Categories
Bangla Contents ইসলামের ইতিহাস কোন পথে ইউরোপের ইসলাম

ফ্রান্সে ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়-১

ফ্রান্সে ইসলামের সূচনা

ফ্রান্সে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে বিজয় হিসেবে বা সে বিজয়কে নির্দিষ্ট একটা সময়ের ফ্রেমে দেখানো মুশকিল। স্পেন বিজয়ের বছর ৭১১ সালকেই ফ্রান্সে ইসলাম প্রবেশের বর্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সে হিসেবে ৭৩২ পর্যন্ত মোট ২১ বছরের সময়কালটাই ফ্রান্সে ইসলামের অগ্রযাত্রা, বিজয় বা প্রভাব সৃষ্টিকারী যুগ।

অবশ্য ৭৩২-এ পরাজয়ের পরও উকবা বিন হাজ্জাজের দৃঢ়তায় ৭৫৯ পর্যন্ত ফ্রান্সের সেপটিম্যানিয়া রাজ্যটি স্পেনের মুসলমানদের অধীনেই বড় একটি প্রদেশ ছিলো। নবম খৃষ্টশতকের শুরুর দিকে আরো কিছু অভিযানের সুবাদে ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী কিছু শহর ইসলামের ছায়াতলে আসে। তবে মাত্র অর্ধশতাব্দীর ব্যবধানে ৯৭৫ সালে তাও হাতছাড়া হয়ে যায়।

দশম শতকজুড়েও কিছু কিছু অভিযান পরিচালিত হয়, তবে সেগুলো তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। এরপরের ৫শ’ বছরের স্পেন শাসনকালে ইউরোপের এ অংশে আর কোনো বড় অভিযান বা সাফল্যের খোঁজ পাওয়া যায় না। ১৪৯২ সালে ফার্দিন্যান্ড এবং ইসাবেলার কাছে গ্রানাডা হস্তান্তরে বাধ্য হওয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপে ইসলামের বিজয়ী অবস্থানের দিন প্রায় শেষ হয়ে আসে।

এসময় অবশিষ্ট ছিলো কেবল ১৩-১৪ শতকে জয় করা পূর্ব এবং দক্ষিণপূর্ব ইউরোপের কিছু অংশ, যা বিশ্বমানচিত্রে আজ বলকান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জাতির দেশ স্পেন দখল করার মাত্র সোয়াশ বছরের মধ্যে ফার্দিন্যান্ড-ইসাবেলা জুটি দেশটিকে মুসলিমশূন্য করতে সক্ষম হয়। (কেমন করে সেটা সম্ভব হয়েছিলো- ইতিহাস হয়তো অনেকেরই জানা। নয়তো কেবল অনুমান করে নিন- হত্যা-দেশান্তর এবং মুসলিম বেশ ও নাম পরিবর্তনে কেমন নিপীড়ন চলেছিলো দু’দিন আগেও রাজত্ব করা রাষ্ট্রের প্রধান ও বৃহত্তম এই নাগরিকসমাজের ওপর)।

৮শ’ বছরের বাসস্থান এবং গৌরবের মুসলিম পরিচয় হারিয়ে স্পেনের মুসলিমেরা আশ্রয় ও জীবিকার খোঁজে অজানার পথে পা বাড়াতে বাধ্য হন। মরিসকো নামে পৃথিবীর বুকে তাদের নতুন পরিচয় দাঁড়ায় ঘর-বাড়ি-ভূমিহীন অসহায় অভিবাসী।

ফ্রান্সের মুসলিম সম্প্রদায়

ফ্রান্সে ইসলাম

৫০-৬০ হাজারের বড় একদল মুসলিম এসময় পাশের দেশ ফ্রান্সেও আশ্রয় নেন। স্পেনের মুসলিমদের এই অভিবাসনের মধ্য দিয়েই ১৬ শতক থেকে ফ্রান্সে মুসলিম জনগোষ্ঠীর নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ৭১১ থেকে শুরু হয়ে ৭৩২ পর্যন্ত বিজয়কাল, ৭৫৯ পর্যন্ত বিশেষ একটি প্রদেশ এবং নবম শতকের কয়েক যুগ, এরপর বিজিত অঞ্চল আর না থাকলেও সবসময়ই ফ্রান্সে কমবেশি মুসলিম উপস্থিতি ছিলো। ১৬ শতকে এসে অভিবাসী আগমনের মধ্য দিয়ে যা নতুন মাত্রা পেলো। এ

রপরের কয়েক শতকজুড়ে শ্রমিক হিসেবে বিশেষত আফ্রিকান মুসলিমেরা ফ্রান্সে পাড়ি জমান। স্থানীয়, অভিবাসী এবং নতুনভাবে ইসলাম গ্রহণ করা নারী-পুরুষ মিলিয়ে ফ্রান্সে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে থাকে, বিশ শতকে এসে যা ব্যাপক রূপ গ্রহণ করে। মুসলিম জাতি বিশেষত নেতৃবৃন্দের উদাসীনতার সুযোগে ১৮-১৯ শতকের পুরো সময়টা ছিলো ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের চূড়ান্ত উত্থানকাল।

নেপোলিয়নের মতো নেতা পেয়ে ফ্রান্সও তখন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হয়ে ওঠে। ব্যাপক চাপে থাকা ফ্রান্সের মুসলিম সম্প্রদায়কে এ সময়টাতে কেবল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করে যেতে হয়েছে। বিশ শতকের শুরুভাগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির সাথে সাথে উসমানীয় মুসলিম শাসনেরও সূর্যাস্ত ঘটে। সালটি ছিলো ১৯২১।

ইসলামের সূচনাকাল থেকে নিয়ে এই প্রথম বিশ্বের কোথাও ইসলাম বা মুসলিম জাতি একক বিজয়ী শক্তি হিসেবে আর টিকে রইলো না। জটিল-কঠিন পৃথিবীর বুকে এটি এমনই এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা, আমরা এখন শুধু যার অনুমানটুকু করার চেষ্টা করতে পারি।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যার আরব-এশিয়ার অঞ্চলগুলো মোটামুটি একটা অবস্থানে থাকলেও ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের মুসলিমদের অবস্থা তখন ছিলো যাচ্ছেতাই।

রাষ্ট্র হিসেবে ফ্রান্স

ফ্রান্স- France

পৃথিবীর প্রাচীনতম এক দেশ ফ্রান্স। এ দেশে মানুষের বসবাসের ইতিহাস প্রায় ১৮ লক্ষ বছরের পুরনো। অবস্থানগত দিক দিয়ে ইউরোপ তো বটেই গোটা বিশ্বেই ফ্রান্স গুরুত্বপূর্ণ এক জায়গা দখল করে আছে। খৃষ্টপূর্ব অব্দের সেল্টিক রাজা গল থেকে নিয়ে মধ্য যুগের বিখ্যাত রোমান শাসনাধীনে থাকার মধ্য দিয়ে ফ্রান্স সভ্যতা ও উন্নতিতে আধুনিক বিশ্বের যে কোনো রাষ্ট্র থেকে বহুগুণ এগিয়ে যায়।

ম্যাডিটেরিনিয়ান সাগর থেকে ইংলিশ চ্যানেল হয়ে দক্ষিণ সাগর এবং অপর দিকে রাইন নদী হয়ে আটলান্টিক মহাসাগর- ফ্রান্স এর মধ্যে প্রায় দু’ লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ মাইলের বিশাল এক দেশ। ২৭ টি প্রশাসনিক রিজিওনে বিভক্ত, গণতান্ত্রিক এবং সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এ দেশে বর্তমানে শহর গ্রাম মিলিয়ে প্রায় ৭ কোটি মানুষ বাস করছেন।

মধ্যযুগের রোমান শাসনের পর বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যকার লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত হলেও এরপর খুব দ্রুত গুছিয়ে ওঠার সুযোগ পায় ফ্রান্স। বিশেষ করে ১৩৩৭-১৪৫৩ পর্যন্ত শত বর্ষের টানা লড়াই শেষে আশপাশের যে কোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্রের আগেই ফ্রান্সে জাতিগত ঐক্য প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে শুধু ভৌগোলিক দিক থেকে বড় নয়, সবচে প্রভাবশালী দেশ হিসেবেও নিজেকে গড়ে তোলে ফ্রান্স। দ্রুততর হয় দেশটির উন্নয়নের ধারা।

এরপর নেপোলিয়নের মতো দক্ষ এবং দূরদর্শী নেতা পাওয়ার সুবাদে শীঘ্রই ফ্রান্স পরিণত হয় বিশ্বের প্রধানতম পরাশক্তি হিসেবে। উন্নত ও শক্তিশালী অর্থনীতির পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যেও ফ্রান্স এসময় ব্যাপক সুখ্যাতি অর্জন করে। যুগে যুগে মানবাধিকার প্রশ্নে আলাদা সুনাম কুড়িয়েছে এই দেশ।

তাই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক’টি অর্থনৈতিক শক্তির একটি হতে পারার পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য এবং মানবাধিকারের রাষ্ট্র হিসেবে ফ্রান্স আজো একটা পরিচিতি ধরে রেখেছে, হোক না তা কাগজে-কলমেই!

Leave a Reply