবল নেয় না, যা দেয় তা কেবল অসামন্যই নয়; অতুলনীয়ও। মুফতি ফজলুল হক আমিনীর মতো বিশাল ব্যক্তিত্বের শৈশবের খোঁজ করতে গিয়ে চঞ্চল, খেয়ালি আর দুরন্তপনার যে ছাপ লক্ষ করি; পাশাপাশি পরবর্তী জীবনে তার প্রখর মেধা, অনন্য ব্যক্তিত্ব, অমিত সাহস এবং উদারতা ও সারল্যের অতুলনীয় নমুনার সূত্রটা ঠিক যেনো মিলছিলো না। বারবার তাল-লয় কেটে যাচ্ছিলো। বাড়ছিলো কেবলই বিভ্রান্তি। এই নদীর খোঁজ আপাত এই বিপত্তির হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করলো।

সন্দেহ নেই, বাড়ির পাশ দিয়ে কুলকুল রবে বয়ে চলা এই তিতাসের কাছ থেকেই তিনি পেয়েছিলেন ভাবনা, কৌতূহল আর সাহসের খোরাক। নদীর বিশালতাই তার অবচেতন মনে গেঁথে দিয়েছিলো বড় হবার স্বপ্ন। এবং দুষ্টু পল্লীবালকদের সাথে খেলাধুলা আর দুরন্তপনায় মেতে থেকেই অর্জন করে নিয়েছিলেন মানুষকে প্রভাবিত করার, সংগঠিত করার এবং সামনে এগিয়ে নেবার নেতৃত্বগুণ।

এসব নিয়ে গভীরে ডুবে যাওয়া আমার ভাবনার ছেদ কাটলেন মধ্যবয়ষ্ক ড্রাইভার-নামেন ভাই, এসে গেছি। খেয়াল করে দেখি সহযাত্রী সবাই নেমে দাঁড়িয়েছে। আমিও নামলাম। রাস্তার পাশেই ছোট্ট একটা খাল পূর্ব থেকে বাঁক নিয়ে সোজা দক্ষিণে এগিয়ে অদূরের তিতাসে পড়েছে। খালের ওপর দিয়ে ব্রিজ হয়ে একটি রাস্তা পশ্চিমে গেছে। আমরা দক্ষিণের পথ ধরলাম। একপাশে খাল অন্যপাশে হাজীবাড়ির তিন পুরুষের ঐতিহ্যবাহী কাঠের ব্যবসা, পাশাপাশি ক’টি স’মিল। গাছ-কাঠ কেটে সাড়িবদ্ধভাবে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। ২০-৩০ গজ পর থেকেই শুরু হয়েছে হাজীবাড়ির সীমানা।

যুগ যুগ ধরে পরিচিত এই হাজীবাড়িই এখন খ্যাতি পেয়েছে আমিনী বাড়ি হিসেবে। অনেকগুলো ছোট বড় ঘর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে কয়েক পুরুষের ঐতিহ্য নিয়ে। দু’একটি ছাড়া সংস্কার হয়নি একটিতেও। মুফতি আমিনীর হাতে গড়া মাদরাসার শিক্ষককে নিয়ে নির্ধারিত ঘরের দিকে এগুলাম। চারপাশে দেয়ালঘেরা জীর্ণপ্রায় একতলা বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে পড়ন্ত বিকেলের একরাশ বিষণœতা নিয়ে। বাঁ দিকের কোণার রুমে শুয়ে আছেন মরহুমের বড় ও একমাত্র ভাই জনাব নূরুল হক। নব্বই ছুঁইছুঁই বয়সের এ প্রবীণ আমাদের দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠলেন।

কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এরপর আমাদের নিয়ে ডুব দিলেন ছ’যুগ আগের সুদূর অতীতে। সঙ্গে ছিলেন মরহুমের মামাতো ভাই এবং স্থানীয় সবকাজের একান্ত সহযোগী আনিসুর রহমান। ক্ষেত্র আমিনপুর। উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি অতিঅবশ্যই বাংলার সিংহখ্যাত মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.

মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.-শেকড়ের খোঁজ

মুফতি ফজলুল হক আমিনী

বাংলায় ঊর্ধতন তৃতীয় পুরুষকে বলা হয় প্রপিতামহ। পিতা-পিতামহ প্রপিতামহ। মুফতি আমিনীর প্রপিতামহ মহিউদ্দিন বেপারী ওরফে মুদ্দি বেপারী আমিনপুর নামে এ গ্রামের গোড়াপত্তন করেন। সঙ্গে ছিলেন তার দু’ভাই হুদি বেপারী এবং মন্দি খনকার। কৌতূকপ্রিয় বাঙ্গালীর নাম সংক্ষেপনের খেসারত দিতে গিয়ে তাদের মূল নামগুলো উদ্ধার করা আজ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিতাসের উত্তর তীরঘেষা এ আমিনপুরে তারা দক্ষিণ তীরের রসুলপুর থেকে এসেছিলেন। ব্যবসায়িক স্বার্থে। দূর-দূরান্তে পাট ও কাঠের চালান দেওয়া-নেওয়ার সুবিধার্থে তিতাসতীরের এখানে এসে তারা বসত গড়েন। মনুষ্যবসতিশূন্য এ অঞ্চলের নাম রাখেন আমিনপুর।

এটি তখন বাঁশবাগান আর ঝোঁপঝাড়ে ঘেরা পশু-পাখির অভয়ারণ্য। রসুলপুরেরও আগে তাদের ঊর্ধতন প্রজন্ম তথা চতুর্থ প্রজন্মের অবস্থান ছিলো পয়াগে। বি.বাড়িয়া জেলা সদরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে এর অবস্থান। এই চতুর্থ প্রজন্মের পুরুষরাও তিন ভাই ছিলেন। হার মাহমুদ, জার মাহমুদ এবং রজব আলী।

বর্তমানে আমিনপুরে তাদের মৌলিক অবস্থান হলেও রসুলপুর, পয়াগ এবং আশপাশে আরো দু’একটি গ্রামে এ বংশের উত্তরাধিকারীরা ছড়িয়ে আছেন। আপাত অর্থহীন এ ইতিহাস টেনে আনার কারণ হলো, মুফতি আমিনী এমন একটি বংশে জন্মগ্রহণ করেন, যারা কমপক্ষে এক-দেড়শত বছর ধরে এ অঞ্চলে দাপটের সাথে বসবাস করে আসছিলেন। এবং ধর্মকর্মে, শিক্ষায়, সচ্ছলতায় তারাই এগিয়ে ছিলেন সমসাময়িক অন্য সবার থেকে।

পরিবার ও বংশীয় আভিজাত্যের বিষয়টিও ফেলনা নয়। বাদশাহ ফকীর হলেও যেমন তার বাদশাহী স্বভাব ছাড়তে পারে না, ফকীর বাদশাহ হয়ে গেলেও তার পুরনো খাসলতগুলো ঝেড়ে ফেলতে পারে না।

বংশ এবং বংশীয় প্রভাবের বিষয়টি ইসলাম শুধু স্বীকারই করে না, অত্যন্ত গুরুত্বও দেয়। প্রশাসন ও বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে ইসলাম এ নিয়ে বর্ণনা করেছে বিশেষ তাৎপর্য।

বিষয়টি আধুনিক বিজ্ঞানেও প্রমাণিত। ডিএনএ’র রহস্য আবিষ্কারের পর থেকে পুরো বিষয়টিই একটি জাদুকরি মোড় নিয়েছে। স্বীকার করতেই হবে, একজন মুফতি আমিনীর গড়ে উঠার পেছনে তার এ বংশীয় ঐতিহ্য সহায়ক হয়েছে অনেক দিক থেকেই।

ইলম ও বুজুর্গির ধারা

মুফতি ফজলুল হক আমিনী

ধর্মকর্ম ও বুজুর্গির দিক থেকে এ বংশের খ্যাতি কয়েক পুরুষ আগে থেকেই। মুফতি আমিনীর রহ. দাদা হাজী সিরাজ আলী মোল্লা সেই আঠারর শেষ এবং উনিশ শতকের শুরুর দিকে চারবার হজ্জ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। এবং তখন থেকেই এ বাড়িটি হাজীবাড়ি হিসেবে ব্যাপক খ্যাতি লাভ করে। মুফতি আমিনীর বাবা আলহাজ্ব ওয়ায়েজ উদ্দিন মোল্লাও হজ্জ করেছেন। তবে সে তুলনায় তাদের ইলমী উত্তরাধিকার তেমন সমৃদ্ধ নয়। মুফতি আমিনীর পূর্বে মধ্যম মানের আলেম হিসেবে পরিচিতি ছিলো তার মামা মরহুম ইদ্রিস মিয়ার।

এক্ষেত্রে সবচে বড় ও গুরুত্বের দাবি রাখে যে বিষয়টি তা হলো, দেশ-বিদেশের হাজারো ওলামায়ে কেরামের আতিথ্য গ্রহণ। মুফতি আমিনীর বাবা ছিলেন যাকে বলে আলেমঅন্তপ্রান।

দেশ-বিদেশের সমসাময়িক এমন কোনো আলেম ছিলেন না, যাদের পদচারণা পাওয়ার সৌভাগ্য থেকে হাজীবাড়ি বঞ্চিত হয়েছে। বিখ্যাত জামেয়া ইউনুসিয়ার সুবাদে পীরজী আব্দুল ওয়াহহাব, শামসুল হক ফরিদপুরী এবং হাফেজ্জী হুজুরের রহ. হরদম যাতায়াত ছিলো। এ বাড়িতে তারা জায়গিরও ছিলেন বেশ কিছুদিন। এ মহান পুরুষরা ছাড়াও নানা সময়ে এ বাড়িতে আগত ওলামায়ে কেরামের তালিকায় আছেন হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী, শায়খ আবু তাহের মুহাম্মদ ইউনুস, খতীবে আজম সিদ্দিক আহমদ, ফখরে বাঙ্গাল মাওলানা তাজুল ইসলাম, মাওলানা আতহার আলী, বড় হুজুর আল্লামা সিরাজুল ইসলাম রহ.সহ তৎকালীন অগণিত ওলামায়ে কেরাম। যাদের প্রত্যেকেই কাশফওয়ালা আলেম ছিলেন।

মুফতি আমিনীর বড় ভাই জনাব নূরুল হক কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, বাবার ঐকান্তিক কামনার পাশাপাশি এসব যুগশ্রেষ্ঠ ওলামায়ে কেরামের দুয়াই আমিনীর বড় হতে পারার এবং এমন আম কবুলিয়াতের বড় রহস্য।

দুটো ভবিষ্যৎবাণী

natun-dak-mufti-amini

একজন মুফতি আমিনী একদিনেই গড়ে ওঠেন না। অনেক দুয়া অনেক পরিশ্রম এবং আল্লাহ পাকের রেজামন্দির বদৌলতেই এ স্তরে কেউ পৌঁছতে পারে। সুতরাং কারো শৈশব, পড়াশুনা এবং চারিত্রিক বৈচিত্র্য দেখে তার ভবিষ্যৎ অনুমান করা হয়তো অসম্ভব কিছু নয়। আমাদের চোখের সামনে হরদমই এসব ঘটে থাকে। তবে মরহুম মুফতি আমিনীকে নিয়ে যে দু’টি ঘটনা ও ভবিষ্যৎবাণী এখানে উল্লেখ করতে যাচ্ছি এগুলো তা থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এবং দুটো ঘটনাই প্রতিনিধিত্ব করে আলাদা দুটো সময়ের, আলাদা দুটো আবহের।

মুফতি আমিনীর বাবা মরহুম ওয়ায়েজ উদ্দিন আলেমদের শুধু ভালোই বাসতেন না; প্রতিটি মুহুর্ত আলেমদের সাথে কাটাবার, তাদের রূহানী ফয়েজ লাভ করার সুতীব্র কামনাও হৃদয়ে লালন করতেন। প্রসিদ্ধি আছে, প্রায়ই তিনি জামেয়া ইউনুসিয়ার দরসে হাদীসে গিয়ে ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম বা বড় হুজুর সিরাজুল ইসলামের দরসে গিয়ে বসে থাকতেন। তার ছেলেদের এমন আলেম হওয়ায় আশাবাদ ব্যক্ত করতেন। দুয়া চাইতেন। বড় ভাই জনাব নূরুল হকের কাছে একদিন ফখরে বাঙ্গাল মাওলানা তাজুল ইসলাম বললেন-

নূরুল হক, আলেমদের প্রতি তোমার বাবার যে মহাব্বত, গোটা বাংলদেশের আর কারো মধ্যে এমন দেখা যায় না। এর পরিণাম অবশ্যই ভালো কিছু হবে। এবং তার ভাষ্যমতে ফখরে বাঙ্গাল মাওলানা তাজুল ইসলামের উল্লেখিত এই ভালো পরিণামই ছিলেন মুফতি আমিনী। মুফতি আমিনী বয়সে তখন একদম শিশু।

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরো অনেক পরের। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম-বুজুর্গ আব্দুল্লাহ দরখাস্তী মাঝে মধ্যে ঢাকায় আসতেন। একবার অনেকে মিলে তার কাছে আবদার করলেন রমজানের একমাস ঢাকায় থেকে যেতে। এটি গেলো শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যায়ের ঘটনা। তিনি রাজি হলেন। তার থাকার জায়গা প্রস্তুত করা হলো চকবাজার শাহী মসজিদের তৃতীয় তলায়। মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. একদিন অন্যরকম একটি দরখাস্ত পেশ করলেন আব্দুল্লাহ দরখাস্তীর কাছে। আহ্বান জানালেন তার প্রিয় একজন ছাত্রকে একঘন্টা করে একমাস পড়াতে। প্রিয় সেই ছাত্রটি অতিঅবশ্যই ফজলুল হক। তিনি রাজি হলেন। শুরু হলো নিয়মিত পড়াশুনা। লালবাগের ছাত্র ফজলুল হক শাহী মসজিদে গিয়ে ফজর পড়ে সবক নেওয়া শুরু করলেন। ঘটনা সেখানেই।

ফরিদপুরী রহ. একদিন বড় ভাই নূরুল হককে নির্দেশ দিলেন সাথে যাবার জন্য। তিনি গেলেন। সেদিন খুলনা থেকে তৎকালীন বড় তিনজন আলেম এলেন আব্দুল্লাহ দরখাস্তী সাক্ষাতে। নামাজের পরপরই সাক্ষাৎ করতে চাইলেও বাধ সাধলেন খাদেম। জানিয়ে দিলেন, এক ঘন্টার আগে কারো কামরায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আছে। যথারীতি এক ঘন্টা অতিবাহিত হলো। ছাত্র ফজলুল হক কামরা থেকে বেরুলেন। সাথে আব্দুল্লাহ দরখাস্তীও। ছাত্রের সাথে সাথে নীচে নেমে এলেন। গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইলেন মোড় নেওয়ার আগ পর্যন্ত যতোক্ষণ ছাত্রটিকে দেখা যায়।

ওলামাদল তো বিস্ময়ে থ, ব্যাপার কি! কামরায় গিয়ে অন্য সবকিছুর আগে এ রহস্যের বিষয়ে জানতে চাইলেন। রেগে গেলেন আব্দুল্লাহ দরখাস্তী। তোমরা এসব জানতে এসো না। তোমরা তো জাহেরি ইলম নিয়ে আমার কাছে এসেছো। ওর ব্যাপারটা আমি জানি।

এই ছেলে একদিন এমন উচ্চতায় উন্নীত হবে, ইস্ট-ওয়েস্টের সবাই তাকে সম্মান করবে।

ছাত্র ফজলুল হক তখন একাডেমিক পড়াশুনার শেষ পর্যায়ে। এভাবেই ধীরে ধীরে তিনি এগিয়ে গেলেন, গড়ে ওঠলেন অনন্য এক রাহবার হিসেবে।

বি.বাড়িয়াকথন

বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার বিবেচনায় বি.বাড়িয়া একটি বিশেষ অঞ্চলের স্বীকৃতি পেতে পারে অনায়াসেই। গেলো শতাব্দীতে আমাদের ইলমী অঙ্গনের জন্য ১৯৮৪ সালে জেলার মর্যাদা পাওয়া

এ অঞ্চলের অবদান সবিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। হাজী ইউনুস, ফখরে বাঙ্গাল , মুফতি নুরুল্লাহ আর বড় হুজুরের মতো বরেণ্য আলেমদের কল্যাণে বরাবরই আলোচনায় থেকেছে এই জেলাটি। আর বিগত দুই দশকের ভূমিকায় এটি তো বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। অনেক আগে থেকেই এখানকার মানুষেরা ধার্মিক, শান্তিপ্রিয়। এটিই বাংলাদেশের অন্যতম জেলা যাতে আজ পর্যন্ত কোনো সিনেমা হল নেই।

সিনেমা হল না থাকাটা নয়, হতে না পারার কারণটাই গুরুত্বপূর্ণ। বরাবরই এখানে আলেমদের প্রভাব ছিলো। সুতরাং বড় হওয়া, গড়ে ওঠা এবং পরবর্তীকালে নিজের কর্মসূচী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিঃশর্তভাবে এই জেলার মানুষকে মুফতি আমিনী পেয়েছেন সমর্থক ও সহযোগী হিসেবে।

বয়সের দ্বন্দ্ব ও অনন্য উত্তরাধিকার

মুফতি আমিনীর রহ. জীবন-মৃত্যুর আপাত সন্দেহমুক্ত হিসেব ১৯৪৫-২০১২। ৬৭ বছর। তার প্রকাশিত বই পুস্তকসহ সবখানেই এই হিসেব দেওয়া। কিন্তু প্রকৃত সত্য অন্যরকম। গ্রামাঞ্চলের মানুষ জন্ম-মৃত্যুর হিসেব নিয়ে সাধারণত মাথা ঘামায় না। তাদের প্রয়োজননির্ভর জীবনে এসবের কোনো মানে নেই। সে হিসেবে মুফতি আমিনীর জন্ম তারিখও টুকে রাখা হয়নি। কিন্তু তার বড় ভাইয়ের দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠের দাবি, ফজলুর বয়স আরো বেশি। অন্তত পাঁচ বছর।

তার যুক্তি, ভারত বিভাগের বিখ্যাত বছর ১৯৪৭ এ তাদের বর্তমান একতলা বাড়িটির ছাদ ঢালাই দেওয়া হয়। ফজলুর বয়স তখন ৫-৬ বছর। সুতরাং মুফতি আমিনীর জন্ম ৪২এর দিকে এবং মোট বয়স প্রায় ৭২ বছর। তার এ দাবি আরো দৃঢ় হয় এ কারণে যে, জীবদ্দশায় মুফতি আমিনী সাহেবও কাছের মানুষদের বলতেন তার জন্ম ৪৫ এ নয়, আরো আগে।

মুফতি আমিনী সাহেবের প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে প্রধান সূত্র হিসেবে আমরা তার বড় ভাই জনাব নুরুল হককে নির্বাচিত করেছি। ৯০ ছুঁইছুঁই এই প্রবীণকে আমরা তার মতো করেই কথা বলতে দিয়েছি। সাথে থাকা স্থানীয় এক হাফেজ সাহেব মাঝে মধ্যে অনর্থক প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ায় আমাদের সামনেই ক’বার তিনি খুব রেগে গেলেন। ধমকে উঠলেন বিচলিত হওয়ার মতো করেই। একটুপর আবার একদম স্বাভাবিক হয়ে দুঃখও প্রকাশ করলেন। এভাবে বলতে বলতেই একসময় তথ্যটি দিলেন। বললেন,

আমিনীর সাহস ও জালালী তবিয়তের মূল ও প্রাথমিক উপাদান পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। আমার খুব রাগ । আব্বাকেও রাগতে দেখেছি। তবে বেশি রাগ ছিলো আম্মাজানের। এর নির্যাসটাই পেয়েছে ফজলু। পরে এর সাথে আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস, কুরআন-হাদীসের ভালোবাসা এবং বুজুর্গদের দুয়া মিলে অসাধারণ এক ব্যক্তিত্বের রূপ পরিগ্রহ করে।

হাজীবাড়ি হাজী পরিবার

বাবা ওয়ায়েজ উদ্দিন এবং মা ফুলবানু নেসার সংসারে আমিনী সাহেবরা ছিলেন পাঁচ ভাই-বোন। দুই ভাই, তিন বোন। নূরুল হক, ফজলুল হক, আমেনা বেগম, মোমেনা বেগম ও উম্মে রূমান। একবোন জন্মের পরপরই মারা যায়। তাকে হিসেবে ধরা হয়নি। এ পাঁচ জনের মধ্যে ‘ফজলু মিয়া’ নামের ছেলেটি ছিলেন তিন নাম্বার। পাঁচ ভাই বোনের অন্য চার জনই বর্তমানে জীবিত । বিদায় নিয়েছেন কেবল তাদের সবার হৃদয়ের মধ্যমণি মুফতি আমিনী।

বাবার মৃত্যু ৮৮-৮৯ এর দিকে, মুফতি আমিনী লালবাগের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব নেওয়ার পর। মায়ের ইন্তেকাল আরো অনেক পরে। দু’হাজার একে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর। অর্থাৎ তার জীবনের সবচে বড়দুটো অর্জনের পরপরই সবচে বড় দুটো কুরবানী আল্লাহ পাক তার কাছ থেকে নিয়েছেন।

শিশুর প্রথম বিদ্যাপীঠ হিসেবে খ্যাত জীবনের সবচে গুরুত্বপূর্ণ এই ক্ষেত্রটি মুফতি আমিনীর জন্য অতিঅবশ্যই একটি উত্তম তাকদীরী ফয়সালা ছিলো। ঐতিহ্য, আভিজাত্য আর সচ্ছলতা শুধু নয়, এই পরিবার আজীবন তাকে ছায়া দিয়ে গেছে মহীরুহের মতো। কখনো এক মুহূর্তের জন্যও তাকে পেছনে ফিরে তাকাবার সুযোগ দেয়নি। তার গতিময় অগ্রযাত্রায় একটুও যাতে ছেদ না পড়ে সেজন্য সবসময়ই এই পরিবার সচেষ্ট ছিলো অসম্ভবরকম। বাবা-মা থেকে শুরু করে ভাই-বোন সবাই, পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যই একান্তভাবে কামনা করে গেছেন- তাদের সন্তানটি, তাদের ভাইটি যেনো নবীর সত্যিকার একজন ওয়ারিস হিসেবে গড়ে ওঠে। একজন বড় আলেম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। সত্যিই এ এক বিরল বাস্তবতা।

যে কারো বেড়ে ওঠা, বড় হওয়া এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার পরিবারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু একটা সময়ে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা চায় ছেলে এবার কিছু দিক। অথবা পরিবেশের কারণেই এ অনিবার্য বাস্তবতাটা সামনে এসে যায়। কিন্তু যাদের সন্তান হবে এমন কালজয়ী, অনন্য এক ব্যক্তি, তারাও তো একটু ব্যতিক্রমই হবেন। এই পরিবারটিও তাদের ‘ফজলু মিয়া’কে গড়ে তুলছিলেন সব দায় থেকে মুক্ত করেই। নইলে-

মুফতি আমিনী তো এমন স্তরে পৌঁছেছিলেন যে, অর্থবিত্ত হরদম তার পায়ের কাছে লুটোপুটি খেতো। এরপরও তিনি না নিজের জন্য কিছু করেছেন, না পরিবারকে কিছু দিয়েছেন। সব বরং ব্যয় করেছেন ইসলামী আন্দোলনের পেছনে। ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থে

তার এই দেওয়া এবং দিতে পারার মানসিকতা যে উদারতা ও মহত্তের পরিচয় বহন করে, তা ভাষার বর্ণনায় তুলে আনা মুশকিল অবশ্যই। কিন্তু নিজের স্ত্রী-সন্তান ও মা-বাবা, ভাই-বোনকে কিছু দেওয়ার দায় থেকে মুক্ত থাকার পরিস্থিতি যারা তার জন্য তৈরি করে রেখেছিলেন তারাও নিঃসন্দেহে অনেক কৃতিত্বের দাবিদার। যে বাড়ির ছেলেটি জাতীয় সংসদের সদস্য হতে পারার গৌরব পর্যন্ত অর্জন করেছেন, তার বাড়িটা আজো কেনো বৃটিশ আমলের জীর্ণতা নিয়ে ধুকবে? তাই আমাদের মতো অবুঝদের প্রশ্নে বড় ভাই যখন বলে ওঠেন,

আমরা টাকা-পয়সার জন্য আমিনীকে গড়ে তুলিনি। আমরা আল্লাহর রাস্তায় ওকে কুরবান করে দিয়েছি। বাবা সবসময় কঠোর ভাষায় বলতেন, ওর কাছে কখনো কিছু চাইবা না বা এমন পরিস্থিতিও সৃষ্টি করবা না যাতে সে বাড়ির বিষয়াদি নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়। আজো আমাদের এবং বাড়ির এ জীর্ণদশা সত্ত্বেও এ নিয়ে আমাদের কারো কোনো চাওয়া নেই, আক্ষেপ নেই। আমরা তো দেখেছি ও কী করছে আর কী করতে পারছে। নিজের জন্য কিছু কি করতে দেখেছেন? ওর বিরল অর্জনগুলোই আমাদের সব।

নদীর তীরবর্তী শহুরে সুবিধাবঞ্চিত একটি গ্রাম হলেও আর দশটা পরিবার থেকে এ হাজী পরিবার ব্যতিক্রম ছিলো। ব্যতিক্রমের অর্থ এই নয় যে, শিক্ষায়-সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রশ্নে ওরা শতভাগ স্বার্থকতার পরিচয় দিয়েছে। তবুও সবসময় ইলমী ও আমলী মানুষদের আনাগোনায় এসবের সহযোগী ও মুনাসিব একটা আবহ এ বাড়িতে ঠিকই গড়ে ওঠেছিলো। তাই স্থানীয়ভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় অপ্রতুলতা সত্ত্বেও উদার নৈতিকতায় এ পরিবারের অগ্রগামিতা সহজেই অনুমেয়।

এ উৎকর্ষতার বরকত ছিটেফুটে হলেও মুফতি আমিনী পেয়েছিলেন নিশ্চয়ই। আর কে না জানে, ছোটবেলার এ ছোট্ট আবেশের রেশটুকু রয়ে যায় আজীবন।

শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা

mufti amini life

শৈশবের প্রসঙ্গটি আগেই মোটামুটি আলোচিত হয়েছে। সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ানো বা খেলাধুলা আর নদীতে সাঁতরানোর মতো বিষয়ে মেতে থাকতে ভীষণ ভালোবাসতেন বালক ফজলু মিয়া। গ্রামের, বিশেষকরে নদীতীরের ছেলেরা একটু বেশিই দুরন্ত হয়। আমি তো বলি ‘দুরন্ত’ শব্দটার ব্যবহার একমাত্র তদের জন্যই বরাদ্দ থাকা দরকার। শহুরে ছেলেদের আর যাই হোক দুরন্ত বলা যায় না! সে সময় থেকেই তার মেধা এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের লক্ষণ ফুটে ওঠতে থাকে। প্রচুর খেলতেন তবে হেরে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না আদৌ। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য তার এ দুরন্তপনা অবশ্যই সহায়ক ছিলো। তবে এসবের মধ্যেও তিনি চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন।

প্রচলিত অর্থে স্কুল তখন ছিলো না। টুলে পড়ানো হতো। সেখানেই তিনি পড়েছেন। এরপর পীরজী মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাবের পরামর্শে তাকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। শুরু হয় অন্য এক ইতিহাস। সত্যিই কি?…
জামেয়া ইউনুসিয়ার বিদঘুটে তিন বছর

বি.বাড়িয়ার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হওয়ার পাশাপাশি ইউনুসিয়া তখন দেশেরও প্রধানতম দ্বীনী শিক্ষাকেন্দ্র। দেশসেরা সব আলেম তখন ওখানেই পড়ান। বাবা ওয়ায়েজ উদ্দিন সেখানেই ছেলেকে ভর্তি করিয়ে দেন। বয়স তখন ৯-১০ বছর। তবে ইতিহাসের চাকা তখন সামনে ধাবিত হতে প্রস্তুত হওয়ার পরিবর্তে পেছনে ঘুরতে শুরু করলো। প্রখর মেধার দ্যুতি ছড়িয়েও বালক আমিনী না পারলেন পাঠে মনোযোগী হতে, না পারলেন খেলাধুলার প্রচন্ড নেশা থেকে নিজেকে বের করে নিতে। ফলে বাবা-মায়ের স্বপ্ন-আকাঙ্খা ক্রমশই দুঃস্বপ্নের অমাবশ্যায় হারিয়ে যেতে শুরু করলো। সব চেষ্টা ব্যর্থ হবার পর সিদ্ধান্ত হলো নদী আর বাড়ির পরিবেশের বাইরে কোথাও পাঠানোর। শেষ চেষ্টার মতো।

প্রচুর তালাশ এবং আবারো বড়দের পরামর্শে যাত্রা এবার মুন্সিগঞ্জের মোস্তফাগঞ্জ মাদরাসায়। এরপর থেকে ইতিহাস হয়তো সত্যিই বদলে যেতে শুরু করলো।

বদলে যাওয়ার শুরু এবং শিক্ষা জীবনের দশ বছর

বিক্রমপুরের মোস্তফাগঞ্জ মাদরাসা। বর্তমানে মুন্সিগঞ্জের অন্তর্ভুক্ত এ মাদরাসাটি ছাত্রদের তরবিয়তের প্রশ্নে তখন ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিলো। হাফেজ হাজী মুহসিনুদ্দীনের রহ. দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মাদরাসাটি দ্রুত উন্নত হতে থাকে। পড়াশুনায়, তরবিয়তে, স্থাপত্যেও। মুরব্বীদের সাথে পরামর্শ করে বালক আমিনীকে বি.বাড়িয়া থেকে মোস্তফাগঞ্জে নিয়ে আসা হয়। চিন্তাগ্রস্ত বাবা ওয়ায়েজ উদ্দিন হাজী মুহসিনের কাছে সব খুলে বলেন। শেষ চেষ্টার কথা জানিয়ে যান ছেলেকেও। হাজী মুহসিন তার অভিজ্ঞ চোখে ব্যাপারটা বুঝে নেন। শুরু হয় তার ক্যারিজম্যাটিক ভূমিকা। হাজী মুহসিন প্রথম এক সপ্তাহ বালক আমিনীকে কোনো সবক দেননি। পড়তে বলেননি একবারও। খেলা আর বালকসুলভ চঞ্চলতার ঘোর থেকে তাকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দিলেন। নিজের সাথে খাইয়ে স্বাভাবিক হওয়ার, নিজেই নিজের করণীয় নির্ধারণ করার স্বাধীনতা দিলেন।

কাজ হলো। বাবা-মায়ের ঐকান্তিক কামনা আর বুজুর্গদের দুয়ার বরকতে বদলে যেতে শুরু করলো বালক আমিনী। ক্লাসে বসতে লাগলো। নিজের ভেতরগত টানেই শুরু হলো অধ্যবসায়। পরের গল্পটা সবার জানা। গল্প?..

হ্যাঁ গল্পই তো! কিছু বাস্তব কিছু অবাস্তব মিলেই তো গল্প হয়। একটু বাস্তবতার সাথে অনেকটুকু স্বপ্ন-কল্পনার রং মেলালেই তো আমরা ওকে গল্পের স্বীকৃতি দিই। তার পড়াশুনা, মনোযোগ, কিতাব-বইপ্রীতি আমাদের কাছে গল্পের মতোই। মোস্তফাগঞ্জে মাত্র ৩ বছরের পড়াশুনায় নিজের ভেতর কিতাব নিয়ে ঘাটাঘাটি করার যে ঝোক, যে নেশা তিনি তৈরি করলেন। এই নেশার ঘোরেই কেটেছে তার পুরোটা জীবন। কিতাব আর বিনিদ্র রজনী তার চেতনার অস্তিত্বে মিশে গিয়েছিলো। বদলে যাওয়ার গল্পটা আসলে এখান থেকেই ।

মুফতি আমিনীর শিক্ষা জীবনের বাকি অংশটুকু বিখ্যাত। বড় কাটারায় এলেন। পীরজী, সদর সাহেব এবং হাফেজ্জী হুজুর সবাই তখন বড় কাটারায়। শুধু ভালো ছাত্র হিসেবে নয়, পূর্ব পরিচিতি এবং বাবা ওয়ায়েজ উদ্দিনের আকাঙ্খার বিষয়টির বিবেচনায় এই বালকটির প্রতি তারা আলাদা নজর দিলেন। দেশসেরা আলেমদের সংশ্রব, সুনজর, হাফেজ্জী হুজুর ও ফরিদপুরীর রহ. বিশেষ তত্ত্বাবধান, প্রখর মেধা আর পরিশ্রমের গড়ে ওঠা মানসিকতার কল্যাণে তরতর করে এগিয়ে গেলেন মুফতি আমিনী।

শামসুল হক ফরিদপুরী ও হাফেজ্জী হুজুর লালবাগে চলে এলেন। নিয়ে এলেন তাকেও। গল্প এগিয়ে চললো নিজস্ব গতিতে। মেহনতের উপমায়, মেধার প্রখরতায়, বুদ্ধির ঝিলিকে আশপাশের সবাইকে মাতিয়ে রাখলেন শিক্ষা জীবনের পুরো আট বছর। ’৬১ তে ভর্তি হয়ে ’৬৮ এ তিনি দাওরা থেকে ফারেগ হলেন অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করে। এরপর শামসুল হক ফরিদপুরীর নির্দেশে পাড়ি জমালেন পাকিস্তানে। তিনি করাচি নিউ টাউনের আল্লামা ইউসুফ বিন্নুরীকে রহ. জানালেন, ২বছরের জন্য আমার এক ছাত্রকে আপনার কাছে পাঠাচ্ছি। উপমহাদেশের তখনকার শ্রেষ্ঠতম আলেম সানন্দে রাজি হলেন। এই ছেলেকে পেয়ে বিস্মিত হলেন তিনিও। এক বছরের মাথায় মুফতী আমিনীকে ডেকে জানালেন, তুমি এবার দেশে চলে যাও। এখানের শিক্ষা তোমার শেষ। দেশে গিয়ে এবার খেদমতে নিয়োজিত হও।

তরুণ আমিনী দেশে ফিরলেন তার মনুষ্যদেহে মুফতী নামের সোনার পালক যোগ করে। যে পালকে ভর করে আকাশে আকাশে উড়ে বেড়িয়েছেন পরবর্তী চার দশকেরও বেশি সময়।

ফজলুল হকের আমিনী হয়ে ওঠা

মুফতী আমিনীর মূল নাম ফজলুল হক। ডাক নাম ফজলু মিয়া। এ নাম থেকে তার আমিনী নামে বিখ্যাত হওয়া নিয়ে নানা গল্প ছড়িয়ে আছে। আমিনপুর থেকেই তার আমিনী হয়ে ওঠা। তবে আমিনপুরী না হয়ে আমিনী হওয়ার কৃতিত্ব শামসুল হক ফরিদপুরীর রহ.। তিনিই তাকে প্রথমে ফজলু পরে আমিনী নামে ডাকা শুরু করেন। একসময় তা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রাবস্থায়ই। এবং আমাদের তিতাসতীরের-আমিনপুরের ফজলু মিয়া হয়ে ওঠেন আমিনী । মুফতী ফজলুল হক আমিনী।
প্রিয় উস্তায, ভালোবাসা নিয়ো

ছোটবেলা থেকেই ওলামাবেষ্টিত পরিবেশে তার বেড়ে ওঠা। ইউনুসিয়া, মোস্তফাগঞ্জ, বড় কাটারা ও লালবাগ দেশসেরা এ চার প্রতিষ্ঠানে তৎকালীন বাংলার শ্রেষ্ঠ সব ওলামার সংশ্রব, তত্ত্বাবধান সবই তিনি পেয়েছেন। পাওয়ার চেয়ে বেশি তিনি আদায় করেছেন। তবে বাংলার প্রধান দু’ নক্ষত্র হযরত শামসুল হক ফরিদপুরী ও হাফেজ্জী হুজুরের বিষয়টি তার জীবনের সাথে অন্যভাবে জড়িত। নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে বালক ফজলুকে তারা মুফতী আমিনী হিসেবে গড়ে তুলেছেন। সে ইতিহাস সবারই জানা। তবে এ দু’জনের প্রতি তার যে কৃতজ্ঞতাবোধ আর ভালোবাসা ছিলো তাই বা আড়ালে থাকে কী করে। পাকিস্তান গমনের পরপরই হযরত ফরিদপুরী রহ. ইন্তেকাল করেন। করাচি খবর পৌঁছার পর যেটা হয়েছিলো আমাদের পক্ষে তা অনুমান করা সত্যি মুশকিল।

প্রিয় শাইখের বিয়োগ সংবাদ শুনে তিনি হুশ হারালেন । খাওয়া গোসল বন্ধ হলো। নামাজ ইবাদতের জোয়ারে ভাটা এলো। দিন যায়, বেলা বয়ে চলে, তার স্বাভাবিক হওয়ায় নাম নেই। অজানা ঘোরে কেটে গেলো ৮-১০ দিন। ছাত্রটি সুস্থ হতে লাগলো। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এলো তার কর্মকা-। কিছুদিন পর বাড়ি থেকে চিঠি এলো বড় ভাইয়ের ঘরে ভাতিজা জন্ম নেওয়ার সুসংবাদ নিয়ে। শোকগ্রস্ত আমিনী জবাব পাঠালেন প্রিয় উস্তাদের নামানুসারে ওর নাম রাখার প্রস্তাব করে। এই শামসুল হকই বর্তমানে হাজীবাড়ির কাঠব্যবসার পঞ্চম উত্তরাধিকার।

হযরত হাফেজ্জী হুজুরের ইন্তেকালের পর তার অবস্থা হয় আরো সঙ্গীন। মশহুর আছে টানা কয়েক বছর কান্নার ভেতর দিয়ে কেটেছে তার সকাল-দুপুর। শুধু তার মানসিকতার কথাই বলি কেনো, তার জীবনের প্রতিটি বয়ানের ছত্রে ছত্রে, তার আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে ধাপে, তার লিখিত সংকলিত প্রতিটি বইয়ের উৎসর্গপত্রে ছড়িয়ে আছেন এই মহান মনীষীদ্বয়। শাইখপ্রীতির এই তো নমুনা !

কুরআন হিফজ: নয় মাসের ঐতিহাসিক সফর

দেশে ফেরার পর আলু বাজারে ইমামতি ও খতীব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মুফতী আমিনীর কর্মজীবন। ক’দিন পর হাফেজ্জী হুজুর তাকে ডেকে নেন জামেয়া নূরিয়ায়। শিক্ষকতার জগতে প্রবেশ করেন মুফতী আমিনী। দিন এগুচ্ছে। এগুচ্ছেন তিনিও। দেশের পরিস্থিতি তখন বেজায় খারাপ। পাকিস্তানীদের জুলুম-শোষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। বাঙালির ক্ষোভও এবার মাত্রা ছাড়ালো। মৌখিক দাবি আর কাগুজে আবদার ছেড়ে তারা জবাব দেওয়া শুরু করলো অস্ত্রের ভাষায়। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলো। বাদ থাকলো না মাদরাসাগুলোও। সময়ব্যয়ের কার্পণ্যে মর্যাদা যাদের মনীষীস্তরের, তারা কী করে অবসর যাপন করেন? হাফেজ্জী হুজুর প্রিয় ছাত্রকে পরামর্শ দিলেন এবার কুরআন হিফজের পর্বটা শেষ করে ফেলতে।

আমিনী সাহেবের জীবনে মোড় ঘুড়িয়ে দেওয়া প্রথম শিক্ষক বাংলার বিখ্যাত হাফেজ হাজী মুহসিনুদ্দীন তখন চাঁদপুরের মোমিনপুরে। যুদ্ধের আঁচ তখনো সেখানে লাগেনি। মাদরাসাও চলছে ভালোই। মুফতী সাহেব রওয়ানা হয়ে গেলেন।

হাজী মুহসিন প্রিয় ছাত্রকে এবার নতুন ছাঁচে গড়তে লাগলেন। তখনই ইতিহাসটা রচিত হতে থাকলো। মাত্র কয়েক মাসে তিনি হিফজ সমাপ্ত করলেন প্রথাগত সব ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেই। তিনি তখন বিয়েযোগ্য পূর্ণ তরুণ এবং পরে সে বছরই বিয়ে করেন। হাজী মুহসিন তার অভিজ্ঞ চোখে দেখা একযুগ আগের স্মৃতি রোমন্থন করলেন আয়েশী ঢংয়ে, স্রোতের গতিতে ছাত্র মুখস্থ করছে পবিত্র কুরআন। হিফজ কমপ্লিট হওয়ার পর তার মোস্তফাগঞ্জের এককালের সাথী এবং মুফতী আমিনীর শিক্ষক হাফেজ উবায়দুর রহমানের কাছে পাঠিয়ে দিলেন শোনাবার জন্য। হাফেজ উবায়দুর রহমান তখন ঐতিহ্যবাহী হাটহজারী মাদরাসায়।

মুফতী আমিনী কুরআন শুনিয়ে ঢাকায় ফিরলেন সে বছরই। এ ছিলো তার মাত্র ন’মাসের সফর। আকাশে উড্ডয়নের ঠিক আগ মুহূর্তে যেনো ঝলমলে ডানায় যোগ হলো পৃথিবীর সবচে’ মূল্যবান পালকটি, তিনি হাফেজ হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন মাত্র নয় মাসে।

বিয়ে ও সংসার : রংধনুর পাঁচ রঙ

১৯৭০ এ পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে তিনি হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত জামেয়া নূরিয়ায় শিক্ষকতা লাভ করেন। শুরু হয় বিয়ের তোড়জোড়। তবে এই তোড়জোড়টা একই সময়ে দুই দিক থেকে শুরু হওয়ায় বিপত্তি বাধে দারুণরকম। সাধের বিয়ে পরিণত হয় উত্তেজনাপূর্ণ টানাপোড়েনে। শুনুন ঘটনা-

বাইয়াতের প্রশ্নে মুফতী আমিনীর রহ. বাবা পীরজী আব্দুল ওয়াহহাব সাহেবের মুরীদ ছিলেন। অন্যসব ওলামার সাথেই তার ছিলো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তবে একটু বিশেষ সম্পর্ক ছিলো বি.বাড়িয়ার মরহুম বড় হুজুর মাওলানা সিরাজুল ইসলামের সাথে। প্রায় প্রতিদিন জামেয়ায় যাতায়াত-কথাবার্তার কারণে সম্পর্কটা একটু বেশিরকমেরই ব্যক্তিগত হয়ে যায় এবং কোনো একদিন বড় হুজুর মেধার দ্যুতি ছড়ানো আমিনীর সাথে তার মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব করেন। স্বাভাবিক কারণেই সানন্দে হ্যাঁ মত জানিয়ে দেন জনাব ওয়ায়েজ উদ্দিন। কথা পাকাপাকি দু’পক্ষ থেকেই।

এদিকে হাফেজ্জী হুজুর করে রেখেছেন অন্য প্ল্যান। হবু জামাতার সাথে কথা বলেছেন আগেই। এবার চিঠি পাঠালেন বাড়িতে। তারই ছাত্র ও খাদেম মুফতী আমিনীর বড় ভাই জনাব নূরুল হককে লেখা চিঠিতে তার পিতা ওয়ায়েজ উদ্দিনকে নিয়ে ঢাকায় বেড়াতে আসার আহ্বান জানান। বিয়ের প্রসঙ্গটি জানিয়ে তাকে দায়িত্ব দেন বাবার সম্মতি আদায়ের। খবর শুনেই বেঁকে বসলেন জনাব ওয়ায়েজ উদ্দিন। দু’পক্ষই পরস্পরের প্রতিটি সদস্যের খোঁজ খুব ভালো জানতেন। সুতরাং বিয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন ঢাকায় তিনি যাচ্ছেন না। ছেলের বিয়ে বি.বাড়িয়াতেই হবে। কাহিনী মোড় নেয় অন্যদিকে। জনাব নূরুল হক তখনো হাফেজ্জী হুজুরের বিয়ের প্রস্তাবটি বাবার কাছে পেশ করেননি। নিজের অনুমান থেকেই তিনি এমনটা বলছিলেন। পরে নূরুল হক এবং তার আলেম মামা জনাব ইদ্রিস মিয়া মিলে তাকে বুঝাতে সক্ষম হন যে, বিয়ে না অন্য প্রয়োজনেও হতে পারে। এবং না যাওয়াটা বড় বেমানান। পিতা-পুত্র রওয়ানা হন ঢাকার পথে।

তারা মেহমান, মেজবানের দায়িত্বে হাফেজ্জী হুজুর। এবং আপ্যায়নের পর যথারীতি প্রস্তাব পেশ করেন হাফেজ্জী হুজুর। অপর পক্ষের কোনো সাড়া নেই। তিনি তো আগে থেকেই নিজ সংকল্পে অটল। হযরত হাফেজ্জীর বুজুর্গি, পুরনো সম্পর্ক কিছুই তাকে টলাতে পারে না। ওদিকে দুই ভাই এবং হাফেজ্জী হুজুরের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান চলছে হরদম। কোনো উন্নতি নেই। দিন যায়। একদিন, দুই দিন. তিন দিন…এবং অবশেষে বাপ-বড়বেটার অনেক যুক্তিতর্কের পর চতুর্থদিন এশার সময় আশঙ্কার কালো মেঘ থেকে মুক্ত হলো আকাশ। পাথরে ঝর্ণার প্রবাহ ছুটলো।

দুই মানব-মানবীর পবিত্র হৃদয়ের মেলবন্ধনের খবর নিয়ে তারায় তারায় কানাকানি চললো। চাঁদ ছড়ালো আলো। বাংলার আকাশ-বাতাসে কম্পন তোলা সিংহপুরুষটির বিয়ে হয়ে গেলো মাত্র তিনজন ব্যক্তির উপস্থিতিতে। বড় অনাড়ম্বরভাবে। বড়ই নীরবে।

মুফতী আমিনী রহ. এবং হাফেজ্জী হুজুরকন্যা মুবারকা সাহেবা-এর চার দশকের বেশি সময়ের সংসার আলোকিত করে জন্ম নেন ৬ সন্তান। দুই ছেলে, চারমেয়ে। ছেলে দু’জন হলেন আবুল ফারাহ ও আবুল হাসানাত। মেয়েরা হলেন যয়নাব, আয়েশা, যাকিয়া, ফারহানা। বর্ণিল শৈশব-কৈশর ও সফল শিক্ষাজীবন শেষ করে সবাই এখন কর্ম ও সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তারা ছাড়াও মুফতী আমিনী রহ. ১৭ জন নাতি-নাতনী এবং তৃতীয় প্রজন্মেরও দু’জন উত্তরাধিকারীকে দেখে গেছেন। আল্লাহ তায়ালা এ পরিবারটির উপর বরকত নাজিল করুন।

উপেক্ষিত রাজনীতি

গত দুই যুগ ধরে তার রাজনীতি ও ইসলামী আন্দোলনের বিষয়গুলো আলোচনায় থেকেছে সবসময়। এগুলো নিয়ে এখন আর প্রাথমিক আলোচনার অবকাশ নেই। তাছাড়া নতুন ডাকের চলমান সংখ্যাতেও অনেক ওলামায়ে কেরাম ও লেখকগণ এ নিয়ে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের প্রয়াস পেয়েছেন। সুতরাং আমি আর ওসব রিপিট করতে যাচ্ছি না।

তবে ভবিষ্যতে গবেষণা ও মূল্যায়নের প্রশ্নে আমার বিবেচনায় তার রাজনীতি ও আন্দোলনের এ দু’যুগকে তিনটি ধাপে ভাগ করতে হবে। একটি এবং প্রথম ধাপ হবে ১৯৮১ থেকে ৮৭ সালে হযরত হাফেজ্জীর ইন্তেকাল পর্যন্ত।

এসময়টায় তার পাওয়ারফুল কণ্ঠ ও স্বভাবসুলভ মেধা থেকে থেকেই দ্যুতি ছড়ালেও তিনি মূলত শিক্ষানবিশ ছিলেন। প্রচলিত রাজনীতির ধরন, চেনা-অচেনা ওলিগলি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে ওঠা-বসার মধ্য দিয়ে শিখেছেন। সমৃদ্ধ করেছেন অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার।

আর দ্বিতীয় ধাপে ’৮৭ থেকে ’৯৭ পর্যন্ত বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন, কমিটি ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা এবং মানুষকে ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী রাজনীতির সাথে পরিচয় করাতে করাতে তিনি একজন যোগ্য ও অনন্য নেতায় পরিণত হয়েছেন।

বাবরী মসজিদ অভিমুখে লংমার্চ, তসলিমাবিরোধী আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক ও পাবলিক কাছে টানতে পারার মতো আন্দোলনগুলো তো পুরো উপমহাদেশের ইতিহাসেই বিরল। অন্যদিকে উলামা কমিটি, জমিয়তুল আনসার, সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ, ইসলামী মোর্চার মতো বিভিন্ন কমিটি ও শক্তিশালী সংগঠন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তার অচিন্তনীয় সাংগঠনিক দক্ষতার প্রকাশ ঘটেছে এবং তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশসেরা সংগঠক হিসেবে ।
’৯৭ এ চারদলীয় জোট গঠনের মধ্য দিয়ে একজন জাতীয় নেতা হিসেবে তার পথচলা শুরু। এরপর তো কেবল এগিয়ে যাওয়ার পালা। নির্বাচন ও সংসদ সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে একরকম ভূমিকা রাখলেন। অন্যদিকে ফতোয়াবিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলন এবং সর্বশেষ নারীনীতি ও শিক্ষানীতির প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের নেতা হিসেবে নিজেকে পাহাড়সম উচ্চতায় উন্নীত করলেন।

পুরো জাতি অবাক হয়ে দেখলো, একা একটা মানুষ কতোটা সাহস, কতোটা ঈমানী শক্তি আর কুরআনের ভালোবাসার স্বাক্ষর রাখতে পারেন। কীভাবে পারেন। শুধু রাজনৈতিক বোধ থেকে এসবের বিবেচনা ও মূল্যায়ন করা যদিও অনুচিত, তবুও এগুলো তার রাজনৈতিক অর্জন হিসেবেই বিবেচিত হবে অনন্তকাল।

ইসলামী আন্দোলনের প্রসঙ্গটি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণে রেখেও আমরা নির্দ্বিধায় এমন মন্তব্য করতে পারি।

শেষের আগে

মুফতী ফজলুল হক আমিনীর মতো ব্যক্তিকে একটিমাত্র দিক বা এঙ্গেল থেকে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। ইলম-তাদরীস-দাওয়াত-রাজনীতি-আন্দোলন সবদিকেই তার দখল অসাধারণ। এতো বিস্তৃত ও বর্ণাঢ্য কার্যক্রম দেখে কেবল মুগ্ধ হওয়া ছাড়া তো উপায় নেই। এই মানুষগুলোর মুখ শতাব্দীতে দু’একবারই দেখা যায়।

একজন আমিনীর জন্য এ জাতিকে আরো কতো কাল অপেক্ষা করতে হবে তা আল্লাহই ভালো জানেন। তবে আমাদের ইসলামী রাজনীতির তৈরিক্ষেত্র যে অন্তত ৩০-৫০ বছর পিছিয়ে গেলো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমর বিল মারুফ আর নাহি অনিল মুনকারের বিবেচনায় আমাদের প্রতিবাদের ভাষাটি তৃতীয় স্তরে নেমে গেলো এই একটি মানুষের চলে যাওয়াতেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এ অক্ষমতাকে ক্ষমা করুন। এই মহান মানুষটিকে জান্নাতে সুউচ্চ মাকাম দান করুন ।

মুফতি আমিনী রহ. : নতুন ডাক বিশেষ সংখ্যা

Leave a Reply