Categories
ইসলামের ইতিহাস

বিস্ময়কর জানিসারি বাহিনী

দুর্ধর্ষ এক যোদ্ধা বাহিনী। বীর বিক্রম। মৃত্যুভয় নেই। তুফানের মতো ধেয়ে আসে। সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহূর্তে উড়িয়ে দেয় সব। যেন মানুষ নয়; মানুষরূপী অসুর। বিশাল বিশাল সৈন্যবাহিনী বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়েও জানিসারিদের কাছে নাস্তানাবুদ হয়। সাহসিকতা, বীরত্ব ও রণকৌশলে এই বাহিনী ছিলো প্রবাদতুল্য।

ওসমানি সাম্রাজ্যের পদাতিক বাহিনীর একটি বিশেষ শাখার নাম জানিসারি। ‘জানিসারি’ তুর্কি শব্দ; যার অর্থ ‘নতুন সেনা’।

তাদের একমাত্র কাজ ও ধ্যান-জ্ঞান হবে যুদ্ধ

মূল তুর্কি উচ্চারণ ‘ইয়ানিচারি’- সেটাই ইংরেজিতে হয়ে গেছে ‘জানিসারি’। আবার কিছুটা বিকৃত করে আরবিতে বলা হয় ‘ইনকিশারি’। ১৩২৬ খৃস্টাব্দে মসনদে বসা ওসমানি সুলতান প্রথম ওরখানের আমলে এই বাহিনীর জন্ম। একদিন সুলতানের উযির আলাউদ্দিন জরুরি এক পরামর্শ নিয়ে এলেন। প্রস্তাব করলেন, ‘বিভিন্ন যুদ্ধে তুর্কিদের হাতে আটক হওয়া বন্দীদের মধ্যে তরুণ ও কিশোরদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়া হোক। পাশাপাশি দেয়া হোক ইসলামের জ্ঞান। নিজ দেশ ও পরিবারের সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ থাকবে না। সুলতান হবেন এই তরুণদের আধ্যাত্মিক পিতা। তাদের একমাত্র কাজ ও ধ্যান-জ্ঞান হবে যুদ্ধ।’ এই পরিকল্পনা অনুসারেই জানিসারি বাহিনীর প্রতিষ্ঠা।

প্রথমে বন্দীদের নিয়ে শুরু হলেও পরে এই বাহিনীতে নিয়মিত খৃস্টান ছেলেদের ভর্তি করা হতো। নিয়ম করা হয়েছিলো, প্রতি পরিবারের পাঁচ ছেলে থেকে একজনকে এই বাহিনীতে ভর্তি করা বাধ্যতামূলক।

শৈশবে এদের ভর্তি করে নির্দিষ্ট ছাউনিতে প্রতিপালন করা হতো। যুদ্ধবিদ্যার পাশাপাশি ইসলামের তালিম দেয়া হতো। অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিদ্যাও শেখানো হতো।

ওসমানি সুলতানরা যদিও খৃস্টানদের সাথে যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করতেন, ধর্ম-কর্ম ও উৎসব পালনে স্বাধীনতা দিতেন- কিন্তু সন্তানদের এভাবে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করায় তারা ক্ষুব্ধ ছিলো। অবশ্য কোনো কোনো ঐতিহাসিক বাধ্যতামূলক ভর্তির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এদিকে জানিসারি বাহিনীর আকার দিনে দিনে বাড়তে থাকলো। ১৬৮০ সালে তাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলো ৫৪,২২২ জনে।

কঠোর জীবনযাপন

জানিসারিদের জীবনযাপন করতে হতো কঠোর নিয়ম কানুনের মধ্যে। আত্মীয়-স্বজনের সাথে যোগাযোগের সুযোগ ছিলো না। যুদ্ধ না চললেও তাদের ছাউনিতে থাকতে হতো। রান্নাঘর, অস্ত্রগুদাম ও প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা ছাউনিতেই ছিলো। সরকারি ভাতা পেতো সবাই। নিজে উপার্জনের অনুমতি ছিলো না। নির্দিষ্ট নিয়মে তাদের পদোন্নতি ও অবসর দেয়া হতো। জানিসারিদের প্রধানকে বলা হতো ‘জানিসারি আগা’। সা¤্রাজ্যের সর্বাধিক শক্তিশালী পদাতিক ফৌজের প্রধান হওয়ায় জানিসারি আগা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বিবেচিত হতেন। তিনি ইস্তাম্বুলে অবস্থান করতেন। সা¤্রাজ্যের নিরাপত্তারক্ষা ও শৃঙ্খলাবিধানের দায়িত্বও তাঁর উপর ন্যস্ত থাকতো।

শৈশব থেকে যুদ্ধ নিয়ে বেড়ে ওঠা, পরিবারের পিছুটান না থাকা ও শাহাদাতের প্রবল আগ্রহ থাকায় জানিসারিরা হতো মৃত্যুভয়হীন। এই বাহিনীর কল্যাণে ওসমানি সুলতানরা এমন এমন অঞ্চল জয় করেছিলেন যেগুলো ইসলামের ইতিহাসে আগে কখনও বিজিত হয়নি।

সুদূর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা পর্যন্ত তাদের সা¤্রাজ্য বিস্তৃত হয়েছিলো। ১৪৫৩ সালে সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ্ কনস্টান্টিনোপল বিজয়েও জানিসারিদের বিরাট ভূমিকা ছিলো। যুদ্ধ-বিগ্রহে তারাই ছিলো ওসমানিদের সবচেয়ে বড় ভরসা। তাদেরকে সামনে মোকাবেলায় পাঠিয়ে সুলতান ও অন্যান্য কর্মকর্তারা পেছনে অবস্থান করতেন।ওসমানি সা¤্রাজ্য ও ওসমানি আমলের মুসলমানদের অনেক গৌরবগাঁথার সাক্ষী এই জানিসারি বাহিনী।

সংস্কারের প্রয়াস ও প্রক্রিয়া

কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য, জানিসারিদের শুরুর ইতিহাস যতটা গৌরবময়, শেষের ইতিহাস ততই করুণ।

এই বাহিনীর উপর সুলতানদের অত্যধিক নির্ভরতাই কাল হয়েছিলো। ক্রমে অহংকারী হয়ে ওঠলো জানিসারিরা। শুধু সৈনিক হয়ে থাকা তাদের পছন্দ হলো না; রাজকীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও হস্তক্ষেপ করতে লাগলো। বড় বড় প্রভাবশালী সুলতানদের আমলে তারা বেশি সুবিধা করতে পারেনি। যখন সা¤্রাজ্য কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লো, জানিসারিদের ক্ষমতা আরও বেড়ে গেলো। অবস্থা এমন দাঁড়ালো- সুলতানের ক্ষমতায় থাকা-না থাকাও তাদের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লো।

১৬২২ সনে তারা সুলতান দ্বিতীয় ওসমানকে পদচ্যুত করে হত্যা করে। ১৬৪৮ সালে সুলতান প্রথম ইবরাহিমকে ফাঁসি দেয় শুধু এই অজুহাতে- তিনি নাকি তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করেন। দুর্বল সুলতানদের তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করার ছিলো না। অনেক উযীরও তাদের আক্রোশের শিকার হয়েছেন। সুলতান চতুর্থ মুরাদের আমলে ১৬৩২ সালে তারা প্রধানমন্ত্রী হাসান পাশাকে হত্যা করে।জানিসারিরা সুলতানের নির্দেশ প্রকাশ্যে অমান্য করতেও আর কুণ্ঠাবোধ করতো না।

সাম্রাজ্যের দুর্বলতা ও বিভিন্ন যুদ্ধে ওসমানি ফৌজের পরাজয়ের পর সেনাবাহিনীতে সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিলো। ইউরোপীয় সৈন্যদের মতো কামান ব্যবহার করার সময় এলো। প্রয়োজন হলো ফৌজের বিধিমালা পরিবর্তনেরও। ওসমানি সুলতানরা সংস্কার প্রক্রিয়ায় হাত দিলেন; কিন্তু বাধ সাধলো জানিসারিরা। তারা জেদ ধরলো, ‘সংস্কার করা চলবে না’। কোনোভাবেই বোঝানো গেলো না তাদেরকে। একের পর এক সব সুলতানই ব্যর্থ হতে থাকলেন। অবশেষে ১৮০৮ সালে সুলতান হলেন দ্বিতীয় মাহমুদ। তিনি জানিসারিদের নানাভাবে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে চাইলেন; সব ব্যর্থ হলো। অবশেষে বাধ্যতামূলক সংস্কারের প্রয়াস চালালেন। নতুন কিছু ফরমান জারি করলেন- যার মধ্যে জানিসারিদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করার হুকুমও ছিলো। প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল পাশার উপর এই নির্দেশমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়লো। কিন্তু ফল হলো একটাই, প্রধানমন্ত্রী প্রাণ হারালেন!

জানিসারিদের নির্মম পরিণতি

প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ আঠার বছর ধৈর্য ধরলেন। অবশেষে ১৮২৬ সালে ২৭ মে সুলতান একটি বৈঠকের আয়োজন করলেন- যাতে ফৌজের বড় বড় অফিসার, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও অন্যান্য গণ্যমান্যরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে জানিসারিদের সংস্কারের পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়। শাইখুল ইসলাম (ওসমানি আমলের প্রধান ধর্মীয় নেতার উপাধি) সংস্কারকে ওয়াজিব বলে ফতোয়া দেন। কিন্তু হায়, তারপরও জেদ ছাড়লো না জানিসারিরা। উল্টো এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে ইস্তাম্বুলের রাজপথে বিক্ষোভ করতে লাগলো। শুধু তাই নয়, আশপাশের বাড়িঘর, দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনায় চালাতে লাগলো হামলা ও অগ্নিসংযোগ।এবার আর কোনো উপায় ছিলো না সুলতানের। জানিসরারিদের দমন করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

ইতিহাসের এ অংশটি বড় করুণ। সুলতান ফৌজের বিভিন্ন বাহিনী তলব করলেন। ডাক পড়লো গোলন্দাজ বাহিনীরও। ১৮২৬ সালের ১৫ জুন সকালে সুলতানের ফৌজ ইস্তাম্বুলে জানিসারিদের ছাউনির দিকে রওনা হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই গোলন্দাজ বাহিনী ছাউনি ঘেরাও করে ফেললো। সবদিক থেকে কামান তাক করে একযোগে গোলাবর্ষণ শুরু হলো। এ আক্রমণ মোকাবেলার শক্তি ছিলো না জানিসারিদের।

অত্যন্ত করুণ হলেও সত্য, ছয় হাজার জানিসারি সেনা এ ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলো। আরও দুঃখজনক, তখনকার প্রেক্ষাপটে এটি ছিলো একটি সুসংবাদ।

তাই এ ঘটনা আলওয়াকিআতুল খাইরিয়া বা মঙ্গলজনক ঘটনা বলে পরিচিত হয়েছে। ঘটনাটির আরেক নাম মাযবাহাতুল ইনকিশারিয়া বা জানিসারিদের হত্যাকাণ্ড

একদা যে ফৌজ এনেছিলো বিজয়বার্তা, যাদের হাতে রচিত হয়েছে ওসমানিদের অগণিত গৌরবগাঁথা, ইসলামের শত্রুদের মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলো যে বাহিনী, পাঁচশ বছর পর ভাগ্যের পরিহাসে সেই তারাই হয়ে গেলো চোখের বিষ।

জানিসারিরা দূরদর্শিতার পরিচয় দিলে, অহেতুক জেদ না ধরলে পরের অনেক ইতিহাসই হয়তো অন্যরকম হতো। তাদের প্রথমদিকের অমর কীর্তি যেমন বিস্ময়কর, তেমনি অবাক করে শেষের এই অদূরদর্শী ও অবুঝ জেদ।


নাঈম আবু বকর

Monthly Natun Dak

Leave a Reply