নাস্তিকতা আস্তিকতার লড়াই

দর্শনে নাস্তিকতা আস্তিকতার লড়াই


মানুষ নিজেকে জীবনের প্রবল স্রোতের উপর জায়মান ঢেউ বিশেষের মতো প্রতক্ষ্য করে। কিন্তু সেই স্রোতের উৎস কোথায়? জীবনের সচ্ছন্দ গতির ভেতরেই সে সত্তার গহীন থেকে উৎসারিত নিগূঢ় সূত্রসমূহের তোলপাড়ে ক্রমাগত হতবিহবল হয়। সে ভাবে স্রষ্টা ব্যতীত সৃষ্টি অসম্ভব। কিন্তু কে রহস্যময় মানুষ ও বৈচিত্রময় বিশ্বজগতের স্রষ্টা?

আকাশের নীলিমা, চন্দ্রের সুষমা, সূর্যের রশ্নিধারা, সমুদ্রের ঊর্মীমালা, কোটি কোটি নক্ষত্র আর গ্রহ উপগ্রহের অভিনব দৃশ্য,- উপন্যাসের মতো সুসজ্জিত ও ধারাবাহিকভাবে বিন্যসিত। কে লিখেছেন এ উপন্যাসটি? তার সঠিক পরিচয় কি? মানুষের সাথে তার কি কোন সম্পর্ক থাকতে পারে? কেমন হবে সেই সম্পর্ক?

সে দেখে মানুষের মৃত্যু। পিতার কবর হয়তো সে নিজেই খনন করেছিলো। তার পরিচিতদের অনেকেই দেখতে দেখতে মৃত্যুবরণ করলো। তার মনে প্রশ্ন জাগে মৃত্যুর পরে কি হয় ? মৃত্যুর সাথে সাথেই কি মানবজীবন শেষ? সে জীবনকে ভোগ করে। সে আনন্দিত হয় এবং আরামের উপকরণ সমূহ ব্যবহার করে, যা সে সৃষ্টি করেনি। সে পানি, বাতাস, আগুন ও মাটি থেকে উপকৃত হয়। মাটি তার জন্য যদি শস্য উৎপাদন না করতো, তার পক্ষে আদৌ কি বেঁচে থাকা সম্ভব হতো?

সে জানে এগুলো কোন মানুষের তৈরী নয়। এগুলো ফলাফল নয় কোন দুর্ঘটনার। এগুলোর সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন। এগুলোর ব্যবহারের জন্যে দৈহিক ও মানসিক শক্তি যা তার অধিত, জীবনযাপন করার জন্য ভাল ও মন্দের চেতনা, যা তার অধিত, সে জানে এগুলো কেউ না কেউ তাকে দিয়ে থাকবেন। যিনি দিলেন তার উদ্দেশ্য কি ? তিনি কি এর হিসাব নেবেন? তার কাছে কি দাঁড়াতে হবে ? জবাবদিহি করতে হবে ?

সে জানে মানুষ হিসেবে তার জন্য নৈতিক জীবনের দরকার। কিন্তু নৈতিক চেতনার ঠিক বিপরীত আহবানকারী তার ভেতরে সক্রিয়। অতএব উভয়ের মধ্যখান দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ নৈতিক শিক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা কি হওয়া উচিত ? সে সমাজে দশজনের সাথে সম্পর্কিত হয়ে জীবন যাপন করে। এদের সাথে যার যার অবস্থান অনুযায়ী কীভাবে ব্যবহার করবে ? কীভাবে বিভিন্ন দল, সম্প্রদায়, জাতি ও রাষ্ট্রের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে?

এসব প্রশ্নের উত্তর সে অনুসন্ধান করে। মেধা, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে এসব বিষয়ে জ্ঞান চর্চা করে। তার চর্চিত জ্ঞানের উপর সে কখনো নি:সংশয় হয়, কখনো হতে পারেনা। সে তার চর্চিত বিদ্যাকে সমাজে ছড়িয়ে দেয়। সমাজ সেটাকে হজম করে কিংবা করেনা। সমাজ অস্থির হয়, অশান্ত হয়। বিজ্ঞান এসব জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে দাঁড়ায়না। এগুলো অবস্তুগত। বিজ্ঞানের আলোচ্যবিষয় বস্তুগত। সে নিজেই বরং মৌলিকভাবে কতিপয় প্রশ্নের জন্ম দেয়। কেননা তার মাধ্যমে মানুষের হাতে চলে আসে বস্তুশক্তি। মানুষ ভাবে সেই বস্তুশক্তি ব্যবহারের নৈতিক সীমা কি হতে পারে?

মানবদেহে বৈচিত্রময় শক্তির সম্মেলন। মানুষ কথা বলে, কাজ করে, চিন্তা করে। এর পেছনে যে শক্তি আছে সেটা প্রয়োগের ক্ষমতা গবেষণার মাধ্যমে বৃদ্ধিও করা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে যে প্রশ্নটা অজান্তেই মনের গহীনে নড়ে উঠে সেটা হচ্ছে এসব শক্তি কল্যাণের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের শিক্ষা কি হতে পারে ? স্নেহ-মমতা, আবেগ-উচ্ছাস, ক্রোধ-ঘৃণা এগুলো মানুষের সত্তায় সার্বক্ষণিকভাবে ক্রিয়াশীল। কিন্তু এগুলো ব্যবহারের উপযুক্ত পথ কি ? এগুলো কখন কোথায় সে প্রয়োগ করবে ?

তার চেতনালোকে যেসব হৃদয়াবেগ ও উদ্দেশ্যরাজি সক্রিয় এগুলোর অনুসরণই কি তার দৈব? এর অনুসরণ কি একেবারে নীতিশূণ্য ও লাগামহীন। সে তার ব্যক্তিত্বের গভীরতর উপলব্ধিতে দ্বন্দমুখর ইচ্ছাসমূহের তাড়না লক্ষ্য করে। সে কি সব ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেবে ? যা তার পক্ষে অসম্ভব। তার বেঁচে থাকার জন্য এ বিশ্বের প্রয়োজন আছে। কিন্তু বিশ্বের জন্য মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজন নেই। তাহলে এই নাট্যাভিনয়ের উদ্দেশ্য কি ? যেখানে মানুষকে তার নিজের ভূমিকায় নিরন্তর অভিনয় করে যেতে হয়। বিশেষত তার কাছে কী আদৌ কোন ভূমিকা আশা করা হচ্ছে ? যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে তার ভূমিকা কি নেহাত প্রয়োজনীয় অথবা এমন কিছু যা অবশ্যম্ভাবী?

এইসব জিজ্ঞাসার জবাব এমন সব দার্শনিকের হাতে তুলে দেয়া যায়না, যারা নিজস্ব রুচি, প্রকৃতি ও স্থান-কালের ভিত্তিতে সমাধান দাড় করান। যারা মানবজাতির অতীতের অভিজ্ঞতা অনেকটাই ভুলে যান।

বর্তমান সম্পর্কে নিজস্ব রুচি ও ঝোকপ্রবণতার কারণে খন্ডিত মীমাংসা উপস্থাপন করেন এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে কতিপয় ধারণা ছাড়া সত্যিকার জ্ঞান বলতে তাদের কিছুই নেই। তারা তাদের জীবনের বিস্তর সময় গবেষণাগারে কোন এক ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে এমনভাবে অতিবাহিত করেন যে, সন্তুষজনক কোন সমাধান পাচ্ছেন না। তারা সমাধানের দিকে যেভাবে আগান, তার চেয়ে দ্রুতগতিতে মানুষের জীবননদী মুহূর্তে মুহূর্তে ধেয়ে চলছে সামনের দিকে। আর প্রতিটি মুহূর্তই মানুষের সামনে খুলে দিচ্ছে নতুন নতুন সুযোগ ও অভিজ্ঞতার দুয়ার। অথচ বিয়োগান্তক সত্য হচ্ছে যে, মুহূর্তগুলো বয়ে যাচ্ছে, আর ফিরে আসছেনা। তারা তো তাদেরকে ঘিরে নিয়তির এই নিরবচ্ছিন্ন ক্রীড়া-কৌতুকের সামনেই অসহায়। কোন দার্শনিক কি এমন যে, সময় তার জন্য অপেক্ষা করেছে ? মানবজাতির জন্য একটা পথনির্দেশ করবেন বলে, কিংবা মুহূর্তসমূহের রহস্য পাঠ করবেন বলে তার সামনে কালের প্রবাহ থেমে গিয়েছিল ? এমনটা হওয়া তো দূরে থাক, কেউ দাবিও করেননি।

আবার যেসব দার্শনিক মানবজাতিকে হুচট খেতে খেতে এগিয়ে যাবার মন্ত্র শুনান এবং বলেন যে, থিসিস, এন্টিথিসিস ও সিনথিসিসের প্রক্রিয়ায় ভুল করবে, সংশোধন করবে আবার ভুল করবে আবার সংশোধন করবে; তারা আসলে মানবজাতির মৌলিক জিজ্ঞাসার কোন জবাবই উপস্থাপন করেননা। তারা এক অন্তহীন শূণ্যতার ভিতর মানবজীবনের উদ্দেশ্যহীন আবর্তন ছাড়া আর কিছুই নির্দেশ করেননা। তারা মানুষকে এ দর্শনের দ্বারা পক্ষান্তরে হতাশ হতে বলেন কিংবা স্বেচ্ছাচারী হতে বলেন।

এ জাতীয় দ্বান্ধিক বস্তুবাদী দর্শনের মাধ্যমে কোথাও কোন জনগোষ্টী শুদ্ধ ও বুদ্ধ হয়েছে এবং ব্যক্তি তার জীবনযাত্রার বাঁকে বাঁকে সৃষ্টি হওয়ার সমস্যার সমাধান পেতে সমর্থ হয়েছে এমন কোন নজীরই লক্ষ্য করা যায়না। বস্তুবাদী দার্শনিকরা জীবনকে পূর্ণাঙ্গরূপ ছাড়া আর বাকি সব পন্থাই পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের সিদ্ধান্তসমূহ মানুষের মৌল প্রকৃতির বিপরীত দিক থেকে এসেছে। ফলত: মানবীয় সীমানা থেকে প্রতিটি সিদ্ধান্তই উত্থিত প্রশ্নের সম্মুখে লা জওয়াব দাড়িয়ে আছে। তারা বলেন, মানুষের প্রকৃতি মূলত নিষ্টুর। কিন্তু কেন ? হৃদয় তার জন্য অসহনীয় বোঝা। কেন হবে ?

মানবজীবন গোলকের মতো কষ্ট থেকে ক্লান্তিতে এবং ক্লান্তি থেকে কষ্টে দেদোল্যমান ক্রীড়া বিশেষ। কেন হবে ? অনমনীয় অস্বীকারের দৃঢ় ভিত্তির উপরই মানব বসতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু কীভাবে ? এইসব দার্শনিক নেতির কাছে সমর্পিত হয়েছেন। তারা বলেছেন- জীবন শীলা ও আবর্তে পরিপূর্ণ সমুদ্রের মতো। মানুষ সতর্কতার সঙ্গে একে পরিহার করে, যদিও সে জানে সব প্রচেষ্টার শেষে জাহাজডুবি সুনিশ্চিত’।

যে বিষয় সম্পর্কে তারা অন্ধ সে বিষয়কে তারা মিথ্যে বলেছেন। তারা বলেছেন- ‘ ‘আমরা এখানে সুখী না হলে চিরদিনই অসুখী রবো’। ‘আমরা এ জীবন হারালে সবই হারালামা। কারণ এটাই প্রথম ও শেষ’। ‘যা কিছু উপভোগ করবে এগুলোই তোমার’। অতএব মানুষ যৌনসর্বস্ব (ফ্রয়েড) কিংবা পেটসর্বস্ব (কার্লমার্কস) কিংবা ধূর্তপ্রকৃতির এক দ্বিপদ জানোয়ার (মেকিয়াভেলি) যে উদ্ভব বন্য ইতর প্রাণীর বিবর্তনিক কাঠামো হিসেবে (ডারউইন)। একটি জন্তুর জন্য কি চাই ? মানুষকে এর চেয়ে বেশি দিতে রাজি নন বস্তুবাদী দার্শনিকরা।

মানুষের জন্য তাই একটি দু:খজনক পরিস্থিতি সামনে এসে দাড়ায়। সেটা হচ্ছে জীবনকে সামগ্রিকভাবে বুঝবার চেষ্টা পরিত্যাগ করা। কেননা সে চাক্ষুষ অভিজ্ঞতাসমূহের উপর নির্ভর করে নিজস্ব চেষ্টার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ গন্ডির বাইরে যেতে পারেনি এবং প্রতিবারই তার সিদ্ধান্ত জীবনের কোন একটি ভগ্নাংশ নিয়ে আবর্তিত হয়েছে মাত্র। সমগ্রের উপলব্ধি মানুষের যুক্তির পদ্ধতিগত প্রয়োগক্ষমতার বাইরে থেকে গেছে। সে তার জীবনের জন্যে পথ এবং পদ্ধতিকে কখনো সম্পূর্ণ এবং জীবন্ত রূপরেখায় প্রত্যক্ষ্য করেনি।

এর ফলে মানুষের জন্য দু’টি পথ খোলা থাকে। একটি হচ্ছে জীবনের লাগামটাকে প্রবৃত্তির হাতে তুলে দেয়া এবং আত্মবিস্মৃতির শূণ্যগর্বে আত্মলীন হয়ে যাওয়া। অপরটি হচ্ছে জীবনবিমুখ হয়ে নিজের সত্তা থেকে পলায়নের চেষ্টা।

অর্থাৎ এমন এক অন্ধউপত্যকায় সমাহিত হওয়া, যা বর্ণ, গন্ধ এবং সবধরণের সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত। উভয়পথের যে কোনটাই মানুষের জন্য অবলম্বন করা সম্ভব। এজন্যে কয়েক কদম অগ্রসর হলেই এর তিক্ত ফলাফল ব্যক্তির মানস, রুচি ও চরিত্র থেকে শুরু করে সমাজশৃঙখলা ও মানবসমষ্টির জীবনের অঙ্গনে ভূমিকম্পের মতো প্রকাশ পেতে শুরু করে। মানুষের জীবন তখন উদ্দেশ্যহীন এবং এর ফলে অর্থহীন পরিক্রমায় উপনীত হয়। বিভিন্ন প্রতিকুল শক্তির সাথে মানসিক অস্থিরতা ও দ্বন্ধের মধ্য দিয়ে জীবেনর ঘানিটানাই হয়ে উঠে তার দিনরাত্রির সাধনা। সে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অহরহ পরিবর্তিত হতে চায়। সে বদলায় সুখের উপকরণ, পসন্দ ও অপসন্দ এবং সে তার অতৃপ্তি গোছাতে আরও নতুন কিছু প্রত্যাশা করতে থাকে।

এভাবে জীবনের কঠোর সংগ্রামে শক্তি যোগাবার ও নির্দেশনা দেবার কোন উচ্চতর পৃষ্টপোষকতার অস্বীকৃতির ফলে তার যাপিত দিবসটি বিস্তর ভোগ বিলাস ও অর্থকড়ির মধ্যেও পথের পৃষ্টায় অস্বস্থিকর কিছু বিক্ষিপ্ত পদচিহ্ণ ছাড়া কিছুই স্থাপন করেনা। এটা সেই বিভ্রান্তির ফল, ভুল গন্তব্যের কারণে যা অনিবার্য দাড়িয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো যে, বিভ্রান্তিপূর্ণ গন্তব্যের দিকে একবার পা বাড়ালে কোন জাতিগোষ্ঠীর গতিপথ পরিবর্তন করা পৃথিবীর সুকঠিন বিষয়সমূহের অন্যতম। যাত্রাপথে মাত্রা কমে বাড়ে, বাঁকবদল হয়, পথচলার সুবিধার্থেই এগুলো করতে হয়। কিন্তু মৌলিকভাবে পথপরিবর্তন, ভীষণ কঠিন ও সুদুরপরাহত। জার্মান দার্শনিক হেগেল এ বিষয়টা আঁচ করতে যাননি। এ কারণেই তার দ্বান্ধিক বস্তুবাদ মানবতার পক্ষে কোন সমাধান দিতে পারেনি। অন্যান্য দার্শনিকের বেলায়ও এরকমটাই ঘটেছে। তারা মানবজাতির একটা বিষয়ে সমাধান দিতে এসেছেন তো খন্ডিত সুরাহা উপস্থাপন করে আরো দশটি জায়গায় বিড়ম্বনা পাঁকিয়েছেন।

এ কারণে মানবজাতিকে তার সর্ববীধ উপকরণসহ অপেক্ষা করতে হয় সর্বশক্তিমানের আওয়াজ শুনার জন্য। যিনি মানবজাতি ও বিশ্বভূবনের স্রষ্টা। মানববিশ্বের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত যার কাছে সুস্পষ্ট এবং জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে কি কি বিষয়ের মুখোমুখি মানুষ হতে পারে, সবকিছুই তিনি অবগত। অতএব তার জন্যে এটা অযৌক্তিক ঠেকে যে, তিনি সর্বজ্ঞ হয়েও মানুষের মৌলিক জিজ্ঞাসার জবাব দেবেন না এবং মানুষ সৃষ্টি করেই ক্ষান্তি দেবেন, সর্বশক্তিমান হওয়া সত্তেও তিনি মানুষের জীবনযাত্রাকে কল্যাণপ্রসু করার জন্যে প্রয়োজনীয় বীধিব্যবস্থা নির্দেশ করবেন না।

বীধিব্যবস্থা তিনি অবশ্যই নির্দেশ করেছেন এবং সেটার নাম ওহী। ওহী কথাটার অর্থ হলো- কোন ব্যক্তির মনের বাসনা ঠোঁট নাড়াচাড়া ছাড়াই অন্যের কাছে গোপনে প্রকাশ করা। কিন্তু নবীর কাছে যে ওহী আসে, সেটা পদ্ধতির বিচারে গোপন হলেও প্রকৃত অর্থে সংগুপ্ত কিছু নয়।

জীবনের উষর প্রান্তর হতে সর্বশক্তিমানের কাছে নির্দেশনার বৃষ্টির জন্যে নির্বিরাম যে প্রার্থনা প্রয়োজনীয়তা ধ্বনিত হচ্ছে, তার জবাবে সেটা এক অলৌকিক সাড়া। কিংবা এভাবেও বলা যায় যে, ওহী হচ্ছে সৃষ্টির আয়োজন ও জীবনের রঙ্গশালার মর্ম, মনুষত্বের আত্মা এবং বিবেক ও প্রজ্ঞার সারসংক্ষেপ। পরম সত্যের রব্বানী উৎসমূল থেকে জ্যোতির্ময় বার্তাবাহকের মাধ্যমে মনোনীত পুরুষের অন্তকরণে এর অবতরণ ঘটে। রূহানী জগতে এক অখন্ড অভিজ্ঞতা নবীর মধ্যে অসামান্য রূপান্তর ঘটায়। বুদ্ধির চঞ্চল স্রোত সেই সমুদ্রের গভীরতম গহনে প্রবেশ করতে পারেনা।

জীবনের যা কিছু শাশ্বত, যা কিছু নিত্য এবং যা কিছু সুদুর বিসর্পিত-সব কিছু সহকারে, কিন্তু সবকিছুর উর্ধ্বে অসীম সত্তার এ এক দ্যুতির বিভাস, যার অনন্ত বিস্তৃতির মধ্যে সমস্ত আত্মা অবনত। ওহী আসে আর জীবন জেগে উঠে। মানুষ তার উদ্দিষ্ট খুঁজে পায়। জবাব খুঁজে পায় তার পরিচয় সম্পর্কে, কর্তব্য সম্পর্কে এবং গন্তব্য সম্পর্কে। সেখানে নির্দেশনা থাকে, সমর্পণের তাগিদ থাকে, থাকে তাওহীদের আহবান। মানুষের জন্যে উন্মুক্ত করা হয় বিশ্বাসকে, জীবনকে, শক্তিকে, সময়কে এবং বস্তুরাজি ব্যবহারের নীতিসম্বলিত কিতাব। সেই কিতাব সৃষ্টিকর্তার প্রকৃত পরিচয় ব্যক্ত করে মানুষের সাথে সৃষ্টিকর্তার সম্পর্কের আদি অন্ত ব্যক্ত করে এবং ব্যক্ত করে মানুষের সাথে সৃষ্টিজগতের সম্পর্কের ধরণ ও নীতিমালা। নবীর জীবন হয়ে উঠে সেই কিতাবের বাস্তব রূপায়ন। কিতাবের প্রতিটি সত্য নবীর জীবনাচারে মূর্ত হয়ে উঠে। ব্যক্তি, সমাজ ও গোটা মানববিশ্বকে একই সত্যের রেখার উপর দাঁড় করাতে চায়। এভাবেই গড়ে উঠে জীবনাদর্শ।
যদিও জীবন দর্শনের এই বুনিয়াদকে বস্তুবাদী দর্শন অস্বীকার করেছে। সে একে পরিহাসের বিষয় হিসেবে দেখেছে এবং প্রত্যাদেশ ও এর উৎস ধারাকে প্রত্যাখান করতে চেয়েছে।

ভলতেয়ার বলেছেন-‘পৃথিবীর ভবিষ্যত সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা না করেই ঘড়ি সংযোজনকারীর মতোই ইশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন’ এবং তিনি আরেকটু অগ্রসর হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন-‘কিন্তু আমরা ঘড়ি বানাতে দেখেছি, পৃথিবী কেউ বানিয়েছে তা দেখিনি। আর কেউ যদি তা বানিয়েই থাকে, তিনি অনুপযুক্তকর্মী অথবা কাজ সমাপ্ত করে অনেক আগে মারা গেছেন। কিংবা তিনি পুরুষ অথবা মহিলা ইশ্বর বা অনেক সংখ্যক ইশ্বর। তিনি সম্পূর্ণ ভালো, স¤পূর্ণই খারাপ অথবা দুই বা কোনটাই নন। সম্ভবত তিনি খারাপ’। সিগমন্ড ফ্রয়েড একে-‘বালক সূলভ মায়াবিভ্রম’ আখ্যায়িত করলেন। যে বিভ্রমের শক্তি নাকি নিহিত রয়েছে-‘আমাদের সহজাত আকাঙ্খার মধ্যে’। দার্শনিক হিউমে ওহী নি:সৃত জীবনাদর্শের সত্যকে এই বলে বাতিল করলেন যে,-‘এগুলো বিজ্ঞান বা মানবীয় প্রজ্ঞার দ্বারা প্রমাণ করা যায়না’।

হিউমে স্বীয় চিন্তায় প্রমাণ খুঁজে পাননি বলে দৃশ্যমান বাস্তবতার বাইরে যা কিছু থাকতে পারে, সবকিছু মিথ্যা বলে ঘোষণা দিলেন। ওহী তার কাছে মিথ্যা, জীবনাদর্শ মিথ্যা, বিশ্বব্যবস্থপনার নিয়ন্ত্রক মিথ্যা, মানুষের কর্মফল মিথ্যা, একমাত্র জড়ই সত্য; যেহেতু জড়ের অস্তিত্বের কথা তিনি জানেন। নিজের অবগতির বাইরের সত্যকে হিউমে অবাস্তব সাব্যস্থ করলেন। নিজের দেখাকেই সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত মীমাংসা বলে অভিহিত করলেন। যে মীমাংসা এতোটাই অসহিষ্ণু যে, তার সীমাবদ্ধ আওতার ভিতর স্থান পায়নি বলে অন্যসব বৃহৎ ও সম্ভাব্য বাস্তবতাকে অবাস্তব বলে চিৎকার জুড়ে দিলো। হিউমের এই চিৎকারকে কি বলা যায়?

হিজরতের-গল্প

আমাদের পাঁটি ইন্দ্রিয় যে বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করতে পারে, সে বাস্তবের সীমানা কতটুকু ? এটা একান্তই দুর কল্পনা যে, ইন্দ্রিয়ের অগোচরে আর কোন অস্তিত্বই নেই। হিউমের এই চিৎকার মানুষকে যা সে দেখতে ও মাপতে পারে তা ছাড়া অন্যসকল কিছুকে অস্বীকার করতে স্বীকার। অথচ অস্বীকার করে বসো থাকা, দর্শনের প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিশীল নয়। দর্শন হলো জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ, বৈচিত্রময় জগত ও জীবনকে আরও বেশি জানার কৌতুহল। রহস্য, তা যতই দুর্জ্ঞেয় হোক, মানুষ একে অতিক্রম করবে এবং বিস্ময়, জিজ্ঞাসা, জীবনের প্রয়োজন, আধ্যাত্মিক প্রেরণা, উদগ্র বাসনা ও সত্যের দ্বারোদঘাটন চেষ্টা থেকে দর্শনের উৎপত্তি।

কোন ব্যক্তি হৃদয়োৎসারিত চিন্তা বা জিজ্ঞাসা সত্যের নি:স্বার্থ অনুরাগ ও সুনিয়ন্ত্রিত ভাবনার মাঝে একটি দীর্ঘ পথ রয়েছে নিশ্চয়ই। সেখানে ইন্দ্রিয় একটি পথ, একটি উপায়, কিন্তু সত্যের জন্যে সকল রাস্তা ভ্রমণ করতে হয়। ঘটনা ও তথ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ও নির্ভুল ধারণা ইন্দ্রিায়ানুভুতির চূড়ান্ত লক্ষ্য। ইন্দ্রিানুভুতি সবদিক দিয়ে সফল হলেই কেবল লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে। যদি লক্ষ্য অর্জিত হয়, তাহলে তা হবে জ্ঞানের একটি উৎপত্তিস্থল। সেই জ্ঞান অন্তর্দৃষ্টি, নির্ভুল দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচার-বিশ্লেষণের ভারসাম্যের সামঞ্জস্যের মধ্য দিয়ে প্রজ্ঞায় উপনীত হবে। মানুষ জ্ঞানের স্বার্থক পরিণতি বিধানে প্রজ্ঞায় উপনীত হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তির প্রজ্ঞা মানেই অমোঘ সত্য নয়। মানুষের নানান সীমাবদ্ধতা এক্ষেত্রে তাকে অপরাগ করে দিয়েছে। এমতাবস্থায় কোন ব্যক্তির ইন্দ্রিয়ানুভুতির, যা জ্ঞানের প্রথম পর্যায় মাত্র, এর উপর ভর করে কোন বিষয়কে সর্বশেষ সত্য বা চূড়ান্ত অসত্য বলে ঘোষণা দেয়া বুদ্ধিবৃত্তিক হঠকারিতা কিংবা সীমালঙ্গন মাত্র।

হিউমের এই হঠকারিতা জড়বাদী বিবেকের কাছে আদর্শ বলে বিবেচিত হলো এবং দার্শনিকদের বড় এক জামাত সপোলকল্পিত এই অলীক অসার বস্তুবাদী ভ্রান্তিবিলাসকে পরিতুষ্টির আধার হিসেবে চর্বন করতে লাগলেন।

তারা একে আধুনিকতা বা নতুন চিন্তা বলে আখ্যায়িত করলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল হাজার হাজার বছর ধরে দার্শনিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মপূজার অব্যাহত এক বমন প্রক্রিয়া। দর্শনের জনকখ্যাত থেলিসের দর্শনে এই আত্মপূজা প্রকটিত হয়েছে। প্রকটিত হয়েছে অ্যানাক্সিম্যান্ডার, অ্যানাক্সিমেনিস, হিরাকলিয়াস, অ্যানাক্সাগোরসের চিন্তাধারায়। প্লেটো ও এরিষ্টটলের দর্শনে যদিও এই প্রথা বাধা পেয়েছিলো, কিন্তু কিছু দিন পরেই এপিকিউরিয়ান, ষ্টয়িক ও লিউক্রুটিয়াসের উদ্দেশ্যহীন দর্শনচর্চায় তা আবারও মাথা তুলে দাঁড়ালো। সেই ধারাবাহিকতা ইউরোপের সুদীর্ঘ অন্ধকার রজনী বা এজ অব ডার্কনেস অতিক্রম করে শোরগুল শুরু করলো থমাস হবসের চিন্তাধারায়, হিউমের রচনাবলীতে ডিটারোট লামেট্রি, হলব্যাক, জনটলেন্ড, কার্টডোগর, আর্নাস্টাহাইকেল, জনলক প্রমুখের দার্শনিকতায়।

কি ফলাফল হলো এই দার্শনিকতার ? ফলাফল হলো জীবনের বিকলাঙ্গ বিশ্লেষণ, বিশ্বজগত ও জীবনপরিক্রমাকে উদ্দেশ্যরহিত এক বিবর্তন ও মানব জীবনকে যাচ্ছেতাই এক পশুপণা সাব্যস্ত করা। মানবের জন্য এবং নিজেদের জন্য এইসব দার্শনিক অকুন্ঠ চিত্তে পশুপণাকে সাব্যস্ত করলেন। তারা সুউচ্চ নিনাদে ঘোষণা করেছেন-‘প্রত্যক্ষণের আওতায় আসেনা, অতএব মানবাত্মা বলতে কিছুই নেই। যদি থাকে, তাহলে সে নিছক জড় থেকে উদ্ভুত জটিল কোন উপবস্তু’। কারণ তারা দেখেছে সত্ত্বা কেবল রয়েছে জড়েরই। আত্মা, অনুভূতি বা চেতনার নেই কোন বস্তুসত্ত্বা। অতএব ‘চেতনা মস্তিস্কের কোষের অনবরত ঘর্ষণজনিত ফল ছাড়া আর কি হতে পারে’? আর মস্তিস্ককোষ ? সে তো ‘কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন গ্যাসের সমাহার’। এইসব দার্শনিক হৃদয়বৃত্তি, ইচ্ছা ও চেতনার কোন স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেছেন। তাদের মতে ইচ্ছা নিয়ন্ত্রিত জাগতিক নিয়মের দ্বারায়। পূর্ববর্তী ঘটনাই পরবর্তী ঘটনাকে অনিবার্য করে তুলে। আজকের কাজই নিয়ন্ত্রণ করে আগামীকালের কাজকে। কর্মপন্থা নির্বাচনে ব্যক্তির ইচ্ছার স্বাধীনতা এতাটাই অলীক কল্পনা, যতটা অলীক বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলার পিছনে সক্রিয় ইচ্ছার কার্যকারিতার বিশ্বাস! কেননা জড়বাদী দার্শনিকদের ধারণায় যান্ত্রিক কার্যকারণ দ্বারাই বিশ্বব্যবস্থা অস্তিত্বপ্রাপ্ত ও সক্রিয়। জড় ও গতির যে ক্রিয়া তার মূলে কোন উদ্দেশ্য নেই, থাকতে পারে না। অতএব কোন উদ্দেশ্য নেই জগতব্যবস্থাপণার কিংবা মানবজীবনের। সুতরাং মানবের জন্য জীবনবিধান-জড়বাদী বুদ্ধিতে এ এক অহেতুক ধারণা, উদ্ভট কল্পনা কিংবা এর পিছনে সুবিধাবাদী লোকদের স্বার্থ হাসিলের কোন চাতুরী রয়েছে!

অতএব এই চাতুরী থেকে বাঁচাবেন বলে মানুষকে কিভাবে জীবন যাপন করতে হবে তা নিজেরাই নির্দেশ করতে শুরু করলেন। তারা মানুষের উপর নিজেদের বিশেষ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন এবং অদৃশ্য প্রভূকে অস্বীকার করে নিজেদেরকে প্রভূ হিসেবে ভাবতে লাগলেন। তাদের দম্ভ বেড়ে গেলো এবং ডেজকার্টস ঘোষণা করলেন-‘আমাকে উপাদান দাও, আমি বিশ্বসৃষ্টি করবো’। মানুষ তাদের চোখে কোন মূল্য নিয়েই বেঁচে রইলোনা। কেননা বিজ্ঞানের সাহায্যে তারা ইচ্ছা করলে মানুষ বানাতে পারেন! এক বিজ্ঞানী মানুষ বানাবার জন্য কি কি জিনিষের প্রয়োজন এর হিসেব করে লিখলেন-‘সাত টুকরো সাবান তৈরী করা যায়, এতটুকু পরিমাণ তৈল, দিয়েশলাইর একশ বিশটি কাটির শীর্ষে আগুন ধরানো যায়, এতটুকু পরিমাণ ফসফরাস, এক ঢোকে পান করার মতো লবণ-ম্যাগনেসিয়াম, কয়েকটি মাঝারি দণ্ড বানাতে প্রয়োজন হয় এতটুকু পরিমাণ লোহা, অল্প চুনা, যা দিয়ে মুরগীর খোঁপের চুনকাম করা যায়, কুকুরের চর্ম পরিস্কার করতে যতটুকু লাগে, সেই পরিমাণ কর্পুর এবং কিছু পানি; এইসব মৌল উপাদান ইচ্ছে করলেই জড়ো করা যায় এবং মানুষ মানাবার জন্য এগুলোর অতিরিক্ত আর কিছুরই প্রয়োজন নেই’। যে মানুষকে বিজ্ঞানীরা চাইলেই বানাতে পারেন, তাকে কিভাবে জীবন যাপন করতে হবে, সেটা কেন বলে দিতে পারবেন না, আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মদাতা (!) বস্তুবাদী দার্শনিকরা ? অত্যন্ত স্বাভাবিক বিবেচনায় তারা সেটি করতে চেয়েছেন।

ফ্রান্সিস বেকন ও রজার বেকন মানুষের ‘উদ্দেশ্যহীন’ ও ‘অসার জীবনকে সার্থক করার জন্য প্রেগমেটিজম এর প্রচার করেছেন। বাস্তবধর্মীতা, বাস্তব শিক্ষার জন্য কার্যকারণের প্রতি লক্ষ্য রেখে ভাল মন্দের বিচার, ফলাফল দ্বারা যুক্তি ও নীতির বিচার, এই হচ্ছে প্রেগমিটিজম বা প্রয়োগবাদ। এর সার কথা হচ্ছে লাভই সত্যের মাপকাঠি। প্রত্যেকটি ব্যাপারে জাগতিক ফলাফল কি হবে, এটাই হচ্ছে বিবেচ্য বিষয়। ‘যা লাভ, তাই সত্য’ এর চেয়ে বড় সত্য আর হতে পারে না। যেখানে সুবিধা, সেখানেই নীতি এবং স্বার্থচেতনাই হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম। সুবিধাই হচ্ছে ইশ্বর। ফ্রান্সিস বেকন ও রজা বেকনের এই দর্শনকে এই সভ্যতা মূল্যবোধের আধুনিক মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছে। যার ফলে মানুষকে ধূর্ত শৃগাল কিংবা হিংস্র হায়েনা হওয়া ছাড়া কোনই পথ থাকেনা। ইতালীর দার্শনিক মেকিয়াভেলি আরেকটু অগ্রসর হয়ে তাকে সরাসরি শৃগাল ও সিংহ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি তার দি প্রিন্স গ্রন্থে লিখেছেন-‘একজন নেতাকে কাজ করার জন্যে শৃগাল এবং সিংহের অনুসরণ করতে হবে। সিংহা নিজেকে ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে পারেনা এবং শৃগাল নিজেকে নেকড়ের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনা। অতএব একজন নেতাকে ফাঁদ চেনার জন্য শৃগাল এবং নেকড়েকে ভীত করার জন্য সিংহ হতে হবে। যারা কেবল সিংহ হতে চান, তারা এটা বুঝেন না।——যদি সকল মানুষ ভাল হতো, তাহলে এই উপদেশ অঠিক হতো। কিন্তু যেহেতু তারা খারাপ এবং তোমার সঙ্গে বিশ্বাস রক্ষা করবেনা, অতএব তুমিও তাদের সঙ্গে বিশ্বাস রক্ষায় বাধ্য নও। ——-তবে এই চরিত্র গোপন রাখা প্রয়োজন এবং ভান করা, কপটতা দেখানো খুবই ভালো। মানুষ এতই সরল এবং বর্তমান প্রয়োজনকে মেনে নিতে এতই প্রস্তুত যে, যিনি প্রতারণা করবেন, তিনিই দেখবেন যে, প্রতারিতরাই প্রতারণার সুযোগ দিয়েছে’।

ইংল্যান্ডের জনস্টুয়ার্টমিল ও বেন্থাম উপযোগবাদী ছিলেন। তারা ব্যক্তির সুখ কোথায় এবং সমাজ ও রাষ্ট্র কি প্রক্রিয়ায় সমৃদ্ধ হবে- এর রূপরেখা তালাশ করলেন বাস্তব চাহিদার ভিতর। তাদের মতে প্রত্যেক জিনিষের বিচার তার প্রয়োজনীয়তা দেখে করতে হবে। মানুষের আনন্দ-বেদনার যেসব রাজনৈতিক ধর্মীয় এবং বাহ্যিক ও ব্যবহারিক দিক রয়েছে, সেগুলোকে এমনভাবে রাষ্ট্রনায়করা পরিচালনা করবেন, যাতে অধিকসংখ্যক লোক অধিক পরিমাণে আনন্দ পেতে পারে। ‘অধিক সংখ্যক লোকের অধিক পরিমাণ আনন্দই উদ্দেশ্য’। কিন্তু যখন অধিক পরিমাণে আনন্দ লক্ষ্য হয়, তখন সেটা অধিক সংখ্যক লোক পায়না, পেতে পারেনা এবং অধিক পরিমাণ আনন্দই উদ্দেশ্য, তখন কতক ক্ষেত্র এমনও ধরা পড়ে, যা অধিক আনন্দের জন্য চাই, কিন্তু ধর্ম ও নৈতিকতা নিষেধ করে, এক্ষেত্রে সুরাহা কোথায় ? সুরাহার ভার তখন বাস্তব চাহিদার উপর ছেড়ে দেয়া হবে। অথচ বাস্তব চাহিদা এমন এক বিষয় যা অন্ধ, একরৈখিক এবং স্থূল। কখনো সে পথভ্রষ্ট, সে ধ্বংসাত্মক, কিংবা কখনো প্রকৃতিবিরোধী। আফিমখোর পূজা করে তার অভ্যাসের। কিন্তু আফিম সেবন তার প্রকৃতি নয়।

প্রকৃতির বিরূপ বা কতগুলো কৃত্রিম অভ্যাসের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মাত্র। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাকে আফিম সেবন করতে হবে। কেননা সে এতে অধিক পরিমাণে আনন্দ খুজে পেয়েছে। রাষ্ট্রের কাজ যেহেতু অধিক পরিমাণে আনন্দ দান, অতএব আফিম সেবনে রাষ্ট্রকে সেবক হতে হবে! স্টুয়ার্টমিল ও বেন্থামের চিন্তাধারা আধুনিক সমাজে সামাজিক সমস্যা সমাধানের প্রধান উপায় ও সভ্যতার একমাত্র মানদন্ড বলে স্বীকৃত। এর পাশাপাশি প্রভাবশালী হিসেবে রয়েছে নিহিলিজম-ঘোর অবিশ্বাস। ধর্ম, রাষ্ট্র ও বর্তমান সমস্ত ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলে নতুন কিছু গঠন করা নিহিলিজমের প্রয়োজন। এর অন্ধ উগ্রতা থেকে বারকুনিন ও ক্রোপথকিনের নৈরাজ্যবাদ ও নিরিশ্বরবাদ জন্ম নিয়েছে। যার অসহিষ্ণু ফলশ্র“তি হলো কম্যুনিজম ও সিডনিক্যালিজমের ধর্ম-নৈতিকতাবিরোধী রণধ্বনি। কম্যুনিজমের উপর যেভাবে নিহিলিজমের ঘোরতর আসর, তেমনি ব্যক্তিবাদ-পূঁিজবাদের উপর রয়েছে ম্যারকান্টাইলিজমের আসর। এর মূল কথা হলো জাতীয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যকলাপ রাষ্ট্রের দ্বারা এভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, যাতে জাতীয় উন্নয়ন অব্যাহত গতিতে চলে। এজন্য ব্যক্তিকে বড় করে দেখতে হবে। ব্যক্তির ধন, ব্যক্তির স্বাধীনতা, ব্যক্তির স্বাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ। এই মতবাদ রাষ্ট্রের অধিক কর্তৃত্বের ফলে জন্ম নেয়া গণঅসন্তুষ্টির পরিণতি। ইউরোপে যা ছিল, রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল সর্বেসর্বা, জনগণের সর্বোচ্চ বিধাতা। ম্যারকান্টাইলিজমে ব্যক্তির ভূমিকাকে মূল গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তি অধিকারের নামে সূচিত হলেও তা ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করতে পারলোনা। ব্যক্তিকে কর্তৃত্ব দিলো, বিধাতার কর্তৃত্ব এবং জন্ম দিল ধনবাদের। যা দুনিয়ার সেরা জিনিষ আর সবাইকে বঞ্চিত করে ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে ভোগ করার জন্য। ব্যক্তি এখানে খোলস মাত্র, ভোগলিপ্সাই আসল বিধাতা। যাকে পরিতুষ্ট করার জন্য সবরকম অর্ঘ্য নিবেদন করবে সে। এতে আরো দৈত্যকার হবে ভোগলিপ্সা, বাড়তে থাকবে তার চাহিদা। সে ব্যক্তির হৃদয়-মনে দিবস-রজনী চিৎকার করতে থাকবে-‘আরো চাই আরো চাই’।

what is the purpose of my life

ভোগবাদের এই প্রকৃতিবিরুদ্ধ ভয়াবহতার ভিতর আরেকটি বিপদের জ্বালামুখ রয়েছে-সেটি হলো জৈবিক ক্ষেত্রে ধর্ম ও নৈতিকতার নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি। বস্তুবাদী দার্শনিকরা অবাধ জৈবিকতার পক্ষে সোচ্চার। এ ক্ষেত্রে বাধা দিতে পারতো ধর্ম, কিন্তু এটি তো তাদের কাছে একদম গাজাখোরী ব্যাপার। আর নৈতিকতা সেটি তো ইন্দ্রিয়সুখেই সমাহিত। রুশোর বক্তব্য হলো-‘ব্যবহার এবং সুখই নৈতিকতার মান নির্ণায়ক’। ‘যত বেশি সম্ভব আনন্দ ও সুখ উপভোগ করো’। এইসব দার্শনিক হচ্ছেন আধুনিক সভ্যতার পয়গাম্বর, যাদের মানবেতর দর্শনের উপর গড়ে উঠেছে তথাকথিত আধুনিক জীবনপদ্ধতি। এই পয়গাম্বরদেরই এক অগ্রসৈনিক হলেন সিগমন্ড ফ্রয়েড। তিনি মানুষকে শিখালেন জীবনের সবকিছুই পাশবিক আবেগ থেকে উৎসারিত। মানুষের কামুক মন, সুখস্বাদ আস্বাদন ও যৌনকামনা চরিতার্থ করার উদগ্র লালসায় নিমজ্জিত। তাকে তা পূরণ করতে না দেয়া হলে জীবন অর্থহীন। তার মতে শিশুটি জন্ম নিয়েই মায়ের দিকে যৌন আকাঙ্খা নিয়ে তাকায়। সে তার ইচ্ছা পূরণ করতে চায়, কিন্তু সেই সামর্থ তার নেই। অবচেতন স্তর, প্রাগচেতন স্তর ও চেতনস্তর- এই তিনটি উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবে ঘটে ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি। এর মধ্যে যেটি শিশুর জন্মলগ্নে আত্মপ্রকাশ করে, সেটি ঈদ বা ঈদম (আদিসত্তা) সকলপ্রকার যৌনকামনা, সুখ, তৃপ্তি, আনন্দ ও চাহিদার প্রতিভূ হলো ঈদ। তার শুধু চাই আর চাই। ঈদের জন্যই শিশু যা পায়, তাই খেতে চায়। যাকে পায় তাকে ভোগ করতে চায়। এমতাবস্থায় আত্মপ্রকাশ করে ইগো বা অহম। ইগো তাকে বারণ করে বলে যে, সবকিছু খাওয়া যায়না, সবাইকে ভোগ করা যায়না। ঈদ ও ইগো সম্মিলিতভাবে নতুন কিছুর জন্য চেষ্টা করে। উদ্দেশ্য ব্যক্তির চাহিদা পূরণ। তারা নীতিনৈতিকতা বুঝে না। শুধুই বুঝে ভোগ আর ভোগ। তাদের তৎপরতা সামাজিক নানা বিধিনিষেধের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার উপক্রম যখন হয় তখন ব্যক্তিত্বের আরেকটি উপাদান জেগে উঠে। সেটি হলো সুপার ইগো। সুপার ইগো সমাজ ও বিধিনিষেধের দৃষ্টি এড়াতে কামনা সমূহকে সরাসরি প্রকাশ হতে না দিয়ে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। প্রেম, ভালবাসা, ঘৃণা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, সাহস, ভয়-ভীতি, দু:খ-বেদনা ইত্যাদি মানবীয় হৃদয়াবেগের বিভিন্ন রূপ হওয়া সত্তেও এ সবের উৎস হচ্ছে একটি মৌলিক আবেগ। আর তা হচ্ছে যৌনস্পৃহা, যৌনকামনা। এই যৌনকামনাই মানুষের হৃদয়ে ক্রমাগতভাবে ছটপট করতে থাকে। নানা ছদ্মবেশে তা আত্মপ্রকাশ করে। যৌনকামনার এই ছদ্মবেশীরূপ হচ্ছে কথাবার্তা, স্নেহ-মমতা, সামাজিক নিয়ম কানুন, ধর্ম ও মতবাদ, পরিবার ব্যবস্থা, হাসি-কৌতুক, ভুল-ভ্রান্তি, স্বপ্ন-কল্পনা, পূজা-ইবাদত ইত্যাদি। আধুনিক সভ্যতা তার এই পয়গাম্বরের দর্শনকে গ্রহণ করে মানুষের যৌন আকাঙ্খাকে একেবারে বেসামাল করে দিয়েছে। সে তার শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতিসহ প্রতিটি দিককে যৌনতার আবেগ দিয়ে সর্বাত্মকভাবে প্লাবিত করেছে। যেহেতু যৌনতা আসল, অতএব এর অভিপ্রকাশ জীবনেরই চিত্রায়ণ। অশ্লীল আর শ্লিল বলে কিছু নেই। কামলুলূপ কে নয় ? প্রত্যেকেই যৌনতার দাস। তাহলে এর ভাষ্যচিত্র বা দৃশ্যরূপায়নে সীমারেখা একে দেয়া জীবনের অমিয় আস্বাদ কিংবা জীবনের বিশ্লেষণের অবাধ পরিক্রমাকে বাধাগ্রস্থ করার শামিল। এটি সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং আধুনিকতা মানেই জীবনের যৌনসত্তাকে সব সীমারেখার উর্ধে স্থান দেয়া। এর নাম ব্যক্তির মুক্তি। আর মুক্ত সমাজ হলো এমন সামাজিক পরিবেশ যেখানে নারী-পুরুষ সর্বত্র সমানভাবে নাক পর্যন্ত ডুবে যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের বিকাশের যাবতীয় উপাদান। যৌনক্ষুধা নিবৃত করা ছাড়া মানুষ স্বীয় অস্তিত্বকে পর্যন্ত বিকশিত ও বাস্তবায়িত করতে পারেনা। ধর্ম, নৈতিকতা, সমাজ বা ঐতিহ্য-এইসব বাধা-প্রতিবন্ধকতা বাতিল মূল্যহীন। এগুলোকে অবশ্যই নির্মুল করতে হবে। অন্তত যেন বাধা দিতে না পারে। এই হলো ফ্রয়েডের ওসওসার ফলশ্র“তি। অবাধ জৈবিকতার দর্শন বিতরণে আধুনিক সভ্যতার পয়গাম্বর ফ্রয়েড একা নন। একই আওয়াজ মার্কসের কন্ঠেও। মার্কসের বক্তব্য হলো- ‘যৌনপবিত্রতা গ্রামীণ সমাজের সামন্তবাদী চারিত্রিক বৈশিষ্টের অবশিষ্ট। এর যা কিছু মূল্য, তা সামন্তবাদী সমাজে অর্থনৈতিক স্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলো’। দরখায়েম বললেন-‘লোকেরা মনে করে ধর্ম সেসব চিন্তাভাবনার ফসল, যা প্রকৃতিগত শক্তি সৃষ্টি করে। কিংবা কতিপয় বিরল বরেণ্য ব্যক্তির মনে আসে। কিন্তু এ পদ্ধতিটিকে সামষ্টিক প্রপঞ্চের উপর আরোপ করা সম্ভব নয়। তবে এসব প্রবঞ্চের প্রকৃতিই বদলে দেয়া হলে ভিন্ন কথা’। শুধু তাই নয়, তার মতে-‘কোনো কোনো মনীষী মানুষের স্বভাবগত ধর্মীয় স্নেহ-বাৎসল্য আছে বলে মনে করেছে। আর শেষ মতটি যৌনচেতনা, পিতা-মাতার সাথে ভালো আচরণ এবং সন্তানের প্রতি স্নেহ-বাৎসল্য প্রভৃতিতে সংমিশ্রিত। আবার অনেকে এই ধর্ম, বিয়ে, পরিবার প্রভৃতির উদ্ভব হওয়ার ব্যাখ্যা এভাবে দিতে চেয়েছে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের বলছে, এইসব ভাবধারা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে বর্তমান নেই’। কিন্তু তাদের এইসব উদ্ভট বক্তব্য মানবপ্রকৃতিকে পশুত্বের মধ্যে লীন করে দেয়ার আহবান হিসেবে পুরোপুরি কার্যকর বলে মনে হচ্ছিলনা। এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে মানবসত্তার ভিতর চরিত্রের অতন্দ্র প্রহরা বিদ্যমান। অতএব চরিত্রকে তারা অস্বীকার করে বসলেন। পাপ বলতে কোনো কিছুই থাকলোনা তাদের অভিধানে। দরখায়েম বললেন-‘পাপ নিতান্তই কাল্পনিক জিনিষ। বিয়ে স্বভাবসম্মত নয়। নৈতিকতা সম্পর্কে সেভাবে কথা বলা যায়না যে, তা স্থিতিশীল সত্তা। তার সবই সামষ্টিক বিবেক বুদ্ধির সৃষ্টি, যা একই অবস্থায় স্থায়ী থাকতে পারেনা। তা এক অপজিট থেকে অপর অপজিটের দিকে পরিবর্তিত হতে থাকে। কালমার্কস বলেছেন-‘চরিত্র হচ্ছে বিবর্তনশীল অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন, যা সব সময়ই পরিবর্তন সাপেক্ষ। তা কোনো স্থায়ী মূল্যমান নয়’। ফ্রয়েড বলেছেন-‘চরিত্র শোষণের চিহ্ণ। মানবতার পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর’। চরিত্রকে খুন করার পর তাদের সম্মুখে পথটি হয়ে গেলো প্রশস্ত। সেই পথ ছিলো জীবনের বিকৃতি ও বিপন্নতার। জীবন সুস্থ ও সচ্ছন্দ সক্রিয় ও গতিমান হয়ে চলবে, সেই সাথে তাতে নৈতিক বিপর্যয়ও থাকবে, এটা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। নৈতিক বিপর্যয় জীবনের বিপর্যয়ের ফলশ্র“তি। জীবনের বিকৃতি ও বিপর্যয়ের অনিবার্য পরিণতি হলো সেই দেখার দৃষ্টি যা মানবজীবনে নৈতিকতাকে অহেতুক বৈ দেখেনা। এ এক ভয়াবহ দেওলিয়াত্ব, মানবেতর চিন্তাধারা, যা এই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি নির্দেশক যে, মনুষ্য সত্তার পতন ধেয়ে আসছে। কেননা প্রকৃতি ও নৈতিকতা অভিন্ন আইনের অধীন এ দু’টি মানুষের পূর্ণাঙ্গ সত্তা ও মানবীয় প্রকৃতি, জীবন ও চরিত্র উভয়ের উৎস।

কিন্তু ইউরোপীয় দর্শন কোনোকালেই এর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারেনি। খৃষ্টধর্মের বৈরাঙ্গ যৌনসম্পর্কের স্বাভাবিকতাকে পর্যন্ত অস্বীকার এবং নারীর মানবীয় সত্তাকে পর্যন্ত অবজ্ঞা করে বসেছিলো। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে সেখানকার দর্শন যৌনউশৃঙ্খলা ও নারীর প্রকৃতিবিরুদ্ধ অবস্থানের গ্রীক উত্তরাধিকার নিয়ে গির্জার বিরুদ্ধে দাড়াতে সচেষ্ট হয়। যেহেতু এই উত্তরাধিকার থেকে এর চেয়ে বেশি কিছুই তাদের পাওয়ার ছিলোনা। অতএব একচক্ষু দার্শনিকের জন্ম হওয়া ছিলো স্বাভাবিক। মার্কস-ফ্রয়েড-দরখায়ন সেই স্বাভাবিকতার শর্ত পূরণ করেছেন মাত্র। পাশ্চাত্যের যৌনউশৃঙ্খলা মূলত জীবনের প্রকৃতিবিরুদ্ধ দর্শনের সন্তান। এর জন্মসূত্র রয়েছে গ্রীক ও রোমান চিন্তার ধারবাহিকতায়। গ্রীকদের দৃষ্টিতে মানুষের নগ্ন শরীরে সৌন্দর্য চরম উৎকর্ষ লাভ করেছে। নর-নারীর নগ্ন দেহই শিল্পকলার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। শরীরের সার্বিক উন্নয়নের জন্যে খেলাধুলাকে খুবই উৎসাহ দেয়া হতো। ইশ্বরকে সন্তুষ্ট করার অভিপ্রায় উন্মুক্ত ষ্টেডিয়ামে নিয়মিত ক্রীড়া অনুষ্ঠিত হতো। অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়রা থাকতো সম্পূর্ণ বিবস্ত্র। হাজার হাজার মানুষ উৎসবের আমেজে তা উপভোগ করতো। যৌনতার জন্যে সবকিছুই ছিলো বৈধ। গ্রীক দর্শন তার নিশ্চয়তা বিধান করেছিলো। যেখানে যতো যৌন অরাজকতা, সেটাই ততো আদর্শ সমাজ, আদর্শ পরিবেশ।

প্লেটো তার রিপাবলিক গ্রন্থে স্বীয় গুরু সক্রেটিসের মুখ দিয়ে কল্পিত সুখরাজ্য তথা একটি আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-‘‘গ্লোকোন সক্রেটিসকে প্রশ্ন করলো: ‘তুমি কি মনে করো প্রহরারত কুকুরদের মধ্যে পুরুষ কুকুর যে কাজ করে মাদী কুকুরকেও তা করা উচিত ? অথবা পুরুষ কুকুরদের সঙ্গে মাদী কুকুরদের শিকার করা উচিত ? অথবা বাচ্চা জন্ম এবং লালনের জন্যে তাদের কুকুরশালায় রাখা উচিত এবং পুরুষ কুকুরদের কি শক্ত কাজের সঙ্গে দলের রক্ষণাবেক্ষণও করা উচিত?’ সক্রেটিস বললেন-‘তাদেরকে সবকিছু একসঙ্গে করতে হবে। পুরুষ শক্তিশালী এবং মাদী দুর্বল শুধুমাত্র এই ধারণা ছাড়া’। ‘কিন্তু একই প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান না দিয়ে তুমি কি পশুদেরকে একই কাজে ব্যবহার করতে পারবে?’ সক্রেটিস বললেন ‘অসম্ভব … … এখন পুরুষদেরকে গান এবং শরীর চর্চা শিখানো হয়। সুতরাং মহিলাদেরকেও এ দু’টি শিল্প শিখতে হবে এবং একইভাবে তাদের কাজে লাগাতে হবে। কুস্তির স্কুলে আমরা পুরুষদের সঙ্গে মহিলাদেরকেও নগ্ন অবস্থায় ব্যায়াম করতে দেখতে চাই। শুধু যুবতী নয়, বৃদ্ধাদেরকেও। ব্যায়ামাগারে বৃদ্ধদের সঙ্গে বৃদ্ধাদেরকেও (আমরা বিজড়িত অবস্থায়) এবড়ো থেবড়ো দেখতে চাই। যারা খেলায় এখনও সুন্দর শুধু তাদেরকে দেখতে ভালো লাগে না … …

আমরা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখতে পেয়েছি এসব জিনিষ লুকিয়ে রাখার চাইতে বিবস্ত্র করা ভালো। চোখের ভালোর চাইতে যুক্তিতে যা ভালো, তাই শ্রেষ্ট। এইসব মহিলাদেরকে পুরুষদের সাধারণ সম্পত্তি হতে হবে। কোন ব্যক্তিরই নিজস্ব ব্যক্তিগত স্ত্রী থাকা উচিত নয়। সন্তানরাও হবে সাধারণ সম্পত্তি। (সমকামিতা ইত্যাদির জন্য, যদিও বলেননি, কিন্তু উদ্দেশ্য এটাই)। পিতা-মাতা তার সন্তান চিনবেনা এবং সন্তানরাও পিতা-মাতা চিনবেনা।’ ‘আমি তোমার বাড়ীতে শিকারী কুকুর এবং খেলার পাখি দেখেছি। তুমি কি কোনদিন তাদের মিলন অথবা প্রজননের দিকে নজর দিয়েছো ?’ ‘এরপর আমাদের সিদ্ধান্ত-শ্রেষ্ট পুরুষদের শ্রেষ্ট মহিলাদের সঙ্গে মেশা উচিত এবং কেবলমাত্র শ্রেষ্ট লোকদের লালন করা উচিত… ত্র“টিপূর্ণ সন্তান জন্মালে তার জন্য খাদ্য এবং লালন পালন ব্যবস্থা নেই, এই যুক্তিতে তাকে সরিয়ে দিতে হবে।’’

প্লেটো আদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজের যে রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন, এর বিকশিত রূপ হচ্ছে আজকের আধুনিকতা, ইউরোপ-আমেরিকার সামাজিক উদারতা। শিল্পবিপ্লব এর বিকাশে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পারিবারিক ও দাম্পত্যজীবনকে অবজ্ঞা করে নব্যযুবকরা এসময় গ্রাম এলাকা থেকে শহরে এলো। যেখানে নৈতিক বন্ধন ছিলো সম্পূর্ণ শিথিল। এ যুবকদের পর্যাপ্ত আয়ের স্বপ্ন দেখানো হলেও তারা ঠকলো। পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনের নতুন ভিত্তি স্থাপন ও তার সুরক্ষার অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিচ্ছিলনা পুঁজিপতিদের আচরণ। ফলে ঝুঁকি ও দায়িত্বপূর্ণ এ পথ পরিহার করে সহজ ও সস্তা উপায়ে যৌন লালসা চরিতার্থ করার সুযোগকে তারা গ্রহণ করলো। এদিকে মার্কস, ফ্রয়েড, দরখায়েম নৈতিক চরিত্রকে ঠাট্রা বিদ্রুপ করে চরমভাবে লাঞ্চিত করলেন। নারীদের আহবান জানালেন যৌন উচ্ছৃঙ্খলা প্রদর্শন করতে। এ কাজ করলেই নাকি নারীরা পুরুষের পাশে থাকতে পারবে সমানাধিকার নিয়ে। সমানাধিকার চাই। অতএব চারদিক থেকে সকল পথে বেরিয়ে এসে নারীদের যৌন কাজকর্মে অংশ গ্রহণ চাই। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও নারী-পুরুষকে কাছাকাছি থাকতে হবে। আগ্রহ শিক্ষার প্রতি এবং নারী-পুরুষের কাছাকাছি অবস্থান শিক্ষাকে আনন্দপূর্ণ করবে। নতুবা শিক্ষা আকর্ষণ শূণ্য। নারীর অনুপস্থিতি শিক্ষার চাহিদাকে বিপথগামী করবে। যৌন কর্মকান্ডের অভিজ্ঞতাও শিক্ষার অংশ। এর অন্যতা মানেই প্রতিক্রিয়াশীলতা, পশ্চাদগামিতা।

সিনেমা আবিস্কৃত হলো, রেডিও, টিভি ছড়িয়ে পড়লো। বেশি বেশি যৌনস্বাদ আস্বাদনের জন্য মানুষকে পাগল বানাবার প্রচেষ্টা জোরদার হলো। সাজঘর, রূপচর্চার কেন্দ্র, নারী-পুরুষের অবাধ মেলা-মেশার নানা অনুষ্ঠান ব্যবিচারের লীলাখেলাকে স্বাভাবিকতা দিলো। দেহ ব্যবসায়ের বড় বড় আড্ডাখানা গড়ে উঠলো যত্রতত্র। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষকে কাছাকাছি এনে তাদেরকে যৌনতার দিকে উদ্বুদ্ব ও আকৃষ্ট করার উদযোগ পরিণত হলো নিয়মে। সাহিত্য ও প্রচার মাধ্যমে নারীদের হাস্য-লাস্য, নৃত্য, মান-অভিমান ও অনুরাগ-বিরাগের সকল পন্থা ও প্রক্রিয়া যুবকদের শিখিয়ে যৌনতার ক্ষেত্রে তাদেরকে অধিকতর আগ্রহী ও প্রশিক্ষিত করা হচ্ছিলো। ভোগ-সম্ভোগ ও স্বাদ-আস্বাদনকেই বুঝানো হলো জীবন। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কাজে পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভোগ ও সম্ভোগে আত্মনিমগ্ন থাকা বাঞ্চনীয়। জীবন সংক্ষিপ্ত এক মহাসুযোগ। এতে কোনো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সুযোগকেও হারানো যায়না। যৌন স্বাদ আস্বাদ হলো আধুনিকতায় দীক্ষিত যুবক-যুবতীর ধর্ম। এ ছিলো এমন এক সুড়ঙ-যার ভেতরে প্রলুব্ধকারী অনেক কিছুই ছিলো। কিন্তু ছিলনা তার শেষ প্রান্ত। পরিতৃপ্তি এর অভিধানে ছিলনা। অতএব যতই ভুগান্ধ হোক সে আরও ভোগের পিপাসায় কাতর। যতই সম্ভোগম্ত্ত থাকুক তার অতৃপ্তি ততই লেলিহান অগ্নিশিখা হয়ে সমগ্র সত্তায় অষ্টপ্রহর দাউ দাউ করতে থাকে। এর উপসর্গ সমূহ প্রকাশ পায় নানা অপরাধ এবং অপরাধের মধ্যে তৃপ্তি তালাশের মধ্য দিয়ে। জন্মনিয়ন্ত্রণের ঔষধ ও প্রক্রিয়াসমূহ যৌনতার ফলে সৃষ্টি না হয়ে পারছিলোনা। একে জনপ্রিয় করে তোলা হলো। সতীত্ব, চারিত্রিক পবিত্রতা ও লজ্জা-শরমের নামগন্ধটুকুও মুছে ফেলার প্রচেষ্টা অনেক দূর এগিয়ে গেলো। পুরুষরা চারিত্রিক দেওলিয়াত্বের জন্যে গর্ববোধ করতে লাগলো। নারীরা নির্লজ্জতায় পুরুষকে অতিক্রম করার আওয়াজ তুললো। পারিবারিক ও বিবাহিত জীবনের বুনিয়াদ থর থর করে কেঁপে উঠলো। বৈবাহিক সম্পর্ককে দেখা হলো ক্ষণিকের এক আয়োজন হিসেবে। প্রমত্তযৌনতা ছড়িয়ে পড়লো পথে-ঘাটে, রাজপথে, পাঠাগার-লাইব্রেরীতে, ক্লাশকক্ষে, শিল্পোৎপাদনক্ষেত্রে, বনে-জঙ্গলে, সমুদ্রতীরে, সাময়িক বা স্থায়ী ক্যাম্পসমূহে, যানবাহনে, রাত ও দিনে, যেখানে সেখানে। আধুনিক পুরুষ ও নারী স্বামীত্ব ও স্ত্রীত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত হলো, বন্ধু ও বান্ধবীতে পরিণত হলো। এই বন্ধুত্বের ভিত্তি কেবলই যৌনতা ও প্রবৃত্তির পাশবিক পিপাসা, এর বিকাশ যৌন উত্তেজনায় উত্তেজিত দু’টি উত্তপ্ত দেহের চাহিদাসমূহের যথেচ্ছ অভিপ্রকাশে। নারী সব সময় প্রস্তুত, পুরুষ ও সর্বত্র যথাসম্ভব আকর্ষণীয় হয়ে উপস্থিত; অতএব নতুন সম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে কোনো দিক থেকেই অসুবিধা নেই। অসুবিধা নেই এই সম্পর্ক ধরে রাখায়, অন্তত যতদিন যৌনসম্পর্ক রক্ষার ক্ষমতা স্থায়ী থাকে। এ বিষয়টি পরিণত হলো আধুনিক সমস্ত দর্শনের দর্শনে। লেখকগণ তাদের প্রকাশ ক্ষমতা ও বর্ণনা বিশ্লেষণের প্রতিভাকে নিয়োজিত করলেন এর পক্ষপাতিত্বে। এটাই হয়ে দাড়ালো সবকিছুর মর্মবস্ত। এটাই উদ্দিষ্ট হয়ে উঠলো প্রত্যেকের। চতুর্দিক থেকে শুনা যাচ্ছিলো দুর্দশার পদধ্বনি। অভূতপূর্ব অস্থিরতার মধ্য দিয়ে সভ্যতার কেন্দ্রীয় ইউনিট পরিবারের বিরুদ্ধে দাড়ালো অবক্ষয়গ্রস্থ যৌবন। গুরুতর বিকৃতি-বিপর্যয় ও অসহিষ্ণু অস্বীকৃতি সবকিছু গ্রাস করে নিলো। ধর্ম যাতে কোন বিষয় না হয়, এ জন্যে তার বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ দাড় করানো হলো। তার ভূমিকাকে জীবন থেকে নির্বাসিত করে নিরপেক্ষতার নামে অর্থহীনতায় পর্যবসিত করা হলো।

যতদুর সম্ভব গৃহকর্তী ও মাতৃত্বকে আকর্ষণহীন, অহেতুক ও বন্দিত্ব হিসেবে চিত্রিত করে সর্বত্রই সর্বোত্তম উপায়ে নারীর প্রলুব্ধকর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হলো। চিরাচরিত নারীর ভূমিকাকে তাচ্ছিল্য সহকারে দেখানো হলো এবং স্বামীর ভূমিকাকে অস্বীকার করে পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে নারীকে ডাক দেয়া হলো। নারীদেহের বাণিজ্যিক রূপ সর্বত্রই ফুটিয়ে তোলা হলো। সবরকমভাবে তার দেহকে উন্মোচিত করা হলো এবং এর দিকে প্রলুব্ধ করা হলো যুবকদের। যুবকরা উন্মাদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো। এক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাচ্ছন্দের জন্য বয়স্কদের প্রতি দায়িত্ব থেকে সে অব্যাহতি কামনা করলো। বয়স্ক পিতা-মাতাকে দেখা হলো বোঝা হিসেবে। যৌনকাজে অক্ষম বৃদ্ধরা হয়ে উঠলো গুরুত্বহীন বস্তু কিংবা জীবন্ত এক সামাজিক দায়। প্রত্যেকেই চেষ্টা করলো বয়সকে লুকিয়ে রাখতে ও যৌবনকে ধরে রাখতে। এটাই কাম্য আধুনিক নারী-পুরুষের এবং এর অন্যথায় জীবনের সমূহ ব্যর্থতা সে প্রত্যক্ষ করে। সে জানে স্বাস্থ্য এবং সুখ যৌন জীবনের উপর নির্ভরশীল। অতএব সেরা জিনিষ থেকে সে বঞ্চিত হওয়ার ব্যাপারে ভীত থাকে। পঞ্চাশ বছরের মহিলা বিশ বছরের যুবতীর গঠন না থাকায় নিজেকে অপরাধী মনে করে। যুবকরা নিজেদের আকর্ষণীয় রাখার জন্যে স্বর্গ-মর্ত্য মন্থন করে তার কাছে ব্যক্তিগত সুখের বাইরে আর কিছুই ভাবার যোগ্য নয়, পরিবার-পরিবেশ ও আত্মীয়স্বজনের বাধন সামাজিক প্রথার চেয়ে অধিক মূল্য রাখেনা। আধুনিক মানুষ এ থেকে মুক্তির মধ্যে প্রত্যক্ষ করে ব্যক্তিস্বাধীনতা। কেননা সে নিজের জন্যেই সৃজিত হয়েছে। কামসুখ কিংবা বস্তুগত লাভালাভ ছাড়া কারো সাথে সম্পর্কিত হওয়ার মধ্যে তার হারাবার রয়েছে অনেক কিছু, কিন্তু পাওয়ার কিছু নেই। সে মানুষকে দেখবে সে কি, এ পরিচয় নয়, বরং তার চেহারাটা কেমন কিংবা তার ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি কতটুকু, এ পরিচয়ে। ফলে পৃথিবীটা পাশবিক খেয়ালে ভরপুর এক জঙ্গলে পরিণত হয়েছে এবং মানুষ উপনীত হয়েছে সর্বকালের বিচারে মানবেতর এক দূর্ভিক্ষণে। এই দূর্ভিক্ষণকে প্রণোদিত করেছেন ডারউইন যতটা, আর কেউই সম্ভবত এর ধারে কাছে যেতে পারেন নি। তার ক্রমবিকাশ তত্ত্বকে গ্রহণ করে মানুষ কথিত পাশবিক পূর্বপুরুষের স্বভাব গ্রহণ করেছে। চারদিকে পশুসুলভ রীতিনীতির প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া তারই অনিবার্য পরিণতি।

দুর্বলের ধ্বংস ও বিলয় এবং বলশালীর স্থায়িত্ব অনিবার্য করে যে দ্বন্দ্ব ও সংশয়পূর্ণ ফলাফল, তা শক্তিমানের ঠিকে থাকা ও দুর্বলের বিলুপ্তিকে আধুনিক বিবেকের কাছে যুক্তি হিসেবে পবিত্রতা দিয়েছে। এর এক বিন্দু অন্যথা পাশ্চাত্য সমাজের কাছে অস্বাভাবিক। পরিণামে জোর যার মুল্লুক তার নীতি শ্বাশ্বত ও চরম সত্যরূপে আধুনিক সমাজ ও পৃথিবীতে অধিষ্ঠান পেয়েছে। ডারউইনের তত্ত্ব যেভাবে আধুনিক বিবেক থেকে আল্লাহর বিশ্বাসকে নির্বাসিত করেছে, তেমনি তৈরী করেছে এক মনস্তুাত্বিক আবর্তন, যেখানে সে প্রতিটি ঘূর্ণিপাকে নিজের সর্বত্র পশুসত্বার উল্লস্ফনকে চূড়ান্ত বাস্তবতা হিসেবে জানে। মানবিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যমানসমূহ এর ফলে চূর্ণবিচুর্ণ হয়ে গেলো।

আধুনিক মানুষকে ডারউইন শিখালেন- জীবনটাই এক ক্রমবিকাশমূলক কার্যক্রম। একটি অতিনগন্য সুক্ষè কীট থেকে শুরু হয়ে বিবর্তনের ধারা অবলম্বন করে বানর স্তর পেরিয়ে আজকের মানুষ। এই যে ক্রমবিকাশ, এর কার্যকারণ একান্তভাবে জৈবিক, রাসায়নিক ও যান্ত্রিক। কোনো স্রষ্টা বা উর্ধ্বতন শক্তি নয়, বরং কালের ঘাত-প্রতিঘাতের সাথে শক্তি পরীক্ষা এবং কোটি কোটি বছরের ক্রমাগত প্রাকৃতিক নির্বাচন ও ক্রমঅভিব্যক্তি প্রবণতা একটি সুক্ষèাতিসুক্ষè জীবকোষকে বিকাশ দান ও রূপান্তর সাধন করে দিয়েছে মানুষের আকৃতি ও অপরাপর প্রাণীর আকৃতি। প্রাণের সেই প্রথম জীবকোষ সৃষ্টি হয়েছিলো মৌল উপাদানের কোনো প্রাথমিক আকস্মিক সংঘাতের ফলে। ডারউইনের এই তত্ত্ব হাজারো ফাক ও ফাকিসহ বৈজ্ঞানিক যুক্তি-প্রমাণের আচ্ছাদনে যেই মাত্র আত্মপ্রকাশ করলো, মানবতা, মনুষ্যত্ব, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার বিপরীতে নিরাপদ দূর্গ হিসেবে এতে প্রবেশ করলো আধুনিক মানুষ। সে তার সমস্ত পাশবিকতার পক্ষে শেষ পর্যন্ত ডারউইনকেই প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে দেখতে পেলো। এর পক্ষে ওকালতি করার জন্য স্রষ্টায় অবিশ্বাসী কম্যুনিজম তার সামর্থকে নিবেদিত করলো। দাড়িয়ে গেলেন বহু দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী ডারউইনের তত্ত্বের রক্ষীর ভূমিকায়। যদিও ডারউইনের তত্ত্ব কাল্পনিক গল্পের অধিক কোনো তাৎপর্য রাখে না বলে শেষ পর্যন্ত নাস্তিক শিবির থেকেই আওয়াজ উচ্চকিত হয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে- ‘চাঁদে এক বুড়ি আছে … …’ জাতীয় গল্পকারদের ধারাবাহিকতায় গল্প বলিয়ে ডারউইন বৈচিত্র ও নতুনত্বের গুণসহ দুনিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণকারী সর্বশেষ ব্যক্তি। দার্শনিকদের কল্পরাজ্যের সাথে এর একটি কাব্যময় সহাবস্থান ছিলো এবং এরকম উর্বর ও উন্নত কল্পনা বিলাসে বস্তুবাদী দর্শনের সংগ্রহশালা ভরপুর।

আমরা যদি বস্তুবাদী দর্শনের এই ভ্রান্তিবিলাসের ফাঁদে না জড়াই তাহলে দেখবো, নিরন্তর যাত্রাপথে বহুবিদ জীবনাদর্শের সাথে মানবজাতির মুলাকাত হয়েছে। এসব জীবনাদর্শ স্ব স্ব কালে বিপর্যস্ত মানব বিশ্বের পুনর্গঠন এবং মানবাত্মার যন্ত্রণার পথ্য উপস্থাপন করেছে। পৃথিবী যখন সর্বনাশের কাদামাটিতে খাবি খায়, সমাজ যখন আরণ্যক হয়ে উঠে, মানুষ যখন মনুষত্ব হারায়, সংস্কৃতি যখন বিবেককে অস্বীকার করে, সভ্যতা যখন পাঁড়-মাতাল হয়ে উঠে, নেতৃত্ব যখন দস্যু ডাকাতের হাতে চলে যায়, মানবতার তখন দূর্ভিক্ষণ।

মানবতার দূর্ভিক্ষণ যখন অমাবস্যাপ্রহরে উপনীত হয়, যখন পরম প্রভুকে অস্বীকার করে মানুষ সেজে বসে মানুষের প্রভু, রাজন্যবর্গ নিজেদের খোদার স্থলাভিষিক্ত বলে ভাবতে থাকে এবং মানবগোষ্ঠীকে পরিণত করতে চায় স্বীয দাসানুদাসে, তখন মানবতার জন্য ঐশী নির্দেশনার বিকল্প থাকেনা। খোদায়ী ব্যবস্থাপনায় পৃথিবীতে তখন নবীর আগমন ঘটে।

তিনি ধর্মের নামে অধর্ম, সভ্যতার নামে বর্বরতা, শিক্ষার নামে কূপমন্ডুকতা এবং সংস্কৃতির নামে চেপে বসা জাহিলিয়াতকে মূলোৎপাঠিত করেন। তার লক্ষ্য থাকে মানুষকে মানুষ ও অন্যান্য প্রতিমার পায়ের তলা থেকে উদ্ধার করে তার প্রকৃত মহিমা প্রতিষ্ঠা করা। সত্যিকার প্রভু যিনি, তার সেজদায় অবনত করা। লা-শরীক আল্লাহ ছাড়া অন্যসব মিথ্যা প্রভুর স্বৈরাচারকে নিশ্চিহ্ণ করা। এই মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি শিক্ষিত, পরিশিলীত ও সচেতন করে তুলেন মানবসম্প্রদায়কে।

তিনি মানুষের উদ্দেশ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাকে অবগত করে জানিয়ে দেন তার প্রকৃত পরিচয়, দায়িত্ব ও শেষ পরিণতির কথা। জীবন ও জগতের এক অখন্ড দর্শনে তিনি মানবতাকে অবলোকন করেন। যা মানুষের জীবনপথে সংশয় ও জিজ্ঞাসাসমূহের অর্থবহ সদুত্তর নিশ্চিত করে এবং প্রতিটি প্রেক্ষাপটে দিক নির্দেশনা বাতলে দেয়।

তিনি ভীতি প্রদর্শন করেন, সুসংবাদও দান করেন। তিনি সভ্যতা, সদাচার ও মানবীয় ঐশ্বর্যের বসন্তকাল সূচনা করেন। তার হাত দিয়ে সূচিত হয় সুকৃতির ধারা, প্রশান্তির প্রবাহ আর নিরাপদ জীবনের কালপর্ব। নবীর হেদায়েত থেকে মানবতা গ্রহণ করে দয়া, সততা, ইনসাফ, দারিদ্রের সাহায্য, এতীমের প্রতিপালন ও পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের শিক্ষা। মানবতা গ্রহণ করে মার্জিত রুচি, সুষম জীবন পদ্ধতি ও উন্নত জীবনের দীক্ষা। নবী স্বীয় সমাজে দৃঢ়ভিত্তি লাভ করেছে যে ব্যাধি, তাকে দুরীভূত করেন এবং তার জাতি-গোষ্ঠীকে নতুন আলোর ঝরণাধারায় স্নাত ও পুলকিত করেন। মূল লক্ষ্যের দিকে তাদের প্রত্যেকেরই দাওয়াত এক ও অভিন্ন। কিন্তু তাদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করতে চাইলে বড়জোর এটাই লক্ষ্য করা যায় যে, তাদের প্রত্যেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র বৈশিষ্টে উজ্জ্বল। কারো মাঝে পাওয়া যায় দরদী আহবায়ক চরিত্রের প্রাধান্য। কারো মধ্যে পাওয়া যায় নির্ভীক মুজাহিদ চরিত্রের প্রাধান্য। কারো মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠে আপোষহীন সংস্কারকের নজীরবিহীন ঔজ্জল্য। কোনো কোনো নবী আইন প্রনয়ন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকে পূর্ণতা দিয়েছেন। কারো হাতে অধিকতর ফলবন্ত হয়েছে জনগণের আধ্যাত্মিক শুদ্ধি ও নৈতিক পরিগঠনের বাগান। কেউ রাজ ক্ষমতায় আসীন হয়ে সাম্য ও জনগণের নিরাপত্তা বিধানকে প্রতিফলিত করেছেন। কারো মধ্যে বিশেষভাবে প্রস্ফুটন পেয়েছে নির্জন সাধনা ও আল্লাহর পরাক্রমের সামনে নিবেদনের বিনয়।

নবী একসময় পৃথিবী থেকে বিদায় হন, তার জীবনাদর্শকে তখন অনুসারীদের মাধ্যমে টিকে থাকতে হয়। কালের ব্যবধানে মানুষের মূঢ়তা এবং চিত্তের দীনতা সেই জীবনাদর্শের দ্বীপশিখাকে নির্বাপিত করে দেয়। মানুষ স্বীয় স্বার্থে বিকৃত করে দেয় তার শিক্ষা ও সত্যকে। তাওহীদের পরিবর্তে সমাজে জেঁকে বসে শিরিকের বর্জ্য। স্বৈরাচার অধিষ্টিত হয় মানুষের চিত্তে, দখল করে নেয় জীবনের যা ছিলো বিত্ত। নবীর অনুসৃত জীবনাদর্শকে বিকৃত করা হয় এবং কর্মের পথ ও পরিণতি সম্পর্কে মানুষ নিশ্চিদ্র এক অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়। ফলে যা অনিবার্য, সব ধরনের অনাচার গ্রাস করতে থাকে মানুষের মানস ও সমাজের নিয়মকে। এজন্যে মানবতার জন্যে অপরিহার্য দাড়ায় এমন এক মহামানব, যার মাধ্যমে নবুওতি মিশনের পূর্ণতা সাধিত হবে। কোন বিশেষ ক্ষেত্র বা দিক নয়, বরং জীবনের প্রতিটি অঙনকে তিনি প্লাবিত করবেন হেদায়াতের আলোকধারায় । মানুষের জন্যে যতগুলো সদগুণ হতে পারে, সব কিছুর মুর্তপ্রতিক হবেন তিনি । কোনো বিশেষ সংস্কার নয়, বরং গোটা জীবনকে তিনি নির্মান করবেন অখন্ড আলোকমালায়। তাঁর জীবনাদর্শ প্রতিকুলতার মোকাবেলায় সুরক্ষিত এবং ঝড়-তুফানের মোকাবেলায় থাকবে অভঙ্গুর। সেই আদর্শের জন্যে যথাযথ বিদ্যমানতার নিশ্চয়তা থাকবে। এবং আদর্শটি হবে সবার জন্য সর্বোপোযোগী। যাতে মানবতার যখন যে প্রয়োজন এক্ষেত্রে ঐষী নির্দেশনা কী, সে সম্পর্কে নিঃসংসয় হওয়া যায় এবং পরিবর্তিত যেকোন পরিস্থিতিতে তার অনুস্বরন করা যায়। কোনো নিদৃষ্ট জাতি কিংবা দেশের পরিসীমায় তার হেদায়েত আবদ্ধ থাকবেনা। বরং বিচিত্র স্বভাব, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাবধারার প্রতিটি জনগোষ্ঠী এই জীবনাদর্শে খুজে পাবে স্ব স্ব সংকটের সমাধান।

ইসরাইল বংশের সর্বশেষ প্রভাবশালী নবী ঈসা মাসিহ আ. প্রবর্তিত জীবনাদর্শ পাদ্রী-পুরোহিত ও রাজন্যবর্গের স্বার্থের কিরিচে যখন কর্তিত হতে লাগলো, তারপর থেকে সেই প্রয়োজনীয়তা দিন দিন ব্যাপক ও সুতীব্র হতে লাগলো। খৃস্টধর্মে তাওহীদের যে বাতিটা প্রবল অন্ধকারে মিটিমিটি জ্বলছিলো, সেন্টপলের প্রবল ফুঁৎকারে তা নিভে গেলো। পৌত্তলিকতা , মিসরীয় নব্যপ্লেটোবাদ, ও বৈরাগ্যবাদের সাথে কাল্পনিক কাহিনী ও বিকৃত ব্যাখ্যার স্থায়ী বসতি গড়ে উঠলো। ফলে তা এতোটাই নি¯প্রাণ হলো যে দুনিয়ার বিস্তৃত অঙনে ব্যাপকতর চাঞ্চল্য ও বলিষ্ট বিপ্লবের জন্ম দেবে তো দুরে থাক, মানুষের আচ্ছন্ন চিন্তার ডোবাপুকুরে ঢেউ জাগাবার শক্তিও খুইয়ে বসলো । খৃস্টধর্মের সৌধটাই গড়ে উঠেছে কর্মময় জীবনের প্রতি উদাসিন্য এবং ইহজগতের তাবৎ কোলাহলকে অস্বীকার করে পরজগতের জন্য ইশ্বর কামনা ও প্রচেষ্টার উপর। ভাবজগতের পবিত্র চিন্তাই হয়ে উঠলো খৃস্টিয় জীবনের চরম ও চূড়ান্ত লক্ষ্য। এবং এ জন্যে সামাজিক শান্তি, নিরাপত্তা, ইনসাফ, বিচার, আইন কানুন ইত্যাদি থেকে যথাসম্ভব দূরত্ব অবলম্বন মোক্ষ লাভের অনুষঙ্গ হয়ে দাড়ালো। ইশ্বরপ্রাপ্তির অপরিহার্য নিয়মের নিগড় ইশ্বরের সন্তানদের করে দিলো জীবনবিচ্ছিন্ন আর জীবনের সাম্রাজ্যের রাজাধিরাজ বানিয়ে দিলো শয়তানকে! জ্ঞান- গবেষণা, চিন্তা-অনুসন্ধিৎসা ও মানুষের বুুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের পথে খৃস্টধর্ম দাড়িয়ে গেলো বাধার দুর্লংঘ্য প্রাচীরের মতো । শিক্ষাঙ্গন আর গীর্জা একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলো। ফলে গীর্জার পথভ্রষ্টতা শিক্ষাঙ্গনকে খোদাদ্রোহী হওয়ার পথ দেখালো। পোপতন্ত্র হয়ে উঠলো বিপদজনক ও সেচ্ছাচারী এবং রাজন্যবর্গ নিজেদের তৈরি করা ধর্মনিরপেক্ষ আইন কানুন ও নীতিমাল দ্বারা সমাজগঠন ও তার পূণর্বিন্যাসে উদ্যোগী হলো। নৈতিকতাকে তারা ধরে নিয়েছিলো একান্তই ধর্মের ব্যাপার। ফলে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রথা-পদ্ধতির শরীর থেকে বন্যপ্রাণীর হিংস্রতা টপকাতে লাগলো। নীতিকথা আর চিত্তাকর্ষক শ্লোগানের আড়ালে বিভিন্ন ইজমের নামে তারা যা প্রতিষ্টিত করলো, চেঙ্গিসী উত্তরাধিকার ছাড়া তা আর কিছুই হলোনা।

নবীজীবন- সীরাত

ঈসা মসিহ আ. এর পূর্বে বনী ইসরাইলের নবী হযরত মুসা আ. ঐষী প্রত্যাদেশসহ প্রেরিত হয়েছিলেন। কিন্তু যে জাতি পয়গাম্বরদে কে হত্যা করতে অভ্যস্থ,তারা মুসা আ. এর ঐষী গ্রন্থকেও অক্ষত রাখলোনা। ইহুদীরা ইচ্ছেমতো একে রদবদল করলো। যেহেতু তারা নিজেদেরকে আল্লার সন্তান বলে ভাবতো, নবুওয়াতকে নিজেদের ঘরোয়া ব্যাপার জানতো, স্বর্গীয় কল্যাণকে নিজেদের গোষ্টিগত সম্পত্তি জ্ঞান করতো, তাই তাওরাতকে তারা যাচ্ছেতাই বিকৃত করতে মোটেও দ্বিধাবোধ করেনি। অবশেষে তারাও পৌত্তলিকতায় লিপ্ত হয়ে গেলো। ফলে তাদের ধর্মগ্রন্থের আবেদন মানুষের চিত্তজয়ের সামর্থ হারিয়ে ফেললো। ইহুদী ধর্ম শুস্কতা-অনার্দ্রতার মরভূমিতে পরিণত হলো। সমাজদেহের উপর যা ছিল পক্ষাঘাতের চিহ্ন। কতিপয় নি¯প্রাণ প্রথা, আইনের অচর্চিত খোলস এবং এমন কথিপয় গোষ্ঠীস্বার্থের জগদ্দল শিলার সমাহার, যা থেকে জীবন ছিলো পলায়নপর। মানুষ এর কবলে কাতঁরাচ্ছিলো এবং যাবতিয় সৃজনশীলতার দরোজায় শিকল এঁটে দিচ্ছিলো এই সব যুক্তিহীন প্রথা-পদ্ধতি। ইহুদীদের এই বিকৃতির সংস্কারের জন্যেই আগমন ঘটে ঈসা মাসীহের আ.। কিন্তু সংস্কার তিনি যা করলেন, তা আবারো সেই চক্রে পড়ে গেলো, যে চক্র নি:শেষ করে দিয়েছিলো মুসার আ. শিক্ষার প্রাণশক্তি। পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই তখন ঐষী আলোর কোন বিকিরণ ছিলোনা। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি ধর্ম মূলত পৌত্তলিকতা ও কল্পিত ভাবধারার উপর দণ্ডায়মান ছিলো। এবং মানুষের পূজার জন্যে ধর্মের নামে নতুন নতুন দেবতার লাইসেন্সের দোকান খুলে বসেছিলো। ভারতভূমিতে বর্ণবাদী ব্রাক্ষণ্যধর্মের ৩৩কোটি দেবতার যাতাকলে সাধারণ মানুষের মাথা তুলার কোন ভরসাই রইলোনা।ব্রাক্ষণ্যবাদী দুর্নিতির মোকাবেলায় বেদের বাণী ছিলো অসহায়। চীনা জাতি মৃত আতœার পূজা-আর্চনার চেয়ে বড় কোনো সত্য থাকতে পারে- এটা ভাবতেই পারতোনা। কনফুসিয়াসের দর্শন তাদেরকে এ থেকে টলাতে পারেনি। পারস্য সম্রাজ্যে জনগণ অগ্নিপুজা আর রাজা-বদশাহদের পায়ের তলায় মাথা ঠুকতে ঠুকতে তখন সর্বস্বান্ত। এ থেকে তাদের পরিত্রাণের কোন সম্ভাবনাই গোচরীভূত হচ্ছিলোনা । আরব উপদ্বীপটি জাহান্নামের দিকে অগ্রযাত্রায় সবার সম্মুখে ছিলো। পৌত্তলিকতা লাভ করেছিলো ভয়াবহ বিস্তার। সব ধরণের হীনকর্মের মতো মূর্তিপূজার অপ্রহিত গতিকে রুখে দাড়াবার সামর্থ ছিলো না বিকৃত হওয়া দ্বীনে হানিফের ।

এমতাবস্থায় গোটা বিশ্বের সর্বত্রই বিপর্যয় ও প্রলয়বাদ্য ধ্বনিত হচ্ছিলো। মনুষত্য ছিলো পলায়নপর। সামগ্রিকভাবে মানবতা নিপিষ্ট ছিলো জাহিলিয়াতের যাতাকলে। মহামানবের আগমনের জন্যে এরচেয়ে উপযুক্ত সময় আর আসেনি। গোটা পৃথিবী যেন একটা সুবিশাল স্টেজ হয়ে তার আগমনের পূর্বমুহুর্তে থরথর করে কাঁপছিলো।

ঐষীবাণীর সর্বশেষ স্ফুলিঙ্গকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে আরবরাই ছিলো আল্লাহর পছন্দ। পৃথিবীর নাভীমূলের এই উপদ্বীপে মক্কা নগরীতে হেরা পর্বতে ধ্যানরত অবস্থায় আরবের সবচে বিশ্বস্থ, সবচে আস্থাভাজন এবং সবচে নিষ্কুলষ মানুষটি সহসা অলৌকিক বার্তাবাহকের সম্ভোধনে সচকিত হলেন। বার্তাবাহক পৃথিবীতে অবতরণ করলেন সর্বশক্তিমানের প্রত্যাদেশ নিয়ে। যে প্রত্যাদেশ মানবজাতির জন্যে মুক্তি ও কল্যানের সর্বশেষ, স¤পূর্ণ ও সুনিশ্চিত ব্যবস্থাপত্র হিসেবে সুরক্ষিত থাকবে।

পাঠ করার নির্দেশ দিয়ে সূচিত সেই ঐষী বিধান মানবজাতির বিশ্বাস, অনুসন্ধিৎসা, জ্ঞানচর্চা, সাম্য, প্রগতি, সামাজিক বন্ধন, বিশ্বভ্রাতৃত্ব সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নতির দরজা খোলে দেবে।


Author: মুসা আল হাফিজ

Source: Natun Dak

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: