এই কেমন জীবন আমার

জানুয়ারি ২০১৫’র শার্লি এবদোয় হামলার ঘটনা নিশ্চয়ই মনে আছে আমাদের।

দুই মুসলিম সহোদরের হামলায় পত্রিকাটির সম্পাদকসহ ৮ জন লেখক-সাংবাদিক নিহত হন। এর পরদিন এক ইহুদি শপে আরো একটি হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে মুসলিম ইস্যুতে আবারো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ইউরোপের পরিবেশ। ফ্রান্সের ঘটনা হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই হাওয়াটা এখানে বেশি লাগে। ইতোপূর্বে এ নিয়ে মোটামুটি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

মাত্র দু’ সপ্তাহের ব্যবধানে তখন ফ্রান্সজুড়ে ১২৮ টি হামলার ঘটনা ঘটেছে মুসলিমদের ওপর। মসজিদগুলোও রক্ষা পায়নি।

গ্রেনেড হামলা, জ্বালাও-পোড়াও, রাস্তাঘাটে হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন, বাচ্চাদের উঠিয়ে নেয়া বা পাসপোর্ট জব্দ করাসহ বাদ যায়নি কিছুই। শুধু জনগণ নয় প্রশাসনও জড়িয়ে পড়ে এসব ঘটনায়।

মুসলিম অভিবাসন বন্ধ এবং ইসলাম নিষিদ্ধে পেগিডার মতো বৃহৎ আন্দোলন ফ্রান্স-জার্মানি হয়ে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ইতোপূর্বে চলতে থাকা শিক্ষা, চাকরি বা ধর্ম পালনের বৈষম্য আরো বাড়ার পাশাপাশি শার্লি এবদোর ঘটনা মূলত ফ্রান্স থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টাকেই সামনে নিয়ে আসে।

দায় বা দোষ যেনো সন্ত্রাসীদের নয় পুরো একটি সম্প্রদায়ের, আরো ভালো করে বললে একটি ধর্মের। ইসলামের।

সুতরাং এই মুহূর্তের ফ্রান্স মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য রীতিমতো এক বধ্যভূমি। নদীভাঙনে এক রাতের ব্যবধানে অসহায় হওয়ার মতো শার্লি এবদোর একটি ঘটনা তাদের পুরো জীবনধারা এমনকি বেঁচে থাকাটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে।

মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের হেফাজত করুন।

ফ্রেঞ্চ মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার

ফ্রান্সের মুসলিমদের মৌলিক অধিকারেরই যখন এই অবস্থা, তখন সহজেই অনুমেয়- ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্নে তাদের অবস্থান কী হবে।

রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার হিসেবেই মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় সাত মিলিয়ন। অথচ মসজিদের সংখ্যা মাত্র ৯০ টি। প্রকাশ্য রাস্তায় বা পাবলিক স্পেসগুলোতে মুসলিম নারীদের হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্কুল-কলেজে মুসলিম ছেলেদের লম্বা পোশাক এবং মেয়েদের স্কার্ফ-হিজাবও নিষিদ্ধ। অথচ তাদের পড়াশোনার বিকল্প হিসেবে ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এখনো কোনোরকম স্বীকৃতি পায়নি।

ফলে মৌলিক ও ধর্মীয় সব ব্যাপারেই ফ্রান্সের মুসলিম সম্প্রদায় বঞ্চিত মানবতার এক জ্বলন্ত উদাহরণে পরিণত হয়েছেন।

বৈষম্যের বাস্তবতা

২০১২ সালে ফ্রান্সের লি ফিগারো ম্যাগাজিনে একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়।

জরিপে দেখা যায়- ৬৭ ভাগ ফ্রেঞ্চ নাগরিকই বিশ্বাস করেন যে, মাগরিবি বা দক্ষিণ আফ্রিকান মুসলিমরা ফ্রেঞ্চ সোসাইটির সাথে নিজেদের খাপ থাওয়াতে পারে না তাই তারা তেমন ভালো অবস্থানেও যেতে পারে না।

এখানে বড় একটা ব্যাপার এই যে, ফ্রান্স সরকার বা ফ্রান্সের জনগণ শুরু থেকেই সব মুসলিমকে অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে চান, যা মোটেই সঠিক নয়।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যারা ফ্রান্সে বসবাস করে আসছেন বা নতুন করে যেসব ফ্রেঞ্চ নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করছেন তারাও কেনো অভিবাসীদের মতো ব্যবহার পাবেন?

যাই হোক এই জরিপ প্রকাশের পর ডেভিট লাইতিন, ক্ল্যারি অ্যাডিডা এবং মারি এ্যানা ভেলফোর্ট এই তিনজন গবেষক নতুন আরেকটি জরিপ চালান। তাদের ভাষ্যটিই পড়ুন –

‘২০০৯ সাল থেকেই আমরা ফ্রান্সের মুসলিম ইস্যুটি নিয়ে গবেষণা করছিলাম। পশ্চিম ইউরোপে, ফ্রান্সই হলো সবচে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। ২০১০ সালেই যা ছিলো সাড়ে সাত মিলিয়ন। আমাদের গবেষণার উদ্দেশ্য ছিলো এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া-

ফ্রান্সের চাকরির বাজারে মুসলিম নাগরিকরা কি মুসলিম হওয়ার কারণেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন? যদি এই হয়, তাহলে এই বৈষম্যগুলোর ধরন কী? গবেষণার কাজে আমরা প্রাধান্য দিলাম অভিবাসীদের।

এমন দুই দল অভিবাসী- যারা একই সময়ে একই দেশ থেকে ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছেন। সেনেগালের সেই দুটো গ্রুপ ছিলো জুলাস এবং সির্রিস। একদল মুসলিম, অন্যদল খৃষ্টান। শুধু ধর্ম ছাড়া বাকি সবক্ষেত্রে তারা সমপর্যায়ের ছিলেন। এক দেশ, এক সংস্কৃতি, ৭০ এর দশকে একসাথে ফ্রান্সে পারি জমানো এবং একইরকম অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অবস্থা।

এই দুই গ্রুপের তৃতীয় প্রজন্মের সিভি ঘেটে আমরা বড় রকমের বৈপরীত্য পেলাম। সমযোগ্যতা নিয়ে চাকরির বাজারে সিভি জমা দিয়ে সেনেগাল থেকে আগত খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী পরিবারের সন্তানেরা চাকরির বাজারে যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডাক পেয়েছেন, মুসলিম পরিবারের উত্তরাধিকারীরা ডাক পেয়েছেন খুবই অল্পসংখ্যক। তাদের মধ্যকার চাকরিপ্রাপ্তদের আয়ের ব্যবধানও প্রায় ১৭%।

এই তথ্য থেকে সহজেই অনুমেয়- আরব বা আফ্রিকান হিসেবে নয় মুসলিম হওয়ার কারণেই তারা এসব বঞ্চণার শিকার হয়েছেন

এখন কথা হলো- কীভাবে এই বৈষম্যের ব্যাপারটি ঘটে? আমরা অবাক হয়ে এক্ষেত্রে জরিপের তথ্যগুলো দেখলাম। বেশিরভাগ ফ্রেঞ্চ নাগরিকই বিশ্বাস করে- তাদের রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের সংস্থা বা জনগণের সাথে মুসলিমদের তেমন সংযোগ নেই, যতোটা রয়েছে তাদের নিজেদের দেশ বা সংস্কৃতির সাথে। অর্থাৎ অবিশ্বাস।

দশকের পর দশক অতিক্রম করার পরও মুসলিমরা তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারে নি। আর এক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান ভূমিকা পালন করে মুসলিম নামগুলো।

চাকরিদাতারা মুসলিম নাম দেখেই প্রথমে ভাবেন এই অবিশ্বাসের ব্যাপারটা, যে সমস্যায় খৃষ্টান বা অন্য ধর্মের কাউকে কখনোই পড়তে হয় না। সেই সাথে মুসলিম ইস্যুতে যতো প্রোপাগান্ডা আছে সবই সামনে চলে আসে এবং মুসলিম তরুণদের চাকরির আবেদন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ে।

এভাবেই চাকরির বাজার এবং উপার্জনের প্রশ্নে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক বৈষম্য। এটি এমন এক সমস্যা- যা হাতে ধরে দেখানো যায় না আবার মেনেও নেয়া যায় না। সমাধানের সহজ কোনো বিকল্প কি আছে?

ফ্রান্স কি মুসলিম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে?

ফ্রান্সে দ্রুত বাড়ছে মুসলমান ও মসজিদের সংখ্যা

সাহাবা মস্ক। প্যারিসের সন্নিকটে অবস্থিত এই মসজিদটি ইতোমধ্যেই ফ্রান্সে ইসলাম গ্রহণের মারকায হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ৮১ ফুট দীর্ঘ মিনারসংবলিত সুদৃশ্য এই মসজিদটি ফ্রান্সে ইসলামের প্রোজ্জ্বল উপস্থিতির নিদর্শন।

শার্লি এবদোয় হামলার পর ফ্রান্সসহ পুরো ইউরোপ যেমন আক্রমণাত্মকভাবে ইসলাম বিরোধিতায় মেতেছে, প্রতিক্রিয়াও হয়েছে ঠিক উল্টো। আল্লাহ পাকের ইচ্ছের বিরুদ্ধে মানুষ পেরে উঠবে কেনো।

এখন সবগুলো সূত্রের খবর- শার্লি এবদোর ঘটনার পর ফ্রান্সে ইসলাম গ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ‘র‌্যাপিডলি’। র‌্যাপিডলি শব্দের তরজমা হয় ‘¯্রােতের মতো’, আমরা অন্তত ‘ব্যাপকভাবে’ তো বলতেই পারি। একটা রিপোর্টের অংশ দেখুন-

‘শার্লি এবদো হামলার পর থেকে ফ্রান্সজুড়ে ইসলাম গ্রহণকারী লোকের সংখ্যা তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেড়ে গেছে। ইমামগণের রিপোর্টও সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, উল্লেখযোগ্যহারে লোকজন এখন মসজিদে আসছেন ইসলামের কালিমা পড়তে।

এক সপ্তাহ আগে আরটিএল (জঞখ) রেডিওর সাথে সাক্ষাতকার প্রদানকালে তরুণ এক নওমুসলিম বলছিলো- ‘এই ঘটনাটিই আমাকে ইসলামের কাছে যেতে ‘প্ররোচিত’ করেছে এবং এর মাধ্যমে সবার কাছে প্রমাণিত হচ্ছে যে প্রকৃত ইসলাম কখনো এসব সমর্থন করে না।’ রেডিও স্টেশনের সূত্রমতে মাত্র ক’ সপ্তাহের ব্যবধানে শুধু ‘গ্রেট মস্ক’ খ্যাত সাহাবা মসজিদ থেকেই ৪০ জন ফ্রেঞ্চ নাগরিক ইসলাম গ্রহণের সার্টিফিকেট নিয়েছেন

সময়ের বিবেচনায় বিগত বছরের তুলনায় যা প্রায় ৫০% বেশি। স্ট্রাসবার্গ এবং এবারভিলিয়ার্স শহরেও এ সময়ে ইসলাম গ্রহণের সংখ্যা গত বছরের চেয়ে ৩০% বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। লিয়ন শহরের বৃদ্ধির রেট ছিলো ২০% এর মতো।

ক’জন ইমাম বললেন বৃদ্ধির এই ধারা দেখে প্রথমদিকে তারাও বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন।

প্রসঙ্গত যোগ করা যেতে পারে যে, ইসলাম গ্রহণকারী এই দলে কেবল সাধারণ তরুণ-যুবারাই নন, যুক্ত হয়েছেন ডাক্তার, স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং পুলিশ অফিসারের মতো পেশাদার লোকেরাও। ইসাবেলা ম্যাটিক নামের একজন নারী ব্যবসায়ী এবং ফিল্মমেকারও কিছুদিন আগে তার ফেসবুক একাউন্টে ইসলাম গ্রহণের খবর দিয়েছেন।’…

নানাসূত্রে এ জাতীয় খবর, বিশেষ ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ফ্রান্সের এই সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে মারওয়ান মুহাম্মদের দাবি খুব একটা অযৌক্তিক মনে হয় না। তবে কি ফ্রান্স সত্যিই মুসলিম রাষ্ট্র হতে চলেছে?

Islam in france

Leave a comment