পর্যাপ্ত খাবার নেই। বিশুদ্ধ পানি নেই। স্যানিটেশন ব্যবস্থা সেই কবে ভেঙে পড়েছে। কোথাও যাবার সুযোগ নেই। বাচ্চাদের স্কুল নেই। বড়দের কাজ নেই। রোগীদের চিকিৎসা বা ঔষধ-সামগ্রীর সংগ্রহ নেই। যখন-তখন অবরোধ-ধরপাকড়, হামলা ও খুনের বিভীষিকা নিয়ে অঘোষিত রিমান্ডে দিন গুজরান করছেন ফিলিস্তিনীরা। ১৭ এর ডিসেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ঘোষণা বদলে দিয়েছে পুরো দৃশ্যপট।

যে স্বপ্ন বুকে নিয়ে ৭  দশক ধরে লড়াই করে আসছিলেন ফিলিস্তিনীরা, এক লহমায় তাতে পানি ঢেলে দিয়েছেন নয়া যামানার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। নতুন উদ্যমে ফিলিস্তিন গ্রাস করতে শুরু করেছে নেতানিয়াহুর ইসরাইল। মৃত্যু, ক্ষুধা, বন্দিত্বই এখন ফিলিস্তিনীদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধীনতা তো দূর, দুই রাষ্ট্রের ভিত্তিতে সমাধানের যে কথা জাতিসংঘের বলেছিলো তা-ও এখন বিশ্বাস করতে পারছেন না ফিলিস্তিনের মানুষজন। করলেই বা কী আসে যায়- কেউ আজ তাদের পাশে যে নেই। একজন শুধু আছেন, যিনি থাকলে আর কারো পরোয়া করার দরকার পড়ে না। সেই আল্লাহর বিচারের প্রতিই তাকিয়ে আছেন গাজার মুসলমানেরা।

জুমাবারগুলো এখন শুধু জামাতের আহ্বান নয়, নতুন লড়াইয়ের বার্তা নিয়েও হাজির হয় তাদের কাছে। জেরুসালেমে ইসরাইলের তৈরি করা সীমান্ত চৌকিগুলো ঘিরে প্রতিবাদের ঝড় তোলেন সর্বস্তরের ফিলিস্তিনী।

হার তারা মানবেন না, স্বাধীনতা অর্জন করে তবেই ক্ষান্ত হবেন।

ফিলিস্তিনীদের প্রাত্যহিক জীবন

কেমন আছে ফিলিস্তিন?

ফিলিস্তিনের মানুষদের বেকারত্বের হার এখন ৫০% এর বেশি। শিল্প কারখানা নেই, চাষবাসের সুযোগ নেই। সমুদ্রে মাছ ধরার স্বাধীনতাটুকু পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হয়েছে। কী করে তারা কাজ করবেন, কোথায় করবেন? ৭০% মানুষ বেঁচে আছেন শুধু বিদেশী ত্রাণের ওপর নির্ভর করে। তাও মাঝে-মধ্যেই ইসরাইলের বাধার মুখে পড়ে। জীবন তখন আরো বিভীষিকাময় হয়ে ওঠে।

ইসরাইল জেরুসালেমে প্রবেশাধিকার এমনকি চিকিৎসার জন্যও বন্ধ করে দিয়েছে, সমুদ্র পথে কড়া পাহারা বসানো, মুরসিকে হটিয়ে মিশরের ক্ষমতায় জেনারেল সিসি অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে একমাত্র স্থল যোগাযোগের পথ রাফা সীমান্তটিও বন্ধ।

পশ্চিমতীর একটু স্বাভাবিক হলেও পুরো গাজা এখন আস্ত একটি কারাগার। সাধারণ পানির সরবরাহ নেই, ভূগর্ভস্থ পানির ৯০ ভাগই পানের অযোগ্য। গ্যাসের সংযোগ নেই, বিদ্যুৎও এই আছে তো এই নেই। বাচ্চাদের স্কুল নেই, হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা নেই। আছে কেবল হামলা,  কখনো আকাশ পথে কখনো-বা সরাসরি।

নিত্যদিন চলছে উচ্ছেদ, অবরোধ আর ধরপাকড়। মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়ে জীবনের হিসেব তো আর করা যায় না। এই অবস্থা চলতে থাকলে খুব বেশিদিন হয়তো লাগবে না- গাজা আর সেখানকার মুসলিমেরা এমনিতেই হারিয়ে যাবেন পৃথিবীর মানচিত্র থেকে। স্বাধীনতার স্বপ্ন আর ২০০৬ এ হামাসকে বিজয়ী করার শাস্তি আর কতোকাল এভাবে তাদের পেতে হবে আল্লাহ মালুম।

গাজা: পেছনে তাকিয়ে

ভূমধ্যসাগরের তীর বরাবর প্রাচীন বাণিজ্য ও নৌপথের ধার ঘেঁষে গাজা উপত্যকার অবস্থান। ১৯১৭ সালের আগে উসমানিয়া খিলাফাহ বা অটোমান সা¤্রাজ্যের অধীনে ছিলো। গত শতকে এটি ব্রিটিশদের কাছ থেকে প্রথমে মিসরীয়, এরপর ইসরাইলের সামরিক শাসনের অধীনে আসে। বর্তমানে এখানে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনির বসবাস। মাত্র ১৪০ বর্গমাইলের সীমানায় এতো লোকের বসবাস ইসরাইল বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটিতে পরিণত করেছে ।

১৯৪০’র শেষের দিকে ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পরপরই ইহুদিরা আরবদের সাথে সংঘাত বাড়াতে থাকে। ১৯৪৮-৪৯ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের গঠনের পর গাজা মিসরীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে মিসর কখনোই গাজা অধিগ্রহণ করেনি। তখনো গাজা একরকম স্বাধীনই ছিলো। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিণতিতে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হওয়া হাজারো ফিলিস্তিনী শরণার্থী জড়ো হন গাজায়। ১৯৬৭ সালের জুনে ছয় দিনের যুদ্ধে মিসরের কাছ থেকে গাজা দখল করে নেয় ইসরাইল। পরাধীন হন ফিলিস্তিনের গাজার অধিবাসীরা।

দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর ২০০৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর একতরফাভাবে গাজা থেকে অধিবাসী এবং সেনাদের প্রত্যাহার করে নেয় ইসরাইল। অবসান ঘটে ৩৮ বছরের ইসরাইলি দখলদারির। পরের বছর অর্থাৎ ২০০৬ সালে হামাস কর্তৃক এক সেনা আটকের অভিযোগে আবারো গাজায় অবরোধ আরোপ করে ইসরাইল। এদিকে ২০১৩ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসি উৎখাত হওয়ার পর গাজার রাফাহ সীমান্ত প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় কায়রো। তখন থেকে গাজা উপত্যকা কার্যত কারাগারে পরিণত হয়। বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী, অবরোধের কারণে গাজায় জিডিপির ক্ষতি হয়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। স্বনির্ভরতার বদলে গাজা এখন অভিবাসীদের শহর।

ইসরাইলের লাগাতার অভিযান

কেমন আছে ফিলিস্তিন?

উচ্ছেদ-অবরোধ-দখলের বাইরে গাজায় বিভিন্ন অজুহাতে একের পর এক অভিযান চালিয়ে এসেছে ইসরাইল।

গাজা থেকে ছোড়া রকেট নিক্ষেপে এক ইসরাইলির মৃত্যুর অভিযোগে ২০০৮ সালের ২৭ মার্চ ‘হট উইন্টার’ নামে অভিযান চালায় ইসরাইল। এতে ১২০ জনের বেশি ফিলিস্তিনী প্রাণ হারান। এরপর জুনে তথাকথিত যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত হামাসের রকেট নিক্ষেপ ও ইসরাইলের পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকে। তখনো শত শত ফিলিস্তিনী নারী-শিশু নিহত হন।

ওই বছরেরই ২৭ ডিসেম্বর ‘অপারেশন কাস্ট লিড’ নামে আরো এক দফা ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইল। তখন ১ হাজার ৪০০ ফিলিস্তিনী এবং এর বিপরীতে মাত্র ১৩ ইসরায়েলি নিহত হয়। ২০০৯ সালের ১৮ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত এই হত্যাযজ্ঞ অব্যহত থাকে।

এরপর ২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শীর্ষ হামাস কমান্ডার আহমেদ জাবারিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ‘অপারেশন পিলার অব ডিফেন্স’ নামে ইসরায়েল নতুন এক অভিযান শুরু করে। আট দিনের ওই অভিযানে অন্তত ১৭৭ ফিলিস্তিনী মুসলমান এবং ৬ ইসরায়েলি নিহত হয়।

এরপর মিসরের মধ্যস্থতায় কার্যকর হয় যুদ্ধবিরতি। ২০১৪ সালের ৮ জুলাই গাজার বিরুদ্ধে ‘অপারেশন প্রটকটিভ এজ’ নামের ভয়াবহ এক অভিযান চালায় ইসরায়েল। উদ্দেশ্য, গাজা থেকে রকেট হামলা এবং বিদ্রোহীদের সুড়ঙ্গ খোঁড়া বন্ধ করে হামাসকে পুরোপুরি নিঃশেস করা।

ওই যুদ্ধে ফিলিস্তিনের ২ হাজার ২৫০ জন নিহত হন। ৫০০’র বেশি ছিলো শুধু শিশু। এগুলো ছিলো গত কয়েক বছরের লাগাতার অভিযান। এর বাইরে দৈনিকই গাজা সীমান্ত বা জেরুসালেমে জুলুম-নিপীড়ন তো চলছিলোই।
২০১৭ সালের অক্টোবরে হামাস ও ফাতাহ কর্তৃপক্ষের মধ্যে হওয়া চুক্তিতে নতুন আশা জেগেছিলো।

বাস্তবে আর তা রূপ লাভ করেনি। গাজায় শান্ত অবস্থা ফিরলে যে ক্ষতি হবে ইসরাইল তা ভালোই বোঝে। ফিলিস্তিনীদের দুর্বিষহ জীবনে ঢেলে দিয়ে নিজেদের অবৈধ দখলদারি জারি রাখতে তারা সম্ভব সবই করছে ও করবে। 
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত জাতিসংঘের শান্তিদূত নিকোলায় ম্লাদেনভ বলেছিলেন- পুরোপুরি ধ্বংসের দ্বারান্তে গাজা উপত্যকা। গাজার বিভীষিকাময় হালের এটাই ছিলো প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

তবে লাভ তো কিছু হয়নি। কয়েক দশক ধরে চলে আসা মানবেতর জীবনযাপনের ধারাবাহিকতা এখন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় আরো প্রকট। আরো করুণ। আল্লাহ পাক ফিলিস্তিন বিশেষত গাজার মুসলিমদের প্রতি রহম করুন।

একজন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফিলিস্তিনের বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপট

ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে হয়তো অনেক কিছুই বলা যায়। তবে বাস্তবতা হলো ফিলিস্তিনীদের স্বাধীনতার স্বপ্ন এখন সুদূর পরাহত। আল্লাহর গায়েবি মদদ ছাড়া দৃশ্যমান হাল বা নিকট ভবিষ্যত কোনোটাই ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সহজ পরিচয় বলা যায়- আ ম্যান অন আ মিশন। বিশেষ কিছু কাজের জন্যই বিশেষ একটি গোষ্ঠী তাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। যথারীতি তিনি প্রমাণও দিয়ে চলেছেন।

নিজের দেশই শুধু নয়, যখন-যেখানে পারছেন বা হাত ঢুকিয়ে হিসেব সব এলোমেলো করে দিচ্ছেন। গত ডিসেম্বরে তেল আবিব থেকে জেরুসালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তর করিয়েই তিনি ক্ষান্ত থাকেন নি। প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনীদের উচ্ছেদ করে ইসলাইলের বসতি স্থাপনের বৈধতা দিয়েছেন। তিনি সমাধান চান, দুই রাষ্ট্র বা একক রাষ্ট্র কিছুই তার কাছে কানো ফ্য্যাক্ট নয়। জাতিসংঘে এক ভোটাভুটিতে হেরে গেলেও ক্ষান্ত হননি।

জাতিসংঘের সহায়তা বন্ধের আহ্বানে সাড়া না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ত্রাণ তহবিল থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। সমালোচনা করায় ২০ কোটি ডলারের বাৎসরিক সহায়তা একক ক্ষমতায় কমিয়ে দিয়েছেন। ফিলিস্তিনের পক্ষে কাজ করা সামাজিক প্রতিষ্ঠান এএলওর যুক্তরাষ্ট্রের অফিস তুলে দিয়েছেন।

এ মুহূর্তে ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলার মতো কোনো অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে নেই। তারও আগে ট্রাম্প পাওয়ারে এসেই ফিলিস্তিনের জন্য ওবামার পাশ করে যাওয়া বিশেষ একটি সাহায্য-তহবিল বাতিল করেছেন। সম্ভব সবভাবেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন- ফিলিস্তিন-ইসরাইল ইস্যুতে ইসরাইল ছাড়া আর কিছুই তার বিবেচনায় নেই।

দুর্নীতির দায়ে ক্ষমতাচ্যুত হবার আশংকায় থাকা নেতানিয়াহু ট্রাম্পের আশকারা পেয়ে এরপর পুরোদমে হামলে পড়েছেন।

৭০ তম নাকবার প্রেক্ষাপটে গত কয়েক মাসেই ২০০’র বেশি ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন। ট্রাম্পের মেয়ে (এক ইয়াহুদির বধূ) মেলানিয়া যেদিন জেরুসালেমে যুক্তরাষ্টের দূতাবাস উদ্বোধন করেন, পাশেই শহরের অপর প্রান্তে সেদিন প্রায় কুড়িজন ফিলিস্তিনীকে গুলি করে মেরেছে ইসরাইল।

ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের রক্তাক্ত এই কূটনৈতিক মিশন কেবল একটি দূতাবাস স্থাপন বা রাজধানী ঘোষণায় আটকে থাকেনি, ৭০ বছরের পুরো প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছে। গোটাবিশ্বের নিন্দা, বেশিরভাগ দেশের সরাসরি বিরোধিতা, জাতিসংঘের সমালোচনা কিছুরই তোয়াক্কা করছেন না ট্রাম্প-নেতানয়াহু।

ফিলিস্তিনী সাংবাদিক দাউদ কাতাব বলেন-

২০০৯ সালে এক বক্তৃতায় নেতানিয়াহু দুই-রাষ্ট্র সমাধান গ্রহণের ব্যাপারে যে শর্ত আরোপ করেছিলেন, এখন তার মধ্যে কিছু অতিরিক্ত ব্যাপার ঢুকে গেছে, যা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাটাই খারিজ করে দেয়। আর এখন ঐতিহাসিক দুই-রাষ্ট্র সমাধান ছুড়ে ফেলার মানে হলো, ফিলিস্তিনী ভূমিতে ইসরাইলি সেনার চিরস্থায়ী উপস্থিতি। ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সে পথেই হাঁটছেন। ৭ দশক পরে এসে ৪০ লাখ ফিলিস্তিনী (বিভিন্ন দেশে রিফিউজি হওয়া স্যংখা এরও বেশি) ইহুদি রাষ্ট্র মেনে নেবে তা কি করে হয়? যে রাজনৈতিক অধিকার ইহুদিদের দেওয়া হয়, সেই অধিকার তাদের দেওয়া হবে না। নিজের রাষ্ট্রে ২য় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকার কথা ফিলিস্তিনীরা কল্পনাও করতে পারে না।

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প যে মনোভাব গ্রহণ করেছেন, সন্দেহ নেই বরকতময় এই অঞ্চলটি তাতে আরও খোলামেলাভাবে বিশৃঙ্খলা ও বিভক্তির পথে এগুচ্ছে। অধিকৃত ভূমিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিনীদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, যেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ও জাতীয় অধিকার ভোগ করছে। আর এর বাইরে পশ্চিমতীর বিশেষত গাজা তো প্রায় মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে।

ফিলিস্তিনের পাশে কেউ নেই

অধিকার আদায়ের জন্য পর্যাপ্ত রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তি ফিলিস্তিনের কখনো ছিলো না, এখন তো আরো নেই। মুসলিম রাষ্ট্র- বিশেষত আরব রাষ্ট্রগুলো পাশে দাঁড়ালে অন্তত সম্মানজনক একটা সুরাহা হতে পারতো। কিন্ত কে এগিয়ে আসবে? মধ্যপ্রাচ্য তথা আরবজুড়েই তো এখন কেবল সংঘাত আর লড়াই। তা না থাকলেও অবশ্য ভালো কিছু হতে পারতো বলে মনে হয় না।

পশ্চিমা মদদ ও সমর্থনে ক্ষমতায় থাকা পদলেহী আরব নেতারাও তো ফিলিস্তিনীদের চিন্তাকে ভালো চোখে দেখেন না। হামাসকে তারা ক্ষমতায় বসিয়েছে এটা ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মতো তারাও মেনে নেয়নি। সৌদির ভাবী বাদশাহ বর্তমান যুবরাজ সামলমান বিন মুহাম্মাদ তো এই সেদিনও ইসরাইলের সমালোচনার বদলে বরং ফিলিস্তিনকে শাসালেন। মিশর তো স্বরণকালের সবচাইলে নির্লজ্জ ভূমিকা নিয়েছে।

মিশরের সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় এক সাংবাদিক হামাসকে ধ্বংসে নেতানিয়াহুকে আল্লাহর নেয়ামত বলে উল্লেখ করেছেন। গাজার অমানবিক পরিস্থিতির জন্য মিশরের ভূমিকা কিছু ক্ষেত্রে বরং ইসরাইলের চাইতেও খারাপ। এমন আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে ভালো আর কী আশা করা যায়?

২০০৫ গাজার ওপর থেকে ইসরাইলের অবরোধ তুলে নেয়ায় বেশ ককে দশক পর ফিলিস্তিনীরা কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেয়েছিলেন। এক বছরের মাথায় সাধারণ নির্বাচলে হামাসকে বিজয়ী করার শাস্তি হিসেবে পুনরায় তারা সব সুযোগ হারান। ফাতাহ-হামাসের অভ্যন্তরীণ লড়াই একদিকে তাদের ভুগিয়েছে, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বে হামাসকে সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসেবে পরিচিত করিয়ে নিজের সব অপকর্ম বৈধ করে নিয়েছে ইসরাইল। তখন থেকেই গাজা উপত্যকাসহ পুরো ফিলিস্তিনই একরকম কারাগারে পরিণত হয়েছে।

জেরুসালেমে ফিলিস্তিনীদের প্রবেশাধিকার মারাত্মকরকম কমিয়েছে, মসজিদে আকসায় গমন কঠোর করেছে, স্থলপথের পর জলপথকেও কার্যত অবরুদ্ধ করেছে। তুরষ্ক-ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমনকি জাতিসংঘের ত্রাণ আটকে দেয়ার মতো ধৃষ্টতাও তারা বরাবরই দেখিয়ে এসেছে। সবমিলিয়ে ফিলিস্তিনীদের ভাগ্য কেবল সংকুচিতই হয়েছে।

২০০৯ এর পর ১৪ সালে আরো এক দফা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরাইল। দুই হাজারের বেশি মানুষ সেই এক লড়াইয়েই প্রাণ হারান। তারপরও বিশ্ববাসী প্রত্যাশিতভাবে সাড়া দেয় নি। নিয়ম করে প্রতি রমজান, নাকবা বা ইন্তিফাদা দিবসকে সামনে রেখে লাগাতার হামলা চালিয়ে আসছে ইসরাইল। আর এমনিতে প্রতিনিয়ত খুনোখুনি তো আছেই।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় হামাসকে সন্ত্রাসী সগঠন আর নিজেদের সুরক্ষার অধিকারের কথা বলে পার পেয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। নিয়ম বা মানবিকতা দুই-ই যেনো অন্ধ হয়ে আছে ফিলিস্তিনের জন্য। 

আন্তর্জতিক সংস্থার ভূমিকা বনাম সাধারণ ফিলিস্তিনীদের জিজ্ঞাসা

২০১২ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়। ওবামা প্রশাসনও এরপর ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির কথা জানিয়েছিলো। ২০১৩ সালে এমন প্রেক্ষাপটেই নতুন একটি শান্তিচুক্তিও অনেকদূর এগিয়েছিলো। ব্যাপার ওই এগোনো পর্যন্তই। ইসরাইল যে ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি আদতে মানবে না সেটাই তারা বুঝিয়ে যাচ্ছে।

২০১৪ সালের একতরফা যুদ্ধে আবার সব এলোমেলো হয়ে গেছে। তবে ১৯৯৩ এর অসলো চুক্তির একটা ভিত্তি অন্তত ক্রিয়াশীল ছিলো। ট্রাম্প এসে পুরো দৃশ্যপটই শুধু নন, অতীত সব সূত্রও অস্বীকার করে বসেছেন। ক্ষেত্রবিশেষ এখন দুই রাষ্ট্রের সমাধানও কেউ কেউ অস্বীকার করতে চান।

জাতিসংঘও আজকাল কদিন পরপর যখন ফিলিস্তিনীদের সহিঞ্চুতা বা সমঝোতার নামে বিশেষ বৈঠক ডাকে, তাতে মনে হয় সব ছেড়ে দিয়ে তবেই ফিলিস্তিনীদের শান্তির বাণী শুনতে হবে। অধিকারের কী আশ্চর্য নমুনা!

ডেইলি লাইফ ইন গাজা নামে সম্প্রতি একটি ডকুমেন্টরি প্রচার করেছে সংবাদ সংস্থা আল জাজিরা। ছোট এক বেকারি চালান নাফিজ আদায়েজ। তিনি জানান- বাবার আমল থেকে তিনি এই ব্যবসা চালান। প্রায় ৬০ বছর। তার বাবা-দাদারাও এই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন তার অবস্থা খুবই শোচনীয়। ক্রেতা নেই। খেতে তো সবাই চায় কিন্তু কেনার পয়সা নেই। আগে জেরুসালমে ছিলেন। উচ্ছেদ হয়ে গাজায় আশ্রয় নিয়েছেন। এখন এখান থেকেও উঠে যতে বলছে ইসরাইলিরা।

ঘুরেফিরে তার তাই একটাই প্রশ্ন- কতোবার তারা ঠিকানা বদলাবেন, কোথায় আর যাবেন? বাঁচবেনই বা কী করে?

পানি সরবরাহকারী প্রবীণ ফিলিস্তিনী নাহিদ আলগুল জানান- মারাত্মক বাজেভাবে দিন গুজরান করতে হচ্ছে তাদের। তার বোনের ক্যানসার। কেমোথেরাপি নিতে জেরুসালেম যাওয়া জরুরি। গাজায় তো সেরকম কোনো হাসপাতাল নেই। ৬ মাস ধরে চেষ্টা করেও ক্যানসার রোগী তার বোনের জন্য জেরুসালমে প্রবেশের কোনো অনুমতি এখনো সংগ্রহ করতে পারেন নি। গাজায় কোনো কাজ নেই, জেরুসালেমে গিয়ে আগে কাজ করতো তার ছেলেরা। তারা তো আরো যেতে পারছে না। সবমিলিয়ে তারা নিদারুণ কষ্টে দিন গুজরান করছেন।

৫০ বছর ধরে সমুদ্রে মাছ ধরেন আহমাদ আল হিসি। তিনি বলেন- ২০০৬ এর নির্বাচনে হামাসকে ভোট দেয়ার শাস্তি হিসেবে সমুদ্রেও মাছ ধরতে দিচ্ছে না ইসরাইল। কদিন পরপর জাল ও নৌকা ধরে নিয়ে যায়। অনেককে সমুদ্রেই গুলি করে মেরে ফেলেছে। একটু দূরে যেখানে বেশি মাছ পাওয়া যায় সেখানে যেতে দিচ্ছে না। ফলে গাজায় মাছের আমদানি মারাত্মকভাবে কমে গেছে। মানুষের হাতে পয়সা নেই, এদিকে সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বেড়ে যাচ্ছে। তারাও কিনে খেতে পারছে না, জেলেরাও কম মাছ পাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এই ব্যবসার সাথে জড়িত অন্যান্যরাও কষ্টে নিপতিত হয়েছেন।

নৌকা যারা বানান, জাল যারা বুনেন, তেল যারা সরবরাহ করেন বা মাছের যারা পাইকার- কেই ভালো নেই। কেমন করে আমরা বেঁচে আছি আল্লাহই ভালো জানেন। সবার তাদের একটাই প্রশ্ন- আর কতোবার আমরা উচ্ছেদ হবো, কোথায় যাবো, আর কতোকাল ইসরাইলের এই দখলদারি ও জুলুম চলবে?…

উত্তর তারা যেমন জানেন না, আমরাও কি জানি? মুসলমানের মানবাধিকার এখন এই পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও আগে আজকাল মাজলুমদের সবক দেয়। তোমরা কিছু করনি তো বাপু?..

আরব: বিভক্তি, রাজতন্ত্র এবং তেল-জমিদারি

 আরবের বিভক্তি, রাজতন্ত্র এবং তেলজমিদারি ইসারায়েলের ক্ষমতার প্রধানতম উৎস। শুনতে খারাপ লাগলেও এটা মানতে হবে-  ফিলিস্তিন মুক্ত করা মানে অনেকাংশেই আরবে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া।

তবে তাই বলে তো আর লড়াই-সংগ্রাম থেমে থাকে না। ফিলিস্তিনীরাও তাই বসে থাকেন নি, লড়েই চলছে। তাদের এ লড়াই দিন দিন মানবতাবাদী যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

আজকের প্রেক্ষাপটে এই লড়াইকে তাই কেবল মুসলমান বা ফিলিস্তিনীদের লড়াই ভাবলে ভুল হবে। কেবল আরবের শাসকশ্রেণি ছাড়া বিশ্বের সব মানবতাবাদী মানুষই এখন ফিলিস্তিনীদের পক্ষে। আরবের শাসনব্যবস্থায় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে ফিলিস্তিনের সমস্যার সমাধান হবে এমন আশা করাটা মুশকিলই। ফিলিস্তিনীদের লড়াইয়ের পাশাপাশি আমাদেরকে তাই আরবের পরিবর্তিত হালাতের  দেিকও কড়া নজর রাখতে হবে।

তারও আগে আমাদের স্যালুট জানাতে হবে ফিলিস্তিনের প্রতিটি নাগরিককে। এতো জুলুম, এতো কষ্ট ও কুরবানির পরও তারা দমে যান নি। হার মানা তো দূর, পরাশক্তি আমেরিকা-ইসরাইলকে প্রতিনিয়ত তারা নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছেন।

যে কোনো মূল্যে আল আক্বসা ফিরে পাওয়া এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাই তাদের শেষ কথা। ৭০ বছর পেরিয়েও তাদের জজবা ও চেতনায় বিন্দুমাত্র আঁচড় লাগে নি। ফিলিস্তিন ও আল আক্বসার প্রশ্নে আর সবকিছুকে তারা এক লহমায় ছুড়ে ফেলতে পারেন।

এমন যাদের মানসিকতা- তাদের কোনো পরাজয় নেই। দুনিয়ার কারো শক্তি নেয় তাদের রুখে দেয় । আমাদের চোখে আপাতত অসম্ভব মনে হলেও খুক শীঘ্রই হয়তো আল্লাহর নুসরত তাদের ভাগ্যে জুটবে। মুক্ত আল আক্বসার চত্বরে লাখো ফিলিস্তিনীর বিজয় মিছিল- কল্পনার এ দৃশ্যপট বাস্তবে নেমে আসুক। নির্মল শৈশব ফিরে পাক নতুন প্রজন্মের ফিলিস্তিনীরা। দূর থেকে আমরা সেই কামনাই করি।

love for Palestine

Leave a comment