মাহে রমজান: আহকাম ও মাসায়েল

কুরবানী- makkah

Date

Author

Blog Duration

28 minutes

রমজান সম্পর্কে আলোচনা

রমজান একটি ইসলামিক মাস যা হিজরি ক্যালেন্ডারের নবম মাস। এটি মুসলিম সমাজে একটি পবিত্র মাস হিসাবে গণ্য করা হয়। এই মাসে মুসলিম সমাজের বৃহত্তর অংশ রোজা রাখে। রোজা হল দিনের সময় খাদ্য এবং পানীয় বর্জন করা, যা সকাল সেহরি থেকে মাগরিব নামাজের আগের সময় পর্যন্ত চলে। রোজা রাখার মাধ্যমে মুসলিম সমাজ পবিত্র মনোযোগ এবং সমর্থন প্রদান করে এবং তাদের দীন সংক্রান্ত প্রকৃত পরিবর্তন সাধন করতে চেষ্টা করে। রমজানে সকাল সেহরি এবং ইফতার নামাজ, তারাবি নামাজ, কুরআন শরীফ পাঠ এবং দান এবং জাকাত প্রদানের প্রথম মাস হিসাবে বিশেষ মর্যাদা পাওয়া হয়।

রমজান অর্থ কি?

আরবি রমজান শব্দটির মূল ধাতু হচ্ছে- “রামাজা” এর অর্থ দহন, জ্বলন ও ছাই-ভস্মে পরিণত হওয়া। কেননা রোজা রাখার দরুন ক্ষুধা-পিপাসার তীব্র জ্বালায় রেজাদারের উদর জ্বলতে থাকে। এই দহন ও কষ্টকে বোঝাবার জন্য আরবি ভাষায় বলা হয়ে থাকে যে রোজাদার দগ্ধ হয়, ভস্মীভ‚ত হয়। ক্ষুধা-পিপাসার কী জ্বালা তা রোজাদার মর্মে মর্মে অনুভব করে বলেই রোজার মাসটির নাম রমজান রাখা হয়েছে।

আর রামাজা ধাতু হতে রামাজাউ শব্দটিও গঠিত হয়েছে। যার উত্তাপের তীব্রতা, জ্বলনের ক্ষিপ্রতা, অবস্থা অবস্থান ও পরিবেশের তাড়নায় রোজাদারের মধ্যে কখোনো কখোনো এই জ্বলন তীব্র রূপ ধারণ করে থাকে।

সহীহ বোখারী শরীফের হাদিসে উক্ত হয়েছে যে, সূর্যোদয়ের পর সূর্য কিরণের তাপে প্রাচীর যখন জ্বলে উঠে, তখনই আউয়্যাবিন নামাজ পড়ার সময়। বস্তুত : সূর্যের তাপের তীব্রতায় মানুষের মাথা হতে পা পর্যন্ত জ্বলন ধরিয়ে দেয়। সূর্য তাপ যতই তীব্র হয় জ্বলনের তীব্রতাও ততো বর্ধিত হতে থাকে। মোট কথা, পুরো রমজান মাসটাই হলো অব্যাহত জ্বলন ও তীব্র দহনের একত্র সমাহার।

আর এই মাসটির রমজান নামকরণের কারণ হলো এই যে, এই মাসে রোজাদারগণ যে সকল নেক আমল করে; তা তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার ও নিশ্চিহ্ন করে দেয়। পিয়ারা নবী মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় যবানে পাকে এমন উক্তিই করেছেন।

রোজার উদ্দেশ্য কি?

রোজার উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তির ভেতর এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হওয়া যে, তিনি নিজেই তার ভেতরগত চাহিদায় মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকবেন।

এ বিষয়টিকে আল্লাহর রাসুল (সা) তার এক হাদিসের মাধ্যমে এভাবে তুলে ধরেছেন: কোনো রোজাদারকে কখনো গালি দেওয়া হলে রোজাদার ব্যক্তি উত্তরে রাগ না দেখিয়ে যদি বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম (আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক), আমি একজন রোজাদার।’ যিনি এমন করেন, তার উত্তরে আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা একজনের মন্দ কাজের বিপরীতে রোজার আশ্রয় নিয়েছে। আমিও তাকে দোজখের আগুন থেকে হেফাজত করেছি।’ (তারতিবুল আমালি আল–খামসিয়্যা লিসশাজরি, হাদিস নম্বর: ১৩৪৮।

এই হাদিস থেকে জানা যায়, রোজা মানুষকে নেতিবাচক মানসিকতা থেকে রক্ষা করে এবং ইতিবাচক মানসিকতাকে লালন পালন করে। রোজা ব্যক্তির ভেতর এমন নমনীয় অবস্থার তৈরি করে যে, কারো উসকানিতে রোজাদার ব্যক্তি ক্ষেপে উঠেন না। অন্যের দিক থেকে খারাপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলে তিনি ভালো ব্যবহার করেন। কেউ গালি দিলেও তিনি কোমল আচরণ করেন।

রোজা ব্যক্তির ভেতর এই সংকল্প জাগিয়ে তোলে যে, তিনি তার শত্রুর জন্যও প্রার্থনা করেন। যে ব্যক্তি তার সঙ্গে মন্দ আচরণ করে রোজাদার ব্যক্তি তার মঙ্গলের জন্যও প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করেন।

আরও একটি হাদিসে রয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন: রোজা শুধু খাদ্য ও পানীয় পরিত্যাগ করার নাম নয়; আসলে রোজা হলো, অশ্লীল ও অনর্থক কথাবার্তা পরিত্যাগ করার নামও (সহি ইবনু খোযায়মা, হাদিস নম্বর: ১৯৯৬)।

কোনো ব্যক্তি যদি বাহ্যিক দিক দিয়ে রোজা রাখেন এবং রোজা অবস্থায় মিথ্যা বলেন, গালি দেন, গিবত করেন, শত্রুতা করেন, কাউকে অপমান করার মতো শব্দ ব্যবহার করেন, তাহলে এই ধরনের কাজে জড়িত থাকা ব্যক্তি সত্যিকারের রোজাদার নন। হাদিসের ভাষায় এই ধরনের ব্যক্তি যেন এমন রোজাদার, যিনি হালাল জিনিসের মাধ্যমে রোজা রাখলেন বটে কিন্তু আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ জিনিসের মাধ্যমে যেন রোজা ভেঙে ফেললেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর : ২৩৬৫৩)।

একই ধরনের আরও একটি হাদিস মুসনাদে আহমাদে এসেছে। এই হাদিস মতে, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন : রোজা একটি ঢাল। সুতরাং তোমাদের মধ্য হতে কেউ রোজাদার হলে তিনি যেন অশ্লীল কথা না বলেন এবং হৈচৈ না করেন। কেউ তাকে মন্দ কথা বললে বা ঝগড়া বাঁধালে তিনি যেন বলে দেন, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর: ৮০৫৯)।

এটাকেই আমি রোজার উদ্দেশ্য কথা বলেছি। এই দুনিয়ায় মুসলমানের আচার–ব্যবহার প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার নয়। একজন বিশ্বাসীর জন্য উচিত নয় যে, কারো উসকানিতে রেগে গিয়ে লড়তে শুরু করবেন।

ভাষা ও আচরণ দিয়ে একজন মুমিনের এই কথা জানান দেওয়া উচিত যে, আমি আপনার চেয়ে ভিন্ন মানুষ। আমি একজন রোজাদার মানুষ। নিজেকে খোদার মর্জির অনুগামী করে রেখেছি। আপনার মতো স্বাধীন নই যে যা ইচ্ছা করা শুরু করব।

রোজার উদ্দেশ্য হল মানব জীবনে আত্মপরিশোধ করা এবং তাকে সহজ সম্পাদনযোগ্য করা। রোজার মাধ্যমে মানুষ শারীরিক এবং মানসিক পরিষ্কার থাকে এবং এর মাধ্যমে মনোযোগ এবং অধিকার বিকাশ করতে পারে। রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষ দানের মানবিক মূল্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে পারে এবং পরিবার, সমাজ এবং দরিদ্র মানুষদের কাছে অনুগ্রহপূর্বক ব্যবহার করতে পারে। এছাড়াও রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ বিকাশ করতে পারে এবং তার সম্পর্ক মাজবুত করতে পারে। সম্পূর্ণ রোজা রাখার ফলে মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং জয়েন্তি অর্জন করতে পারে।

রোজার ইতিহাস

কোরআনের নির্দেশনা-

‘হে ঈমাদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমারে আগের লোকদের (নবি-রাসুল ও তাদের উম্মত) ওপর। যাতে তোমরা পরহেজগার হতে পার।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৩)

এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে, রোজা হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগের নবি-রাসুলদের জন্যও ফরজ ছিল। সে হিসেবে প্রথম নবি ও প্রথম মানুষ হজরত আদম আলাইহিস সালামই হবেন প্রথম রোজা পালনকারী। কিন্তু প্রথম রোজা রাখা এবং এর সংখ্যা কয়টি ছিল এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট দলিলভিত্তিক ঘোষণা না থাকলেও হজরত আব্দুল কাদের জিলানি রাহমাতুল্লাহি আলাইহিসহ সুফি-সাধকরা কিছু তথ্য তুলে ধরেছেন। তাহলো-

সুফি-সাধকদের মতে, হজরত আদম আলাইহিস সালাম যখন নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলেন এবং তারপর তাওবাহ করছিলেন, তখন ৩০ দিন পর্যন্ত তার তাওবা কবুল হয়নি। কারণ তাঁর দেহে নিষিদ্ধ ফলের নির্যাস রয়ে গিয়েছিল। এরপর তাঁর দেহ যখন তা থেকে পাক-পবিত্র হয়ে যায়, তখন তাঁর তাওবাহ কবুল হয়। তারপর তাঁর সন্তানদের ওপরে ৩০ রোজা ফরজ করে দেওয়া হয়।

হজরত ইবনে হাজার আসকালানি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এ বর্ণনার প্রমাণে সনদ নেই। এর কোনো দলীল পাওয়াও কঠিন ব্যাপার। (ফতহুল বারি)

তবে দুনিয়ায় প্রথম রোজা পালন সম্পর্কে হজরত আব্দুল কাদের জিলানি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, হজরত যির ইবনে হুবাইশ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আইয়্যামে বিজ (চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা আদম আলাইহিস সালামকে একটি ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু আদম আলাইহিস সালাম সেই ফল খেয়ে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসতে বাধ্য হন। সে সময় তাঁর শরীরের রং কালো হয়ে যায়। ফলে তাঁর দুর্দশা দেখে ফেরেশতারা কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন-

‘হে আল্লাহ! আদম আপনার প্রিয় সৃষ্টি। আপনি তাঁকে জান্নাতে দিয়েছিলেন। আমাদের দ্বারা তাঁকে সেজদাও করিয়েছেন। আর একটি মাত্র ভুলের জন্য তার দেহের রং কালো করে দিলেন?
তাদের এ আবেদনে আল্লাহ তাআলা হজরত আদাম আলাইহিস সালামের কাছে ওহি পাঠালেন- তুমি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখ। আদম আলাইহিস সালাম তাই করলেন। ফলে তাঁর দেহের রং আবার উজ্জ্বল হয়ে যায়। এ জন্যই এ তিনটি দিনকে আইয়্যামে বিজ বা উজ্জ্বল দিন বলা হয়।’ (গুনইয়াতুত ত্বলিবিন)

এ ঘটনায়ও কোরআন-সুন্নাহর কোনো ব্যাখ্যা বা মতামত সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়নি। তবে হাদিসে এসেছে-

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে কিংবা সফরে থাকাকালীন সময়ে আইয়্যামে বিজ-এর রোজা রাখা থেকে বিরত থাকতেন না।’ (নাসাঈ, মিশকাত)

তবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, রোজা শুধু উম্মতে মুহাম্মাদির ওপরই ফরজ হয়নি বরং আগের নবি-রাসুলদের ওপরও রোজার বিধান ছিল। কোরআনুল কারিমের ঘোষণাই এর প্রমাণ।

২. হজরত নূহ আলাইহিস সালামের রোজা

আদম আলাইহিস সালামের পর নবুয়ত ও রেসালাতের মহান দায়িত্ব নিয়ে পৃথিবীতে আসেন হজরত নুহ আলাইহিস সালাম। তিনি দুনিয়ার প্রথম রাসুল ছিলেন। তাঁকে দ্বিতীয় আদমও বলা হয়। তাঁর ওপরও রোজার বিধান ছিল।

মুসলিম উম্মাহর জন্য শুধু রমজান মাস রোজা পালন করা ফরজ। অথচ হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, নুহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বছরে ২ দিন ছাড়া সারা বছর রোজা পালন করতেন। হাদিসে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘হজরত নূহ আলাইহিস সালাম শাওয়াল মাসের ১ তারিখ (ইয়াওমুল ফিতর) এবং জিলহজ মাসের ১০ তারিখ (ইয়ামুল আজহা) ছাড়া গোটা বছর রোজা রাখতেন।’ (ইবনে মাজাহ)

হজরত নুহ আলাইহিস সালামের সময় রোজার বিধান সম্পর্কে তাফসিরে ইবনে কাসিরে একটি তথ্য এসেছে-
হজরত মুয়াজ, ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, আতা, কাতাদাহ ও যাহহাক রাদিয়াল্লাহু আনহুম বর্ণনা করেন, নুহ আলাইহিস সালামের যুগে প্রত্যেক মাসে ৩টি রোজা রাখা ফরজ ছিল। পরে আল্লাহ তাআলা রমজানের এক মাস রোজার বিধান দেয়ার মাধ্যমে তা (প্রত্যেক মাসের ৩ দিনের রোজা) রহিত করে দেন।’ (ইবনে কাছির)

অন্য বর্ণনায় এসেছে-
হজরত নুহ আলাইহিস সালামের যুগ থেকে হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ পর্যন্ত রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে কমপক্ষে ৩টি করে রোজা ফরজ ছিল।’ (ইবনে কাছির)

৩. হজরত ইবরাহিম আলাহিস সালাম ও পরবর্তী যুগের রোজা

হজরত নূহ আলাইহিস সালামের পর সর্বাধিক পরিচিত নবি ছিলেন হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। কোরআনের ঘোষণায় তিনি মুসলিম জাতির পিতা। আল্লাহ তাআলা তাকে খলিল তথা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তাঁর যুগেও ৩০টি রোজা রাখা আবশ্যক ছিল।

তাঁর পরের যুগকে বলা হতো বৈদিক যুগ। সে ধারাবাহিকতায় বেদের অনুসারী ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যেও ব্রত তথা উপবাস প্রথা চালু ছিল। তারা প্রত্যেক হিন্দি মাসের ১১ তারিখে ব্রাহ্মণদের ওপর একাদশী’র উপবাস করতো।

পরবর্তী যুগে মূর্তি পূজারী ব্রাহ্মণরাও ব্রত বা উপবাস করতেন। তারা কার্তিক মাসের প্রত্যেক সোমবার উপোস থাকতেন। মূর্তি পূজারি হিন্দু যুগীরা ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করে চল্লিশে ব্রত পালন করতো।

মূর্তি পূজারী হিন্দুদের মতো জৈন সম্প্রদায়ের লোকেরাও উপবাস করতো। তাদের মতে, ৪০ দিন ধরে একটি করো উপবাস হয়। গুজরাট ও দাক্ষিনাত্যের জৈনরা কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি করে উপবাস করে।

প্রাচীন মিসরীয়রাও উপবাস করতো। প্রাচীন গ্রীসে শুধু নারীরা থিমসোফিয়ার ৩ তারিখ উপবাস করতো। ফার্সিয়ানতের ধর্মগ্রন্থের এক শ্লোক দ্বারা জানা যায়, তাদের ধর্মেও উপবাস ছিল। বিশেষ করে তাদের ধর্মগুরুদের জন্য পাঁচ সালা উপবাস আবশ্যক ছিল। (ইনসাইক্লোপেডিয়া অফ ব্রিটেনিকা)

৪. হজরত মুসা আলাইহিস সালামের রোজা

হজরত ইবরাহিম আলাহিস সালামের পর সর্বাধিক পরিচিত আসমানি কিতাবধারী নবি ছিলেন হজরত মুসা আলাইহিস সালাম। তাঁর যুগেও রোজার বিধান ছিল। তিনিও রোজা পালন করেছেন। আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা আলাইহিস সালামকে আসমানি কিতাব ‘তাওরাত’ নাজিল করার আগে ৪০ দিন রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম তুর পাহাড়ে রোজা পালনে ক্ষুধা ও পিপাসায় ৪০ দিন অতিবাহিত করেছিলেন।

সে হিসেবে মুসা আলাইহিস সালামের অনুসারীরা ৪০ দিন পর্যন্ত রোজা পালনকে উত্তম বলে বিবেচনা করতেন। ৪০তম দিনে রোজা রাখাকে তারা ফরজ তথা আবশ্যক মনে করতো। আর তা ছিল তাদের সপ্তম মাসের (তাশরিন) দশম তারিখ। এ দশম দিন ছিল তাদের কাছে আশুরা।

আশুরার দিনে আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা আলাইহিস সালামকে ১০ আহকাম দান করেছিলেন। আর এ কারণেই তাওরাতে ১০ তারিখ রোজা পালনের জন্য জোর তাগিদ করা হয়। এছাড়াও ইয়াহুদিদের অন্যান্য ছহিফাগুলোতেও অন্যান্য দিনে রোজা পালনের হুকুম পাওয়া যায়।

এছাড়াও হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে-

হজরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় (হিজরত করে) এসে ইয়াহুদিদের আশুরার দিন (মুহররমের ১০ তারিখ) রোজা অবস্থায় দেখতে পেলেন। তাই তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আজকে তোমরা কিসের রোজা করছো? তারা বলল, এটা সেই মহান দিন; যেদিন মহান আল্লাহ হজরত মুসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর কাওমকে মুক্ত করেছিলেন। আর ফেরাউন ও তার জাতিকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন।
ফলে শোকরিয়া স্বরূপ মুসা আলাইহিস সালাম ঐদিন রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরা আজকে ঐ রোজা করছি।’ (বুখারি ও মুসলিম)

আর তাতেও প্রমাণিত হয় যে, মুসা আলাইহিস সালামের যুগে এবং তার আগে ও পরে ইয়াহুদিদের মধ্যে রোজার প্রচলন ছিল।

৫. হজরত দাউদ আলাইহিস সালামের রোজা

হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম সবচেয়ে বেশি রোজা পালনকারী নবি ছিলেন। যুগে যুগে যত নবি-রাসুল রোজা পালন করেছেন, তাদের মধ্যে হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম অন্যতম। হজরত মুসা আলাইহিস সালামের পর তাঁর কিতাবের অনুসারী নবি ও শাসক হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম রোজা পালন করেছেন। তাঁর রোজা পালন ছিল আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়। কেমন ছিল তাঁর রোজা পালন? কেন তাঁর রোজা পালন ছিল আল্লাহর কাছে সর্বাধিক পছন্দের?

হজরত মুসা আলাইহিস সালামের শরিয়তকে নতুন জীবন দান করেছিলেন হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম। তিনি একাধারে নবি ও শাসক ছিলেন। কেননা হজরত দাউদ আলাইহিস সালামের নবুয়তের আগে বনি ইসরাইলের এক বংশের কাছে থাকত নবুয়তের দায়িত্ব আর অন্য বংশ পালন করতো রাজত্ব। হজরত দাউদ আলাইহিস সালামই একমাত্র নবি; যিনি সর্বপ্রথম একসঙ্গে নবুয়ত ও রাজত্ব লাভ করেছিলেন।

হজরত দাউদ আলাইহিস সালামের রোজা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় ছিল। তাঁর কণ্ঠে ছিল সুরের জাদু। তাঁর কণ্ঠে আসমানি কিতাবের তেলাওয়াত ছিল চমৎকার। তার রোজা পালন সম্পর্কে হাদিসে পাকে সুস্পষ্ট বর্ণনা ওঠে এসেছে-

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা হজরত দাউদ আলাইহিস সালামের রোজা। তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন বিনা রোজায় থাকতেন।’ (নাসাঈ, বুখারি, মুসলিম, মিশকাত)

অর্থাৎ হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম সবচেয়ে বেশি রোজা পালন করতেন। তিনি বছরের অর্ধেক দিন রোজা রাখতেন। একদিন পর একদিন তিনি রোজা পালন করতেন। এ জন্য আল্লাহর কাছে হজরত দাউদ আলাইহিস সালামের রোজা সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিল বলে উল্লেখ করেছেন স্বয়ং বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

৬. হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের রোজা পালন

হজরত দাউদ আলাইহিস সালামের পর আসমানি কিতাবধারী বিশিষ্ট নবি ও রাসুল ছিলেন হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম। তাঁর যুগে এবং তাঁর জন্মের আগেও রোজা বিধান প্রচলনের প্রমাণ পাওয়া যায়। হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম রোজা পালন করতেন। ঈসা আলাইহিস সালামের যুগে রোজার রাখার প্রমাণ কোরআনের বর্ণনায় প্রমাণিত-

‘فَقُولِي إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا فَلَنْ أُكَلِّمَ الْيَوْمَ إِنسِيًّا
‘তবে বলে দাও, আমি আল্লাহর উদ্দেশে রোজা মানত করছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলব না।’ (সুরা মারইয়াম : আয়াত ২৬)

তিনি জঙ্গলে বা বনে ৪০ দিন রোজা পালন করেছেন। নিজেকে আসমানি কিতাবের ধারক হিসেবে তৈরি করতে হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম কিতাব আসার আগে দীর্ঘ ৪০ দিন পর্যন্ত রোজা রেখেছিলেন।

৪০ দিন রোজা পালনের পর আল্লাহ তাআলা হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে আসমানি গ্রন্থ ইঞ্জিল দান করেন। আর খ্রিস্টান ধর্মে এখনও রোজা রাখার প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে।

হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের সঙ্গীরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে- ‘আমরা পবিত্র আত্মাকে কিভাবে বের করব? উত্তরে তিনি বলেছিলেন- তা দোয়া এবং রোজা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে তা কখনো বের হতে পারে না।’

হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের রোজা সম্পর্কে সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী উল্লেখ করেছেন যে-
‘হজরত মুসা আলাইহিস সালামের যুগে যে রোজা ফরজের পর্যায়ে ছিল ঈসা আলাইহিস সালাম নিজের রোজার ব্যাপারে নতুন করে কোনো বিধিনিষেধ দিয়ে যাননি। তিনি শুধু সিয়ামের নীতি ও কিছু নিয়ম বর্ণনা করেছেন এবং তার ব্যাখ্যা ও সমন্বয়ের ভার গির্জাওয়ালাদের ওপর ছেড়ে দেন।

খ্রিস্টীয় ২য় থেকে ৫ম শতকের মধ্যে খ্রিস্টানদের রোজার নিয়ম-কানুন তৈরির বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন হয়। ওই সময় ইস্টারের আগে দুইদিন রোজা রাখার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। ওই দুইটি রোজাই অর্ধেক রাতে এসে শেষ হতো। আর ওই দিন যারা অসুখে থাকতো; তারা শনিবার রোজা পালন করতে পারতো।

খ্রিস্টীয় ৩য় শতকে রোজার দিন নির্দিষ্ট করা হয়। সে সময় আবার ইফতারের সময় নিয়েও মতভেদ ছিল। কেউ মোরগ ডাক দিলে ইফতার করতো। আবার অন্ধকারে খুব ছেয়ে গেলে ইফতার করতো।

আবার খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতকে এসে ৪০টি রোজা পালনের তথ্য পাওয়া যায়। রোমানদের রোজা, আলেকজান্দ্রিয়া লাসানদের গির্জাগুলো রোজা দিন নির্দিষ্ট করে। কিন্তু রোজা নিয়মাবলী ও বিধিনিষেধ রোজাদার ব্যক্তির বিবেক ও দায়িত্বানুভূতির ওপর ছেড়ে দেয়া হয়।

তবে ইংল্যান্ডে ষষ্ঠ এর্ডওয়াড ও প্রথম ইলিজাবেথের যুগে তাদের দেশে রোজার সময় গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ করে। তার এর কারণ হিসেবে বর্ণনা করেন যে- ‘মাছ শিকার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিষয়ে উপকৃত হওয়া একান্ত দরকার।

রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের বর্ণনা
হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে তার অনুসারীরা জিজ্ঞাসা করতো যে, আমরা আমাদের অপবিত্র আন্তরসমূহকে পূতপবিত্র করতে কী করতে পারি? বা কিভাবে অন্তরসমূহকে অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করতে সক্ষম হবো?

হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম তাদেরকে বলেছিলেন, ‘অন্তরসমূহের কলুষতা ও অপবিত্রতাকে পবিত্র রাখতে রোজা এবং দোয়ার বিকল্প নেই। অন্তর পবিত্র করতে রোজা রাখার নসিহত করেছিলেন।

৭. হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের রোজা

হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের সমসাময়িক নবি ছিলেন হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম। তিনি নিজে রোজা রাখতেন এবং তার অনুসারীগণের মধ্যেও রোজা রাখার রীতি বিদ্যমান ছিল।

যুগে যুগে রোজা পালনের ধরণ যেমনই হোক না কেন, ইসলাম দিয়েছে রোজার সুন্দর ও যুযোগযোগী বিধান। কোরআন-সুন্নায় ঘোষিত হয়েছে রহমত বরকত মাগফেরাত ও নাজাত পাওয়ার উপায়।

প্রিয়নবির ঘোষণায় রোজার গুরুত্ব
রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করেও মিথ্যা কথা বলা, পরনিন্দা ও অন্যান্য পাপাচার থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারলো না; তার পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি)

এ কারণে পূর্ববর্তী যুগের সব নবি-রাসুলদের সময়ও এ কথার ঘোষণা ছিল যে, তোমরা যখন রোযা রাখবে তখন লোক দেখানো মনোবৃত্তি নিয়ে মানুষের মত নিজেদের মুখমন্ডলকে উদাস করে রাখবে না। কেননা, এই শ্রেণীর মানুষ নিজেদের মুখমন্ডলের আসল রূপ বিকৃত করে রোজাদার রোজাদার ভাব গ্রহণ করতো। যাতে মানুষ মনে করে যে তারা রোজাদার।

প্রাক ইসলামি যুগে আরবাসীরাও রোজা সম্পর্কে ওয়াকিফ হাল ছিল এবং তা পালনে সক্রিয় ছিল। মক্কার কুরাইশরা জাহেলিয়াতের যুগে ১০ মহররম রোজা রাখতো। এ দিনে পবিত্র কাবায় নতুন কিসওয়া বা গিলাফ পরিধান করানো হতো। (মুসনাদে আহমদ)

‘প্রাক ইসলামি যুগে মদিনার ইয়াহুদিরাও পৃথক পৃথকভাবে আশুরার উৎসব ও রোজা পালন করতো।’ (বুখারি)

তাদের রোজা পালনের দিনক্ষণ ছিল তাদের নিজেদের গণনার সপ্তম মাসের ১০ম দিন। প্রিয়নবি মদিনায় হিজরতের পরও ইয়াহুদিরা রোজা পালন করতেন। যা দেখে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, তোমাদের চেয়ে আমরাই এ রোজ রাখার হকদার বেশি।

সুতরাং মুমিন মুসলমানের আত্মায় তাকওয়ার বীজ বপনে রোজার বিকল্প নেই। রোজা রাখলেই মানুষ মুত্তাকি হয়ে যায়। রোজা মানুষকে মুত্তাকি হতে প্রস্তুত করে। আল্লাহর ভয় অর্জন করে পরিশুদ্ধ জীবন গঠনের অন্যতম প্রশিক্ষণও এ রোজা পালন।

যেভাবে যুগে যুগে সব নরি-রাসুল রোজা পালনের মাধ্যমে নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে তৈরি করেছিলেন। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা রোজার বিধানে আগের লোকদের ওপর রোজা ফরজে কথা উল্লেখ করেছেন এবং তাকওয়ার অধিকারী হওয়ার বিষয়টিই ওঠে এসেছে কোরআনে-
‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেভাবে তোমাদের আগের লোকদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল। যাতে তোমার তাকওয়াবান হতে পার।’ (সুরা বাক্বারা : আয়াত ১৮৩)

যুগে যুগে রোজার বিধানের ধারাবাহিকতায় উম্মতে মুসলিমদের ওপর একটানা এক মাস রোজা পালন ফরজ করেছেন মহান আল্লাহ। যে মাসে তাদের হেদায়েত পাওয়ার জন্য দান করেছেন কোরআন। কোরআনের অনুসারী প্রাপ্ত বয়স্ক মুমিন মুসলমান এ মাসটি পেলেই রোজা রাখতে হবে মর্মে ঘোষণা এসেছে এভাবে-

‘রমজান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসব্যাপী রোজা রাখবে।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৫)

কোরআন-সুন্নাহর বর্ণনায় এ কথা সুস্পষ্ট যে, রোজা শুধু উম্মতে মুহাম্মাদির ওপরই ফরজ হয়নি বরং আগের নবি-রাসুলদের ওপরও রোজার বিধান ছিল। শুধু তা-ই নয়, হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের পরবর্তী যুগে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে এ রোজা রাখার প্রচলন অব্যাহত ছিল। যারা নিজ নিজ ধর্মানুসারে ব্রত বা উপবাস করতো।

আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুসলিমার জন্য এ রোজার বিধান ফরজ করেছেন। আর রমজানের উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য রহমত বরকত মাগফেরাত ও নাজাতের মাস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

রোজার প্রয়োজনীয় মাসায়েল

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে রোজা তৃতীয়। রোজা পালন করার জন্য কিছু মাসায়েল রয়েছে। যার মাধ্যমে রোজা রাখা রাখার বিধান বিদ্যমান।

রোজা কার উপর ফরজ

রোজা ইসলামের অন্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। রোজা ফরজ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে।

  • মুসলিম হওয়া
  • আক্কেল বা বোধবুদ্ধি সম্পন্ন হওয়া
  • বালেগ হওয়া বা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া

কার জন্য রোজা ভাঙ্গার অনুমতি রয়েছে: সাময়িকভাবে রমজান মাসে রোজা ভাঙ্গার অনুমতি রয়েছে। রমজান মাসে দুই অবস্থায় রোজা ভাঙ্গা যায়। কিন্তু তা পরিবর্তিতে কাযা আদায় করে দিতে হবে।

  • অসুস্হতা
  • মুসাফির

১. অসুস্থতা: যদি রোজা রাখলে অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে বা অন্য কোন নতুন রোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অথবা রোগমুক্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে বিলম্ব হয় তাহলে রোজা ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। তবে ডাক্তারের পরামর্শ বা রোগীর পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

২. মুসাফির: মুসাফির বলা হয় যে ব্যক্তি নিজ এলাকা থেকে ৬১ মাইল বা ৯৮ কিলোমিটার দূরে যায় এবং সেখানে গিয়ে ১৫ দিনের চেয়ে কম থাকার জন্য সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে নিজ এলাকা থেকে বের হয়ে ফিরে আসা আসা পর্যন্ত সে ব্যক্তি মুসাফির। মুসাফির থাকা অবস্হায় রোজা ভঙ্গ করার অনুমতি রয়েছে। সে সময়ে যদি রোজা রাখা কষ্টসাধ্য হয় তাহলে তখন রোজা না রেখে পরবর্তীতে কাযা আদায় করে দিতে হবে।

এই দুই অবস্থা ছাড়াও কয়েকটি কারণে রোজা না রেখে পরবর্তীতে কাযা আদায় করা বৈধতা দেওয়া হয়েছে। গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা যদি রোজা রাখলে দুগ্ধ শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে বা সন্তানের জীবনের ঝুঁকি থাকে তাহলে রোজা না রাখার বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

মহিলাদের মাসিক পিরিয়ডের সময়ে রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। মহিলাদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় যার সময়সীমা ৪০ দিন তখনও রোজা না রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তা পরবর্তীতে কাযা আদায় করে দিতে হবে।

যে সব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় এবং কাজা কাফফারা উভয়টা ওয়াজিব হয়

১. রমজান মাসে রোজা রাখার পর ইচ্ছাকৃত ভাবে পানাহার বা স্ত্রী সহবাস করলে।
২. রমজানের রোজা নিয়্ত করে রাখার পর রোজা অবস্হায় ইচ্ছা করে সামনে বা পিছনের রাস্তায় সঙ্গম করলে বা করালে।
৩. সিংঙ্গা দেওয়ার দরুণ কিংবা চতুষ্পদ জন্তুর সাথে যৌন সঙ্গম করার দরুণ বা কোন রমণীকে স্পর্শ দরুণ রোজা ভঙ্গ হয়েছে ধারণা করে ইচ্ছাকৃত পানাহার করা৷

উপরোক্ত কারণে রমজানের একটি রোজার বদলে অন্য সময়ে একটি রোজা ও কাফফারা ওয়াজিব হয়ে যায়। [জওহারাহ ও বাহারে শরীয়ত ৫ম খন্ড]

যে সব কারণে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায় এবং শুধু কাজা ওয়াজিব হয়

১. নিদ্রা অবস্থায় সঙ্গম করলে
২. বমির বেশির ভাগ মুখে আসার পর তা গিলে ফেললে
৩. নাকে তরল ঔষুধ প্রবেশ করালে ও ইচ্ছা করে নশ টানলে
৪. রোযাদার অবস্হায় অখাদ্য ভক্ষণ করলে
৫. বাধ্য হয়ে স্ত্রী সহবাস যৌন সঙ্গম করলে
৬. কুলি করার সময় অনিচ্ছায় গলার ভেতর পানি প্রবেশ করলে
৭. প্রস্রাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে ওষুধ বা অন্য কিছু শরীরে প্রবেশ করালে
৮. রোজাদারকে জোর করে কেউ কিছু খাওয়ালে
৯. রাত অবশিষ্ট আছে মনে করে সুবেহ সাদিকের পর পানাহার করলে
১০. ইফতারের সময় হয়েছে ভেবে সূর্যাস্তের আগে ইফতার করলে
১১. মুখ ভরে বমি করলে
১২. ভুলবশত কোনো কিছু খেয়ে, রোজা ভেঙ্গে গেছে ভেবে ইচ্ছা করে আরো কিছু খেলে
১৩. বৃষ্টির পানি মুখে পড়ার পর তা খেয়ে ফেললে
১৪. কান বা নাক দিয়ে ওষুধ প্রবেশ করালে
১৫. জিহ্বা দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে ছোলা পরিমাণ কোনো কিছু বের করে খেয়ে ফেললে
১৬. রোজা স্মরণ থাকা অবস্থায় অজুতে কুলি বা নাকে পানি দেওয়ার সময় ভেতরে পানি চলে গেলে [ফাতাওয়ায়ে শামি, ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, বাহরে শরীয়ত ইত্যাদি]

রোজার কাজা ও কাফফারা

রোজার কাজা হলো একটি রোজার পরিবর্তে আরেকটি রোজা রাখা।

রোজার কাফফারা ৩ টি।

১. দাস-দাসী মুক্ত করা
২. ধারাবাহিক ভাবে ৬০ টি রোজা রাখা
৩. ৩-৬০ জন মানুষকে ভালোভাবে দুই বেলা আহার করানো

যেসব কারণে রোজা মাকরুহ হয়

১. গড়গড়াসহ কুলি করা
২. বিনা প্রয়োজনে খাবারের স্বাদ নেওয়া
৩. রোজা অবস্থায় মুখে থুথু জমিয়ে তা গিলে ফেলা মাকরুহ
৪. রোজা অবস্থায় পেস্ট বা এমন ঝাঁজযুক্ত মাজন দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা মাকরুহ। তবে মিসওয়াক করা জায়েজ
৫. থুথু মুখে জমিয়ে গিলে ফেলা
৬. কামাসক্ত হওয়ার ভয় থাকলে স্ত্রীকে স্পর্শ করা, চুম্বন করা
৭. সন্দেহযুক্ত সময় পর্যন্ত বিলম্ব করে সাহরি খাওয়া
৮. সাহরি ও ইফতার ছাড়া ধারাবাহিকভাবে একাধিক দিনের রোজা রাখা মাকরুহ ইত্যাদি

রোজার নিয়ত

রোজা সহিহ হওয়ার জন্য নিয়ত করা ফরজ। আরবি বা বাংলা যে কোন ভাবে করা যায়। আপনি আরবিতে এভাবে করতে পারবেন:

“নাওয়াইতু আন আছুম্মা গাদাম মিন শাহরি রমাজানাল মুবারাকি ফারদাল্লাকা, ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।” অর্থাৎ হে আল্লাহ! আগামীকাল পবিত্র রমযান মাসে তোমার পক্ষ থেকে ফরয করা রোজা রাখার নিয়ত করলাম, অতএব তুমি আমার পক্ষ থেকে কবুল কর, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।

ইফতারের নিয়ত

আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযক্বিকা, ওয়া আফতারতু বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি তোমারই সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেয়া রিযিক্বের মাধ্যমে ইফতার করছি।

মাসিকের পর কখন রোজা রাখা উচিত?

রমজানে রজঃস্রাবের কারণে নারীরা তিন থেকে দশ দিন রোজা রাখতে পারেন না এবং নামাজও আদায় করতে পারেন না। অনুরূপভাবে নিফাস অবস্থায় অর্থাৎ সন্তান প্রসবোত্তর স্রাব চলাকালীন (সর্বোচ্চ ৪০ দিন) নামাজ ও রোজা পালন করতে পারেন না। এ সময়ের রোজাগুলো পরে আদায় করে নিতে হয়; কিন্তু এ সময়ের নামাজ আর আদায় করতে হয় না।

যেহেতু নিফাস বা প্রসবোত্তর স্রাবের সর্বনিম্ন কোনো সময় নেই; তাই স্রাব (রক্তক্ষরণ) বন্ধ হলেই নামাজ ও রোজা পালন শুরু করতে হবে (৪০ দিনের অপেক্ষায় থাকা যাবে না)।

অনেক নারী রোজা পালনের সুবিধার্থে ওষুধ খেয়ে রজঃস্রাব বন্ধ রাখেন। এতে যদি (বিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শমতে) শারীরিক কোনো বড় ধরনের অসুবিধা না হয়; তাহলে কোনো অসুবিধা নেই।

রোজা অবস্থায় রজঃস্রাব হলে ওই দিনের রোজা হবে না; কিন্তু রমজানের সম্মানে সেদিন ইফতার পর্যন্ত তার পানাহার থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। পরদিন থেকে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত রোজা রাখতে হবে না।

যাঁরা যেকোনো কারণে রোজা রাখতে পারেন না, তাঁরা রমজান মাসের রোজার সম্মানে ও রোজাদারদের সম্মানার্থে প্রকাশ্যে পানাহার থেকে বিরত থাকবেন।

কোনো নারী যদি রমজানের কোনো রাতে সাহরির সময় শেষ হওয়ার আগে স্রাব থেকে মুক্ত হন এবং যেকোনো কারণে গোসল করতে না পারেন; তাহলে সাহরি খেয়ে রোজা শুরু করবেন, পরে গোসল করে নামাজ আদায় করবেন।

বিশেষ সময়ের করণীয় আমল

নারীদের রজঃস্রাবের সময়ে নামাজ পড়া, রোজা রাখা, কোরআন তিলাওয়াত ও স্পর্শ করা এবং মসজিদে প্রবেশ করা নিষেধ। কিন্তু তাঁরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বা নির্দিষ্ট ইবাদতের সময় হলে অজু করে এসে জায়নামাজ বিছিয়ে কিছু সময় বিভিন্ন দোয়া দরুদ, তাসবিহ তাহলিল ও জিকির আজকার করবেন; এতে তিনি সম্পাদিত আমলের ও সময় নির্ধারিত আমলের সওয়াব লাভ করবেন।

অনেকে মনে করেন অন্তঃসত্ত্বা নারী রোজা পালন করলে সন্তানের কোনো ক্ষতি হতে পারে; তাই তাঁরা রোজা না রেখে তার ফিদইয়া দিতে চান; এটা মোটেই ঠিক নয়। যদি অবস্থা এমন হয় যে অভিজ্ঞ কোনো ডাক্তার, যিনি ধর্মীয় বিধানের গুরুত্ব ও রোজার সামগ্রিক দিক সম্বন্ধে যথাযথ ওয়াকিবহাল এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা জানার পর তাঁকে রোজা পালনে নিষেধ করে থাকেন; তবে এই নারী সন্তান প্রসবের পর সুস্থতা লাভ করলে তখন এই রোজা কাজা আদায় করবেন। এ ক্ষেত্রে ফিদইয়া বা কাফফারা গ্রহণযোগ্য হবে না।

ফিদইয়া হলো শুধু তাঁদের জন্য, যাঁরা অসুস্থতা বা বার্ধক্যজনিত অক্ষমতার কারণে রোজা রাখতে পারছেন না, যে অসুস্থতা থেকে আর সুস্থ হওয়ার কোনো আশা বা সম্ভাবনা নেই। আর শুধু শুধু অহেতুক আশঙ্কায় রমজানের ফরজ রোজা ছেড়ে দেওয়া জায়েজ হবে না।

রোজা রাখলে কি পিরিয়ডে প্রভাব পড়ে?

কোনো কারণে ঋতুস্রাবের সময় ১০ দিনের চেয়ে বেশি হলে, সাধারণত তাঁর ঋতুস্রাব যত দিন স্থায়ী হয় তত দিন পর্যন্ত নামাজ-রোজা বন্ধ রাখবেন। এরপর থেকে আবার সব ইবাদত পালন করবেন। আর যদি ১০ দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে স্রাব আসার শেষ দিন পর্যন্ত ঋতুস্রাব গণ্য করে নামাজ-রোজা ইত্যাদি বন্ধ রাখবেন। এই সময়ে নামাজের কাজা না থাকলেও পরবর্তী সময়ে রোজার কাজা আদায় করে নিতে হবে। (আদ্দুররুল মুখতার: ১/ ৩০০-৩০১)

রমজানের রোজা, হজের কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কারণে নারীরা ওষুধ সেবনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে স্রাব বন্ধ রাখেন। ওষুধ সেবনের মাধ্যমে স্রাব বন্ধ রাখা বৈধ হলেও তা ব্যবহারের আগে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। (মুসান্নাফে আবদুর রাজজাক: ১২১৯ ও ১২২০; আল-মুহিতুল বুরহানি: ১ / ৩৯৯)

ঋতুস্রাব চলাকালীন নারীরা কুরআন তিলাওয়াতও করবেন না এবং অন্যকে শেখানোর উদ্দেশ্যেও কুরআন পড়বেন না। তবে একান্ত প্রয়োজন হলে পূর্ণ আয়াত তিলাওয়াত না করে এক বা দুই শব্দ করে কাউকে বলে দিতে পারবেন। (বাদায়েউস সানায়ে: ১ / ১৫০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১ / ৩৯)

কেউ যদি ঋতুস্রাব অবস্থায় ইতিকাফ করেন, তাহলে তাঁর ইতিকাফ আদায় হবে না। এমনকি ইতিকাফের মাঝখানে ঋতুস্রাব চলে এলেও ইতিকাফ ভেঙে যাবে। (ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১ / ২১)

রমজান কোন ধর্মের?

ইসলামে রোজা বা রমজান ফরজ হিসাবে বাধ্যতামূলক করা হয় হিজরি দ্বিতীয় বর্ষে। এরপর থেকেই অপরিবর্তিত রূপে সারা পৃথিবীতে রোজা পালন করা হচ্ছে।

রমজানের মতো না হলেও ইহুদি এবং অন্যান্য আরও অনেক জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও রোজার মতো সারাদিন পানাহার না করার ধর্মীয় রীতি দেখা যায়।

তবে ইসলামের প্রধান পাঁচটি ধর্মীয় স্তম্ভের একটি হচ্ছে রোজা। অন্য চারটি ফরজ হচ্ছে ঈমান, নামাজ, যাকাত, হজ্জ।

রমজান কিভাবে শেষ হয়?

রমজান মাসের ২৯ বা ৩০ তারিখে ঈদের চাঁদ ওঠার মধ্য দিয়ে রমজান মাস শেষ হয়। রমজান মাস শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে হয় ঈদুল ফিতর।

মুসলমানদের জীবনে রমজান আসে পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে, জীবনকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর তাগিদ নিয়ে। রমজান এলো, রমজান গেল, কিন্তু আমাদের প্রাপ্তি কতটুকুু—এ নিয়ে হিসাব-নিকাশ করার সময় হয়েছে। রমজান হলো মুমিনের জন্য বার্ষিক সুযোগ, যেন সে অন্ধকার থেকে আলোর পথে, গোমরাহি থেকে হিদায়াতের পথে আসতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রমজান মাসই হলো সেই মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হিদায়াত ও সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য বিধানকারী।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫)

মাহে রমজানের রোজা মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে চলার শিক্ষা দেয়। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি ও আত্ম-অহংবোধ ভুলে গিয়ে সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধিশালী সমাজ প্রতিষ্ঠার মাসই হলো মাহে রমজান। রোজা মানুষকে পার্থিব লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়।

রোজা মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ, মিতাচার, মিতব্যয়িতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার শিক্ষা দেয়। রমজানে বিশেষ বিশেষ ইবাদতের বিধান দেওয়া হয়েছে। যেমন—সিয়াম সাধনা, তারাবি, রোজাদারকে ইফতার করানো, ইতিকাফ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, সহমর্মিতা প্রকাশ, শবেকদর অন্বেষণ, ওমরাহ পালনসহ বহু ইবাদতের বিধান রয়েছে। ভাবার বিষয় হলো, আমরা কতটুকু আমল করতে পেরেছি, কতটুকু নিজেকে আলোকিত মানুষরূপে গড়ে তুলতে পেরেছি, রমজানের দাবি আমাদের জীবনে কী পরিমাণ বাস্তবায়িত হয়েছে—এসবের যোগ-বিয়োগ করার সময় এখনই।
সুফিবাদের পরিভাষায়, এই হিসাব-নিকাশ করাকে ‘মুহাসাবা’ বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অথচ তারা এখনো উদাসীনতার মধ্যে বিমুখ হয়ে আছে।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১)
এ বিষয়ে ওমর (রা.)-এর একটি চমৎকার কথা আছে—‘তোমার হিসাব নেওয়ার আগে তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিয়ে নাও।’

তাই এখন সময় হিসাব-নিকাশের। জীবনে অগ্রযাত্রার জন্য প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মূল্যায়ন খুবই জরুরি।

রমজানের শেষে মানুষ কি করে?

দেখতে দেখতে রমজান মাস শেষ হয়ে গেল। এভাবেই আমাদের জীবন একদিন শেষ হয়ে যাবে। মানুষ বলতেই কয়েকটি দিনের সমষ্টি।

একটি দিন অতিবাহিত হয় তার জীবনের একটি অংশ খসে পড়ে। জানি না আমরা আবার আগামী রমজান পাব কিনা। রমজানের জন্য প্রতিটি মুমিন-মুত্তাকির আফসোস করা উচিত।

একজন মুমিন রমজানের জন্য আফসসোস না করে কীভাবে থাকবে, অথচ এ রমজানে জান্নাতের দরজাগুলো উন্মুক্ত করা হয়। একজন গোনাহগার কি কারণে রমজানের জন্য আফসোস না করবে, অথচ রমজানে জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয়। কেন শয়তান রমজানের কারণে জ্বলে পুড়ে না মরবে, অথচ তাতে সে আবদ্ধ থাকে। রমজানে নেককারদের অবস্থা ছিল এমন যে, রমজানে তারা আল্লাহর দরবারে দণ্ডায়মান থাকে, তার শাস্তিকে ভয় করে।

রমজানের এ রহমতের দিনগুলোতেও বঞ্চিত হয়েছেন কত রাত জাগরণকারী। বঞ্চিত হয়েছেন কত কত ঘুমন্ত ব্যক্তি। কত ঘুমন্ত অন্তর আল্লাহর জিকিরে মশগুল, কত জাগ্রত অন্তর আল্লাহর অপরাধে লিপ্ত। কিন্তু বান্দাদের উচিত নেককাজের জন্য চেষ্টা করা এবং তার কবুলের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা। এটাই নেককারদের অভ্যাস।

ইয়াহইয়া ইবনে কাসির বলেছেন, ‘আল্লাহর কতক নেক বান্দার দোয়া ছিল, ‘হে আল্লাহ, তুমি আমাকে রমজানের কাছে সোপর্দ কর ও রমজানকে আমার কাছে সোপর্দ কর। এবং রমজানকে আমার কাছ থেকে কবুল করে নাও’। (হুলইয়াতুল আউলিয়া : ৩/৬৯)।

ইবনে দিনার বলেন, ‘কবুল না হওয়ার ভয়, আমল করার চেয়েও বেশি কষ্টের’। আব্দুল আজিজ আবু দাউদ বলেন, ‘আমি তাদের খুব আমল করতে দেখেছি, তবুও আমল শেষে তারা কবুল না হওয়ার শঙ্কায় ভীত থাকত’। (লাতায়েফ : ৩৭৫)। রমজানের আমল কবুল হওয়ার আলামত হলো-রমজানের পরও ধারাবাহিক আমল করে যাওয়া কবুল হওয়ার সব চেয়ে বড় আলামত। কেউ বলেছেন, ‘নেকির সওয়াব হচ্ছে, নেকির পর নেকি করা। এক নেক আমলের পর দ্বিতীয় নেক আমল করা, প্রথম আমলটি কবুল হওয়ার আলামত। যেমন নেক আমল করার পর গোনা করা, নেক আমল কবুল না হওয়ার আলামত’।

রমজান পেয়ে ও তাতে সিয়াম-কিয়াম করে, রমজানের পর গুনাহ করা মূলত আল্লাহর নিয়ামতকে গোনাহের মোকাবিলায় দাঁড় করানোর শামিল। যদি কেউ রমজানেই রমজানপরবর্তী গোনা করার ইচ্ছা করে থাকে, তবে তার রোজা তার ওপরই পতিত হবে এবং তওবা না করা পর্যন্ত তার জন্য রহমতের দরজা বন্ধ থাকবে।

কত সুন্দর! গোনাহর পর নেকি করা, তাতে গোনাহ মিটে যায়, আর নেকির পর নেকি করা আরও সুন্দর! খুবই খারাপ নেকির পর গোনাহ করা, যার কারণে নেকি নষ্ট হয়ে যায়। তওবা করার পর একটি গোনাহ করা, তওবার আগে সত্তরটি গোনাহর চেয়েও খারাপ। তওবা করার পর তাওবা ভঙ্গ করা খুবই খারাপ। ইবাদতের সম্মান লাভ করে গোনাহর অসম্মান মাথায় নেওয়া বড়ই লজ্জাকর।

হে তওবাকারীরা, রমজানের পর তোমরা গোনাতে ফিরে যেও না। তোমরা ইমানের স্বাদের ওপর গোনার প্রবৃত্তি প্রধান্য দিও না। তোমরা আল্লাহর জন্য ধৈর্য ধারণ কর। তিনি তোমাদের উত্তম জিনিস দান করবেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, যদি আল্লাহ তোমাদের অন্তরে কোনো কল্যাণ আছে বলে জানেন, তাহলে তোমাদের থেকে যা নেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন, আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। (আনফাল : ৭০)।

হে ইবাদত গোজার বান্দারা, যেসব ইবাদতের মাধ্যমে তোমরা রমজানে আল্লাহর ইবাদত করেছ, সে ইবাদত এখনো বিদ্যমান। রমজানের সঙ্গে সঙ্গে তা চলে যায়নি। হয়তো তোমরা তা পুরোপুরি করতে পারবে না, কিন্তু একেবারে ছেড়ে দিও না। বিশর হাফিকে বলা হয়েছে, ‘কতক লোক রয়েছে, যারা রমজানে খুব ইবাদত ও পরিশ্রম করে। তিনি বলেন, তারা খুবই খারাপ, যারা রমজান ছাড়া আল্লাহকে চিনে না। নেককার সে ব্যক্তি যেসব সময় আল্লাহর ইবাদত করে। (লাতায়েফ : ৩৯৬)।

রমজান কিভাবে পালন করা হয়?

রমজানের প্রকৃত অর্থ হল আত্মসংযম তথা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। তাই রমজানের মাস হল সংযম, ইবাদাহ, দান করে পূণ্য অর্জন করার মাস। তারাবীহ-তাহাজজুদের পাশাপাশি রমজান মাসে মুসলিম ধর্মালম্বী মানুষেরা গরিব-দুঃখী ভাইবোনদের নিজের সাদ্ধমত দান করে পূর্ণ অর্জনের চেষ্টা করেন। একমাত্র রোজার দিনগুলোতে নিজেরা উপবাস থেকে গরিব মানুষের অভুক্ততা ও দুর্দশার কি কষ্ট সেটা অনুভব করা যায়।

রমজান মাসে রোজার দিনে শুধু নিজেকে অভুক্ত রাখার অর্থ সংযম করা নয়। এই সংযমের অর্থ হল রোজা রাখা ব্যক্তির চোখ, নাক, কান, মুখ ইত্যাদি ইন্দ্রীয়গুলোকে সংযম করা।

রোজার দিনে নিজেদের ইন্দ্রীয়গুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন করা যেমন- কান দিয়ে খারাপ শোনা উচিত নয়, চোখ দিয়ে খারাপ কিছু দেখা উচিত নয়, মন থেকে খারাপ কিছু চিন্তা করা উচিত নয়, মুখ দিয়ে মিথ্যা ও কটু কথা বলা উচিত নয়।
এইভাবে রোজা রাখার মধ্যে দিয়ে নিজেদের ইন্দ্রীয়গুলোকে সংযম করে রমজান আমাদের অসত্যের পথ ছেড়ে দিয়ে সত্যের পথে পরিচালিত হতে শেখায়।

রোজা মনের কালিমা ঘুচিয়ে দিয়ে আমাদের মনকে নির্মল করে তোলে।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *