[প্যারিস হামলা – ১৫ নভেম্বর, ২০১৬]

দেশে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া দুর্বোদ্ধ জঙ্গি অপতৎপরতার জের, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি, বিচ্ছিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, স্থানীয় নির্বাচনের তোড়জোড়, দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া উল্লম্ফন এবং ক’বছর ধরে চলতে থাকা রাজনৈতিক দুরাবস্থার চাপে আমাদের এই সময়কার প্রাত্যহিক দিনযাপন এমনিতেই বিচ্ছিরি এক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো।

১৫ নভেম্বর রবিবার সকালটা জটাজটিল এ পরিস্থিতির সঙ্গে আরো বড় এক দুঃসংবাদ নিয়ে হাজির হলো। পত্রিকা খুলেই দেখতে হলো- সন্ত্রাসী হামলার শিকার প্যারিস নিয়ে লাল বর্ণের পিলে চমকানো সব শিরোনাম। ‘প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা’, ‘রক্তাক্ত প্যারিস, স্তম্ভিত বিশ্ব’ ইত্যাদি হেডিংয়ের পাতাজোড়া খবর। হতাহতদের শোক আর স্মরণে, জঙ্গি দমন আর সন্ত্রাস নির্মূলের শ্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠলো পুরো বিশ্ব। প্যারিসের ঘটনায় ব্যথিত এবং মুসলিম উম্মাহর ভাবনায় শংকিত হওয়ার পাশাপাশি অবাক হয়ে আমরা তখন দেখলাম-

এই শোক আর কান্না এতোটাই প্যারিসকেন্দ্রিক হয়ে উঠলো যে, দু’দিন আগে বৈরুত ও পরে মালিতে একইরকম বর্বর সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হওয়া অপর প্রায় ৮০ জনের খবর মাটিচাপা পড়ে গেলো।

ইহুদিদের হাতে ক’সপ্তাহ ধরে লাগাতার বর্বরতার শিকার হতে থাকা অসহায় ফিলিস্তিনিদের কান্নাও মিডিয়ার দৃষ্টি কাড়তে ব্যর্থ হলো। প্যারিস আক্রান্ত হবার পরপরই মধ্যরাতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে সরাসরি আইএসকে দায়ী করলেন, একদিন পেরুবার আগেই আইএস হামলার বিষয়ে নিজেদের স্বীকারোক্তিও জানিয়ে দিলো।

ওলাঁদের ঘোষণার পর থেকেই ইউরোপ-আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের পক্ষ থেকে একের পর এক ঘোষণা আসতে শুরু করলো- বিশ্বকে আইএস মুক্ত করার। ব্যাপক উদ্যমে সিরিয়ায় নতুন করে হামলা শুরু করলো ফ্রান্স। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে বৈঠক করে ওঁলাদ সম্মিলিত আক্রমণের খসড়া তৈরি করলেন। ১৫ নভেম্বর তুরস্কে জি-২০ সম্মেলনে হাজির হওয়া ওবামা-পুতিন গোপন এক বৈঠকে সিরিয়ার বিষয়ে ঐক্যমত্যে পৌঁছলেন। ফ্রান্সের উদ্যোগে আইএসের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে বিশেষ প্রস্তাব পাস হলো। সিরিয়ায় হামলায় এগিয়ে এলো যুক্তরাজ্য এবং জার্মানিও।

হামলার পর থেকে নিয়ে এই পর্যন্ত ঘটা বা ঘটতে থাকা সব ব্যাপারের সাথেই বিশ্ববাসী আমরা একমত পোষণ করলাম। দ্বিধাহীন সমর্থন জানালাম। কিন্তু মিডিয়ার সাধারণ কভারেজ পেতে অক্ষম হওয়া বিপরীত দিকের এই খবররগুলোও আমাদের সমানভাবে উদ্বিগ্ন করে তুললো।

প্যারিস হামলার রাতেই ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী কাল প্রদেশে নিরীহ শরণার্থী শিবিরে আগুন দেয়া হলো। ফ্রান্সের বেশ ক’টি মসজিদ দুর্বৃত্তদের আক্রমণের মুখে পড়লো। কানাডার একটি মসজিদ আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হলো।

দাড়ি-বোরকাসহ ইসলামের দৃশ্যমান পোশাকধারী পশ্চিমের মুসলিম সদস্যদের অনেকেই হয়রানির শিকার হতে থাকলেন। এই ঘটনাগুলোকে আমরা বিক্ষুব্ধ জনতার ভুল বা আবেগী আচরণ হিসেবেও ধরে নিতে পারতাম, কিন্তু রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের পক্ষ থেকেও যখন একইরকম বিবৃতি আসতে থাকলো তখন তো আর সে সুযোগ থাকে না। হামলার জন্য দায়ী করা হলো আইএসকে, তারা দায় স্বীকারও করলো- অথচ বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়লেন কিনা স্থানীয় নিরপরাধ মুসলিম আর অসহায় শরণার্থীরা!

বেশ ক’টি ইউরোপীয় দেশ পরদিনই নিজেদের ভাগে পড়া শরণার্থী গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালো। ফ্রান্স-বেলজিয়ামসহ ইউরোপজুড়ে শুরু হওয়া অভিযানগুলোতে মুসলিম নাগরিকদের নিগ্রহের খবর পাওয়া যেতে থাকলো। ব্রাসেলসের এক মুসলিমপ্রধান পল্লীকে জঙ্গি উৎপাদনের আখড়া হিসেবে আখ্যায়িত করা হলো।

ফ্রান্স সীমান্তে হাজির হওয়া শরণার্থীরা এ সময় পড়লেন আরো বিপাকে- ‘ফ্রান্স রাখবে না আর যুক্তরাজ্য ঢুকতে দেবে না’ এমন পরিস্থিতিতে পড়ে অসহায় দিন গুজরান করতে বাধ্য হতে থাকলেন ঘটনার পর থেকেই।

এদিকে প্যারিস হামলার সপ্তাহ না ঘুরতেই ফ্রান্সের পক্ষ থেকে ঘোষণা এলো প্রায় ১৬০ টি মসজিদ বন্ধ করে দেওয়ার। ক’দিন পর মিললো আরো বড় দুঃসংবাদ- হামলার ঠিক দু’সপ্তাহের মাথায় অনুষ্ঠিত হওয়া ফ্রান্সের আঞ্চলিক নির্বাচনে চরম মুসলিমবিদ্বেষী ন্যাশনাল ফ্রন্ট অভাবনীয় বিজয় অর্জন করলো।

বহু বছরেও ফ্রান্সের যে কোনো ধরনের নির্বাচনে একটামাত্র আসন পেতে ব্যর্থ হওয়া ন্যাশনাল ফন্টের এই বিজয়ে একবার কল্পনা করুন- আসছে দিনগুলোতে কেমন বিপদের মুখে পড়তে চলেছেন ফ্রান্সের প্রায় এক কোটি মুসলিম। এ খবরগুলোকে আপনি কী বলবেন?

বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কেবল শোক-ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ঘটে যাওয়া কিছু আবেগী ভুল? সিদ্ধান্তে যাবার আগে সিরিয়াকে নিয়ে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরজুড়ে চলা রাশিয়া ও পশ্চিমা জোটের বিতর্ক, রাশিয়ার একতরফা হামলা, সিরিয়াকে নো ফ্লাই জোন ঘোষণা এবং পশ্চিমের মুখোশ খুলে দেয়ার হুমকিটাও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

তারও আগে চলুন প্যারিস হামলার পরবর্তী এক-দেড় সপ্তাহের ধারাবাহিক ক’টি রিপোর্টে আরো একবার চোখ বোলাই। খবরের সত্যতা এবং সূত্রগুলো সতর্কতার সাথে যাচাই করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সংবাদগুলো আংশিক সম্পাদনাসহ তুলে ধরছি। শুধু সংবাদের জন্য সংবাদ না হয়ে ভবিষ্যতেও কাজে লাগতে পারে এমন তথ্যনির্ভর রিপোর্টগুলোই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। ঘটনার ধরন, প্রতিক্রিয়া এবং ঘটনাপরবর্তী পদক্ষেপগুলোই আপনাকে অনেক কিছু বলে দেবে।

হামলার সূত্রপাত ও ভয়াবহতা

Table of Contents

বছরের শুরুতেই উগ্রপন্থীদের গুলি ও বোমায় রক্ত ঝরেছিলো ফ্রান্সে। বছরের শেষ দিকে এসে আবারও রক্তাক্ত হলো দেশটির রাজধানী প্যারিস। শুক্রবার (১৩ নভেম্বর, ২০১৫) রাতে প্যারিসের ছয়টি স্থানে প্রায় একই সময়ে পরিচালিত হামলায় অন্তত ১২৯ জন নিহত হয়েছেন। উপর্যুপরি গুলি, বোমা ও আত্মঘাতী এসব হামলায় আহত হয়েছেন আরো অন্তত ৩৫২ জন। তাদের ৯৯ জনের অবস্থাই গুরুতর। নিহত হয়েছেন সাতজন হামলাকারীও।

খবর এএফপি, গার্ডিয়ান, বিবিসি ও রয়টার্সের।

চলতি বছরেরই ৭ জানুয়ারি প্যারিসে ব্যাঙ্গ পত্রিকা শার্লি এবদো কার্যালয়ে জঙ্গি হামলায় ১১ জন নিহত হন। বলা হচ্ছে- ১৩ নভেম্বরের ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নিয়ে ফ্রান্সে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। চলতি শতাব্দীতে ইউরোপে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী হামলা।

এর আগে ২০০৪ সালে মাদ্রিদে ট্রেনে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১৯১ জন। ইরাক ও সিরিয়ায় সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) অনলাইনে শুক্রবারের হামলার দায় স্বীকার করেছে। বাড়তি সতর্কতা হিসেবে প্যারিসে দেড় হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে হামলার পরপরই দেশটির সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়।

প্যারিসে স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত নয়টার দিকে কম্বোডীয় একটি পানশালায় হামলা চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে বন্দুকধারীরা। রাত প্রায় সাড়ে ১০টা পর্যন্ত একটি কনসার্ট হল, একাধিক রেস্তোরাঁ ও জাতীয় ক্রীড়া স্টেডিয়ামসহ ছয়টি স্থানে হামলা চালানো হয়।

এর মধ্যে বাতাক্লঁ কনসার্ট হলেই ৮৭ জন নিহত হন। চারজন একে-৪৭ বন্দুকধারী কনসার্ট হলে ঢুকে গুলি চালানো শুরু করে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বেতার উপস্থাপক পিয়ের জানাসজক বলেন-

‘বন্দুকধারীরা ঢুকেই গুলি চালানো শুরু করে। চারদিকে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। ওরা বলছিল- এটার জন্য তোমাদের প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ দায়ী। সিরিয়ায় হামলায় অংশ নেওয়া তার ঠিক হয় নি।’

বাতাক্লঁ কনসার্ট হল ছাড়া জাতীয় ক্রীড়া স্টেডিয়াম স্তাদ দো ফ্রঁস এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বুলভার্দ দো শারন, বুলভার্দ ভলতেয়ার, রু দো লা ফঁতাইন অরোয়া ও রু আলিবেয়ার এলাকায় হামলা হয়েছে।
ডিয়াম স্তাদ দো ফ্রঁসের বাইরে দুটি আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এতে চারজন নিহত হয়। ওই সময় স্টেডিয়ামে ফ্রান্স ও জার্মানির জাতীয় দলের ফুটবল খেলা চলছিল। খেলা দেখতে সেখানে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রি ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার স্টাইনমেয়ার।

ধরপাকড়

১৪ নভেম্বর সকালে এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে বলে স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান প্যারিসের প্রসিকিউটর ফ্রাঁসোয়া মলাঁ। এদের একজনকে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের সীমান্ত থেকে আটক করা হয়। তিনি বলেন, সাতজন হামলায় অংশ নেয়। আগে হামলাকারীর সংখ্যা আট বলা হলেও তা ঠিক নয়। তিনটি সংঘবদ্ধ দল একযোগে হামলা চালায়। পরে আরো বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।
প্যারিসের পুলিশের ধারণা-

হামলাকারীদের মধ্যে তিনজন ব্রাসেলস থেকে এসেছিলেন। হামলাকারীদের একজন প্যারিসের এক শহরতলির বাসিন্দা। এদিকে প্যারিসে হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পাশের দেশ বেলজিয়ামেও প্রায় কুড়ি জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ফ্রান্সজুড়ে আতঙ্ক

হামলার পর ফ্রান্সজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মেয়রের পক্ষ থেকে প্যারিসের বাসিন্দাদের ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। শনিবার নির্ধারিত সব ধরনের খেলাধুলা, জনপ্রিয় ইউ টু ব্যান্ডের কনসার্ট স্থগিত করা হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় প্যারিসে পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ আইফেল টাওয়ার।

আইএসের দায় স্বীকার

হামলার দায় স্বীকার করে একদিন পরই (১৪ নভেম্বর) শনিবার বিবৃতি দিয়েছে আইএস। বিবৃতিতে বলা হয়- আইএসের পক্ষ থেকে প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে হামলার জন্য আটজনকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিয়ে পাঠানো হয়েছিল। ফ্রান্স যত দিন তার বর্তমান নীতি বজায় রাখবে, ততদিনই প্যারিস হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকবে। অনলাইনে তারিখ উল্লেখ না করে ছাড়া এক ভিডিও ফুটেজে আইএস হুমকি দিয়ে বলেছে- তাদের যোদ্ধাদের ওপর বিমান হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের হামলা চলতে থাকবে।’

উল্লেখ্য- ইরাক ও সিরিয়ায় সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিমান হামলা চলছে। এ লড়াইয়ে অংশ নিতে সম্প্রতি পারস্য উপসাগরে একটি রণতরি পাঠানোর ঘোষণা দেন ওঁলাদ। গত সেপ্টেম্বর থেকে সিরিয়ায়ও আইএসবিরোধী হামলা শুরু করে ফ্রান্স।

প্যারিসের ৬ স্থানে হামলা

হামলার সময় হামলার স্থান হামলার ধরন ও নিহতের সংখ্যা

শুক্রবার- রাত ৯: ২০ স্তাদ দো ফ্রঁস (স্টেডিয়াম) আত্মঘাতী হামলায় নিহত: ৪

রাত ৯: ২৫ কবোজ রেস্তোরাঁ গুলিতে নিহত: ১

রাত ৯: ৩৮ লা বেল ইকুইপ বার গুলিতে নিহত: ১৮

রাত ৯: ৪৯ বাতাক্লঁ কনসার্ট হল গুলি ও বিস্ফোরণে নিহত: ৮৯

রাত ১০:০০ বুলভার্দ ভলতেয়ার সড়ক গুলিতে নিহত: ১২

রাত ১০:১০ কাসা নস্ত্রা পিৎজার দোকান গুলিতে নিহত: ৫

নিহতরা কে কোন দেশের

প্যারিসের ছয়টি স্থানে শুক্রবারের ওই হামলায় আহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন ১৪ নভেম্বর মারা গেছেন। এ নিয়ে নিহতদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৩২ জন। এঁদের মধ্যে ফরাসি ছাড়াও আছেন ১৪টি দেশের মোট ২২ জন। এসব দেশের মধ্যে বেলজিয়াম ও চিলির তিনজন করে; আলজেরিয়া, পেরু, রোমানিয়া ও তিউনিসিয়ার দু’জন করে এবং যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, মেক্সিকো, মরক্কো, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও সুইডেনের একজন করে।

প্যারিসের বাতাক্লঁ কনসার্ট হলে নির্বিচারে গুলির সময় গান করছিলো মার্কিন গানের দল ইগলস অব ডেথ মেটাল। এই দলটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক নিক আলেক্সান্ডার। সেখানে নিহতদের মধ্যে তিনিও একজন।

হামলা পরবর্তী প্রতিক্রিয়া

হামলার পরপরই মধ্যরাতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ এ হামলার জন্য আইএসকে দায়ী করেন। তিনি বলেন-

এ হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে দেশের বাইরে। আইএসই এ হামলা চালিয়েছে। এক্ষেত্রে ফ্রান্সের ভেতর থেকেও সহযোগিতা পেয়েছে হামলাকারীরা। ফ্রান্স এর জবাব দেবে অত্যন্ত নির্মমভাবে। এ সময় পুরো জাতিকে তিনি সন্ত্রাসের ব্যাপারে আরো সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান, ঐক্যবদ্ধ ফ্রান্সকে যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসমুক্ত করার ঘোষণা দেন। নিহতদের স্মরণে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়া এবং নতুন সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ রুখতে হামলার পরপরই ফ্রান্সের সীমান্তও বন্ধ করে দেয় হয়।

ফরাসি প্রধানমন্ত্রি ম্যানুয়েল ভল্স বলেছেন-

‘আমরা এখন যুদ্ধের মধ্যে আছি। যুদ্ধের মতোই সংগঠিতভাবে আমাদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। আমরাও এর সমুচিত জবাব দেব। অবশ্যই সেটা ফ্রান্সে ও ইউরোপে; সিরিয়া এবং ইরাকেও।’

ফ্রান্সে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের দ্বিতীয় দিন ছিল (১৫ নভেম্বর) রোববার। সাপ্তাহিক ছুটির এই দিনেও বন্ধ ছিল প্যারিসের বিখ্যাত জাদুঘর ও থিয়েটারগুলো। লোকজন খুব একটা বের হয়নি ঘরের বাইরে।

তবে এর মধ্যে রাস্তাঘাটে কড়া নিরাপত্তা ও জোরালো তল্লাাশি ছিলো। সেনাবাহিনী ও পুলিশের শত শত সদস্য টহল দেন রাজপথ ও মেট্রো স্টেশনগুলোতে। আর নিহতদের স্মরণে প্যারিসের নটরডেম ক্যাথিড্রালে গতকাল সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় প্রার্থনাসভার। সেখানে যোগ দেয় কয়েক হাজার মানুষ।

আইএস হামলার দায় স্বীকার করে প্যারিসে আরও হামলার হুমকি দিলেও এর কড়া জবাব দিয়েছে ফ্রান্স। আইএস ধ্বংস করতে ফ্রান্স অঙ্গীকারাবদ্ধ বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ। স্থানীয় সময় সোমবার ফ্রান্সের পার্লামেন্টে তিনি এ অঙ্গীকার করেন।

ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ বলেন, জরুরি অবস্থার সময়সীমা বাড়ানোর জন্য তিনি একটি বিল পার্লামেন্টে উত্থাপন করবেন এবং সংবিধান পরিবর্তনের জন্যও অনুরোধ করবেন। ইরাক ও সিরিয়ায় ফ্রান্সের সামরিক অভিযান জোরদার করা হবে বলেও তিনি জানান।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বলেন-

‘জরুরি অবস্থা অবলম্বন করতে আমাদের একটি যথাযথ কর্মকৌশল প্রয়োজন। এ জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। অন্য যেসব পদক্ষেপ নিতে তিনি বলেছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পুলিশের আরো পাঁচ হাজার তল্লাাশি চৌকি স্থাপন, প্রতিরক্ষা বাজেটে নতুন করে কাটছাঁট না করা, ফ্রান্সের জন্য হুমকিস্বরূপ বিদেশিদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া ইত্যাদি। ওঁলাদ বলেন, আইএসের বিরুদ্ধে হামলার কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে বসবেন।

তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা আরো বাড়ানোর কথা বলেন এবং বিমানবাহী রণতরী শার্ল দ্য গল আইএসের বিরুদ্ধে অভিযানে ব্যবহারের কথা জানান। গত সোমবার (১৬ নভেম্বর) সিরিয়ার রাক্কা শহরে আইএস ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ফ্রান্সের বিমান।

ফরাসি কর্মকর্তারা জানান- ১০টি বিমান থেকে ২০টি নির্দেশিত (গাইডেড) বোমা ফেলা হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানেরা ফ্রান্সকে নিরাপদ রাখতে সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গতকাল দেওয়া এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন-

‘এই হামলা আমাদের সবার বিরুদ্ধে হামলা। কঠোর সংকল্প এবং সম্ভাব্য সমস্ত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা এই হুমকি মোকাবেলা করব।’

প্যারিস হামলায় শতাধিক নিহত হওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে ফ্রান্সকে সার্বিক সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ওবামা বলেন-

এটা শুধু ফ্রান্সের মানুষের ওপর হামলা নয়, এই হামলা মানবতার ওপর হামলা। এ হামলা সব জাতির ওপর হামলা। এই শোক ও বেদনার সময় আমরা ফ্রান্সের পাশে থাকবো। ফ্রান্স সরকার ও জনগণকে সার্বিক সহযোগিতা করবো।

এই হামলার নিন্দা জানিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান বলেন, নিহতদের পরিবারের জন্য আমার সমবেদনা রইলো। আশা করি আহতরা দ্রুত সেরে ওঠবেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রি ডেভিট ক্যামেরন ফ্রান্সের জনগণের সহায়তায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন। জার্মান চান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল বলেছেন-

এ হামলা শুধু ফ্রান্সের জনগণের ওপর হামলা নয়, এ হামলা আমাদের সবার ওপরই হামলা। এর জন্য জবাব আমাদের সবাইকে একসঙ্গে দিতে হবে। ফ্রান্স সরকারের সঙ্গে জার্মান সরকার যোগাযোগ রাখছে। যেভাবে ফ্রান্সকে সহায়তা করা যায় আমরা করবো।

পাশাপাশি সন্ত্রসীদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়বো আমরা। অন্যান্য বিশ্বনেতারাও একইভাবে সন্ত্রসীদের নিন্দা এবং ফ্রান্সের প্রতি সমবেদনার কথা জানিয়েছেন।

প্যারিস হামলায় মুসলিম নেতাদের প্রতিক্রিয়া

প্যারিস হামলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুসলিম দেশগুলোর নেতারা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান বলেছেন, একটি দেশ হিসেবে সন্ত্রাসীদের কর্মকা- সম্পর্কে আমাদের জানা আছে। আমরা এখন বুঝতে পারছি ফ্রান্স ভোগান্তির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

দেশ হিসেবে আমরা ফ্রান্সের পাশে আছি। নিহতদের পরিবারের প্রতি আমাদের সমবেদনা। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রি নাজিব রাজাক বলেছেন-

সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রি নওয়াজ শরীফ বলেছেন, প্যারিসে জঘন্য ও নির্মম হত্যাকা-ের জন্য সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রি আবদেল আল জুবায়ের বলেছেন, শুক্রবারে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলা সকল নীতি, নৈতিকতা ও ধর্মের লঙ্ঘন।

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেন, মানবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য আমি তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। ফ্রান্সের পাশে সন্ত্রাস দমনে ইরান রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জুকু উইদুদু বলেছেন, সন্ত্রাসবাদের মোকাবেলায় সকল আন্তর্জাতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার গুরুত্ব দিতে হবে। যাতে প্যারিস হামলার পুনরাবৃত্তি না হয়।

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি বলেছেন, প্যারিসে সন্ত্রাসীদের হামলায় তারা প্রমাণ করে দিয়েছে তাদের কোন সীমানা নেই। তারা মানবতার শত্রু। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য মুসলিম দেশের নেতারাও এ সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানান।

ফরাসিদের পাশে বিশ্ববাসী : যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরোনো বন্ধু ফ্রান্সকে সমর্থন জানাতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রি জন কেরি সোমবার প্যারিস গেছেন। তিনি হামলাকারীদের মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে অভিহিত করেছেন। তুরস্কে জি-২০ সম্মেলনে হাজির হওয়া বিশ্বনেতারাও হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পারস্পরিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

ফ্রান্সবাসীর শোকের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিখ্যাত ও সুপরিচিত স্থাপনাগুলো ফরাসি পতাকার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়।

এর মধ্যে ছিলো লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজ, বার্লিনের ব্রান্ডেনবার্গ গেট, নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্যকেন্দ্র এবং দুবাইয়ের বুর্জ আল খলিফা। ফেসবুক, টুইটার, ইন্সট্রগ্রাম এবং ইউটিউবসহ বিখ্যাত সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ফ্রান্সের পতাকা ব্যবহার করে বিশেষভাবে শোক প্রকাশ এবং ফ্রান্সের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপনের আহ্বান জানায় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নিজেদের কোটি কোটি গ্রাহকের প্রতি।

এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে ফরাসি দূতাবাসসহ বিভিন্ন স্থানে ফুল দিয়ে ও মোমবাতি জ্বালিয়ে প্যারিসের নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় লাখো মানুষ।

ইউরোপজুড়ে শত শত অভিযান

১৩ নভেম্বর শুক্রবার রাতের সন্ত্রাসে হতভম্ব প্যারিস শোকে মুহ্যমান। ফরাসিরা স্মরণ করেছে হারানো স্বজনদের। শ্রদ্ধা জানিয়েছে তাঁদের বিদেহী আত্মার প্রতি। একই সঙ্গে হামলায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে ফ্রান্সসহ ইউরোপজুড়ে চলছে শত শত অভিযান।

এরই মধ্যে তিন হামলাকারীর পরিচয় শনাক্ত করেছে ফরাসি পুলিশ। এদের একজনের বাবা ও ভাইসহ ছয় নিকটজনকে আটক করা হয়েছে। শনাক্ত হওয়া তিনজন পরস্পরের ভাই হতে পারে বলে জানিয়েছে ফরাসি গণমাধ্যম। হামলায় ব্যবহৃত একটি গাড়ি পাওয়া গেছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। এর মধ্যে ছিল কয়েকটি একে-৪৭ রাইফেল। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে-

হামলাকারীদের কেউ কেউ হয়তো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, শুক্রবার রাতের আক্রমণটির পরিকল্পনা করেছিল বেলজিয়ামের একটি গ্রুপ এবং তারা ফ্রান্সের কিছু লোকের সহযোগিতা পেয়েছিল । ফরাসী প্রধানমন্ত্রি মানুয়েল ভালস আরো বলেছেন, ওই হামলা সংগঠিত হয়েছিল সিরিয়া থেকে, এবং ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে আরো আক্রমণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, জরুরি অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে জিহাদি আন্দোলনের সাথে যুক্ত লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বেলজিয়ামে এ ঘটনার ব্যাপারে সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এদিকে, ইসলামিক স্টেট এ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করার পর গতরাতে ফ্রান্সের জঙ্গীবিমানগুলো সিরিয়ার রাক্কা শহরে – যা ইসলামিক স্টেট নিয়ন্ত্রিত এলাকার রাজধানী – একাধিক স্থাপনার ওপর ২০টি বোমা ফেলেছে। খবর এএফপি ও রয়টার্সের।

কীভাবে চালানো হলো ভয়াবহ এ হামলা?

১৩ নভেম্বর শুক্রবারের হামলায় অংশ নেওয়া সাতজনের মধ্যে ছয়জন বিস্ফোরণে নিজেদের উড়িয়ে দেয়। আর একজন নিহত হয় পুলিশের গুলিতে। এতগুলো মানুষ এমন সুসংগঠিত হয়ে একসঙ্গে ছয়টি স্থানে কীভাবে হামলা চালাতে পারল- সেটাই এখন খুঁজে দেখা হচ্ছে। পুলিশ বলেছে-

হামলাকারীদের কাজ দেখে মনে হয়েছে, প্রশিক্ষণ দিয়ে অনেক দিন ধরে তাদের তৈরি করা হয়েছে। এমনও হতে পারে- তারা সিরিয়ার যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ আগেই বলেছেন-

দেশের বাইরে প্রস্তুতি নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ফ্রান্সের ভেতর থেকেও সহযোগিতা পেয়েছে হামলাকারীরা।
ধারণা করা হচ্ছে- হামলাকারীদের কেউ কেউ ফ্রান্সে ঢোকে আশপাশের দেশ থেকে। সেই ধারণা থেকে ইউরোপের অনেকগুলো দেশে চালানো হচ্ছে অভিযান। এরই মধ্যে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস থেকে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করেছে সে দেশের পুলিশ।

৫ নভেম্বর জার্মানির ব্যাভারিয়া এলাকায় মেশিনগান, হাতবন্দুক, বিস্ফোরক বোঝাই গাড়িসহ এক ব্যক্তিকে আটক করেছিল পুলিশ। প্যারিসে হামলার সঙ্গে ওই ব্যক্তির যোগসূত্র থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ফ্রান্সের ‘প্রতিশোধ’ হামলা এবং ধ্বংসযজ্ঞ

প্যারিস-হামলার পর থেকে নিজ দেশে ব্যাপক অভিযানের পাশাপাশি সিরিয়াতেও ভয়ঙ্কর প্রত্যাঘাত চালিয়ে যাচ্ছে ফ্রান্স। উত্তর-মধ্য সিরিয়ার রাক্কায় আইএস গ্রুপের ‘ডি ফ্যাক্টো রাজধানীতে‘ চলছে ফরাসি বিমানবাহিনীর অব্যাহত আক্রমণ। সহযোগিতায় আছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর। প্রথম দু’দিনেই ১০টি যুদ্ধবিমান মোট ২০টি গাইডেড বোমা বর্ষণ করেছে নির্দিষ্ট টার্গেটে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডানের এয়ারবেস থেকে এই হামলা চালানো হচ্ছে। ফ্রান্সের বিমানবাহিনীর দাবি- গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আইএস বাহিনীর সেইসব ঘাঁটি যেখান থেকে পরিকল্পনা করা হয়েছিল প্যারিস-হামলার।

যদিও বিরোধী অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন- ফরাসি বিমানবাহিনী এখন পর্যন্ত ৩০টি বোমা বর্ষণ করেছে। এই হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে ফুটবল স্টেডিয়াম, জাদুঘর এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ২ লাখ মানুষের শহর রাক্কা। অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন- প্যারিসে জঙ্গিহানা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। কিন্তু ফ্রান্সেরও উচিত আরো সচেতন হয়ে বিমানহানা চালানো।

যদিও ফ্রান্স এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর জানিয়েছে- আইএস সদস্যদের বিরুদ্ধে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবে না। আমেরিকা ও ফ্রান্স দু’ দেশের প্রতিরক্ষা দফতরই আলোচনা জারি রেখে পাল্টা প্রত্যাঘাত চালাচ্ছে আইএস ঘাঁটিতে।

সিরিয়ায় হামলা শুরু করেছে যুক্তরাজ্য এবং জার্মানি

সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটকে লক্ষ্য করে (৩ ডিসেম্বর, ২০১৫) বিমান হামলা শুরু করেছে যুক্তরাজ্য। রয়্যাল এয়ার ফোর্সের টর্নেডো বিমান প্রথমবারের মতো আইএসকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সের আইনপ্রণেতারা বুধবার এক ভোটাভুটিতে এই হামলার অনুমোদন দেন। অনুমোদন দেয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই সিরিয়ায় আক্রমণ করল দেশটির বিমানবাহিনী।

অনুমোদনের পর পরই সাইপ্রাস দ্বীপের আকরোতিরি ঘাঁটি থেকে ছেড়ে গিয়েছিলো এই টর্নেডো বিমানগুলি।
বিবিসির প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রতিবেদক জনাথন বিয়েল জানিয়েছেন- টর্নেডোগুলো যখন রয়্যাল এয়ারফোর্সের ঘাঁটি ছেড়ে যায়, তখন এগুলোতে ছিল তিনটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা। বিমান দু’টি যখন ফিরে আসে, তখন সেগুলোতে আর কোনো বোমা ছিলো না। বিমান হামলার ঘটনা আজ প্রথম হলেও যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স আগে থেকেই সিরিয়ায় আইএস বিরোধী অভিযানে অংশ নেয়।

বৃটিশ সামরিক বাহিনীকে সিরিয়াতে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর অনুমতি দিয়েএকটি প্রস্তাাব পাস করে বৃটেনের সংসদ সদস্যরা। দশ ঘণ্টারও বেশি বিতর্কের পর ৩৯৭ জন এমপি ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।

বিপক্ষের চাইতে তারা ১৭৪টি ভোট বেশি পান। ভোটের ফলাফল জানার সঙ্গে সঙ্গে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে ক্ষুব্ধ বিক্ষোভ দেখা যায়। অনেক বৃটিশ জনতাই এ ধরনের হামলার বিপক্ষে। এর আগে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রি ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন- বৃটেনে আইএস জিহাদিদের হামলার জন্য অপেক্ষা না করে লড়াাইটা আইএসের কাছে নিয়ে যাওয়াটাই ভালো হবে।

এদিকে, জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ জার্মানিও। জার্মান পার্লামেন্টে ভোটাভুটির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সিরিয়ায় আইএসবিরোধী লড়াইয়ে অংশ নিতে ছয়টি অনুসন্ধানী টর্নেডো বিমান ও একটি ফ্রিগেট মোতায়েনসহ সরাসরি ভূমিকা পালনের জন্য একটি প্যাকেজ অনুমোদন করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। ভোটাভুটিতে প্যাকেজটি অনুমোদনের পক্ষে ভোট পড়ে ৪৪৫টি। বিপক্ষে পড়েছে ১৪৬টি।

বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত মাসে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ১৩০ জন নিহত হওয়ার পর ফরাসি সরকারের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে জার্মানি এই ভোটাভুটির সিদ্ধান্ত নেয়। তবে জার্মানির কোনো সেনা সরাসরি ওই যুদ্ধে অংশ নেবে না। রাশিয়া পৃথকভাবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে সিরিয়ায় আইএসবিরোধী হামলা শুরু করেছে।

অভিযোগের আঙুল…

প্যারিস হামলার জন্য আমেরিকা দায়ী : উইকিলিকস

প্যারিস হামলার জন্য আমেরিকা ও তার মিত্রদের অভিযুক্ত করেছে উইকিলিকস। হামলার পর এক টুইট বার্তায় উইকিলিকস বলে- বছরের পর বছর ধরে সিরিয়া ও লিবিয়ায় চরমপন্থীদের অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ দেওয়ার ফলেই প্যারিসের এই হামলা।

পরের দিন আরেক টুইট বার্তায় ওয়েবসাইটটি বলে- প্যারিস সন্ত্রাসী হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছে। ইরাক ও সিরিয়াতেও ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এই দুই মৃত্যুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যে উগ্রপন্থীদের প্রতিপালন করেছে তার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।

আরেক টুইট বার্তায় উইকিলিকস বলে- প্যারিসে ইসলামি সন্ত্রাসীদের হামলায় ১২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ায় আড়াই লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। এই ব্যাপারটা তখনো মজার ছিলো না, এখন মজার না।
ওয়েবসাইটটি আরো বলে- সিরিয়া ও ইরাক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে উগ্রপন্ত্রীদের যারা অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করেছে তাদের প্রত্যেককে বিচারের আওতায় আনা উচিত।

প্যারিসে হামলার নেপথ্য নায়ক ইসরাইল : মাহাথির মোহাম্মাদ

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রি মাহাথির মোহাম্মদ ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করেছেন।

তিনি বায়তুল মোকাদ্দাস দখলদার ইসরাইলের সমালোচনা করে বলেছেন- প্যারিসে হামলার নেপথ্য নায়ক হচ্ছে ইসরাইল। ইসরাইল যেকোনো মূল্যে দখলীকৃত এলাকার ওপর আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেছেন, যতদিন পর্যন্ত ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না হবে ততদিন ইসরাইল অন্য যেকোনো উপায়ে তার লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং সন্ত্রাসী হামলা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।

ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রির বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে।

জাতিসংঘে আইএস নির্মূলের প্রস্তাব অনুমোদন
মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কয়েকগুণ বাড়ানোর একটি প্রস্তাব জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে-

গেল সপ্তায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ১৩২ জন নিহতের ঘটনায় দায় স্বীকার করে আইএস। আর এরই জেরে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা এক জরুরি বৈঠকে বসে শুক্রবার ফ্রান্স প্রস্তাবিত খসড়া প্রস্তাবটি অনুমোদন করে।

প্যারিসের স্টেডিয়াম, কনসার্ট হল এবং বেশ কয়েকটি বার ও রেস্টুরেন্টে চালানো ওই হামলায় শতাধিক মানুষ আহত হন। ২০০৪ সালে মাদ্রিদে বোমা হামলার পর এই ঘটনাকেই ইউরোপে সংঘটিত ‘সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে।
বিবিসি জানিয়েছে- ফ্রান্সের পেশ করা এই খসড়া প্রস্তাবে জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আইএসের বিরুদ্ধে ‘প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ’ নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। তিউনিসিয়ার সুশি ও তুরস্কের আঙ্কারায় সাম্প্রতিক হামলার জন্যও আইএসকে দায়ী করেছে নিরাপত্তা পরিষদ।

প্রস্তাবে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন অংশজুড়ে আইএস ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলো’ নির্মূলে ভূমিকা রাখতে আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ‘সন্ত্রাসী হামলা দমন ও প্রতিরোধে’ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোরও তাগিদ দেয়া হয়েছে।

তবে রাশিয়া ও ফ্রান্সের বিরোধিতায় প্রস্তাবে আইএসের দখল করা অঞ্চলে স্থলসেনা পাঠানোর বিধান যুক্ত করা হয়নি। দেশদুটো মনে করে- এক্ষেত্রে ইরাক ও সিরিয়ার নিজস্ব বাহিনীই ‘যথেষ্ট’।

তিন দশকে ইউরোপে সাতটি সন্ত্রাসী হামলা

স্পেনের মাদ্রিদে ২০০৪ সালের মার্চে ট্রেনে বোমা হামলার ঘটনার পর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শুক্রবারের এই হামলাটিই ইউরোপে সবচেয়ে ভয়াবহ। ১৯৮০ সাল থেকে প্যারিস হামলার আগ পর্যন্ত ইউরোপে সংঘটিত সাতটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার তথ্য তুলে ধরা হলো।
ফ্রান্স : চলতি বছরের ৭-৯ জানুয়ারি দেশটিতে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে।

প্রথম দিনে দুই বন্দুকধারী ব্যাঙ্গ সাপ্তাহিক শার্লি এবদোর প্যারিস কার্যালয়ে হামলা চালায়। তাদের গুলিতে আট কার্টুনিস্ট ও সাংবাদিক এবং পুলিশের ২ কর্মকর্তাসহ ১২ জন নিহত হন। পরের দিনগুলিতে এক নারী পুলিশ সদস্য নিহত হন।

৯ জানুয়ারি এক বন্দুকধারী একটি ইহুদি বিপণিকেন্দ্রে ঢুকে চারজনকে হত্যা করে। সাঈদ এবং শরিফ কোয়াচি নামের দু’ ভাইকে এ ঘটনার জন্য প্রধানত দায়ী করা হয় এবং দু’জনই পরে নিহত হন।

নরওয়ে

আন্দ্রেস ব্রেইভিক নামের এক উগ্র খৃষ্টান ডানপন্থী ২০১১ সালের ২২ জুলাই রাজধানী অসলোর সরকারি ভবনের বাইরে বোমা হামলা চালালে আটজন নিহত হন। পরে সে ওটোয়া দ্বীপে লেবার যুব সম্মেলনে গুলি চালিয়েও ৬৯ জনকে হত্যা করে।

যুক্তরাজ্য

২০০৫ সালের ৭ জুলাই যুক্তরাজ্যের লন্ডনে তিনটি পাতালরেল ও একটি বাস লাইনে চারটি হামলায় ৫৬ ব্যক্তি নিহত হয়। আল-কায়েদাকে এ হামলার জন্য দায়ী করা হয়।

স্পেন

২০০৪ সালের ১১ মার্চ মাদ্রিদগামী চারটি কমিউটার ট্রেনে কয়েকটি বোমা হামলা চালানো হলে ১৯১ জন নিহত এবং প্রায় ২ হাজার ব্যক্তি আহত হয়। প্যারিস হামলার আগ পর্যন্ত এটিই ছিলো ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা।

যুক্তরাজ্য

১৯৯৮ সালের ১৫ আগস্ট আয়ারল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের ছোট একটি শহরে ওমাঘে গাড়িবোমা হামলায় ২৯ জন নিহত হয়। পরে ওই হামলার দায় স্বীকার করে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি।

স্পেন

বার্সেলোনার একটি বিপণিকেন্দ্রের পার্কিংয়ে ১৯৮৭ সালের ১৯ জুন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইটিএর গাড়িবোমা হামলায় ২১ জন নিহত হয়।

ইতালি

১৯৮০ সালের ২ আগস্ট একটি রেলস্টেশনের বিশ্রামাগারে বোমা বিস্ফোরণে ৮৫ জন নিহত এবং ২০০ জন আহত হয়। ওই ঘটনায় উগ্র ডানপন্থী সন্ত্রাসী দলের দুই সদস্যের যাবজ্জীবন কারাদ- হয়।

ফ্রান্সে মুসলিমবিদ্বেষী ন্যাশনাল ফ্রন্টের জয়জয়কার

জনমত জরিপের পূর্বাভাস যা দেয়া হয়েছিল ঠিক তা-ই ঘটতে যাচ্ছে। ফ্রান্সের আঞ্চলিক নির্বাচনে মুসলিমবিদ্বেষী উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট-এর জয়জয়কার হতে চলেছে। রোববার অনুষ্ঠিত ফ্রান্সের ১৩টি আঞ্চলিক নির্বাচনে মারিন লো পেনের নেতৃত্বাধীন উগ্র ডানপন্থী দলটি শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৬টিতে এগিয়ে আছে।

আর ভরাডুবি হতে চলেছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দের দল সোসালিস্ট পার্টির।

অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি’র দল লে রিপাবলিক (যার সাথে আরো দু’টি দক্ষিণপন্থীয় দল) এগিয়ে আছে মাত্র ৪ অঞ্চলে। আর একটি এগিয়ে আসে কট্টর বাম একটি দল।

ফ্রান্সকে ১৩টি বিভাগীয় অঞ্চলে ভাগ করে এ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে মোট প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট পরেছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম খবর দিয়েছে।

দলীয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট ভোটের ৩০ শতাংশ পেয়েছে উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট। লে রিপাবলিক পেয়েছে ২৭ শতাংশ, সোসালিস্ট ২৩ শতাংশ। পরিবেশবাদী দল হিসেবে বিবেচিত ইকোলজিস্ট পেয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং কট্টর বাম দল হিসেবে পরিচিত এসটিএল পেয়েছে ৪ শতাংশ ভোট।

ফ্রান্সের এই আঞ্চলিক নির্বাচনের ফলাফলে মোটেও বিস্মিত হননি এখানকার বিশ্লেষকরা। তারা আগেই বলেছিলেন- প্যারিসে গত মাসে সন্ত্রাসী হামলার পর উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে।

এর কারণ হিসেবে তারা দলটির মুসলিমবিদ্বেষী এবং অভিবাসন ঠেকাও মনোভাবকে চিহ্নিত করেছেন। প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর পরই ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেত্রী সরাসরি এই হামলার জন্য মুসলমানদের দায়ী করেছেন। তিনি আরো বলেছিলেন- কোনো অবস্থায়ই সিরিয়ার শরণার্থীদের পশ্চিমা দুনিয়ায় আশ্রয় দেয়া ঠিক হবে না।

ফ্রান্সের এই নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিলো প্যারিসে ৩০ বছর ধরে বসবাসরত মোহাম্মদ হামিদুল আলমের কাছে। ফ্রান্সে বাস করেন এমন বাংলাদেশীদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ফ্রান্সের সরকারি প্রশাসনে উচ্চপর্যায়ে রাষ্ট্রীয় অ্যাটাশে এডমিনেস্ট্রেশন পদে চাকরি করছেন।

তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন- অনেকটা সস্তা কথাবার্তা ও অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি করে লো পেনের ন্যাশনালিস্ট পার্টি আঞ্চলিক নির্বাচনে ভালো ফল করেছে। নির্বাচনের আগে তারা বলেছে- ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। তারা ক্ষমতা যেতে পারলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবেন।

শুধু তাই নয়, অভিবাসন নীতি বিরোধী মনোভাবও তাদের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি বলেন- লো পেনের বাবা জ্যঁ মারি লোপেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য।

৮০ বছর বয়সী এই নেতা হরহামেশাই বলে চলেছেন তার দল ক্ষমতায় এলে ফ্রান্সকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে আনা হবে। যেসব অভিবাসী ফ্রান্সের নাগরিত্ব পেয়েছেন তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হবে।

এই সবই কিন্তু সস্তা জনপ্রিয়তারই অংশ, যা এখন কাজে লাগাচ্ছে তার মেয়ে লো পেন। তবে তার এই সস্তা কথা ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কতখানি প্রভাব রাখতে সক্ষম হবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। সময়ই সেটা ঠিক করে নেবে।

তবে ন্যাশনাল ফ্রন্টের এই ভালো ফল আগামী ২০১৭ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এদিকে, বিবিসি জানায়, নির্বাচনের আগে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রি ম্যানুয়েল ভালস সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন- ভোটাররা যেনো ন্যাশনাল ফ্রন্ট নেত্রী মারিন লো পেনের ‘কৌশলের ফাঁদে’ পা না দেন।

এখন এই দলে মাথা-কামানো (স্কিন হেড) লোক দেখা যায় না তবে অশ্বেতাঙ্গ লোকও দেখা যায় না। এরা ইহুদিবিদ্বেষী কথাবার্তা বলার ব্যাপারে ঠিকই হুঁশিয়ার থাকেন। তবে ইসলামবিরোধী কথাবার্তা এ দলের নেতা-নেত্রীদের মুখে হামেশাই শোনা যায়।

দলটি মনে করে- ব্যাপক অভিবাসনের কারণেই ফ্রান্সে উগ্রপন্থী ইসলামের উত্থান ঘটেছে। ফিলিপ ল্যানসেড নামের একজন ব্যবসায়ী বিবিসিকে বলছিলেন- আগে তিনি ন্যাশনাল ফ্রন্টে যোগ দেবার কথা ভাবতেই পারতেন না, কিন্তু ১৩ই নভেম্বরের আক্রমণের পর দিনই তিনি এই দলে যোগ দিয়েছেন।

ফ্রান্সের মার্সেই নগরীতে (যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা আড়াই লাখ) একটি মসজিদের ইমাম আবদুর রহমান গুল বলছেন- ন্যাশনাল ফ্রন্ট সবক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। শিক্ষা, চাকরি সবক্ষেত্রেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা- যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এর পরিণতিতে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি। এখানেই একটি নির্বাচনী সভায় মারিন লো পেন ফরাসি আত্মপরিচয়ের উল্লেখ করে বলেছেন-

‘আমরা জানি আমরা কী এবং কী নই। আমরা কিছুতেই কোনো ইসলামিক জাতি নই।’

মার্সেই শহরে ফ্রন্ট ন্যাশনালের উত্থানের পর শহর যেন দু’ভাগ হয়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বিবিসির গ্যাব্রিয়েল গেটহাউসকে বলছিলেন- আমরা তাদের এলাকায় যেতে ভয় পাই, তারা এখন আমাদের এলাকায় আসতে ভয় পায়। এই ‘তারা’ ‘আমরা’ কারা?
তিনি বুঝিয়ে দেন, ‘তারা’ মানে ‘ফরাসি’ আর ‘আমরা’ মানে ‘মুসলিম’।…

সাম্প্রদায়িক আক্রমণ

ফ্রান্সে শরণার্থী শিবিরে দুর্বৃত্তদের আগুন

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে পশ্চিমা বিশ্ব সৃষ্ট সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী আইএসের বোমা-গুলিতে ১৩২ নিহত হওয়ার অজুহাতে আইএসের কবল থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ওপর ফরাসী সন্ত্রাসীরা হামলা শুরু করেছে।

হামলার পরদিন ১৪ নভেম্বরই ফ্রান্সের বন্দর নগরী কালের জঙ্গলে অবস্থিত শরণার্থী শিবিরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে শরণার্থীরা পালাতে শুরু করেছেন।

কালের ডেপুটি মেয়র ফিলিপ মিগ্নোনেট জানিয়েছেন, প্রায় দশ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা জানি না কীভাবে আগুন লেগেছে। দমকল বাহিনী আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তীব্র বাতাসের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আগুন লাগার পরপরই শরণার্থীরা পালাতে শুরু করেছেন জানালেও কালের ওই জঙ্গলে কতজন শরণার্থী অবস্থান করছিলেন তা বলতে পারেননি ডেপুটি মেয়র।

আগুনে কত সংখ্যক শরণার্থী হতাহত হয়েছে তাও বলতে পারছেন না কালের ডেপুটি মেয়র। তিনি বলছেন-

‘এখন পর্যন্ত আমরা নির্দিষ্ট করে কিছু জানতে পারি নি। কারণ আগুনের হল্কার কারণে উদ্ধারকর্মীরা এখনো ঘটনাস্থলেই ঢুকতে পারে নি। তীব্র বাতাস ও শরাণার্থী শিবিরে ব্যবহৃত বোতল ভর্তি গ্যাসের কারণে আগুনের আঁচ ভয়ানক হয়ে ওঠছে।”

দ্য কালের জঙ্গলে তৈরি করা শিবিরে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা শরার্থীরা অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ প্রত্যাশী। তাদের সঙ্গে ফরাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকবার সংঘর্ষও হয়েছে।

নিহত মুসলিম যুবককে জঙ্গি সন্দেহে বাবা-ভাই গ্রেফতার : প্যারিসে সন্ত্রাসবাদী হামলায় নিহতদের মধ্যে একজন মুসলিমকে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী দাবি করে তার বাবা ও ভাইকে গ্রেফতার করেছে ফরাসি পুলিশ।

শনিবার প্যারিস থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছোট শহর রমিলি সুর সেইন থেকে ওই ছেলেহারা মুসলিম বাবা ও তার ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাদের কারা হেফাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ। বার্তা সংস্থা এএফপি জানাচ্ছে-

নিহত ২৯ বছর বয়সী ফরাসি যুবককে বাটাক্লঁ হলে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী হিসেবে সন্দেহ করে তার বাবা ও ভাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পুলিশ রমিলি সুর সেইন শহরের বাড়িতে গিয়ে নিহত যুবকের বাবার বাড়িতে তল্লাাশি চালায়। অন্যদিকে প্যারিস থেকে আট কিলোমিটার দূরে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় বনডোফল কমিউনে নিহত যুবকের ভাইয়ের বাসায়ও হানা দেয় পুলিশ। হামলার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথমবার প্যারিসে কারফিউ ও ফ্রান্সজুড়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

আগুন দেয়া হলো কানাডার মসজিদে

কানাডায় একটি মসজিদে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আগুন দেয়া হয়েছে। এ ঘটনাকে ইসলাম বিদ্বেষী তৎপরতা হিসেবে দাবি করেছেন স্থানীয় মুসলমানরা।

কানাডার কেন্দ্রীয় ওনটারির প্রদেশের পিটারবোরো নগরীর মসজিদ আস-সালামে এই আগুন দেয়া হয়েছে। নগরীর একমাত্র মসজিদটি ১৪ নভেম্বর শনিবার স্থানীয় সময় রাত ১১টার দিকে আগুন দেয়া হয়। এ ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আগুনের ঘটনায় কেউ হতাহত হয় নি কিন্তু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। মসজিদ আস-সালামে কেন আগুন দেয়া হয়েছে এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত তা বের করার জন্য তদন্ত অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।

এদিকে স্থানীয় সূত্র থেকে বলা হয়েছে, মসজিদটি মেরামতে ৮০ হাজার ডলার লাগবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এ জন্য চাঁদা এবং দান সংগ্রহ করছেন স্থানীয় মুসলমানরা।

নগরীর মেয়র এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন- বিদ্বেষের কারণে যদি মসজিদে আগুন দেয়া হয়ে থাকে তবে তার সঙ্গে কানাডার সাধারণ মানুষের কোনো যোগসূত্র নেই। প্যারিসের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পরপরই কানাডার এ মসজিদে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটলো।

শংকার কালো মেঘ

১৬০টি মসজিদ বন্ধ করছে ফ্রান্স

ফ্রান্সে চলমান জরুরি অবস্থার আওতায় প্রায় শতাধিক অনিবন্ধিত মসজিদ বন্ধ করে দেবে দেশটির সরকার। ফ্রান্সের প্রধান ইমাম হাসান আল আলায়ি এ তথ্য জানিয়েছেন।

ডিসেম্বর নাগাদ জরুরি অবস্থার আওতায় পুলিশের গোয়েন্দা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রায় ১৬০টি মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। এর মধ্যে তিনটি মসজিদ ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করলো দেশটি।

গত মঙ্গলবার প্যারিস হামলায় ব্যবহৃত একটি বন্দুকের মালিককে পূর্ব প্যারিসের একটি মসজিদ থেকে আটকের পর ওই ‘লাগনি-সুর-মারনে’ নামক মসজিদটি বন্ধ করে দেয়া হয়। মসজিদটিতে তল্লাাশি চালিয়ে কিছু ‘জিহাদি’ কাগজপত্র উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে ফ্রান্সের পুলিশ।

প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত গেনেভিলিয়ার্স শহরে এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিয়রে আরো দুটি মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে হামলার দু’দিন পরই।

ফ্রান্সের প্রধান ইমাম হাসান আল আলায়ি স্থানীয় মসজিদগুলোয় ইমাম নিয়োগের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তিনটি মসজিদ বন্ধ হওয়ার ঘটনার সত্যতা তিনিও নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি তিনি জানান, ‘সামনে আরো মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। উল্লেখ্য, এর আগে শার্লি এবদোর অফিসে হামলার পর উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগ এনে ফ্রান্স থেকে ৪০ জন বিদেশী ইমাম বহিষ্কার করা হয়।

শরণার্থী গ্রহণে অস্বীকৃতি

প্যারিস হামলার পর থেকেই ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে শরণার্থী বিরোধী নতুন রব ওঠেছে। তাদের অভিযোগ- শরণার্থীদের ¯্রােতে মিশে সন্ত্রাসীরাও পশ্চিমে প্রবেশ করছে, তাই আরো শরণার্থী নিয়ে নিজেদের দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তারা ঝুঁকিতে ফেলবে না।

হামলার পরপরই ফ্রান্স সরকার সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের কথা বলে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। ফ্রান্স সীমান্তে উপস্থিত হওয়া হাজারো সিরীয় শরণার্থী এতে নিদারুণ বিপাকে পড়েন। হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ড সরকার শরণার্থীদের আশ্রয় দেবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাজ্য সরাসরি কোনো ঘোষণা না দিলেও হামলার পর থেকেই শরণার্থীদের নতুন করে দেশে ঢুকতে দিচ্ছে না।

ইংলিশ চ্যানেল হয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ প্রত্যাশী হাজারো শরণার্থী এখন ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী বন্দর নগরী কালে বিপর্যস্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। হামলার পরপরই তাদের তাঁবুতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশসহ বিক্ষুব্ধ জনতার সাথে বেশ ক’বার তাদের সংঘর্ষও বেঁধেছে। ফ্রান্সের মুসলিম বিদ্বেষী ন্যাশনাল ফ্রন্ট প্রধান লো পেন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন- ফ্রান্সে তিনি আর কোনো শরণার্থীকে আশ্রয় দেবেন না এবং ক্ষমতায় এলে অভিবাসীদের নাগরিকত্বও বাতিল করবেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি স্টেটের মধ্যে ২৬টিই প্যারিস হামলার প্রথম দু’দিনের মধ্যেই শরণার্থীদের আশ্রয় না দেওয়ার ব্যাপারে তাদের মত জানিয়ে দিয়েছে। এক বছর পর অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প তো যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের যেকোনো ধরনের প্রবেশ বন্ধের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে রীতিমতো হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন।

তার ভাষায়- বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা মুসলিমদের মন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সুতীব্র ঘৃণায় ভরপুর। এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা এবং সেটার সুরাহা করার আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না।

প্যারিস হামলার জন্য তিনি সকল মুসলিমকে দায়ী করতে চান এবং যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাস ঠেকাতে তার ভাষায়- প্রধানত মুসলিমদের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং মুসলিমদের তিনি রীতিমতো তৎকালীন জার্মান নাৎসি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেঁটে দেয়া শরণার্থীদের নির্দিষ্ট কোটাকে ¯্রফে পাগলামি বলে আখ্যায়িত করেছেন। কাজাখ প্রেসিডেন্ট সরাসরি বিরোধিতা না করলেও প্যারিস হামলার পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সাম্প্রতিক এক জরিপে কাজাখের ৯৪ ভাগ মানুষই শরণার্থী ইস্যুতে নেতিবাচক মত দিয়েছেন। স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রি রবার্ট ফিকো বলেন- ইউরোপে আগত শরণার্থীরা স্লোভাকিয়ায় থাকার জন্য আসছে না। এখানে তাদের ধর্মীয় কিংবা আত্মীয়তারও কোনো সূত্র নেই।

তাদের বরং উচিত অন্য কোথাও চলে যাওয়া। ডেনমার্ক সরকার শরণার্থী বিরোধিতায় রীতিমতো ট্রেডমার্ক হয়ে ওঠেছে। শরণার্থীদের ডেনমার্কে প্রবেশে অনুৎসাহিত করতে তারা বিভিন্ন লেবানিজ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন পর্যন্ত দিয়েছে। বিজ্ঞাপন বাবদ এখন পর্যন্ত খরচ দাঁড়িয়েছে ৩০,০০০ হাজার ইউরো বা প্রায় ২৬ লাখ টাকা।

পশ্চিমের দেশ হিসেবে এখনো পর্যন্ত জার্মাানই শরণার্থী ইস্যুতে সবচেয়ে ইতিবাচক মত ব্যক্ত করেছে। প্যারিস হামলার সাথে শরণার্থী ইস্যুকে গুলিয়ে না ফেলতে ইউরোপের অন্যান্য দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর এ্যাঙ্গেলা মার্কেল।

জার্মানির প্রেসিডেন্ট ইওয়াখিম গাউক প্যারিস হামলার এক দিনের মাথায় ঘোষণা করেন- তার দেশ শরণার্থী ইস্যুতে পূর্বের অবস্থান থেকে সরে আসবে না। জার্মান প্রেসিডেন্ট বলেন- মুক্তমন নিয়ে শরণার্থীদের গ্রহণ করার অর্থই হলো মানবতা। তাই জার্মানির মানুষকে শরণার্থীদের প্রতি সমবেদনার মনোভাব রাখার আহ্বান জানিয়েছেন গাউক। বলেছেন প্রয়োজনে শরণার্থীদের সাহায্য করার কথাও।

‘এমনটা করলে অন্যের দুঃখ লাঘব করে শান্তি বজায় রাখার মাধ্যমে সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তোলা যায়। সেজন্য যার যতটুকু সামর্থ্য, তা করা উচিত’।

বহু জার্মানকে তিনি সেটা করতে দেখেছেন বলেও জানান গাউক। চারপাশের বিশ্ব দেখে ‘ভয় না পেতে’ জার্মানদের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন- বরং অন্যের চাহিদা অনুভব করে সেটা পূরণে সমাজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। হাঙ্গেরিসহ বেশ কিছু দেশ এবং অনেক ইউরোপীয় নেতা জার্মানির এই অবস্থানের নিন্দা করেছেন।

শরণার্থী বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলো দ্বিধাবিভক্ত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন লাখো শরণার্থী। তারা এখন কোনো দেশে ঢুকতে পারছেন না, কোনো দিক থেকে সহায়তা বা আশ্বাসও পাচ্ছেন না।

ফলে- শিশু-বৃদ্ধদের নিয়ে রীতিমতো মানবেতর জীবন যাপনে তারা বাধ্য হচ্ছেন। অনেককেই আজকাল আশ্রয়-খাদ্য নতুবা গুলি করে মেরে ফেলার নির্মম আকুতিও প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। এদিকে, সিরিয়ায় বিভিন্ন দেশের হামলা তীব্রতর হওয়ায় হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পশ্চিমের পথে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সীমান্তে ক্রমশই দীর্ঘ হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরছাড়া অসহায় মানুষদের মিছিল।

প্যারিস হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন মোড়

প্যারিসে জঙ্গি হামলায় ১৩২ জন নিহতের ঘটনায় আটলান্টিকের ওপারের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে মনোনয়নপ্রত্যাশী ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানের প্রার্থীরা প্যারিস হামলার পর নতুন করে কর্মকৌশল ঠিক করছেন।

সন্ত্রাসবাদ দমন, রাষ্ট্রীয় ও জনগণের নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শরণার্থী গ্রহণের মতো বিষয়গুলোর পাশাপাশি জঙ্গিবাদ দমনে কী করবেন, তা ঘটা করে প্রচারে ব্যস্ত প্রার্থীরা।

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আগামী বছর ১০ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্যারিস হামলার পর মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ জানিয়ে দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ওবামা ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারির শরণার্থী গ্রহণের চিন্তা নিছক কাল্পনিক।

তার ভাষায়- আর যদি শরণার্থীদের আশ্রয় দিতেই হয়, তবে কেবল খৃষ্টান শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া যেতে পারে।
প্যারিস হামলার পরদিনের বিতর্কে তোপের মুখে পড়েছেন হিলারি ক্লিনটন। দলের অন্য প্রার্থী বার্নি সেন্ডারস অভিযোগ করেন-

তৎকালীন সিনেটর হিসেবে হিলারি ইরাক যুদ্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ইরাক যুদ্ধের পরিণতিতেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নতুন জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান হয়েছে। জবাবে হিলারি বলেছেন- জঙ্গি উত্থান রোধে যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। এমন অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। তাদের ঠেকাতেই হবে।

ওদিকে রিপাবলিকান দলের আলোচিত প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস হামলার পর আগেভাগেই বলে রেখেছেন- সিরিয়া থেকে প্রেসিডেন্ট ওবামা যেসব শরণার্থী গ্রহণ করবেন, নির্বাচিত হলে তিনি তাদের সোজা সিরিয়ায় ফেরত পাঠাবেন।

রিপাবলিকান দলের অপর প্রার্থী জেব বুশ বলেছেন-

‘আমাদের সময় এ যুদ্ধকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। এ জঙ্গিগোষ্ঠীকে পরাজিত করার জন্য সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে।’

এদিকে, আইএসের উত্থান রোধ ও জঙ্গিবাদ দমনের কৌশল নিয়ে পরিষ্কার কোনো পরিকল্পনা নেই- এমন অভিযোগ করে হোয়াইট হাউসের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ স্মিডথ বলেছেন-

প্রশাসনে বা রাজনৈতিক বিতর্কে মঞ্চে এমন একজন লোকও নেই, যিনি বলতে পারবেন- এখন কী করা উচিত। তিনি বলেন- রিপাবলিকানরা আইএস দমনে প্রশাসনের কোনো সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল নেই বলে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে দায়ী করছেন। কিন্তু রিপাবলিকান দলের কাছেও এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা বা কৌশল নেই।

প্যারিসে আবার হামলা কেনো?
-যুক্তরাজ্যের ডেইলি টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণ

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে হামলায় ১৩২ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো ২০০, যার মধ্যে ৮০ জনের অবস্থা গুরুতর। তবে এই হামলা ফরাসি কর্তৃপক্ষের কাছে একেবারেই ‘অপ্রত্যাশিত’ ছিলো না। যে কোনো সময় জঙ্গি হামলা হতে পারে- এমন আশঙ্কা তাদের মধ্যে আগে থেকেই ছিলো।

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ফ্রান্সে বারবার হামলার কারণ নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন করেছে। পত্রিকাটির মতে- বর্তমানে প্রতিটি পশ্চিমা দেশের রাজধানীতেই জঙ্গি হামলার আশঙ্কা আছে। তবে প্যারিসের মতো শহরে হামলার আশঙ্কা বেশি। কেনো? সহজ উত্তরটি হলো-

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন স্থানে জঙ্গিদের সঙ্গে লড়ছে ফরাসি সেনা। তবে, ইউরোপের মধ্যে সর্বাধিক মুসলমানের বাস এই ফ্রান্সেই। এখানে সমাজও বিভিন্নভাবে বিভক্ত। এ ছাড়া আরো অনেক কারণ আছে, যে জন্য জঙ্গিদের হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ফ্রান্স। এ কারণেই শার্লি এবদোতে হামলার পর ফ্রান্সের প্যারিসে আবারো এমন হামলার ঘটনা ঘটলো।

প্যারিসে হামলার শিকার এক ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমকে বলেন- একজন হামলাকারী চিৎকার করে বলছিলো, ‘এটি সিরিয়ার জন্য।’ টেলিগ্রাফের মতে- ওই হামলাকারী সিরিয়ার বদলে মালি, লিবিয়া, ইরাকও বলতে পারত।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ১০ হাজার ফরাসি সেনা মোতায়েন আছে। এর মধ্যে তিন হাজার পশ্চিম আফ্রিকায়, দুই হাজার মধ্য আফ্রিকায়, সাড়ে তিন হাজার ইরাকে। মালিতে আল-কায়েদার শাখা আল-কায়েদা ইন দি ইসলামিক মাগরেবের সঙ্গেও লড়ছে ফরাসি সেনারা। এ ছাড়া ইরাকেও আছে ফরাসি সেনা। আর গত সপ্তাহে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ উপসাগরে বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে লড়তেই এই উদ্যোগ নিয়েছে ফ্রান্স।

তবে দেশের ভেতরকার কোনো কারণেও প্যারিসে হামলা হতে পারে। ফ্রান্সের মুসলমানদের আদর্শ হিসেবে কয়েকজন মুসলিম ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদকে প্রতিবেদনে দেখানো হয়। তবে দেশটিতে অধিকাংশ মুসলমানই নিজেদের স্বতন্ত্র হিসেবেই দেখেন। দেশটিতে বোরকা নিষিদ্ধ করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

পত্রিকাটির মতে- ফ্রান্সের কারাগার তরুণদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করার একটি উপযোগী স্থান। এর আগে কয়েকটি হামলায় অংশ নেওয়া অনেকেরই সন্ত্রাসবাদে দীক্ষার শুরুটা হয় ফ্রান্সের কারাগারে। একটি সূত্রের বরাত দিয়ে টেলিগ্রাফ জানায়- দেশটির কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের ৭০ শতাংশই মুসলমান।

তবে সংখ্যাটি অবশ্যই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয় কারণ, ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে ফ্রান্স কোনো ব্যক্তির ধর্ম সম্পর্কে তথ্য রাখে না। যুক্তরাজ্যের কারাগারের মুসলিম বন্দির সংখ্যা মাত্র ১৪ শতাংশ, যেখানে দেশটির মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ মুসলমান।

শার্লি এবদোতে হামলার পরপরই টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে ফ্রান্সের কারাগারে চরমপন্থী মতবাদ ছড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরে। তবে প্রায় এক বছর কেটে গেলেও এই ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ফ্রান্স।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী- ফ্রান্সে হামলার জন্য জঙ্গিদের অস্ত্র জোগাড়ের কাজটিও সহজ। দেশটির সঙ্গেই বেলজিয়ামের সীমান্ত। বেলজিয়াম দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সমস্যায় আছে। এ ছাড়া যে-কোনো বলকান রাষ্ট্র থেকেও ফ্রান্সে সহজে অস্ত্র পাচার করা যায়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বলকান রাষ্ট্রগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণ মুসলিম উপস্থিতি বিদ্যমান। সব দক্ষিণপন্থী নেতা ও গোষ্ঠী, ফ্রান্সের লো পেন থেকে শুরু করে হাঙ্গেরির ওর্বান অথবা জার্মানির পেগিডা আন্দোলন, সকলেরই বক্তব্য এক- উদ্বাস্তুদের ¯্রােতে মিশে ইউরোপে আসছে সন্ত্রাসীরা। জাতিসংঘ অবশ্য এই ধারণার বিরোধিতা করেছে।

ফ্রান্সের দক্ষিণপন্থী ‘ন্যাশানাল ফ্রন্ট’ দলের নেতা মারিন লো পেন গত সোমবারেই দাবি তোলেন যে, ফ্রান্সে যাবতীয় অভিবাসী গ্রহণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

লো পেন একটি বিবৃতিতে বলেন যে, শুক্রবার প্যারিসের আক্রমণে সংশ্লিষ্ট এক সন্ত্রাসী গতমাসে গ্রিসে এসে পৌঁছায়।
হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রি ভিক্টর ওর্বান ১৬ নভেম্বর সোমবার বুদাপেস্ট সংসদে বলেন যে, উদ্বাস্তু সংকটের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘দুর্বল, অনিশ্চিত ও অক্ষম’ হয়ে পড়েছে৷ তার মতে, ইইউ-এর সদস্যদেশগুলির মধ্যে উদ্বাস্তুদের বেঁটে নেওয়ার পরিকল্পনা বেআইনি ও এর ফলে ‘ইউরোপে সন্ত্রাসবাদ ছড়াবে’৷

প্যারিস হামলা : শুধুই সন্ত্রাস না অন্যকিছুও?

পুরনো খবর ফের পড়া বেশ বিরক্তিকর। জানা বিষয়ের পুনর্পাঠ আমাদের স্বভাব-বিরোধী। সেই ঝুঁকি নিয়েও যথেষ্ট দীর্ঘ করে প্যারিস হামলার ঘটনা এবং পরবর্তী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলো সংক্ষেপে যতœসহকারে এখানে তুলে আনার চেষ্টা করলাম।

হামলার পুরো বিবরণ, স্থান-ধরন-হতাহতের সংখ্যা, দোষারোপ-স্বীকারোক্তি, ফ্রান্সসহ সারা বিশ্বের সাধারণ নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর উদ্যোগ, বিশ্বনেতাদের বক্তব্য, ফ্রান্স সরকারের পদক্ষেপ, পাল্টা সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক উস্কানি, বিপরীত অভিযোগের তীর, ইউরোপের ভয়াবহ সাত হামলা, ন্যাশনাল ফ্রন্টের অভাবিত বিজয়, মুসলিম নিধনের পাঁয়তারাসংক্রান্ত রিপোর্ট এবং সবশেষে গার্ডিয়ানের বিশেষ একটি বিশ্লেষণও তুলে ধরা হয়েছে।

হামলা পরবর্তী বিশ্বমিডিয়ার প্রায় পুরো রিপোর্টিংয়ের সারসংক্ষেপ এখানে চলে এসেছে বলেই মনে করছি আমি। এবার আসুন একটু ব্যবচ্ছেদে যাই। ফ্রান্সে যা ঘটলো- যে কারণে ঘটলো আর মিডিয়া যেভাবে আমাদেরকে সেগুলো দেখাতে ও বিশ্বাস করাতে চাইলো- সব কি সত্যি এমনই? হামলার ভয়াবহতা আর শোকের তীব্রতায় বিপরীত বক্তব্য নেয়ার বা সেটা বিবেচনার সুযোগ মিডিয়া হয়তো পায় নি, তাই বলে কি বিপরীত কিছু সত্যিই নেই?

তৃতীয় বিশ্বের ছোট্ট এই দেশের অখ্যাত এক প্রান্তে বসে আমার-আপনার এসব বিশ্লেষণ সমস্যার কোনো সমাধান করবে না জানি- তবুও সত্যটা জানা প্রয়োজন। পর্দার আড়ালের বাস্তবতাটাও একবার যাচাই করা দরকার। এ যুগের মিডিয়ার দেয়া তথ্য ফিল্টারিং ছাড়া গ্রহণ করে নিলে আখেরে অনেক বিপদ, অন্যসব ভাবনা বা কারণ-বর্ণনাকে পাশ কাটিয়ে অন্তত এই কারণে হলেও একটা উপসংহারে তো আমাদের পৌঁছতেই হবে।

আমরা এখন কোন পৃথিবীতে বাস করছি?

১৩-২০ নভেম্বর ২০১৫, এই একটা সপ্তাহে বিশ্ববাসী সাম্প্রতিক কালের ভয়াবহতম ক’টি সন্ত্রাসী হামলার রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করলো। ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় লেবাননের বৈরুতে পৃথক দুটো বোমা হামলায় কমপক্ষে ৪৩ জন নিহত এবং বহু মানুষ জখম হলেন। ২৭ ঘণ্টার ব্যবধানে পরদিন ফ্রান্সের প্যারিসে ছ’টি স্থানে একই সময়ের হামলায় নিহত হলেন অন্তত ১৩২ ইউরোপীয়।

তিন দিনের ব্যবধানে ফের দুঃসংবাদ এলো। ক্ষেত্র এবার নাইজেরিয়া। এখানেও পৃথক দুটো হামলায় ৪৪ জন মানুষ নৃশংসতার শিকার হয়ে জীবন হারালেন। দু’দিন পর আবার- এবার মালীতে নিহত হলেন আরো ৩০ জন।

এদিকে ফিলিস্তিনেও এই ক’দিনের লাগাতার ইহুদি বর্বরতায় নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছেন শিশু-কিশোরীসহ দুই ডজনের মতো নিরীহ ফিলিস্তিনী। বিশ্বজুড়ে বিক্ষিপ্ত অন্যান্য ছোটখাঁ হামলা বা সাধারণ দুর্ঘটনা তো ছিলোই। মাত্র এক সপ্তাহে প্রায় তিনশ’ মানুষ অস্বাভাবিক মৃত্যুর মুখে পড়লেন, পঙ্গুত্ব বরণ করলেন অসংখ্য নারী-পুরুষ। প্রিয়জন হারানো মানুষগুলোর কষ্ট আর অসহায়ত্ব তো কোনো এ্যাঙ্গেল থেকেই হিসেবে আনা সম্ভব নয়।

বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়- আমরা এখন কোন পৃথিবীতে বাস করছি?

Leave a comment