Categories
Bangla Contents

শার্লি এবদোয় প্রাণঘাতী হামলা: অভিযোগ ও বাস্তবতা

শার্লি এবদোয় হামলা

নবীজীর সা. ব্যাঙ্গচিত্র বা কার্টুন ইস্যুটি ২০০৫ ’র শেষদিকে প্রথমবারের মতো ব্যাপক আলোচনায় আসে। আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই- ২০০৫ সালের ৩০ এ সেপ্টেম্বর ডেনমার্কের ‘জিল্যান্ড পোস্টেন’ পত্রিকায় নবীজীর সা. ১২টি ব্যাঙ্গচিত্র ছাপা হলে গোটা মুসলিম বিশ্ব ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে।

৫৯ টি মুসলিম রাষ্ট্রে লাগাতার বিক্ষোভ চলেছে দিনের পর দিন। পরিস্থিতি এতোটাই জটিল আকার ধারণ করেছিলো যে, ২২টি দেশ থেকে ডেনমার্ক সরকার তার রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ফ্রান্সসহ ইউরোপের আরো কিছু পত্রিকা এসময় জিল্যান্ড পোস্টেনের সমর্থনে নতুন করে সেসব কার্টুন প্রকাশ করলে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করে। ফ্রান্সের এক সম্পাদককে তখন চাকরিচ্যুতও হতে হয়।

নবীজীর সা. অবমাননা এবং কার্টুন ইস্যুতে ডেনমার্কের সাথে তখনই প্রথম ফ্রান্সের নামও জড়িয়ে যায়।

রাজপথে বিক্ষোভ ও কূটনৈতিক প্রতিবাদের পাশাপাশি ডেনমার্কের পণ্য বর্জনের মধ্য দিয়েও সেসময় নতুন এক প্রতিবাদ জানানো হয়- বিশেষত আরব বিশ্বের পক্ষ থেকে। ডেনিশ সরকারের সূত্রমতে- কেবল সৌদি আরবের এক সপ্তাহের বর্জনের কারণেই তাদের আড়াইশ মিলিয়ন ডলারের লোকসান গুনতে হয়েছিলো। প্রতিবাদের এই দিকটাই কৌশলগতভাবে সবচেয়ে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিলো।

প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে এমন ব্যাপক, নজিরবিহীন ও লাগাতার প্রতিবাদের পরও ওরা থেমে যায়নি। যেমন থাকেনি অতীতে। ঠিক ছয় বছরের মাথায় আবার নবীজীর সা. ব্যাঙ্গচিত্র প্রকাশের খবর আসে। পত্রিকা এবার- শার্লি এবদো, দেশ- ফ্রান্স । প্রথমবার কেবল সমর্থনে থাকলেও এবার এই জঘন্য কাজে জড়িয়ে পড়ে ইউরোপের বুকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সদস্যের দেশ, শিল্প-সাহিত্য ও মানবাধিকারের দেশ হিসেবে খ্যাত ফ্রান্স নিজেই।

উল্লেখ্য, ফ্রান্সের এই পত্রিকাটি সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে বিদ্রুপাত্মক কার্টুন, রিপোর্ট এবং কৌতুক প্রকাশের জন্য বিখ্যাত।

২০১১ সালের নভেম্বর মাসে শার্লি এবদোয় রাসূলকে সা. নিয়ে কার্টুন ছাপা হয়। ২০০৫ এর ধৃষ্টতার পর আবারও বিনা উস্কানিতে কার্টুন ছাপানোয় পত্রিকাটি বিক্ষুব্ধ জনতার রোষের মুখে পড়ে, অফিসেও আগুন দেওয়া হয়। হ্যাকিংয়ের শিকার হয় পত্রিকাটির ওয়েবসাইট। আলকায়েদাসহ বেশ কিছু কট্টরপন্থী সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্পাদককে হত্যার হুমকিও আসে। এরপর ধীরে ধীরে ব্যাপারটা আড়ালে চলে যায়, জীবনের আর সব ঘটনার মতো এই প্রতিবাদের উত্তাপও একসময় কমে আসে। শার্লি এবদো নামটাই আমরা ভুলে যাই।

তবে- আমরা ভুলে গেলেও কোনো কোনো পক্ষ বেশ ভালো করেই নামটা মনে রেখেছিলো। তারা কারা, কেনো বা কী ভাবনায় নামটা মনে রেখেছিলো আমরা জানতাম না। আমাদের জানার সুযোগ ঘটে ২০১৫’র জানুয়ারিতে। অকল্পনীয় এক হামলার মুখে পড়ে সম্পাদকসহ মোট ১২ জনের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে আবারও শার্লি এবদো আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে, ভয়াবহ কিছু চিত্র ও বাস্তবতা সাথে নিয়ে।

শার্লি এবদোয় কীভাবে এই হামলা?

ভিডিও এবং উপস্থিত লোকদের সাক্ষের ভিত্তিতে পুলিশ দু’জনকে চিহ্নিত করে, তারা আপন দু’ ভাই ফ্রান্সেরই নাগরিক সাঈদ এবং শরিফ কোয়াচি।

৭ জানুয়ারি ২০১৫ সকাল, স্থানীয় সময় সাড়ে এগারটায় দু’জন সশস্ত্র মুখোশধারী ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত ব্যাঙ্গাত্মক সাপ্তাহিকী শার্লি এবদোর অফিসে ঢুকে পড়ে। তারা আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিতে দিতে ৫০টির মতো গুলি ছোড়ে। এতে মোট ১১ জন সাংবাদিক ঘটনাস্থলেই নিহত হয়, আহত হয় আরো ১১ জন। এরপর পালানোর সময় তারা একজন পুলিশ অফিসারকেও হত্যা করে। নিজেদের তারা আল কায়েদা ইয়েমেন শাখার সদস্য দাবি করে, যারা ইতোমধ্যে হামলার দায়-দায়িত্ব স্বীকারও করে নিয়েছিলো।

ক’দিন পর অন্য এক প্রদেশে এক ইহুদি সুপার শপে হামলার ঘটনায় নিহত হয় আরো পাঁচজন। ফ্রান্স সরকার একে ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংস ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং দেশজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার ঘোষণা দেয়। ভিডিও এবং উপস্থিত লোকদের সাক্ষের ভিত্তিতে পুলিশ দু’জনকে চিহ্নিত করে, তারা আপন দু’ ভাই ফ্রান্সেরই নাগরিক সাঈদ এবং শরিফ কোয়াচি।

৯ জানুয়ারি ফ্রান্স পুলিশের বিশেষ এক অভিযানে হামলায় অংশ নেওয়া দুই ভাই নিহত হন। রহস্যে মোড়ানো এ হামলার প্রকৃত কারণ ও পূর্বাপর ফলাফল ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে নিহত সাংবাদিকদের জন্য গোটা বিশ্ব সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

১১ জানুয়ারি ৪০ জন বিশ্বনেতার উপস্থিতিতে প্রায় বিশ লাখ মানুষ প্যারিসে জাতীয় ঐক্য ও সংহতিমূলক এক বিশাল সমাবেশে জড়ো হন।

ফ্রান্সের অন্যান্য প্রদেশেও এ র‌্যালির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে আরো প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের জমায়েত হয়। সাম্প্রতিককালে ইউরোপের ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন ঘটনা।

তবে এতোসবের পরও নিজেদের সংযত না করে পরের সপ্তাহে বরং ঘোষণা দিয়ে পুরো প্রচ্ছদে আরো বিশাল আকারের একটি কার্টুন ছাপায় শার্লি এবদো।

যে পত্রিকার সর্বোচ্চ সার্কুলেশন রেকর্ড মাত্র খাঁ হাজারের, সেই পত্রিকাটি ১৬টি ভাষায় মোট ৩০ লাখ কপি ছাপিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া হয়। প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নবীজীর সা. এমন অবমাননায় ফের বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিহত হয় নবীপ্রেমিক অন্তত ১০ জন মুসলমান।

পড়–ন বিশেষভাবে চয়িত ও সম্পাদিত সে সময়ের ক’টি সংবাদ ভাষ্য।

শার্লি এবদোর ধৃষ্টতা- ১

ফরাসি ব্যাঙ্গাত্মক ম্যাগাজিন শার্লি এবদোর কভারপেজে মহানবী হজরত মুহাম্মদকে সা. নিয়ে কার্টুন ছাপানোর প্রতিবাদে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অন্তত দশজন নিহত ও অসংখ্য লোক আহত হয়েছেন। শার্লির পক্ষ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম বিশ্বের এ বিক্ষোভের নিন্দা জানিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ হয়েছে আফ্রিকার দেশ নাইজারে। যে দশজন নিহত হয়েছেন তারা সবাই নাইজারের নাগরিক। গত দুইদিন ধরে সেখানে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। প্রথম দিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর দেশটির রাজধানী নিয়ামিসহ বেশ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ হয়। এ সময় দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর জিন্দারে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত দশজন নিহত হন।

আহত হন অর্ধশতাধিক। ওইদিন বিক্ষোভের পর নাইজার সরকার সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং চার মুসলিম নেতাকে আটক করে। এতে জনগণ আরও ক্ষুব্ধ হয় এবং শনিবার আবারও রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় অন্তত দুটি চার্চে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। গৌরি শহরে পররাষ্ট্রমন্ত্রির বাসভবনে হামলা চালায়। এ ছাড়া দেশটিতে অবস্থিত ফরাসি সংস্কৃতি কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে।

এদিকে, নাইজারের এমন সহিংস পরিস্থিতিতে দেশটিতে অবস্থিত ফরাসি নাগরিকদের প্রতি সতর্কতা জারি করেছে ফ্রান্স। নাইজারে অবস্থানরত ফরাসি নাগরিকদের ঘরের বাইরে না যাওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালি, সেনেগাল, মৌরতানিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়াতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য- এই সব ক’টি দেশ এক সময় ফ্রান্সের অধীনে ছিল।

একই ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার পাকিস্তানে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশটির করাচি শহরে পুলিশের গুলিতে বার্তাসংস্থা এএফপির এক ফটো সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এ ছাড়া রাজধানী ইসলামাবাদেও বিক্ষোভ হয়। অন্যদিকে, বিক্ষোভ হয়েছে আফগানিস্তানে। রাজধানী কাবুলে শুক্রবার জুমার নামাজের পরপর বেশ কিছু লোক বিক্ষোভ করেছে।

এ সময় তারা ফ্রান্সের পতাকায় আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ফ্রান্সবিরোধী স্লোগান দেয়। সেইসঙ্গে শার্লি এবদোর অফিসে যারা হামলা চালিয়েছে তাদের প্রশংসা করা হয়।

শার্লি এবদোর পাতায় নবী কারিমকে সা. নিয়ে কার্টুন ছাপানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে ফিলিস্তিনে। আল আকসা মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের পর রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে সেখানকার মুসলমানরা। এ সময় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় বিক্ষোভকারীরা। কারণ প্যারিসে নিহতদের শোকসভায় উপস্থিত হয়েছিলেন আব্বাস।

একই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে তুরস্ক, ইয়েমেন, সুদান, জর্ডানসহ অন্যান্য আরব দেশে। তবে এসব দেশে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

এদিকে, শার্লি এবদোর ঘটনার প্রতিবাদে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে যে সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে তার নিন্দা জানিয়েছে ওয়াশিংটন। শুক্রবার করাচির ফরাসি কনস্যুলেট অফিসের বাইরে সংঘর্ষে অন্তত তিনজন লোক আহত হওয়ার পর এক বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিবৃতিতে শার্লি এবদোর পক্ষাবলম্বন করে বলা হয়েছে- ব্যাঙ্গচিত্রসহ তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে এটি তাদের সার্বজনীন অধিকার।

সূত্র- বিবিসি, আলজাজিরা

শার্লি এবদোর ধৃষ্টতা- ২

ফ্রান্সের বিদ্রƒপাত্মক পত্রিকা সাপ্তাহিক শার্লি এবদোর প্রচ্ছদে মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মদকে সা. অবমাননা করে নতুন করে কার্টুন ছাপানোয় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা।

নতুন করে কার্টুন প্রকাশ করায় বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। মুসলিম দেশগুলোর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এটিকে উস্কানিমূলক বলেও অভিহিত করেছেন। এবদোর চলতি সংস্করণ প্রকাশের আগে মিশরের ধর্মীয় নেতারা হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন- ইসলামের নবীকে নিয়ে যেনো আর কোনো কার্টুন ছাপা না হয়। তাদের মতে- এ নিয়ে যতো বেশি বাড়াবাড়ি করা হবে ততো বেশি ইসলামিক চরমপন্থীদের হামলার হুমকিতে পড়তে হবে। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ সিসি তার সরকারের প্রধানমন্ত্রিকে ধর্ম অবমাননাকারী পত্রিকা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দিয়ে ডিক্রি জারি করেছেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ইউরোপের ইসলামভীতি এবং মুসলিমবিরোধী কার্যকলাপ বন্ধে ব্যর্থতার জন্য পশ্চিমা নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি পবিত্র ধর্ম ইসলাম ও মুসলমানদের ব্যাপারে পশ্চাত্যের মনোভাবের নিন্দা করেন। তুরস্কের একটি আদালত এই প্রচ্ছদটিকে অপমানজনক, অপরাধমূলক ও ধর্মদ্রোহী কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই প্রচ্ছদটি যেসব ওয়েবসাইটে থাকবে সেগুলোকে ব্লক করার জন্য আদেশ দেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে শার্লি এবদে নিষিদ্ধ করেছে সেনেগাল। শার্লি এবদোর প্রচ্ছদের কার্টুনটি লিবারেশান নামে ফ্রান্সের আরেকটি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার কারণে সেই পত্রিকাটিও সেনেগালে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জর্ডানের আদ-দুস্তুর পত্রিকা লিখেছে- প্রচ্ছদে আবারো হযরত মুহাম্মদের সা. কার্টুন আঁকায় শার্লি এবদো নতুন করে প্ররোচনা দিচ্ছে। ইরানের অফিসিয়াল টিভি চ্যানেল আইআরআইএনএনও এটিকে একটি উস্কানিমূলক কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছে। নতুন এই প্রচ্ছদ হয়তো আবারো নতুন কোনো সহিংসতার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করে নিউইয়র্ক টাইমসও একটি খবর প্রকাশ করেছে।

সংবাদমাধ্যম জানায়, গত বুধবার শার্লি এবদোর প্রথম সংখ্যা প্রকাশ করা হয় এবং এর প্রচ্ছদে হজরত মুহাম্মদকে সা. অবমাননা করে আবার ব্যাঙ্গচিত্র ছাপানো হয়। নতুন সংখ্যায় মহানবীর অবমাননাকর কার্টুন ছাপানোর পর ফ্রান্সের মুসলিম সংগঠনগুলো মুসলমান সম্প্রদায়কে শান্ত থাকার আগাম আহ্বান জানিয়েছিল।

কিন্তু তা সত্ত্বেও ফরাসি মুসলমানরা সাপ্তাহিকীটির ন্যক্কারজনক তৎপরতার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ এবং নিন্দা প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে পারেন নি।

ফরাসি একজন মুসলমান বলেন- ওরা মুসলমানদের উস্কে দেওয়ার তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে, একজন মুসলমানের কাছে তার মা-বাবার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানীয় রাসূল সা., মুসলমানদের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানানো কেনো ওদের জন্য এতো কষ্টকর হয়ে উঠছে- বোঝা যাচ্ছে না। শার্লি এবদোর ঘটনায় যারপরনাই ক্ষুব্ধ আরেক ফরাসি মুসলমান বলেন- আমি কাউকেই অবমাননা করতে চাই না, কিন্তু ফ্রান্স কেনো মুসলমানদের মূল্যবোধের প্রতি সম্মান দেখাতে পারে না?

এদিকে ফরাসি সাপ্তাহিকের এ হঠকারিতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্বের ধর্মীয় নেতারা এবং এ তৎপরতাকে তারা সরাসরি মুসলমানদের প্রতি অবমাননা বলে অভিহিত করেছেন।
প্যারিসের শার্লি এবদোয় প্রকাশিত সর্বশেষ কার্টুনটিতে দেখা যাচ্ছে যে, সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে শোক জানিয়ে ‘যে সুই শার্লি’ বা আমিই শার্লি লেখা একটি প্ল্যাকার্ড হাতে ইসলামের নবী দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ওপরে লেখা- ‘সব অপরাধ ক্ষমা করা হলো’।

নতুন এ সংখ্যাটি ১৬টি ভাষায় ৩০ লাখ কপি ছাপানো হয়েছে। এর আগে পত্রিকাটি মাত্র ৬০ হাজার কপির মতো ছাপা হতো। সূত্র- আল-জাজিরা, সিএনএন, এএফপি।

শার্লি এবদোর ধৃষ্টতা- ৩

ইসলামকে কটাক্ষ করে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশের পর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার জন্য ইউরোপের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দায়ী করেছেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রি আহমেদ দাভুতৌলু। রোববার প্যারিসে তিনি বলেন, ইউরোপে ধর্ম ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিভেদকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটছে।

সুদূর প্যারিসে শার্লি এবদো কার্যালয় ও সুপারশপে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহতদের স্মরণে রোববার জেরুজালেম পৌরসভায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে এমন আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

হারানো স্বজন আর স্বগোত্রীয়দের সম্মান জানানোর পাশাপাশি হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান অংশগ্রহণকারীরা। তারা বলেন, ‘আশা করি, ফ্রান্সের নিরাপত্তা বাহিনী এখন আরো বেশি সজাগ হবে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আরও বেশি মনোযোগী হবে। শার্লি এবদো’র কার্যালয় ও সুপারশপে হামলার মতো ঘটনা আবার যেন না ঘটতে পারে তা তারা নিশ্চিত করবে।’

তবে ইসলামকে কটাক্ষ করে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশের পর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার জন্য ইউরোপের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রবণতাকে দায়ী করেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রি। রোববার সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানাতে আয়োজিত সংহতি সমাবেশে যোগ দিতে প্যারিসে আসেন তিনি।

তুর্কি প্রধানমন্ত্রি আহমেদ দাভুতৌলু বলেন- ‘দুঃখজনক যে, ইউরোপে সাম্প্রতিককালে ধর্ম ও বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য ও বিভেদকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়েছে। আর এটাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার উত্থানের মূল কারণ। বহু সংস্কৃতির সমাজে বিভিন্ন ধর্মের, বর্ণের মানুষ যেন ঐক্যের সঙ্গে বাস করতে পারে- শান্তির জন্য তা নিশ্চিত করতে হবে। সূত্র- বিবিসি, সিএনএন

নবীজীর সা. শানে বারবার কেনো এই গোস্তাখি?

তিনটি পৃথক সংবাদভাষ্য এখানে তুলে ধরলাম- পুরো ব্যাপারটা বিচারের ক্ষেত্রে নানাভাবে এটা সহায়ক হবে। এবার এ ঘটনার মূলের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক-

কেনো এরা বারবার নবীজীর শানে এমন গোস্তাখি করে? কেনো বারবার এমন কার্টুন ছেপে বিশ্বকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয় বা দিতে চায়?

ইসলামকে আক্রমণের এই ঘৃণ্য ধারাটি সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর সময়কাল থেকেই চলে আসছে। তার যুগেই ইহুদি-খৃষ্টানরা এক হয়ে ইসলামকে পৃথিবীর বুক থেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য ভয়ংকর সব ষড়যন্ত্র শুরু করে। আর এ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই মুসলমানদের ধর্মীয় নিদর্শন এবং মহান সব ব্যক্তিদের নিয়ে ব্যাপকভাবে উপহাস করা শুরু করে।

তাদের এসব জঘন্য আচরণে ক্ষোভে ফেটে পড়ে মুসলিম জাহান। উন্মুক্ত হয় ক্রুসেড বা সর্বাত্মক ধর্মীয় যুদ্ধের পথ। ক্রুসেডে ইতিহাসখ্যাত মুসলিম বীর সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর হাতে সম্মিলিত কুফরি শক্তির শোচনীয় পরাজয় ঘটে। তবে ওরা থেমে যায়নি বা থাকেনি। বরাবরই নানাভাবে এসব ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে।

পাকিস্তানের প্রখ্যাত কলামিস্ট ইয়াছির মুহাম্মদ খান বলেন- ক’বছর আগে খৃষ্টান চার্চের পাদরি থেকে মুসলিম হওয়া আমাদের এক ভাইয়ের একটি বই পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো।

তাতে তিনি লিখছেন- ‘মুসলমানদের মহান ব্যক্তিদের অপমান করা একটি সূচিবদ্ধ ষড়যন্ত্রের অংশ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো- মুসলমানদের ঈমানী শক্তি আন্দাজ করা, মেপে দেখা- এখনো তারা কতোটা সচেতন। কতোটা টগবগে আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস।’

ক’বছর পরপরই তারা এসব ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে পরখ করার চেষ্টা করে মুসলমানরা এখনো কতোটা মুসলমান আছেন বা কতোটা বদলে গেছেন। আর এসবে ইন্ধন যোগায় ইউরোপ-আমেরিকারই কোনো-না-কোনো দেশ।

যুগ যুগ ধরে প্রতি পাঁচ-সাত বছর অন্তর এই খেলার আয়োজন এরা করে আসছে। কখনো নিজেরা, কখনো সালমান রুশদী বা তসলিমার মতো ভাড়াটে মুসলিম নামধারীরা ওদের হয়ে কাজগুলো করে দেয়।

তাই দুঃখ-কান্না-ক্ষোভের পাশাপাশি সচেতনতা এবং কৌশলী হওয়ারও বিকল্প নেই আজকের মুসলিম জাহানের।

শুধু আবেগ নয়, বাস্তবতাও বিবেচনা করুন

আরো কিছু কথা এখানে বলে রাখা দরকার। শার্লি এবদোয় হামলার ঘটনাটিকে কেবল নবীপ্রেমের প্রতিশোধ হিসেবে ভেবে নিলে অন্যায় হবে। আমরা জানি না- প্রকৃতপক্ষে কারা এই হামলার সাথে জড়িত।

পশ্চিমা মিডিয়া আমাদের বলেছে দু’জন মুসলিম তরুণ এ হামলা চালিয়েছে- সেটা সত্য হতে পারে, নাও হতে পারে। আজকের জটিল বিশ্ববাস্তবতায় ঘটনার দৃশ্যমান কারণের চেয়েও মূল বিবেচ্য বিষয় হয়- এর দ্বারা কে কতোুঁকু লাভবান হচ্ছে।

নবীজীর সা. অবমাননাকারীদের শাস্তি আমরা অবশ্যই চাই, কিন্তু শার্লির ঘটনায় যেভাবে রিএ্যাক্ট এসেছে- তাতে কেবল মুসলিম যুবকদ্বয়ের হামলার খবরে বিশ্বাস রাখা মুশকিল। তারা হামলা চালিয়েছে না তাদের দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে বিশেষ কোনো পরিকল্পনার অংশ হিসেবে- সেটা কে ঠিক করবে?

এই হামলার পর নিরাপত্তার নামে ইউরোপজুড়ে যেভাবে অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত ইউরোপের লাখো মুসলিম যেভাবে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন সেটাও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিতে হবে।

শার্লি এবদোয় হামলা হওয়ার মাত্র দু সপ্তাহের ব্যবধানে তখন ফ্রান্সজুড়ে ১২৮ টি হামলার ঘটনা ঘটেছে মুসলিমদের ওপর। মসজিদগুলোও রক্ষা পায়নি।

গ্রেনেড হামলা, আগুন জ্বালিয়ে দেয়া, রাস্তাঘাটে হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন, বাচ্চাদের উঠিয়ে নেওয়া বা পাসপোর্ট জব্দ করাসহ বাদ যায়নি কিছুই। শুধু জনগণ নয় প্রশাসনও জড়িয়ে পড়ে এসব ঘটনায়। মুসলিম অভিবাসন বন্ধ এবং ইসলাম নিষিদ্ধে পেগিডার মতো বৃহৎ আন্দোলন ফ্রান্স-জার্মানি হয়ে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।

ইতোপূর্বে চলতে থাকা শিক্ষা, চাকরি বা ধর্ম পালনের বৈষম্য আরো বাড়ার পাশাপাশি শার্লি এবদোর ঘটনা মূলত ফ্রান্স থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টাকে সামনে নিয়ে আসে।

মুসলিম নাগরিকদের সন্ত্রাসী বা সন্দেহভাজন জঙ্গি হিসেবে তুলে ধরতে পারলে পশ্চিমের অনেক লাভ। এই লাভ বা প্রয়োজনের জন্য তারা শার্লির চেয়েও বড় ঘটনা ঘটাতে পিছপা হবে না, এটা বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না। হিসেবটাও তাই সবদিক বিবেচনা করেই মেলানো প্রয়োজন।

এসব দুর্ঘটনায় পশ্চিমের নিরপরাধ মানুষের প্রতি সংহতি জানানোর পাশাপাশি আমরা তাই অসহনীয় ভোগান্তির শিকার আমাদের মুসলিম ভাই-বোনের কথাও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবনায় নিতে চাই। সেটা বিবেক এবং সময়েরও দাবি।

শার্লি এবদোর ঘটনার প্রেক্ষাপটে পরিচিতি ও বিস্তৃতি পাওয়া পেগিডা অনলাইন-অফলাইনে তাদের কাজ সমানভাবেই অব্যাহত রেখেছে, অপচেষ্টা চালাচ্ছে আরো জোরদার করে ইসলাম বিদ্বেষী এই আন্দেলনকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে।

সুতরাং আবেগ পাশে রেখে বাস্তবতার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতিগুলো বিবেচনা করাই কি উচিত নয়? নবীঅবমাননার প্রতিশোধ নিতে এই হামলা মুসলিম ভ্রাতৃদ্বয় যেমন করতে পারে, মুসলিমদের কোণঠাসা করতে এবং তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিবাদের ঢোল পেটানো বজায় রাখতে পশ্চিমারা নিজেরাও ঘটাতে পারে- এই সম্ভাবনা আপনি নাকচ করে দেবেন কোন যুক্তিতে?

Leave a Reply