বাংলা বনাম বাংলাদেশ

আক্ষরিক অর্থে বিশ্বমানচিত্রে তখন বাংলাদেশ নামের কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। স্বাধীন-স্বনির্ভর বাংলাদেশ তো নয়ই, পূর্ব পাকিস্তানও নয়; বাংলাদেশ তখনও ইংরেজের অধীনে ভারতবর্ষের একটা প্রদেশের অংশ মাত্র।

চল্লিশের দশকে বাংলাদেশ বলতে আমরা এখানে তখনকার বাংলা আর বর্তমান বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটিকেই বোঝাতে চাইছি।

গেলো শতাব্দীটি আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে সবচে’ ঘটনাবহুল। এতো লড়াই-সংঘাত, এতো ভাঙা-গড়া পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। দু’ দুটো বিশ্বযুদ্ধ এবং বিশ্বমানচিত্রের ব্যাপক কাটাছেঁড়ার প্রতি লক্ষ করলে আশা করি আপনিও এই সত্যকে কবুল করবেন। অন্যদিকে, ঘটনাবহুল বিংশ শতাব্দীর সবচে’ উত্তাল সময়পর্ব ছিলো আবার এই চল্লিশের দশক।

চল্লিশের দশক: ঘটনাচিত্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হিটলারের নৃশংস নাৎসি বাহিনীর পতন, কয়েক শতাব্দীজুড়ে বিশ্বের ব্যাপকতম মানচিত্র নিজেদের অধীনে রাখা বৃটিশ সাম্রাজ্য এবং সমাজতন্ত্রের উত্থানে কয়েক দশকজুড়ে বিশ্ব নেতৃত্বে ছড়ি ঘোরানো সোভিয়েত ইউনিয়নকে পেছনে ফেলে দৃশ্যপটে যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাব, আলোচিত চীনা বিপ্লব এবং ফিলিস্তিনি ভূখ-ে ইসরাইল নামক চাপিয়ে দেয়া রাষ্ট্রের অবৈধ জন্মের মতো ঘটনাগুলো এই দশকজুড়ে পৃথিবীকে উত্তাল করে রেখেছিলো।

একই সময়, কয়েক যুগের লাগাতার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের এই উপমহাদেশও বৃটিশরাজের কবল থেকে নিজেকে উদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলো। বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং স্বাধীকারের লড়াই একীভূত হয়ে এই অঞ্চলের মানুষদের জন্যও চল্লিশের দশকটিকে দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছিলো।

চল্লিশের উত্তাল দশকটি কেবল মানুষ বা সময়কে উদ্বেলিত করেই ক্ষান্ত হয় নি; বদলে দিয়েছে মানচিত্র, বিশ্বনেতৃত্বের মঞ্চ এবং কোটি মানুষের জীবনধারাও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতবর্ষ

১৯৪২ সালে জার্মানির মিত্র জাপান কলকাতায় বোমা বর্ষণ করে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অংশও এসময় আক্রান্ত হতে শুরু করে। বিশ্বযুদ্ধের বিচারে হামলাগুলো খুবই সীমিত এবং সাধারণ হলেও জাপানি বিমানগুলো ঠিকই চক্কর দিয়ে বেড়াতো পুরো উপমহাদেশের আকাশজুড়ে।

চল্লিশের-দশকে-বাংলাদেশ

বিশ্বযুদ্ধের তিন-সাড়ে তিন বছরে নানা সময় তারা বাংলাদেশসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বৃটিশ সেনা ছাউনি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছিলো, প্রতিবাদে ইংরেজ সরকারের বিমানবিধ্বংসী কামানগুলোও থেকে থেকে গর্জে ওঠতো। সরাসরি যুদ্ধ বা প্রত্যক্ষ ক্ষয়ক্ষতির শিকার এ উপমহাদেশের মানুষকে খুব একটা হতে হয় নি, তবে ভয়ংকর আশংকাটা শীঘ্রই সামনে চলে আসে।

চল্লিশের ভয়াবহ মন্বন্তর তথা দুর্ভিক্ষ

যুদ্ধের অজুহাতে খাদ্যপণ্য পরিবহনের বাহনগুলো ইংরেজ সরকার তুলে নিলে বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে খাদ্য বিনিময়ে দীর্ঘসূত্রিতা এবং এক পর্যায়ে তীব্র সংকট তৈরি হয়। ১৯৪৩ এ উপমহাদেশ বিশেষত বঙ্গদেশ নামের এই অঞ্চলে শুরু হয় তীব্র মন্বন্তর তথা দুর্ভিক্ষ। পাকিস্তান আমলের বিশিষ্ট আমলা আজিজুল জলিল তার স্মৃতিকথায় লিখেন-

‘১৯৪৩ সালের বাংলার মন্বন্তর আমাদের শিশুচোখের সামনেই ঘটল। দৈনিক দেখতাম অভাবনীয় করুণ দৃশ্য। হাড্ডিসার মানুষেরা কোনমতে একটু খাবার পাওয়ার আশায় রাস্তার মোড়ের ডাস্টবিন হাতড়াচ্ছে। এদের বেশির ভাগ নিকটবর্তী গ্রাম থেকে শহরে এসেছে খাবারের খোঁজে। এতই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল এরা যে, যদিওবা কোন কাজ থাকত তা এদের পক্ষে করা সম্ভব হত না। এই ভয়ানক দৃশ্য কোনদিনই ভুলব না। আর কোনদিন যেন দেখতেও না হয়। আমার মনে আছে মা এবং আরো অনেকে আমাদের এলাকার ক্ষুধার্তদের জন্য রুটি আর ভাত রান্না করতেন।

জাপানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বৃটিশ সরকার নৌকা এবং অন্যান্য যানবাহন নিয়ে নিয়েছিলো এর ফলে খাদ্য সামগ্রি চলাচল ব্যাহত হয়ে অভাব দেখা দেয় এবং দাম বেড়ে যায়। অন্য কারণ ছিল অতি মুনাফার জন্য ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানো এবং সরকারি রিলিফের অভাব। আসলে কিন্তু বাংলায় তখন মোট খাদ্য সামগ্রীর অভাব ছিল না।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সে সময় কলকাতা আর্ট কলেজের শিক্ষক। তিনি কাঠকয়লা দিয়ে আঁকলেন মন্বন্তরের উপর তাঁর সেই বিখ্যাত স্কেচগুলি- ক্ষুধার্ত মানুষ আর কুকুর কাড়াকাড়ি করছে রাস্তার মোড়ের ডাস্টবিনের ছিটেফোটা খাবার নিয়ে।’…

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও বঙ্গভঙ্গ রদ: পর্দার অন্তরালের কাহিনী

আজকে আমরা যেভাবে, যে বাস্তবতার ভিত্তিতে দুই বাংলাকে পৃথকভাবে চিনি ও জানি, এই বিভাজন এক কালে ছিলো না। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বা ‘বাংলা’ প্রদেশ হিসেবে পৃথক যে মানচিত্র এখন আমরা দেখি, ‘বঙ্গ’ বা বাঙলাদেশ নামে সেটি একটাই ভূখণ্ড ছিলো পৃথিবীর বুকে।

১৯০৩ সালে বৃটিশ সরকার শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাকে পৃথক করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯০৫ সালের অক্টোবরে এটি পাস হওয়ার কথা ছিলো। ইংরেজের অধীনতা এবং হিন্দু জমিদারদের নিষ্পেষণে জর্জরিত মুসলিম প্রধান পূর্ববঙ্গের জনগণের জন্য খুব দরকারি হলেও সেজন্য তারা আন্দোলন করেনি বা দাবিও তোলেনি।

চল্লিশের-দশকে-বাংলাদেশ

তবে পশ্চিমবঙ্গের সুবিধাবাদী হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও জমিদাররা প্রয়োজনীয় এই বিভাজন শেষ পর্যন্ত হতেও দেয়নি।

এই অঞ্চলের মুসলিমদের সুবিধাপ্রাপ্তির ব্যাপারে হিংসা এবং নিজেদের ব্যবসায় ও ক্ষমতার কেন্দ্রে ঘাটতি সৃষ্টির আশংকায় তারা সুতীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে এবং এই আইনটি ভেস্তে দেয়। পুরো বঙ্গকে নিজেদের দেবীর সাথে তুলনা করে ভক্তি ও ভালোবাসায় দেশ ডুবিয়ে দিয়েও যখন সুবিধে করতে পারছিলো না, বাঁধিয়ে দেয় দাঙ্গা।

সাথে নিরপরাধ ইংরেজ নাগরিক হত্যাসহ সহিংস অপতৎপরতা। লর্ড কার্জনের প্রস্তাবিত এই আইন শেষ নাগাদ আলোর মুখ দেখার আগেই রদ হয়ে যায়।

সংগ্রামের নয়া ফর্মুলা ও মুসলিম লীগ

রাষ্ট্রক্ষমতা হারানোর দেড়শো বছরের মাথায় একটু আশাবাদী হয়ে উঠতে থাকা মুসলিম সমাজ হিন্দুদের এই জিঘাংসা ও বিদ্বেষের ধরন দেখে নিদারুণভাবে হতাশ হয়ে পড়ে। শুরু হয় নিজেদের স্বতন্ত্র প্লাটফর্ম গড়ে তোলার নতুন সংগ্রাম। এই সংগ্রামই এরপর মুসলিম লীগ নামে বাস্তবে রূপ পরিগ্রহ করে।

১৯৪০ সালের মার্চে মুসলিম লীগের হয়ে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক পার্লামেন্টে লাহোর প্রস্তাবে ভারত বিভাগের দাবি উত্থাপন করলে হিন্দু-মুসলিম উভয় পক্ষের ধারাবাহিক আন্দোলনই আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত একটা পর্যায়ে এসে উপনীত হয়।

পর্দার অন্তরালে তখন প্রদেশ বিভাজন, মানচিত্রে কাটাছেঁড়াসহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পত্তির ভাগ-বন্টনের নানারকম খেলা চলতে থাকে উভয় শিবিরে। ইংরেজের ছত্রছায়ায় দুই শতাব্দীজুড়েই উচ্চবর্ণের হিন্দুদের উপেক্ষা ও জুলুম এবং সবশেষে ক্ষমতা ভাগাভাগির এই পর্যায়েও চূড়ান্ত স্বার্থপরতার মানসিকতা দেখে বাধ্য হয়েই মুসলিম নেতৃবৃন্দ ভারত ভাগের পক্ষে আওয়াজ তুললেও শেষ দিনটি পর্যন্ত তারা অবিভক্ত ভারতবর্ষের ব্যাপারেই আন্তরিক ছিলেন।

ভারতবিভক্তির দায় আসলে কার

লোভী ও স্বার্থপর আখ্যা দিয়ে ভারতভাগের পুরো দায় মুসলিম নেতাদের ওপর চাপিয়ে দিলেও কয়েক দশকের মধ্যেই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে থাকে যে- হিন্দু নেতারাই আসলে স্বার্থের কলকাঠি নেড়ে সব এলোমেলো করেছেন। জিন্নাহ সাহেবদের তুলনায় নেহেরু-প্যাটেল সাহেবরাই যেকোনো উপায়ে ক্ষমতার মসনদে বসতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন, হিন্দু ও ইংরেজ ঐতিহাসিকরাই সেটা কবুল করেছেন।

আজিজুল জলিল লিখেছেন- ‘সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ফেডেরাল গঠনতন্ত্রের অধীনে ভারতের ঐক্য বজায় রাখতে রাজি ছিলেন, শর্ত একটাই- তাতে যদি মুসলমানদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হয়। এক সময়ের কবি ও কংগ্রেসনেত্রী সরোজিনী নাইডু জিন্নাহকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত বলে উল্লেখ করেছেন।

তিরিশ বছর পর প্রকাশনার নিয়মে প্রকাশিত ব্রিটিশ সরকারের কাগজপত্রে এবং মওলানা আজাদের মৃত্যুর পঁচিশ বছরর পর প্রকাশিত ‘ভারত স্বাধীনতা অর্জন করল’ বইতে দেখা যায়- কংগ্রেসের বয়স্ক নেতৃবৃন্দ, (প-িত নেহেরু এবং প্যাটেলসহ) যাঁরা অনেক দিন জেলে ভুগেছেন; ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে গিয়েছিলেন- দরকার হলে দেশ ভেঙে।’

একইভাবে আমাদের এই বাংলার বিভাজনের ক্ষেত্রেও হিন্দু নেতারা মুসলিম নেতৃবৃন্দের ওপর দায় চাপিয়েছেন। অথচ কংগ্রেসের তৎকালীন কলকাতার নেতৃবৃন্দের বিবৃতি এবং হিন্দু ও ইংরেজ ঐতিহাসিকদের কলমেই পরিষ্কার- অবিভক্ত বাংলা এমনকি স্বাধীন বাংলার ব্যাপারেও শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ সাহেব আন্তরিক ছিলেন।

দ্বিখণ্ডিত বাংলা: বঙ্গবন্ধুর বয়ানে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আন্দোলনের একনিষ্ঠ সমর্থক এবং নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি নিজের গভীর ভালোবাসার কথা লিখে গেছেন- ‘পাকিস্তান না আনতে পারলে লেখাপড়া শিখে কী করবো? আমাদের অনেকের মধ্যে এই মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছিল।’ (পৃষ্ঠা-৩২)।

৩৬ নং পৃষ্ঠায় তিনি আরো লিখেছেন ‘অখণ্ড ভারতে যে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না এটা আমি মন-প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতাম।’ পাকিস্তানের প্রতি গভীর আবেগ সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান অখণ্ড বাংলার প্রতি ভালোবাসার কথাও জানিয়েছেন। এটি কেবল তার একার নয় পাকিস্তান আন্দোলনের তৎকালীন প্রধান সব নেতার মতামত হিসেবে সহজেই বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রমাণ সহকারেই।

তিনি লিখেছেন- ‘এই সময় শহীদ সাহেব (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী), হাসিম সাহেব মুসলিম লীগের তরফ থেকে এবং শরৎবসু ও কিরণশঙ্কর রায় কংগ্রেসের তরফ থেকে এক আলোচনা সভা করেন। তাদের আলোচনায় এই সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশ ভাগ না করে অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করা যায় কিনা? শহীদ সাহেব দিল্লীতে জিন্নাহর (কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ) সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তার অনুমতি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।

বাংলাদেশে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতারা একটা ফর্মুলা ঠিক করেন। বেঙ্গল মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি এ ফর্মুলা সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করে। যতদূর আমার মনে আছে তাতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ একটা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে। জনসাধারণের ভোটে একটা গণপরিষদ হবে। সেই গণপরিষদ ঠিক করবে বাংলাদেশ হিন্দুস্তানে না পাকিস্তানে যোগদান করবে, নাকি স্বাধীন থাকবে।

এই ফর্মুলা নিয়ে সোহরাওয়ার্দী ও শরৎবসু দিল্লীতে জিন্নাহ ও গান্ধীর সাথে দেখা করতে যান। শরৎবসু নিজে লিখে গেছেন যে, জিন্নাহ তাকে বলেছিলেন, মুসলিম লীগের কোনো আপত্তি নাই, যদি কংগ্রেস রাজি হয়। ব্রিটিশ সরকার বলে দিয়েছে, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একমত না হলে তারা নতুন কোনো ফর্মুলা মানতে পারবেন না।

শরৎবাবু কংগ্রেস নেতাদের সাথে দেখা করতে যেয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছিলেন। কারণ সরদার বল্লভ ভাই প্যাটল তাকে বলেছিলেন, ‘শরৎবাবু পাগলামী ছাড়েন, কলকাতা আমাদের চাই। মাহাত্মা গান্ধী ও পন্ডিত নেহেরু কিছুই না বলে তাকে সরদার প্যাটলের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আর মিস্টার প্যাটল তাকে খুব কঠিন কথা বলে বিদায় দিয়েছিলেন।

কলকাতা ফিরে এসে শরৎবসু খবরের কাগজে বিবৃতির মাধ্যমে এ কথা বলেছিলেন এবং জিন্নাহ যে রাজি হয়েছিলেন এ কথাও স্বীকার করেছিলেন’। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী পৃষ্ঠা-৭৪)।

এ নিয়ে মোহাম্মদ আবদুল মান্নান তার বইয়ে এরপর লেখেন-

‘শরৎবসুকে ১৯৪৭ সালের ৮ জুন লিখিত এক চিঠিতে গান্ধী জানিয়ে দেন যে, তিনি বাংলাদেশ পরিকল্পনার বিষয় নিয়ে নেহেরু ও প্যাটেলের সাথে আলোচনা করেছেন এবং এই উদ্যোগের প্রতি তাদের সম্মতি নেই। গান্ধী তার এই চিঠিতে শরৎবসুকে অখ- স্বাধীন বাংলা গঠনের পরিকল্পনা ত্যাগ করার জন্য বাংলা ভাগের বিরোধিতা হতে বিরত থাকার পরামর্শ দেন।’ (বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, পৃষ্ঠা ২৮২-২৮৩)।

স্বার্থ আর রাজনীতির ব্যাপারকে পাশ কাটালেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়- ১৯০৫ এ বঙ্গভঙ্গ রোধ করতে গিয়ে হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবীগণ যে বঙ্গকে মা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন, বন্দে মাতরম সঙ্গীতে সর্বস্ব উজাড় করে হলেও মা ও দেবীর সম্মান রক্ষার শপথে বলীয়ান হয়ে উঠেছিলেন, দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাঁধিয়ে পুরো অঞ্চলজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন; সেই তারাই আবার ৪৭ সালে এসে কী করে বাংলাকে পৃথক করতে মরিয়া হয়ে উঠলেন? ভুল স্বীকার তো পরে, প্রপাগাণ্ডা টুকুও আজ পর্যন্ত তারা বন্ধ করেন নি। এখনো মুসলিম নেতৃবৃন্দকেই দায়ী করে যাচ্ছেন।

উত্তাল সেই দশকজুড়ে নেতারা যখন মানচিত্রের এমন কাটাছেঁড়া ও দেশভাগের নানারকম দরকষাকষিতে ব্যস্ত; স্বাধীনতার আনন্দ ও অনিশ্চিৎ ভবিষ্যতের শংকার দোলাচল এবং নতুন দেশে নতুন বাসস্থান তালাশের ঝঞ্জাট সব মিলেমিশে উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলিম নাগরিকদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিলো। দাঙ্গা-হাঙ্গামার নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা আর বাবা-দাদার বাসস্থান ও কাছের আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে নতুন ঠিকানার খোঁজে পথে নামতে বাধ্য হওয়ায় তাদের জীবন হয়ে উঠেছিলো বিভীষিকাময়।

স্বাধীনতা ও মুক্তি: গোলাপের কাঁটা কতোটা বিষাক্ত হয়

এতোসব বিড়ম্বনা সত্ত্বেও এই দশকটি তাদের জীবনে এনে দিয়েছিলো মুক্তিও। নিজের পথে নিজের মতো করে চলার এবং নিজের ইচ্ছেমতো বলার স্বাধীনতাও। সবমিলিয়ে হিন্দু-মুসলিমসহ উপমহাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনেই চল্লিশের দশকটি হয়ে উঠেছিলো তাৎপর্যময়। ভীষণরকম।

চল্লিশের দশকটি বাংলাদেশের জন্য কেবল দুইশ’ বছরের পরাধীনতার কবল থেকে মুক্তি বা নতুন জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার কালই ছিলো না। ছিলো স্বর্ণযুগ। আধুনিক কবিতার। চিত্রকলার। গণসঙ্গীতের।

ছোটগল্প এবং উপন্যাসসহ শিল্প-সংস্কৃতির প্রায় সকল মাধ্যমেরই। ফররুখ আহমেদ, আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, শওকত ওসমান, সৈয়দ ওলীউল্লাহ এবং আবুল ফজলের মতো ব্যক্তিত্বরা দেখিয়েছিলেন- ইসলামের মর্মবাণী ও ভাষাকে উচ্চকিত রেখেও কী করে আধুনিক শিল্প ও সাহির্ত চর্চা করা সম্ভব। কতোটা মৌলিকভাবে সম্ভব।

কবিতার বাঁক বদলানো রীতি ও নিপুণ গদ্যে তাঁরাসহ আরো অনেকেই রীতিমতো বিপ্লব সৃষ্টি করেছিলেন। নানাভাবে এড়ানোর চেষ্টা করা হলেও তাদেরকে শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় নি। সম্ভবও নয়।

পাকিস্তান সৃষ্টি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেক্ষাপট

চল্লিশের দশকে পাকিস্তান সৃষ্টির ঘটনাটি যতোটা মহৎ ও মহিমাময়, আছে স্বপ্নভঙ্গের কালো অধ্যায়ও।

লাহোর প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে এই দশকের শুরুতেই বাংলাদেশের মানুষ যেমন আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলো, স্বাধীনতা লাভের পরপরই বাংলা ভাষার বিরোধিতার প্রশ্নে বিষাদে ছেয়ে যায় তাদের মন। পথ হারাতে শুরু করে মুসলিম লীগও।

স্বপ্নভঙ্গের করুণ সুর ছড়িয়ে দিতে দিতেই বিদায় নেয় ঘটনাবহুল চল্লিশের দশক।


mufti amini

Leave a comment