Categories
Bangla Contents

বইকে ভালোবাসতে পারা


বাংলাদেশে মোটাদাগে তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে : কওমি মাদরাসা শিক্ষা, আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা এবং সাধারণ শিক্ষা।

সাধারণ শিক্ষার আবার দুটি ভাগ : বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি মাধ্যম।

আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি বারো বছর এবং তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য আরও পাঁচ বছর মোট সতেরো বছর পড়াশোনা করতে হয়।

কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় প্রথম শ্রেণি থেকে নিয়ে দাওরা হাদিস বা তাকমিল পর্যন্ত পড়াশোনা করতে কোথাও বারো বছর, কোথাও দশ বছর, কোথাও সাত বা আট বছর সময় লাগে।

কোনো কোনো কওমি মাদরাসা নতুন সেবা চালু করেছে : যাঁরা সাধারণ শিক্ষায় মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পাস দিয়েছেন তাদের জন্য ছয় বছরে দাওরা হাদিস সম্পন্ন করার ব্যবস্থা আছে।

এ-শিক্ষাব্যবস্থায় এখন চালু আছে দুটি টার্ম : শর্ট কোর্স এবং লং কোর্স।

বইয়ের সঙ্গে পাঁচ থেকে পঁচিশ বছর

যাই হোক। পাঁচ বছর বয়স থেকে নিয়ে পঁচিশ বছর বা তারও বেশি সময় আমাদের বইয়ের সঙ্গে কাটাতে হয়। যাঁরা শিক্ষা সম্পন্ন করেন ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক এ-দীর্ঘ সময় তাঁদের বই নিয়ে পড়ে থাকতে হয়।

এত দীর্ঘ সময় বইয়ের সঙ্গে বসবাস করার পরও কেনো যে মানুষ বইকে ভালোবাসে না তা খুবই আশ্চর্যজনক ও রহস্যময়।

এতদিন কোনো মানুষের সঙ্গে বসবাস করার পর কিছু খারাপ স্বভাব থাকা সত্ত্বেও তার সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা হয়, বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে; কিন্তু বইয়ের সব ভালো গুণ থাকা সত্ত্বেও কেনো যে তার সঙ্গে ভালোবাস হয় না, বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে না, তা বোধগম্য নয়। তারপরও কিছু কারণ ব্যাখ্যা করা যায়।

নতুন বিষয়কে জানার ও বোঝার আগ্রহ বইয়ের প্রতি ভালোবাসার অন্যতম কারণ; এই আগ্রহ যাঁদের নেই আজীবন বইয়ের সঙ্গে বসবাস করেও তাঁরা বইকে ভালোবাসতে পারেন না।

‘তিরিশ পৃষ্ঠা পড়তে পেরেছি’

একই সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করে একই সঙ্গে শিক্ষকতায় প্রবেশ করেছি এমন একজনের উদাহরণ দেওয়া যাক। তিনি একদিন আমার বিছানায় বসতে বসতে বললেন, ‘তুমি যে কীভাবে এত বই পড়ো তা আমি বুঝে পাই না। আমি তো পড়তে পারি না।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, আপনি (বয়সে বড় বলে আপনি) বই পড়া শুরু করুন; আমি আপনাকে পুরস্কার দেবো।’ আমি তিনশো বিশ পৃষ্ঠার একটি চমৎকার বই তাঁর হাতে দিয়ে বললাম, ‘এই বইটির প্রতি পঞ্চাশ পৃষ্ঠা পড়ার জন্য আপনি পুরস্কার পাবেন দশ টাকা; বইটি পড়ে শেষ করতে পারলে পাবেন একশো টাকা।’

তিনি মৃদু হেসে বইটি নিয়ে গেলেন। এক সপ্তাহ পর বইটি ফেরত দিয়ে বললেন, ‘তিরিশ পৃষ্ঠা পড়তে পেরেছি। আমাকে দিয়ে আর হবে না।’ আমার এই সহপাঠী শিক্ষকতায় আছেন এবং আজীবন তাই থাকবেন; কিন্তু বইকে হয়তো কোনোদিনই ভালোবাসতে পারবেন না। তিনি যে-বইগুলোর পাঠদান করেন তাঁর জ্ঞানের পরিধি ওগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এ-ধরনের অজস্র উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে আছে।

লিখতে হলে শিখতে হয়

যাঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত আছেন তাঁদের অবশ্যই পড়তে হয়। কারণ, লিখতে হলে শিখতে হয় এবং শিখতে হলে পড়তে হয়। আবার না-পড়েও অনেকে লেখালেখি করেন। তাঁদের লেখায় থাকে অজস্র ভুল। একজন উর্দু রাসে উমিদ থেকে কেপ অব গুড হোপ-এর অনুবাদ করতে গিয়ে এটিকে বলেছেন ‘আশার চূড়া’; কিন্তু এটি তো উত্তমাশা অন্তরীপ।

আরেকজন নারীর শত্রুদের বর্ণনা দিয়ে সিডও (ঈঊউঅড) সনদকে বলেছেন ‘সিডিও সনদ’ এবং অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে এই সনদের সমালোচনা করেছেন। বোঝা যায়, তিনি এ-ব্যাপারে কিছুই পড়েন নি। মৌলিক লেখা বা অনুবাদ যে শতভাগ নির্ভুল হতে হবে তা নয়; কিন্তু এমন ভুল কখনোই কাম্য নয়।

দুঃখকে ভুলে থাকার জন্য বা বেদনাকে জয় করার জন্য বই পড়েন অনেক পাঠক। মনকে সুখ দিতেও বই পড়া হয় অনেক।

তাঁরা বই পড়েন তথ্য বা জ্ঞান আহরণের জন্য নয়; রস-আস্বাদনের জন্য। তাঁরা বাক্যের গঠন, শব্দের প্রয়োগ, বক্তব্য ও বর্ণনার প্রতি তেমন খেয়াল করেন না; একটানা পড়ে যান, রসটুকু আস্বাদন করেন এবং মনকে সুখ দেন।

আবার যাঁরা শেখার জন্য পড়েন, তাঁরা পড়েন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে; শব্দ-প্রয়োগ ও বাক্যগঠনের প্রতি দৃষ্টি রাখেন, বর্ণনা কেমন হলো তা দেখেন এবং সব তথ্যকেই সন্দেহাতীত সত্য বলে গ্রহণ করেন না।

যেসব তথ্যে তাঁদের সংশয় জাগে, সে-ব্যাপারে তাঁরা অনুসন্ধান করেন। যাঁরা আরও পরিশ্রমী ও শৃঙ্খলাপ্রিয় তাঁরা জরুরি তথ্য বা চমৎকার শব্দপ্রয়োগ ঘটেছে যেসব বাক্যে সেগুলো লিখে রাখেন খাতায়।

মরহুম মনীষী জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘খেতের আইল না বেঁধে জমি চাষ করা যে-কথা, নোট না নিয়ে বই পড়া একই কথা।’

নোট রেখে বই পড়লে অনেকভাবে উপকৃত হওয়া যায় এবং বই পড়া শেষে মনে হয় আমার অনেক কিছুই জানা হলো। তারপরও কথা হলো, যে-উদ্দেশ্যেই পড়–ন আর যেভাবেই পড়–ন বই আপনাকে উপকৃত করবেই।

সমমনা কয়েকজন একসঙ্গে বসবাস করলে আরও একটি উপায়ে পঠিত বই থেকে উপকৃত হওয়া যায়। সপ্তাহশেষে বা মাসশেষে তাঁরা একটি বৈঠক বা আড্ডায় মিলিত হতে পারেন এবং সংশ্লিষ্ট সপ্তাহ বা মাসে পঠিত বইটি বা বইগুলোর ভালোলাগা বা মন্দলাগা এবং অন্যান্য বিষয় ব্যক্ত করতে পারেন। এতে কথক ও শ্রোতা সবাই উপকৃত হবেন।

কওমি মাদরাসা সবাই আবাসিক থাকেন বলে এই কাজটি করা তাঁদের জন্য খুবই সহজ। নির্দিষ্ট মাসে বা সপ্তাহে কী বই পড়া হবে তা পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে নির্ধারণ করে তাঁরা পাঠচক্রও করতে পারেন। আমাদের হাতে যখন সুযোগ থাকে, সে-সুযোগ অবশ্যই কাজে লাগানো উচিত।

২. কী বই পড়তে পারি

অনেকের জিজ্ঞাসা থাকে, আমি কী বই পড়তে পারি বা আমার কী বই পড়া উচিত? আসলে এই প্রশ্নের কোনো সোজাসাপ্টা উত্তর দেওয়া যাবে না। কী বই পড়া উচিত তা যেমন রুচি ও মূল্যবোধের নির্ভর করে তেমনি নির্ভর করে প্রয়োজনীয়তার ওপর।

কে কী উদ্দেশ্যে বই পড়ছেন তাও বই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। অনেকেই বইয়ের তালিকা প্রস্তুত করে উপদেশ দিয়ে থাকেন সেগুলো পাঠ করার জন্য; কিন্তু তা সবার জন্য বা সবসময় কার্যকরী নয়।

‘মৃত্যুর আগে অবশ্যই পাঠ করতে হবে’—এমন বইয়ের তালিকা পাওয়া যায় অনেক। গুগলে সার্চ দিলেই আপনি পেতে পারেন এমন তালিকা।

আমি বেশ কয়েকটি তালিকা সংগ্রহ করেছি এবং প্রার্থনা করছি যেনো এগুলো পাঠ করার আগে আমার মৃত্যু না হয়। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, আমি ওই বইগুলো পড়ছি না। হয়তো এসব তালিকার কিছু বই আমি আগে পড়েছি বা পরে পড়বো; কিন্তু নিয়মতান্ত্রিকভাবে ওইগুলোই পড়ছি না। আমি এখন পড়ছি জওহরলাল নেহরুর রচনাসমগ্র : বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ, ভারত সন্ধানে এবং আত্মচরিত। সেই সঙ্গে পড়ছি মসনবিয়ে রুমি। মসনবিয়ে রুমির কথা অবশ্য আছে ‘মৃত্যুর আগে পাঠ করতে হবে’-এর তালিকায়। আরও একটি বই হাতে আছে আমার : মোল্লা আবদুস সালাম জয়িফের লেখা মাই লাইফ উইথ তালিবান।

কী বই পড়বো তা বোঝার জন্য আমাদের বড় বড় গ্রন্থাগারে যাওয়া এবং বইয়ের বাজারে গিয়েও খোঁজ-খবর করা উচিত। সাহিত্য-পত্রিকা ও সামায়িকী পাঠ করে ইদানীং কী ধরনের বই প্রকাশিত হচ্ছে সে-সম্পর্কে ধারণা রাখা উচিত। রুচিবোধ ও চাহিদাই বলে দেবে কোন বই আমাদের পড়তে আর কোনটা না পড়লেও চলবে। রুচিবোধ তৈরির জন্য শুরুর দিকে ভালো ও বিখ্যাত লেখকদের বই পড়া দরকার। তা না হলে নিম্ন ও মাঝারি মানের লেখকদের বই পড়েই জীবন কাটাতে হতে পারে।

৩. পাঠ্যক্রম বহির্ভূত বই

পাঠ্যক্রম বহির্ভূত বই পড়ে ‘সত্যভ্রষ্ট ও আদর্শচ্যুত’ হওয়ার কথা প্রচলিত আছে কওমি মাদরাসায়। বলা হয়ে থাকে, গুরুর তত্ত্বাবধানে থেকে বা গুরুর নির্দেশনা মেনে বই না পড়লে ছাত্ররা সত্যভ্রষ্ট ও আদর্শচ্যুত হতে পারে। কথাটির ওপর জোর দেওয়ার জন্য কারো কারো উদাহরণও টেনে আনা হয়। আসলে এতটা সরলীকরণ করে কেবল বই পড়ে সত্যভ্রষ্ট হওয়ার কথা বলা সঙ্গত নয়।

কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা করে সত্যভ্রষ্ট হওয়া খুব কঠিন; যিনি ছোটোবেলা থেকে দাওরা হাদিস পর্যন্ত ভালোভাবে পড়াশোনা করে আলেম হয়েছেন তাঁর পক্ষে কেবল বই পড়ার কারণে সত্যভ্রষ্ট হওয়া অসম্ভব বলা যায়।

যাঁরা সত্যভ্রষ্ট ও আদর্শচ্যুত হন তাঁরা আসলে পড়াশোনা না করার কারণে হন। যাঁরা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেন না, ভিন্ন চিন্তানিয়ে ব্যস্ত থাকেন, ভালো ফলাফল করতে পারেন না, আলাদা যোগ্যতা থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা থাকে না বা মাঝপথে মাদরাসার পড়াশোনা ছেড়ে দেন, তাঁদের কেউ কেউ হয়তো আদর্শ বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না।

তাঁদের হীনমন্যবোধ থেকে হতাশা তৈরি হয় এবং হতাশাবোধে জর্জরিত হয়ে তাঁরা নানান কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েন। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক অযোগ্যতা হীনমন্যতা ও হতাশার কারণ নয়; এর অবকাঠামোগত ও অভ্যন্তরীণ কারণ আছে। এই কারণগুলো আমরা উচ্চারণ করি না এবং এ-ব্যাপারে মাথাও ঘামাই না।

কওমি শিক্ষাব্যবস্থা আখেরাতে সাফল্য অর্জনের কথা বলে এবং পরিশুদ্ধ ও পবিত্র জীবনযাপনের কথা বলে। কিন্তু জীবনজীবিকার ব্যবস্থা কীভাবে হবে, কীভাবে পূরণ করা হবে জীবনের ন্যূনতম চাহিদাগুলো—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা, কীভাবে অমুখাপেক্ষী হয়ে বেঁচে থাকা যাবে এই সমাজ ও পরিবেশে তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বা রূপরেখা কওমি মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থায় নেই। জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করে এই ব্যবস্থায় শিক্ষা সমাপন করে যখন সমাজ-পরিবেশে নূন্যতম সামঞ্জস্যবিধান করে জীবনযাপন করা যায় না; অন্যের কাছে মুখাপেক্ষী হতে হয় ও গ্লানি বহন করতে হয় এবং এ-ব্যাপারগুলো তাঁর আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত হানে, তখন একজন মেধাবী ছাত্রও হীনমন্যতাবোধ করেন ও হতাশাগ্রস্ত হন।

কেউ স্বীকার করুন আর না করুন—সঙ্গত কারণেই বর্তমানে কওমি মাদরাসার মেধাবী ছাত্রদের মধ্যেও হীনমন্যতা ও হতাশা প্রকট হয়ে উঠছে। ইসলামে পরনির্ভরশীলতা ও পরমুখাপেক্ষিতার ঠাঁই নেই। এই হাদিস কারোর অজানা থাকার কথা নয়—নিচের হাত থেকে ওপরের হাত শ্রেষ্ঠ।

সত্যভ্রষ্ট ও আদর্শচ্যুত বলে কী বোঝানো হয় তাও বিবেচনার বিষয়। আপনি যদি কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা শেষ করে মাদরাসায় না পড়িয়ে বা মসজিদে ইমামতি না করে অন্যকোনো কর্মপন্থা বেছে নেন; ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া হতে পারে, তথ্যমাধ্যম হতে পারে, হতে ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্যকিছু এবং এজন্য আপনাকে সত্যভ্রষ্ট বা আদর্শচ্যুত বলা তাহলে তা হবে দুঃখজনক ও অপরিণামদর্শী।

এখন অনেক মেধাবী ছাত্রই কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা শেষ করে বা তার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন।

তাঁরা যে-কর্মক্ষেত্র ও জীবনপদ্ধতি বেছে নেবেন সেখানে যদি ইসলামকে মেনে চলেন এবং নিয়োজিত থাকেন দীনের সেবায় তাহলে সত্যচ্যুত ও আদর্শহীন হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

কোনো ব্যক্তি কওমি মাদরাসা থেকে আলেম হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন এবং ইসলামের বিরুদ্ধে উচ্চকিত হয়ে উঠেছেন এমন দৃষ্টান্ত কেউ উপস্থিত করতে পারবেন না।

৪. বইকে ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ সময়

বইকে ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ সময় হলো বয়ঃসন্ধিকাল। তাই বলা যায়, এখন বয়ঃসন্ধিকাল যার বইকে ভালোবাসার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

বারো থেকে উনিশ বা বিশ বছর বয়সকে বয়ঃসন্ধিকাল বলে। এই বয়সটাতে মানুষের জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। এ

ই বয়সে যে-দুঃসহ যন্ত্রণা থাকে হৃদয়ে, যে অটুট-সংকল্প থাকে বুকে, যে-সবুজ স্বপ্ন থাকে চোখে তার সবই অকৃত্রিম ও নির্ভেজাল। এই বয়সে খুব তুচ্ছ কারণে চোখে জল ছলছল করে, সামান্য আঘাত পেলে বুকে কষ্টের ঢেউ জাগে, প্রতারিত হলে চিত্ত বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে—এই বয়সে এই মানবিক গুণাবলি সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে বিশুদ্ধ। বয়ঃসন্ধিকালের স্বভাব ও প্রকৃতি যে কেমন তা বোঝার জন্য আমরা সুকান্ত ভাট্টাচার্যের ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতাটি পড়তে পারি। এই বয়সে মন ও মস্তিষ্কে যে-বীজ রোপিত হয় তাই পরবর্তী জীবনে বৃক্ষ হয়ে ওঠে।

যে-স্বপ্ন ও সাধনা, যে-আকাক্সক্ষা ও পরিশ্রম, যে-সংকল্প ও প্রচেষ্টা বয়ঃসন্ধিকালে মানুষকে বৈশিষ্ট্যম-িত করে, সেগুলোই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অলংকার। মানবজীবনে এই বয়সটুকুর গুরুত্ব অপরিসীম এবং মনোবিজ্ঞানীদের কাছে তা স্বীকৃত। তাই এই বয়সেই আমাদের বইকে ভালোবাসতে হবে এবং বইকে গ্রহণ করতে হবে বুক পেতে। আমি যখন হেদায়েতুন্নাহু পড়ি তখনকার একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। আমি অনেক দিন লাগিয়ে অনেক কষ্টে কিছু টাকা জমিয়ে একজন লেখকের কিশোরসমগ্র কিনলাম।

বইটি যে সবার সামনে পড়বো এমন সুযোগ নেই। ঘুমের সময় হয়ে গেলে অনেকেই মসজিদের বারান্দায় পড়াশোনা করে। আমিও বইটি লুকিয়ে নিয়ে মসজিদের বারান্দায় গেলাম। রাত গভীর হলে এবং সবাই চলে এলে নিরাপদ নির্জনতায় মোড়ক থেকে বইটি খুললাম এবং বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কিছুক্ষণ কাঁদলাম। নিতান্ত বালকসুলভ কা-। কিন্তু সেদিন বইয়ের প্রেমে আমার চোখ থেকে উৎসারিত হয়েছিলো যে-পবিত্র অশ্রু তা আজও আমাকে অনুপ্রেরণা যোগায়।
৫.
মাতৃভাষা ব্যতীত সাধারণ শিক্ষায় ইংরেজি, আলিয়া মাদরাসায় আরবি ও ইংরেজি এবং কওমি মাদরাসায় আরবি ও উর্দু ভাষা শেখানো হয়।

ভাষা শেখার দুটি উদ্দেশ্য আছে :

ক. প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষা;

খ. সংশ্লিষ্ট ভাষার সাহিত্য পাঠ এবং সে-ভাষায় কিছু লেখা।

কওমি মাদরাসায় যে-আরবি ও উর্দু ভাষা শেখানো হয় তা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের জন্য; বিশেষ ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে যোগাযোগ রক্ষার জন্য তা ব্যবহার করা হয়। কওমি মাদরাসার পাঠ্যসূচিতে আরবি সাহিত্যের আধুনিক ও প্রতিনিধিত্বশীল কোনো গ্রন্থ নেই। মাকামাতে হারিরির কিছু অংশ পড়ানো হয়; কিন্তু গ্রন্থটি প্রাচীন ও প্রচ- দুর্বোধ্য। ছাত্ররা গ্রন্থটি থেকে তেমন উপকৃত হতে পারে না। এটির প্রয়োজনীয়তা আবশ্যক হলে আরবি সাহিত্যের বিশেষ কোর্সে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. কর্তৃক সংকলিত দুই খ-ের ‘আল-মুখতারাত মিনাল আদাবিল আরাবি’ আরবি সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বশীল গ্রন্থ; কিন্তু এটি পড়ানো হয় মুষ্টিমেয় কিছু মাদরাসায়, পুরোটা নয়, কিছু অংশ।

এখন কোথাও কোথাও আরবি সাহিত্যের ওপর বিশেষ কোর্স চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের হলেও এগুলো থেকে উপকৃত হওয়া যায়।

দশ-বারো বছর চর্চা করার পরও আরবি ও উর্দু লেখার ও বলার ভাষা হয়ে ওঠে না। উর্দু বলা ও লেখা তুলনামূলক সহজ হলেও আরবি বলা ও লেখাটা একটু কঠিন। ভিনদেশি ভাষা বুক থেকে মুখে এবং মাথা থেকে কলমে আনতে হলে আলাদা শ্রম ব্যয় করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট ভাষা পত্র-পত্রিকা এ-ক্ষেত্রে অনেকটা সহায়ক হতে পারে। পত্র-পত্রিকা পাঠের মাধ্যমে বর্তমান যোগাযোগের আরবি ও উর্দু ভাষাকে আয়ত্ব করা যাবে।

আরবি বা উর্দু সাহিত্য পাঠ ও চর্চা

যাঁরা আরবি বা উর্দু সাহিত্য পাঠ ও চর্চা করতে চান তাঁরা ব্যক্তিগত বা দলগত উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। আরবি সাহিত্য এক বিশাল ব্যাপার। এ-ক্ষেত্রে সামান্য দক্ষতা অর্জন করতে হলে আপনাকে ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘ সময় ও বিপুল প্রচেষ্টা ব্যয় করতে হবে। উর্দুর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। তবে উর্দু বাংলা ভাষার কাছাকাছি হওয়ায় তুলনামূলক সহজ।

আরবি ও উর্দু সাহিত্যের খ্যাতিমান ও শক্তিশালী কয়েকজন লেখক

আমি আধুনিক আরবি ও উর্দু সাহিত্যের খ্যাতিমান ও শক্তিশালী কয়েকজন লেখকের নাম দিচ্ছি। দেখুন তো তাঁদের লেখা পাঠ করে কেমন মনে হয়।

আরবি সাহিত্য :

মিসরের তাওফিকুল হাকিম, তাহা হোসাইন, নাজিব মাহফুজ, নাজিব আল-কিলানি, আহমদ আমিন, সালাহ আবদুস সবুর, আবু হাদিদ, মোস্তাফা সাদেক আর-রাফেয়ি, মোস্তাফা লুতফি আল-মানফালুতি ও মহিলা কবি ফাতেমা নাউত; ফিলিস্তিনের মাহমুদ দারবিশ, তাওফিক যিয়াদ, সামিহ আল-কাসিম, আদনান আন-নাহবি, ইউসুফ আদ-দিক, মহিলা লেখিকা রিতা আউদা; সিরিয়ার আলি মুস্তাফা আত-তানতাবি, এ্যাডোনিস (আলি আহমদ সাঈদ), নাজ্জার কুব্বানি, মহিলা লেখিকা বাহিজা মিসরি ইদলিবি ও গাদা আস-সাম্মান; তিউনিশিয়ার আবুল কাসেম আশ-শাবি, মুহাম্মদ কামাল আস-সাখিরি; ইরাকের আহমদ মাতার, বদর শাকের, মহিলা কবি নাযিক আল-মালায়িকা; লেবাননের খলিল জিবরান খলিল, তালাআত সাকিরাক; সুদানের মহিলা কবি রওজা আল-হাজ; কুয়েতের দুজন লেখিকা সুআদ আস-সাবাহ, সাদিয়া মুফরাহ।

উর্দু সাহিত্য :

ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, সাদত হাসান মান্টো (উর্দু ছোটোগল্পের ইমাম), প্রেমচন্দ, কৃষণ চন্দর, রাজেন্দ্র সিংবেদী, উপেন্দ্রনাথ আশক, ইসমত চুগতাই, কদরতুল্লাহ শিহাব, বলবন্ত গাগরি, আলি সরদার জাফরি, আগা হাশর কাশ্মিরি এবং মহিলা কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে আছেন কুররাতুল আইন হায়দার, আখতার শিরানি, কামিলা শামসি প্রমুখ।

তালিকা আরও দীর্ঘ করা যেতো; কিন্ত যাঁদের নাম উল্লেখ করেছি তাঁরাই যথেষ্ট হতে পারেন। আপনি আরবি ও উর্দু সাহিত্যের যেকোনো দুজন লেখকের অন্তত দুটি বই পড়–ন।

৬. বইপাঠ পরিকল্পনা ও প্রকল্প

আমরা যদি বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প সামনে বই পড়ি তাহলে কাজটি আমাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে যায়। আমি কিছু প্রকল্পের নাম দিচ্ছি, অন্যরাও ইচ্ছেমত বানিয়ে নিতে পারেন।

১. কমিউনিজম : অপরাধ, নিপীড়ন, সন্ত্রাস

এই প্রকল্পের আওতায় আমরা পড়বো কমিউনিজম ও কমিউনিস্টদের সমালোচনায় লেখা বই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলাভাষার বাম লেখকেরা ইসলাম ও ইসলাম-বিশ্বাসীদের আক্রমণ করে আসছেন। বর্তমানে তাঁদের আক্রমণ তীব্র হয়ে উঠেছে। আমাদের পক্ষ থেকে ক্রোধের ভাষায় সামান্য জবাব দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। তারা যদি আমাদের পিঠে আঘাত করে তাহলে আমাদের আঘাত করতে হবে তাদের মগজ ও হৃৎপি-ে। এই আঘাত হতে হবে যৌক্তিক ও প্রামাণ্য। কমিউনিস্টরা প্রগতিশীলতা ও সাম্যবাদের দাবিদার হলেও এরা যে কতটা ভয়ংকর ও নৃশংস হতে পারে তার দালিলিক প্রমাণের অভাব নেই। আমাদের সেগুলো পাঠ করতে হবে।

২. ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা : কৌশল ও জটিলতা

এ-বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনা ও লেখালেখির বিকল্প নেই। কারণ, বিষয়টি আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সঙ্গে জড়িত।

৩. উলামা-মাশায়েখ : চরিতাভিধান

বাংলাদেশের যে-সকল উলামা-মাশায়েখ ইসলামের প্রচার-প্রসার ও জ্ঞান বিকাশের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের সংক্ষিপ্ত জীবনী নিয়ে রচিত হবে এই চরিতাভিধান। এমন একটি অভিধান তৈরি করতে পারলে কত বড় কাজ যে তা ভাবতেই আমি শিহরিত হচ্ছি। এই কাজটি একাকী করা সম্ভব না হলেও যৌথভাবে সম্পন্ন করা মোটেও অসম্ভব নয়।
পরিকল্পনা ও প্রকল্প সামনে নিয়ে বই পাঠ করলে অল্প সময়ে অনেক উপকৃত হওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন মনীষীর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘এই পৃথিবীর পথে সবাই হেঁটে যায়; কিন্তু কেউ কেউ তার পদচিহ্ন রেখে যায়।’ এই পৃথিবীর বুকে পদচিহ্ন রেখে যেতে হলে এবং সময়ের প্রতিনিধিত্ব করতে হলে আমাদের অবশ্যই এবং অবশ্যই ভালোবাসতে হবে বইকে। বইয়ের স্থান হোক বুক শেলফে নয়, আমাদের বুকে।


লেখক: আবদুস সাত্তার আইনী

Source: Natu Dak

Leave a Reply