সাদাকালো ফ্রেম রঙিন জীবন

সাদাকালো ফ্রেম রঙিন জীবন (নির্বাচিত মালফুজাত)

আস্থা

রুটি বানানোর জন্য আটা গুললেন সাহাবী হাবীবের স্ত্রী। ঘরে ম্যাচ বা চকমকি পাথর ছিলো না। আগুনের খোঁজে গেলেন পাশের বাড়িতে। এই ফাঁকে একজন ভিক্ষুক এসে হাজির। হাবীব রা. শুয়েছিলেন। আর কিছু না থাকায় খামিরার সবটুকু আটা ভিক্ষুকের হাতে তুলে দিলেন। আগুন নিয়ে এসে স্ত্রী দেখেন শূন্য পাত্র পড়ে আছে।

-কী ব্যাপার, আমাদের আটা কোথায় গেলো?
-সাহাবীর জবাব নেই।
-আপনি কি আটা সদকা করে দিয়েছেন?
-হ্যাঁ।
-একটা রুটির পরিমাণ হলেও রেখে দেিতন, দুজনে ভাগ করে খেয়ে নিতাম।
-ও নিয়ে ভেবো না। যাকে দিয়েছি তিনি অঢেল ধন-সম্পদের মালিক।

স্বামীর এমন উদারতায় অভ্যস্ত স্ত্রী এরপর আর কিছু বললেন না। অনেকটা সময় পার হলো। সাহাবী নির্বিকার শুয়ে। স্ত্রীও। তাদের ক্ষুধা যখন অসহ্য পর্যায়ে, দরজায় আওয়াজ হলো- ঠকঠক। হযরত হাবীব রা. এগিয়ে গেলেন। দু’ হাতে দুই পাত্র নিয়ে ঘরে ঢুকলেন একটু পর। একটায় রুটি অন্যটায় গোশত। বললেন-

দেখলে তো। এমন কারো সাথেই বন্ধুত্ব করা উচিত। আমি পাঠালাম (দান করলাম) শুধু আটা, আর তিনি (আল্লাহ তায়ালা) রুটির সাথে গোশতও ব্যবস্থা করে পাঠালেন!

চুমু

রাতে দুরুদ পড়ার অভ্যেস ছিলো। সেদিনও যথারীতি আমলটা শেষ করে ঘুমুতে গেলাম। মাঝরাতে হঠাৎ কীভাবে যেনো ঘরের দরজাটা খুলে গেলো। দেখলাম- ঘরে প্রবেশ করছেন রাসূলে আরাবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অলৌকিক নূরে ঘর আমার ঝলমল করে উঠলো। আর সেকি খুশবু! উত্তেজনায় পুরো শরীর কাঁপতে লাগলো। নবীজি তখন বললেন- তোমার মুখম-লটা এগিয়ে দাও, যার সাহায্যে প্রতিদিন আমার শানে দুরুদ পড়ো। আমি তাতে চুমু খাবো।

বিশিষ্ট বুজুর্গ মুহাম্মাদ ইবনে সাইদ এরপর বলেন- নবীজির দিকে চেহারা বাড়িয়ে দিতে আমার খুব সঙ্কোচ হলো। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমার গলদেশে চুমু খেলেন। ওমনি গেলো ঘুমটা ভেঙে। লাফিয়ে ওঠায় পাশে শুয়ে থাকা আমার স্ত্রীও জেগে ওঠলো। অনুভব করলাম- পুরো ঘর তখনো জান্নাতি সুবাসে মৌ মৌ করছে।

পরীক্ষা

পৃথিবীখ্যাত ইলমের শহর বাগদাদে আমন্ত্রিত হলেন ইমাম বুখারি রহ.। সেখানকার মুহাদ্দিসগণ তার মেধা ও যোগ্যতার একটা পরীক্ষা নিতে চাইলেন। পরামর্শ মুতাবেক দশজন মুহাদ্দিস ইমাম বুখারির সামনে দশটি করে মোট একশ’টি হাদীস পাঠ করলেন। কোনোটার বাক্য পরিবর্তন করে। কোনোটার সনদ। সবগুলোর ক্ষেত্রেই ইমাম বুখারি মাথা নাড়লেন- না, এমন হাদীস তার জানা নেই। তার জবাব ভক্তদের মনে উৎকণ্ঠা ছড়ালো- এতগুলো হাদীসের একটাও তিনি জানেন না! হাদীস শাস্ত্রে ইমামের যোগ্যতা নিয়ে কারো কারো মনে সন্দেহও সৃষ্টি হলো। দশজনের সবার হাদীস পড়ে শুনানো শেষ হলে ইমাম বুখারি মুখ খুললেন। একশত হাদীসের প্রত্যেকটির ভুল রূপ শুনিয়ে শুদ্ধটা কেমন তাও শুনিয়ে গেলেন একাধারে। সবগুলোর সনদ ও রেফারেন্স সহকারে। উপস্থিত জনতাসহ পুরো মজলিসের মাথা ততক্ষণে যুগপৎ লজ্জা ও শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে এলো। এভাবেও সম্ভব!

লজ্জা

খাজা বখতিয়ার রহ.। ইসলামের ইতিহাসে মহান এক আলেম বুজুর্গ ও সাধক পুরুষ ছিলেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি আজব এক ওসিয়ত করে বসেন- তার জানাযা এমন কাউকে পড়াতে হবে, জীবনে কখনো যার তাহাজ্জুদের নামাজ কাযা হয় নি। যথারীতি তার ইন্তেকাল হলো, জানাজা প্রস্তুত হলো। কে হবে ইমাম? উপস্থিত জনতা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। কে এমন সাধক পুরুষ, জীবনে একদনিও যার তাহাজ্জুদ নামাজ কাযা হয় নি? গবার চোখে-মুখে প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়- কে সেই ইমাম?

এক সময় দেখা গেলো এগিয়ে আসছেন স্বয়ং সুলতান। সুলতান শামসুদ্দিন আলতামাশ রহ.। তিনি জানাযার নামাজ পড়ালেন। সালাম ফিরিয়ে শুধু এটুকু তার মুখ থেকে বেরুতে শোনা গেলো- খাজা সাহেব আজ আমাকে লজ্জিত করে গেলেন। আমার অবস্থা প্রকাশ করে দিলেন!
বাঘের খাঁচায়

হিজরি প্রথম শতাব্দীর অনন্য এক সুফি ছিলেন বুনানে হাম্বল রহ.। জন্ম বাগদাদে হলেও তার বসবাস ছিলো মিশরে। হাম্বল রহ. একবার মিশরের বাদশাহকে বিশেষ কিছু বিষয়ে পরামর্শ দিলেন। অসৎ বাদশাহ ইবনে তুলূনের তা পছন্দ তো নয়ই, সহ্যও হলো না। প্রচ-রকম রেগে গেলো। জল্লাদ ডেকে হুকুম করলা- মহান এই বুজুর্গকে ক্ষুধার্ত বাঘের খাঁচায় ছুঁড়ে ফেলতে।

বাদশাহের হুকুমমতো বুনানে হাম্বলকে রহ. বাঘের খাঁচায় ঠেলে দিয়ে বাইরে থেকে খাঁচার মুখ বন্ধ করে দেয়া হলো। উৎকণ্ঠায় উপস্থিত জনতার হৃদয় থেকে থেকে কেঁপে ওঠছে। টু শব্দটি বের হচ্ছে না কারো মুখ থেকে। বাঘ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। চারপাশ ঘুরে ঘুরে তার শরীর শুঁকতে লাগলো। এবং একসময় ঠিক যেভাবে এগিয়ে এসেছিলো সেভাবেই অন্যপাশে সরে গেলো। বুজুর্গের কারিশমায় উপস্থিত জনতা ততক্ষণে তাকবির শুরু করেছে। খাঁচা থেকে তাকে বের করে আনা হলো। জিজ্ঞেস করা হলো- বাঘ যখন চারপাশ ঘুরে শরীর শুঁকছিলো তখন আপনার কেমন লাগছিলো? তিনি স্বাভাবিক গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললেন- হিং¯্র প্রাণীদের ঝুটার ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের ইখতেলাফ নিয়ে ভাবছিলাম- শেষ রায়ে তা পাক হবে না নাপাক! ঊাঘ যেহেতু গায়ে মুখ লাগিয়েছে তাই এখন ভাবছি- একবার গোসলখানা থেকে ঘুরে আসবো কিনা!

জবাব

আব্বাসি খলিফা মনসুর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। একটা মাছি এসে তাকে জ্বালাতে শুরু করলো। বারংবার। প্রচ- বিরক্ত হয়ে খলিফা একসময় নওকরকে ডাকলেন-
-দেখো তো দরবারে কোনো আলেম উপস্থিত আছেন কিনা, থাকলে ডাকো।
-মাকাতিল বিন সুলাইমান আছেন।
-ভেতরে নিয়ে এসো।
মাকাতিল বিন সুলাইমান রহ. ভেতরে এলেন। খলিফা মনসুর বিরক্তিভরা গলায় তাকে জিজ্ঞেস করলেন-
-আপনি কি জানেন কোন কারণে আল্লাহ পাক মশা-মাছি সৃষ্টি করেছেন?
-মাকাতিল রহ. তৎক্ষাণাৎ জবাব দিলেন- অহংকারীদের শাস্তি দেয়ার জন্য!
রাগ ও বিরক্তিতে রক্তিম হয়ে ওঠা বাদশাহর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। জবাব দেয়ার মতো কিছু খুঁজে পেলেন না আর।

মুখোমুখি

মহাজ্ঞানী লোকমান হাকীমের সাথে একবার মানবীয় স্বভাবগুলোর বিচিত্র এক আলাপ হয়েছিলো।
লোকমান হাকীম- কে তুমি? কোথায় তোমার বাসস্থান?
-আমি মেধা, থাকি মানুষের মাথায়।
লোকমান হাকীম- তুমি কে, থাকো কোথায়?
-আমি লজ্জা, আমার অবস্থান মানুষের চোখের আড়ালে।
লোকমান হাকীম- আর তুমি কে ভাই, ঠিকানা-ই বা কী?
-আমি ভালোবাসা। মানুষের হৃদয় আমার বসতঘর।
লোকমান হাকীম- তুমি এতো পেছনে দাঁড়িয়ে কেনো? সামনে এসো, বলো তুমি কোথায় থাকো?
-আমি তাকদির, মানবজাতির মাথা আমার ঠিকানা।
লোকমান হাকীম- মাথা তো তোমার না, মেধার ঠিকানা।
তাকদির- আমি এলে মেধা কোথায় হারিয়ে যায়, পাত্তাই থাকে না ওর!
লোকমান হাকীম- এবার তুমি বলো- তোমার পরিচয়।
-আমি মোহ, থাকি চোখে।
লোকমান হাকীম- তা কী করে সম্ভব? চোখ তো লজ্জার বসতঘর!
মোহ- আমি এলে লজ্জা দৌড়ে পালায়।
এরপর এগিয়ে আসে লোভ। লোভের দাবি- আমার বসবাস মানবহৃদয়ে।
লোকমান হাকীম- হতেই পারে না। হৃদয়ে তো ভালোবাসা থাকে।
লোভ- আমি যখন দৃশ্যপটে হাজির হই- ভালোবাসা ছুটতে ছুটতে পালায়!…

আইন

সততা ও স্বচ্ছতার খোঁজে গোটা বিশ্ব আজ দিশেহারা। কতো কী-ই না করা হয়, হচ্ছে। তবু কোনো সুরাহা মিলছে না। ইতিহাসে এক্ষেত্রে অমর এক দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন এবং থাকবেন বাদশাহ কাম্বুজিয়া। আদি যুগের এ বাদশাহ তার দেশের আদালতগুলোর ন্যায় ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দারুণ একটা পদ্ধতিই উদ্ভাবন করেছিলেন। কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠলে প্রমাণ সাপেক্ষে তাকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হতো। শলীর থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হতো চামড়া। যে আসনে বসে বিচারক রায় দিতেন তাতে সেঁটে দেয়া হতো তার চামড়া এবং পরবর্তী বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হতো তারই সন্তানকে। বাবার চামড়ার ওপর বসে আদালত পরিচালনা করতেন দুর্নীতির দায়ে জীবন খোয়ানো বিচারক বাবার ছেলে। আজকাল এমন ্রপথার প্রচলন করলে কেমন হতে পারতো!

হৃদয় থেকে প্রাণে

চাইলেই খুশি হওয়া ও সুখে থাকা আমাদের সাধ্যে নেই। কিন্তু খুব সহজেই আমরা অন্যদের খুশি করতে পারি। সৃষ্টি করতে পারি সুখের পরিবেশ। জীবনের দীর্ঘ পথ সাফল্যে ও আনন্দে কাটাতে পারাই তো আমাদের লক্ষ্য নয়, কারো কাঁটা বিছানো পথ ফ্রি কওে দেওয়াটাও আমাদেও দায়িত্ব।এক মশাল থেকে অন্য মশালে আলো বিলাবার মতো আনন্দকেও আমরা ব্যাপক করে দিতে পারি। নিজের সুখ কুরবান কওে দিয়ে কারো নিঃসঙ্গতার ভাগিদার হওয়া, মুখে হাসি ফোটানো এবং কারো দীর্ঘশ্বাস দূও করতে পারা কি কম কথা? চারপাশটাকে বদলে দেয়ার এ ব্রত ছড়িয়ে পড়–ক ফুল থেকে ফুলে। হৃদয় থেকে প্রাণে, সবখানে।

প্রশ্ন

আলমারীর জিনিসগুলো গুছাচ্ছিলাম। একটা দামি প্লেট আচমকা হাত খসে পড়ে গেলো। টুকরো টুকরো হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো। ইস! এখন আমি কী করি? এতো মূল্যবান জিনিসটা তো আর ফিরে আসবে না। এটা-ওটা এমন হাজারো ভাবনায় বিভোর হয়ে রইলাম। একসময় হঠাৎ আমার চিন্তার ধারা বদলে গেলো। মনে জাগলো- আমাদেও জীবনটাও তো এই প্লেটের মতোই। যে কোনো সময় যা ছিনিয়ে নেয়া হতে পারে। এবং একবার খোয়াল আর কখনো তা ফিওে পাওয়া হবে না। একবারমাত্রই এই সযযোগ আমরা লাভ করি। সুতরাং এখনই জীবনটাকে গুছিয়ে নেয়ার উপযুক্ত সময় নয় কি?
মনে রেখো

সন্তানের জীভনে বাবা-মায়ের দুআ বড় বেশি প্রয়োজন। এটা একটা নেয়ামত- যার কোনো মূল্য হয় না, বিকল্পও নেই। বাবা-মায়ের শুভকামনা ছাড়া কেউ জীবনে সফল হতে পাওে না। সুখী থাকতে পাওে না। না পৃথিবীতে, না পরকালে। তাদেও দুআ আমাদেও জীবনে নির্ভরতার ছায়ার মতো। প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি পদক্ষেপে।

মোতি

  • জীবন একটা কিতাব, মৃত্যু পর্যন্ত যা রমানুষের সঙ্গ দেয়।
  • জীবনের জটিল অধ্যায়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে হলে দরকার সুস্থ মেধার, গভীর মনোযোগের।
  • কঠিন শব্দের চেয়ে সহজ শব্দ হ্রদয়ে দ্রুত ও বেশিরকম প্রভাব ফেলে।
  • কী আশ্চর্য, অঅমরা হৃদয়ে কিছু ধারণ করতে চাই। অথচ (গুনাহ করে) আগেই তা ছিদ্র কওে নিই।
  • মাত্রাতিরিক্ত পান করলে আবেহায়াতও বিষ হতে বাধ্য।

এবং কুরআন

  • কুরআনের পারা ত্রিশটি, মনযিলের সংখ্যা সাত
  • সূরা ১১৪টি। রুকুর পরিমাণ ৫৪০।সবচে’ বড় সূরা বাকারা, ছোট কাউসার।
  • সূরা ইয়াসীনকে বলা হয়- কুরআনের হৃদয়। ফাতেহাকে মা। আর রহমানকে দুলহান। আয়াতুল কুরসিকে প্রাণ।

সুলতান আইয়ূবী রহ.

-সুযোগে উত্তম নীতি কথা সবাই বলতে পারে, আমলের তাওফিক অল্প লোকেরই হয়।
-মুসলমান মরেও জীবিত থাকে। কাপুরুষ জীবিত থেকেও মৃতের চেয়েও অসহায়।

হারুনুর রশীদের দরবারে ইমাম শাফেয়ী

ইলমের খোঁজে ইমাম শাফেয়ী সুদীর্ঘ সফর করেছেন, এই পূর্ণাঙ্গ সফরনামা তার কিছু ছাত্র আবার লিখে রেখেছেন। একবার তিনি বাগদাদেও হাজির হলেন। তিনি বলেন আমি বাগদাদে প্রবেশ করা মাত্রই একজন গোলাম আমার সঙ্গী হলো এবং খুবই ভদ্্রতার সাথে আমাকে জিজ্ঞেস করলো-
আপনার নাম জানতে পারি কি?
-বললাম- মুহাম্মাদ
-আপনার বাবার নাম?
-ইদরীস।
আপনার বংশ?
-শাফেয়ী, আমি বললাম।
-আপনি কি মুত্তালিব গোত্রের? বললাম হ্যাঁ..।

গোলামটি এসব কথোপকথন তার আস্তিনের ভেতরে থাকা একটি স্লেটে লিখে রাখলো এবং বিদায় নিয়ে চলে গেলো। আমি এরপর শহরের একটি মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নিলাম আর ভাবতে থাকলাম- ছেলেটি এসব জানতে চাইলো কেনো? এর ফলাফলই-বা কী হতে পারে? এভাবেই অর্ধরাত্রি চলে গেলো। মাঝরাতে হঠাৎ মসজিদের দরজায় জোরে করাঘাত হলো। এতো জোরে যে মসজিদে বিশ্রামরত সবার ঘুম ভেঙে গেলো। দরজা খুলে দেয়া হলো। দেখলাম সেই গোলামটি দাঁড়ানো। ভেতরে ঢুকে সে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে সবার চেহারা দেখতে দেখতে একসময় আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি বললাম ভাবনার কিছু নেই, তুমি যাকে খুঁজছো সেই লোকটি আমিই। সে বললো- আমিরুল মুমিনীন হারুনুর রশীদ আপনাকে স্মরণ করেছেন। আমি কিছু না বলে বেরিয়ে এলাম এবং তার সাথে চলতে থাকলাম।

আমি দরবারে পৌঁছে সুন্নাত মুতাবেক তাকে সালাম দিলাম। তিনি আমার সালাম দেয়ার ধরন পছন্দ করলেন। বুঝলেন- দরবারের লোকেরা নানাভাবে দেখানোর জন্য যে সালাম দেয় তা ভুল। সালামের সুন্নাত তরিকা এটাই। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং আমাকে বললেন- আমি ধারণা করছি তুমি বনু হাশিম গোত্রের। আমি বললাম- আমিরুল মুমিনীন, এই ‘ধারণা’ (যাআম) শব্দটা ব্যবহার করবেন না। কারণ কুরআনে যতো জায়গায় এই শব্দটা এসেছে ততো জায়গায়ই মন্দ, বাতিল এসব অর্থে এসেছে। তিনি তাই করলেন। এবং আরবী যাআম শব্দের বদলে ক্বুল শব্দটি বললেন। আমি এবার জবাব দিলাম। হ্যাঁ। তিনি আমার বংশ জিজ্ঞেস করলেন। আমি হযরত আদম পর্যন্ত আমার পুরো নসব শুনিয়ে দিলাম, যেহেতু তা পুরোই আমার মুখস্থ ছিলো। আমিরুল মুমিনীন বললেন- এতোটা শুদ্ধ এবং ব্যাকরণগত দিক ঠিক রাখার অধিকারী কেবল আব্দুল মুত্তালিব বংশের লোকেরাই। তিনি এরপর বললেন- আমি চাই আমার বিচার বিভাগের দায়িত্ব আপনার ওপর ন্যস্ত করতে এবং এর বদলে আমার পুরো সাম্রাজ্য এবং স্থাবর সম্পদের অর্ধেক আপনাকে দিয়ে দিতে। সবার ওপর আপনার এবং আমার হুকুম চলবে। আর সেই হুকুমতের ভিত্তি হবে কুরআন-হাদীস এবং ইজমায়ে উম্মত।

আমি বললাম-আমিরুল মুমিনীন! আপনি যদি এটা চান যে এই সকল সম্পত্তি এবং রাজ্যের ভাগ পেয়ে আমি কেবল এইটুকু দায়িত্ব পালন করবো যে সকালে বিচার বিভাগের দরজা খুলে দেবো এবং সন্ধ্যায় সেটা বন্ধ করবো তবুও আমি তাতে রাজি হবো না, এমনকি কেয়ামতের আগ পর্যন্তও না। এই জবাব শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন। বললেন- আচ্ছা, আপনি কি আমার কিছু হাদিয়া গ্রহণে রাজি হবেন? বললাম- হতে পারি, যদি সেগুলো নগদ হয়, ওয়াদা নয়। আমিরুল মুমিনীন আমার জন্য এক হাজার দিরহামের হুকুম জারি করলেন এবং সে মজলিসেই তা গ্রহণ করে নিলাম। আমি বের হবার পথে সেখানে উপস্থিত খাদেম ও গোলামেরা আমাকে বললো আপনি কি আমাদেরকেও কিছু হাদিয়া দেবেন? আমি তখন উপস্থিত সবার জন্য এক হাজার দিরহাম সমানভাবে ভাগ করলাম। আমি কেবল তাই রাখলাম যা উপস্থিত সদস্য সবাই পেয়েছে’।

পূর্ববর্তী আলেমদের হেকমতি মালফুজাত

নির্বাচিত মালফুজাত

মানুষদের সাথে মেলামেশার আদর্শ পদ্ধতি:

হযরত আকিম বিন সায়ফী বলেন- মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করা বা এড়িয়ে চলা শত্রুতা সৃষ্টি করে। আবার ঘনিষ্ট মেলামেশা বা সার্বক্ষণিক সান্নিধ্য অনেক খারাপ বা অসৎ সঙ্গ জুটিয়ে দেয়। তাই উচিত হলো দুয়ের মধ্যবর্তী কোনো পথ বের করে নেয়া।

সুন্নাতের অনুসরণই বড় তাকওয়া:

হযরত ওমর ফারুক রা. একবার জানতে পারলেন- এক খিত্তা বা কোনো এক দারুল হরব থেকে যে বস্ত্র আসে তাতে নাপাক লাগা থাকে। তিনি এটা শুনে তৎক্ষণাৎ তা পরিহার করার হুকুম দিলেন। তখন এক সাহাবী বললেন যে, নবীজীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুগেও এমন কাপড় আসতো, তিনি তা বর্জন করেন নি। সাহাবাদের পরতে দিয়েছেন এবং তিনি নিজেও পরেছেন। হযরত ওমর সাথে সাথে তাওবা ও ইস্তেগফার করলেন এবং বললেন এতে নাপাকি থাকলে বা এটা তাকওয়ার খেলাফ হলে নিশ্চয়ই নবীজী তা ব্যবহার করতেন না।

ব্যাপার ছিলো এই যে, ইসলাম যেমন পরিচ্ছন্নতার দিকটিকে খুব গুরুত্ব দেয় তেমনি সন্দেহ থেকেও বিরত থাকতে বলে। তাই শুধু অন্য দেশ থেকে এসেছে বলেই কাপড়ে নাপাকির হুকুম লাগিয়ে দেয়া হয়নি।

এভাবেই একবার ইমাম যাইনুল আবেদিন তার ছেলেকে বললেন, আমার জন্য একটা কাপড় বানিয়ে দাও যা আমি কেবল ইস্তেঞ্জার সময় ব্যবহার করবো। কারণ ইস্তেঞ্জায় বসলে দেখি যে মাছি নাপাকিতে বসে আবার উড়ে এসে আমার কাপড়েও বসে। তখন ছেলে উত্তর দিলো- বাবা, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন করতেন না। তিনি এক কাপড়েই ইস্তেঞ্জা করতেন এবং নামাজও পড়তেন। ছেলের মুখে এ কথা শুনে ইমাম সাহেব তার ইচ্ছে থেকে সরে এলেন এবং আর কাপড় বানালেন না।

বিনয়ের মধ্যেও অহংকার:

হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন- কোনো ব্যক্তি লোক সমাগমে যদি নিজের মন্দ বয়ান করে তাহলে এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে সে নিজের প্রশংসাই করে (কারণ, লোকে তখন তার প্রশংসা করে)। এটা খুবই আত্মকেন্দ্রিক নোংরা এক কাজ, মানুষদের দিয়ে নিজের প্রশংসা করিয়ে নেয়া। এটা একপ্রকার রিয়াও।

সন্তান লালনপালনের আদর্শ পদ্ধতি:

শায়খ আব্দুল ওয়াহহাব শে’রানী বলেন- আমার ছেলে আব্দুর রহমানের প্রথম প্রথম ইলমের প্রতি আগ্রহ ছিলো না। বিষয়টা নিয়ে আমি খুবই চিন্তিত ছিলাম। এসময় আল্লাহ পাক আমার অন্তরে ঢেলে দিলেন যে, এ বিষয়টা আমি যেনো তার মহান দরবারেই সোপর্দ করে দিই। আমি তাই করলাম। আল্লাহর অনুগ্রহে সেদিনই তার মধ্যে ইলমের ঝোঁক তৈরি হয়ে গেলো এবং সে নিজের চেষ্টায় তার সব সহপাঠীদের পেছনে ফেলে অগ্রগামী হয়ে গেলো।

তিনি আরো বলেন যে, আমি আমার শায়খ আলী খাওয়াছের কাছে শুনেছি যে তরবিয়তের প্রশ্নে আলেম এবং নেককার ব্যক্তিদের সন্তানদের জন্য কোনো জিনিস তেমন উপকারী নয়, যেমন উপকারী কেবল তাদের জন্য দুয়া করা এবং তাদের ব্যাপারটিকে অল্লাহর দরবারে সোপর্দ করে দেওয়া।

আমল বিশুদ্ধ করার আগে নিয়ত বিশুদ্ধ করা জরুরী:

হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন- জান্নাতবাসীদের জান্নাতে প্রবেশ এবং জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশ তাদের আমলের ভিত্তিতেই হবে এবং তারা সেখানে চিরস্থায়ী বাসিন্দা হবে তাদের নিয়তের কারণে। কারণ যারা সৎ ও আমলদার ছিলো তারা নিয়তে করেছিলো যে যতোদিন দুনিয়াতে থাকবে ততোদিন কেবল আমলের উপরেই থাকবে, পক্ষান্তরে যারা শিরক-বিদআতে লিপ্ত ছিলো তারাও নিয়ত করেছিলো যে দুনিয়াতে যতোদিন থাকবে ততোদিন কেবল শিরক বিদআতেই লিপ্ত থাকবে। তাই আমলের চেয়ে নিয়তের গুরুত্ব বেশি।

কোন আমল বেশি?

তাওরাতে আল্লাহ পাক বলেন- যে আমল আমার কছে গ্রহণযোগ্য তাই বেশি। আর যেটা গ্রহণযোগ্য নয় তা-ই কম, বাস্তবে তা যতোই বেশি হোক না কেনো।
তালীম ও ওয়াজ কীভাবে মানুষের হক?

হযরত শাদ্দাদ বিন হাকীম বলেন- যে ব্যক্তির মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকবে তার উচিত মানুষদের সামনে তালীম ও ওয়াজ করা। যার মধ্যে এগুলো থাকবে না তার উচিত ওয়াজ ছেড়ে দেয়া। সেই তিনটি বৈশিষ্ট্য হলোÑ মানুষদের আল্লাহর নেয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়া, যাতে তারা শুকরিয়া আদায় করে। তাদের গুনাহ স্মরণ করিয়ে দেয়া যাতে তারা তওবা করে। শয়তানের শত্রুতা সম্পর্কে তাদের সচেতন করা যাতে তারা তার ফন্দি থেকে বাইরে থাকতে পারে।

ইশক কী এমন জিনিস!

-হাকীম মুহাম্মাদ উমর, ডাক্তার- দারুল উলূম দেওবন্দ

ইশক এমন পরিচিত একটা শব্দ, যা সাধারণ-বিশেষ, জ্ঞানী-মূর্খ, বড়-ছোট সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। কিন্তু সাধারণ এ শব্দটির বাস্তবতা বা প্রকৃত অর্থ এমন গূঢ় রহস্যময় যে ভেবেও কূল করা যায় না। নিচে ডাক্তার সাহেবের আকর্ষণীয় নিবন্ধটি তুলে ধরা হলো।

সন্দেহ নেই, কুরআনে কারীমে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। হাদীসের বিশাল ভা-ারেও দুর্বল একটি বর্ণনা ছাড়া তেমন কোথাও এর উল্লেখ পাওয়া যায় না। কতিপয় আলেম সেজন্যই ব্যাপকভাবে ইশ্ককে নিন্দনীয় আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য কথা এই- ইশ্ক হলো মহাব্বতের প্রাবল্য বা প্রবল মহাব্বত। এর সম্পর্ক যদি আল্লাহ এবং তার রাসূলের সাথে হয় তাহলে তো সেটা হবে ওয়াজিব। এর বাইরে যদি কোনো বৈধ ক্ষেত্র বা মানুষের সাথে সম্পর্কিত হয় তাহলে হবে বৈধ। আর এ ক্ষেত্রগুলোতে যদি মহাব্বতের সীমা অতিক্রম করে এবং ইশকের স্তরে চলে যায় তো সেটা যদিও শরীয়তের উদ্দেশ্যের আওতায় থাকবে না কিন্তু নিন্দনীয় না হয়ে সেটা প্রশংসারই দাবিদার হবে। তবে- ব্যাপারটা আল্লাহই ভালো জানেন।

নবীদের ইরশাদ:

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- ইশক হলো এমন সাড়িবদ্ধ সেনাবাহিনীর ন্যায়, যাদের মধ্যে পরিচিতরা অন্তর্ভুক্ত হয় আর অপরিচিত বা অনির্বাচিতরা ঝড়ে পড়ে। (মেশকাত শরীফ) এর দ্বারা বুঝা যায় ইশক বা মহাব্বরে শেকড় হলো সেই রূহানি সম্পর্ক যা আযল থেকে রূহসমূহের ভেতর রেখে দেয়া হয়েছে।

হযরত উমর ফারুক রা. বলেন- ইশক হলো শাস্তির একটা প্রকার। আর কোনো সমঝদার ব্যক্তি তো এই বিপদকে জেনেশুনে ঘাড়ে নিতে রাজি হতে পারে না। ইশক কোনো বাধ্যতামূলক জিনিসও নয় যে চাপিয়ে দেয়া হবে।

দার্শনিকদের বক্তব্য:

বুক্বরাত হাকীম-
-ইশক হলো হৃদয়ে জন্ম নেয়া এমন আশা যাতে দ্রুতই লোভের কালো থাবা জায়গা করে নেয়।
-ইশক হলো প্রিয় কোনো কল্পনার ব্যাপারে তৃপ্ত ও খুশি হওয়ার নাম। এর নাড়াচাড়াটাই হলো শওক্ব বা উদ্দীপনা।
-ইশক হলো এমন এক অন্ধ অনুভূতি- যা মাহবুবের দোষ-ত্রুটির খোঁজ রাখতে অক্ষম।

অচেনা এক দার্শনিক:

ইশক হলো বিশেষ একটি ইচ্ছের অপর নাম, যা হৃদয়ে জন্মে, প্রতিপালিত হয়ে হৃদয়ে লোভের বহু উপাদান সৃষ্টি করে দেয়। আর যখনই সে ইচ্ছে প্রবল হয়ে ওঠে তো আশেক অস্থিরতা, লোভ-লালসার হাতে কাবু হতে থাকে। এমনকি এই অস্থিরতা ক্রোধ এবং হিং¯্রতায়ও রূপায়িত হয়ে যায়। যেহেতু কালোর স্বভাবে এ বিষয়ও আছে যে তা চিন্তাশক্তির লোপ পাইয়ে দেয়, যে চিন্তাশক্তি মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে; তাই শেষমেশ এই বেচাইন হালত একজন আশেককে পাগল পর্যন্ত করে দেয়। এ পর্যায়ে আশেক কখনো আত্মহত্যা করে, ক্রোধে কখনো খুনোখুনি করে বসে, কখনো ভালোবাসার ধন পেয়ে আনন্দেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কখনো কষ্টে এমন তড়পায় যে জীবনই বিষাক্ত হয়ে উঠে।

আফলাতুন:

প্রেম শারীরিক উত্তাপ-উত্তেজনা সংক্রান্ত এমন এক শক্তির নাম যা জৈবিক ভাবনা এবং কল্পণাপ্রবণতা থেকে তৈরি হয়। মানুষের অস্তিত্বের ভেতরে থাকে এর শিকড় তবে এটা সবার গায়েই স্বভাব বিরোধী একটি পোশাক চাপিয়ে দেয়। এমনকি এটা একসময় নফসের রোগ এবং আগ্রহের প্রবল্যে পরিণত হয়ে এমন অপ্রতিরোধ্য অসুস্থতায় পরিণত হয় যে মৃত্যু ছাড়া এর সহজ কোনো বিকল্প থাকে না।

জালিনূস:

মহাব্বত হলো আত্মার একপ্রকার কাজ। আর এটা লুকায়িত থাকে আত্মার প্রধানতম অঙ্গগুলোর আড়ালে। যখন এই কাজ নিজের শক্তি এবং পর্যাপ্ত প্রভাব তৈরি করে নিতে সক্ষম হয় তখন দিল-দেমাগ-জিগর সব খারাপ হয়ে যায়।

ফারাবী:

ইশক হলো আংশিক অসুস্থতা আর আংশিক পাগলামোর নাম। এটা হলো মানবজন্মের সকল দুঃখের সেরা দুঃখ। এটা সত্যিই সকল প্রকার রোগের অর্ধেক হবার যোগ্যতা রাখে। আর এতে সন্দেহ নেই কারণ ইশক হলো সূক্ষ্ম আর শরীর হলো ভারি। সব অসুস্থতা শরীর থেকে তৈরি হয় অর ইশক হলো আত্মা থেকে। আর এটা স্পষ্ট যে সূক্ষ্ম বিষয় সূক্ষ্ম জায়গাতেই দ্রুত জন্ম নিয়ে প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এর কাছাকাছিই হলো সূক্ষ্ম কোনো বিষয়ের ভারি জিনিসে ছড়িয়ে যাওয়া।

ইবনে খাল্লিকান:

ইশক হলো মৃত্যুর একটি ঢোক। ধ্বংসের বাগিচাগুলের মধ্য থেকে একটি বাগিচা। ইশক দৃষ্টিগ্রাহ্য হওয়া না হওয়া থেকে বহুদূরে। ইশক হলো চকমকি পাথরের একটি টুকরোর মতো যা হৃদয়ে লুকিয়ে থাকে, আঘাত লাগলে জ্বলে ওঠে নয়তো আড়ালেই পড়ে থাকে।

আরবের এক নারী:

মিসকিন আশেকের শত্রু হলো সব জিনিস। শীতল হাওয়া তাকে অস্থির করে। বিজলির চমক তার ঘুম কেড়ে নেয়। রাষ্ট্রের রীতি-নীতি তার বুকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। লোকের নিন্দা তাকে পীড়িত করে। প্রিয় স্মৃতি তাকে অসুস্থ করে তোলে।

এক বিধবা নারী:

মহাব্বতে পড়লে বিবেক বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। শরীর পরিশ্রমে লেগে যায়, নীরবে অশ্রু প্রবাহিত হতে থাকে। প্রতিটি নতুন দিন আত্মায় মহাব্বতের নতুন ছোঁয়া নিয়ে হাজির হয়। আর মহাব্বত প্রেমাস্পদের অবাজ্ঞায় পড়লে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

তামিমী:

ইশক না আশেকদের ইচ্ছেয় তৈরি হয় না তাদের প্রবৃত্তি থেকে। আশেক হওয়ার বিষয়টা মূলত এমন যে কোনো ধ্বংসকারী অসুস্থতার কবলে পড়ে যাওয়া। দুটোর মাঝে বিন্দু পরিমাণ ফাঁক নেই।

আবু ওয়েইল:

মহাব্বত যদি পাগলামোর চূড়ান্ত রূপ বা এমন পর্যায়ে না যায় তাহলে জাদুর নিংড়ানো রস তো হবেই। মহাব্বত হলো কোনো মাধ্যম ছাড়া প্রেমাস্পদের সাথে জড়িয়ে যাওয়া।

সুফিয়ানে কেরাম

শিহাবুদ্দীন নাবিরী:

সর্বপ্রথম ভালো লাগার অনুভব তৈরি হয়। এরপর জাগে নৈকট্যপ্রাপ্তির ইচ্ছে। এরপর এটা নিরেট প্রীতির রূপ নেয়, যার পরের ধাপই হলো মহাব্বত বা ভালোবাসা। এরপরের স্তর হলো প্রবৃত্তির, এরও পর ইশকের স্তর। ইশকই আবার শেষ স্তর নয়। তা পাগলামোর প্রথমিক ধাপ এরপর আসে পূর্ণ পাগলামো।

জুনাইদ বাগদাদী:

ইশক হলো মহাব্বতের বিশেষ এক স্তর, যা বান্দাদের আল্লাহ প্রদত্ত মেহেরবানিসমূহের অন্যতম।

বাগদাদের এক অত্যাশ্চর্য দিক

বাগদাদ শহরটি শত শত বছর ধরে খিলাফাত এবং বিভিন্ন সালতানাতের অধীনে ছিলো। স্বাভাবিক তো এটাই ছিলো যে রাজা-বাদশাহদের কবর এখানেই বেশি থাকবে। কিন্তু অবাক হবার বিষয় হলো এই শহরে কোনো বাদশাহর ইন্তেকাল হয়নি। যতো রাজা-বাদশাহ এই শহরে বাস করেছেন, তাদের ইন্তেকাল হয়েছে এই শহর থেকে বেরুবার পর।

খলীফা আবু জাফর মনসুর, খলীফা মাহদী, খলীফা হাদী, হারুনুর রশীদ, মামুনুর রশীদসহ সবার ইন্তেকাল হয়েছে এই শহর থেকে বের হবার পর। একমাত্র মুহাম্মাদ আমীনের ব্যাপারে বলা হয় যে তাকে এই শহরেই হত্যা করা হয়েছে। তবে তাহক্বীক হলো যে তাকে বাগদাদের বাইরেই হত্যা করা হয়েছে। কবরও বাগদাদের বাইরেই অবস্থিত। কবি বলেন-

আরবী-
‘পৃথিবীর বুকে আপনি কি বাগদাদের মতো কোনো শহর দেখেছেন? নি:সন্দেহে তা দুনিয়ার জান্নাত। এই শহরের মালিক হুকুম জারি করে দিয়েছেন যে, কোনো বাদশাহের মৃত্যু এই শহরে হবে না। নিশ্চয় তিনি নিজের সৃষ্টির ব্যাপারে যেমন খুশি হুকুম প্রদান করেন।’

খলীফা আবু জাফর মানসুর এবং পারস্যের এক মুসাফির

খলীফা আবু জাফর মানসুর আব্বাসী যখন বাগদাদ শহরের গোড়াপত্তন করলেন, পারস্য থেকে এক মুসাফির সেখানে উপস্থিত হলো। শহর ঘুরে দেখার পর সে মুসাফির রাজ দরবারেও হাজির হলো। তিনি খলীফাকে বললেন- আপনি এমন এক শহর গড়ে তুলেছেন যা অতীতে কোনো বাদশাহর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে এই শহরে তিনটি ত্রুটি দেখতে পাচ্ছি।

একটি ত্রুটি বা অপূর্ণতা এই যে, এই শহর পানি থেকে অনেক দূরে। আর মানব সম্প্রদায়ের সবচে বেশি প্রয়োজন হলো পানির। দ্বিতীয় ত্রুটি হলো- মানব চক্ষু চারপাশে সবুজ দেখতে পছন্দ করে কিন্তু আপনার শহরে সবুজের পরিমাণ খুব সামান্যই। তৃতীয় বিষয় হলো- আপনার সব মন্ত্রী আর রাজকর্মকর্তারা আপনার সাথেই বাস করে। এর বড় সমস্যা হলো যে বাদশাহর কিছুই এতে গোপন থাকে না। বরং সবকিছ ুজনসম্মুখে প্রকাশ হয়ে যায়।

তার অভিযোগ শুনে খলীফা বললেন- তুমি যে তিনটি বিষয়ের কথা বললে সেগুলোর একটিও ভ্রুক্ষেপ করার মতো বা পাত্তা দেয়ার মতো কোনো বড় সমস্যা নয়। কারণ তোমার প্রথম যে বিষয় পানিস্বল্পতা, সেটা কোনো সমস্যাই নয়। প্রয়োজনমাফিক পানি এই শহরে বিদ্যমান। আর অতিরিক্ত কিছুর চিন্তা করা তো অপচয় ছাড়া কিছু নয়। আর গাছপালা বা সবুজের যে কথা বললে সেটার জবাব হলো অমরা সবুজের মুগ্ধতা দেখা বা সেসবে বিভোর হয়ে থাকার জন্য তো জন্ম গ্রহণ করিনি। তৃতীয় যে বিষয়টির কথা বললে- আমার গোপনীয়তা বজায় রাখা বিষয়ক সতর্কতা। তোমার জেনে রাখা উচিত জনগণের কাছে আমার গোপন রাখার মতো কিছু নেই। আমি সেটা চাইও না।

খলীফা মানসুরের চিন্তা নিজের জায়গায় হয়তো ঠিকই ছিলো। তবে কালের ধারাবাহিকতায় বাগদাদেও সেই পারস্যের মুসাফিরের কিছু পরামর্শ বাস্তবায়িত হতে দেখা গেছে। বাগদাদের আশপাশে সবুজায়নের জন্য চাষবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দজলা নদী থেকে নহর কেটেও শহরে আনা হয়েছে। (তারিখে বাগদাদ)

সামান্য সাক্বীর অসামান্য দৃষ্টিভঙ্গি

হযরত জুন্নুন মিশরীর ব্যাপারে শত্রুতাবশত কে একবার অভিযোগ আনলো এবং সে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে গ্রেফতার করে বাগদাদে আনা হলো। হাতকড়া পড়া অবস্থায় রাজ দরবারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তিনি পড়েছিলেন। তীব্র পিপাসায় কাতড়াচ্ছিলেন। ভাবছিলেন কাকে এই হালতের কথা বলা যায় বা কে শুনবে তার কথা? ঘটনাক্রমে তখনই অত্যন্ত ভদ্র পোষাক পড়া এক লোক তার সামনে এসে উপস্থিত হলো। তার হাতে ছিলো কিছু ফল এবং সাথে থাকা মশকে পানি। জুন্নুন লক্ষ করলেন- এ তো বাদশাহের নিয়োজিত পানি পান করানোর সাক্বী, সে তো তার কথা শুনতে পারে না। লোকদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে এই লোক কোনো দরবারি লোক নয় সে বরং সাধারণ মানুষদেরই পানি পান করানোর দায়িত্ব পালন করে থাকে।

তিনি তার কাছে পানি চাইতেই অত্যন্ত আদবের সাথে পানি পান করালো। তিনি খুশি হয়ে তার দিকে এক দিনার বাড়িয়ে দিলেন। সে নিতে অস্বীকার করলো। তিনি বারবার দিতে চাওয়ার প্রেক্ষিতে সে বললো- আপনি একজন কয়েদি। আর এটা ভদ্রতা বা মানবিকতার কোনো পর্যায়েই পড়ে না যে একজন কয়েদির কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করা হবে। তিনি সামান্য একজন সাক্বীর উন্নত এই মানবিক বোধ ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে উপস্থিতদের উদ্দেশ্য করে বললেন- তোমরা মানবিকতা আর জীবনের প্রকৃত দর্শনের শিক্ষা এর কাছ থেকে নিতে পারো।

-সাদাকালো ফ্রেম রঙিন জীবন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *