সাম্প্রতিক কওমি সনদের স্বীকৃতি নিয়ে কওমি শিবির নানা পথ ও মতে বিভক্ত। কেউ ‘কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৩’-এর ঘোর বিরোধী। কেউ আবার সেই কর্তৃপক্ষ আইনের মাধ্যমে সনদের স্বীকৃতি নিতে গভীর আগ্রহী। ভার্চুয়াল জগতের কোন কোন ভাই আল্লামা শফীর দা. বা. বিরোধিতায় সনদের স্বীকৃতি না পেয়ে নাখোশ। তীব্র এবং তীর্যক মন্তব্য করেছেন শায়খের উদ্দেশ্য নিয়ে। আবার কোন কোন ভাই আপাতত স্বীকৃতি নিয়ে নিলে ভাল হতো বলেও ধারণা ব্যক্ত করেছেন। একটা অংশ স্বীকৃতির চরম বিরোধিতা করেছেন। তারা বলেছেন এটা উসূলে হাশতেগানার বিপরীত।

অন্য একটা দল আবার বলছেন আমরা আওয়ামীলীগের কাছ থেকে সনদের স্বীকৃতি নেব না। তাদের যুক্তি, যারা আমাদের ভাইদের রক্ত নিয়েছে শাপলা চত্বরে, রাতের অন্ধকারে; তারা আমাদের জন্য ভাল কিছু দেবে সেটা হিসেবে মেলে না। শয়তান নামাযের জন্য ডাকলেও এতে একটা ঘাপলা থাকেই। খলের হয় না ছলের অভাব। এভাবেই যুক্তি পাল্টা যুক্তি দিয়ে সরব ছিল বেশ কয়েকদিন ভার্চুয়াল জগতের সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুক।

সবার কথাতেই নিজ বক্তব্যের পক্ষে জোড়ালো যুক্তি অথবা খোড়া যুক্তি ছিল। কিন্তু কারোই এই শিক্ষার প্রতি দরদের কমতি ছিল আমি কখনই সেটা মনে করি না। সর্বশেষ খবরে জানা যায় বেফাকুল মাদারিসের বাইরে এগারটি বোর্ড স্বীকৃতি নিতে যাচ্ছে। একমাত্র বেফাকই নিচ্ছে না। অনলাইনে এবং অফলাইনে আমরা সনদের স্বীকৃতির পক্ষে অনেক জোড়ালো মত পেয়েছি। পেয়েছি স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা। এই নিবন্ধে আমারা দেখাতে চেষ্টা করবো স্বীকৃতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো। ইতিহাসের ঘটনা পরম্পরার আলোয় আনবো মনের গহীনে জেগে ওঠা কালোমেঘাচ্ছন্ন শঙ্কার কথা। সচেষ্ট হবো ষড়যন্ত্রের বিছানো ফাঁদের সীমান্তটা দেখতে এবং দেখাতে। মহান আল্লাহ সহায়।

চলুন একটু ঘুরে আসি অদূর ও সূদূর ইতিহাসের পাতা থেকে। ইতিহাসের সেইসব ঘটনা আমাদের বর্তমান স্বীকৃতি সংক্রান্ত সমস্যাবলীর মূলে যেতে সহায়তা করবে বলে আশা করি।

বৃটিশ পর্ব :

ঘটনা-০১:

উপমাহাদেশের স্বাধীনতা হরণোত্তর সব মাদরাসা বন্ধ করে দেয় ইংরেজ সরকার। কারণ তারা জানতো এরা তাদের জন্য সমস্যার কারণ হবে। বাজেয়াপ্ত করে মক্তব-মাদরাসার সব জমাজমি। ইসলামি শিক্ষার পরিসমাপ্তি দেখতে পায় বৃটিশরা। কিন্তু সেই বন্ধ করা মাদরাসাওয়ালারাই দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করে ইংরেজ শাসনের কফিনে ঠুকে দেন চূড়ান্ত পেরেক। দারুল উলুম দেওবন্দের সন্তানদের স্বাধীন চেতনার কাছে হেওে একদিন ভারত ছাড়তে হয় বৃটিশদের। এই ক্ষত তারা ভুলতে পারেনি আদৌ। সেই থেকেই তারা আছে এই শিক্ষা ব্যবস্থার পেছনে। কাদিয়ানী, রেজভী থেকে শুরু করে হালের একদল আহলে হাদীসকেও ব্যবহার করছে ‘আকীদার অশুদ্ধতা’ নামক এক বায়বীয় অভিযোগের ভিত্তিতে। সেই আকীদার ঠিকাদাররা বলছে দেওবন্দীদের আকীদায় আছে বিদাআত ও শিরক।

ঘটনা-০২:

দারুল উলুম দেওবন্দ ইংরেজ বিরোধী। তাই তাদের প্রয়োজন ইংরেজদের পক্ষের কিছু আলেম-উলামা। সেই আশায় ওয়ারেন হেস্টিংস ১৮৮১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কলকাতা মাদরাসা। যেখানে তারা চেষ্টা করেছিল তাদের অনুগত একদল দরবারি আলেম তৈরি করার। কিন্তু দেখা গেছে তাদের মধ্যে যারা যোগ্য তারা ইলম অর্জন করার পর ইংরেজদের পক্ষে কমই গেছে; তল্পীবহন করতে। আর যারা ইলম ও প্রজ্ঞায় দুর্বল ছিল তারাই গেছে তাদের পক্ষে। সুবিধে হয়নি তাদের এই প্রকল্পেও। যার ইতিহাস বহন করছে বর্তমান আলিয়া মাদরাসা।

ঘটনা-০৩:

কলকাতা মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর ইংরেজরা যখন দেখল, এটা তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। তখন তারা সাধারণ মানুষের মাঝে একটা প্রত্যাশা তৈরি করে। যাতে সবাই চাকরি ও শাসকদের সুযোগ সুবিধা লাভের আশায় মাদরাসায় ইংরেজি শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে। পরিকল্পনা সফল হয়। জনতার মধ্য থেকেই দাবি ওঠে মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৭-৮ সালের জনশিক্ষা পরিচালক আর্চডেল আর্ল-এর নেতৃত্বে গঠিত বিখ্যাত ‘আর্ল কমিটি’ এবং ১৯১৪ সালে গঠিত নাথান কমিটি মাদরাসা শিক্ষায় আমূল পরিবর্তনের সুপারিশ করে। ১৯১৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে মাদরাসা শিক্ষায় নিউ-স্কিম ব্যবস্থা সর্বত্র চালু হয়। এ স্কিমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ফারসি ভাষা বর্জন ও ইংরেজি বাধ্যতামূলক করা। এসময় পাঠ্যসূচিতে বাংলা, অঙ্ক, ভূগোল, ইতিহাস, ইংরেজি, অঙ্কন, হাতের কাজ এবং ড্রিল অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে ১৯১৪-১৫ সাল থেকে নিউ-স্কিম ও ওল্ড-স্কিম নামে মাদরাসার দু’টি ধারা চালু হয়। সেই সময়ে শর্তারোপ করা হয়-যদি কোন মাদরাসা নিউ-স্কিম পদ্ধতিতে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তিত না করে, তাহলে তাদের জন্য সব ধরণের সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা বন্ধ করে দেওয়া হবে। তখন যুক্ত বাংলার অনেক আলেম এটাকে ইসলাম ও ইসলামি শিক্ষার ওপর নতুন খবরদারির চেষ্টা হিসেবে দেখলেন। সেজন্য তারা মাত্র কয়েকটি মাদরাসা নিয়ে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের উপর ভরসা রেখে; সরকারী সাহায্য পাওয়ার আশা ত্যাগ করেই ওল্ড-স্কিম শিক্ষা ব্যবস্থার উপর অটল থাকলেন। সরকার সেই মাদরাসাগুলোকে ‘খারিজী’ তথা সরকারী সাহায্য থেকে বাতিল হিসেবে ঘোষণা দেয়। ইতিহাস বলে ১৯২২ সালে দুই বাংলা মিলে মাত্র ১৯ টি মাদরাসা ওল্ড-স্কিমের তালিকায় ছিল।

পরে কালক্রমে নিউ-স্কিম মাদরাসা সাধারণ স্কুল-কলেজের রূপ ধারণ করে। ১৯৫৭ সালে সরকারি এক ঘোষণায় অসংখ্য মাদরাসাকে স্কুল-কলেজে রূপান্তরিত করা হয়। ১৯৭৪ সালের হিসেবে যার সংখ্যা ছিল ১০৭৪ টি। ঢাকায় বর্তমান নজরুল কলেজ, চট্টগ্রামের মুহসীন কলেজ, রাজশাহীর হাই মাদ্রাসা এককালে মাদরাসা থাকলেও অধুনা এই কলেজগুলো ইসলামি শিক্ষার ঐতিহ্য হারানোর সাক্ষী হয়ে আছে।

বাংলাদেশ পর্ব :

ঘটনা-০১:

প্রেসিডেন্ট এরশাদ তখন ক্ষমতায়। বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসাগুলোকে এমপিওভূক্ত করেন। শিক্ষকগণ সরকারি টাকায় নিজেদের বেতন-ভাতা উত্তোলন করেন। আরো পরে মাদরাসার দাখিল ও আলিমকে সাধারণ শিক্ষার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের সমমান দেওয়া হয়। আলিম পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় মাদরাসার শিক্ষার্থীরা। আরো পরে ফাজিলকে ডিগ্রির মান দেওয়া হয়। কামিলকে মাস্টার্সের মান দেওয়া হয় এই সেদিন।

ঘটনা-০২:

হঠাৎ করেই আলিম পাশ করা ছাত্রদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কয়েকটি সাবজেক্টে ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাথে সাথে আরো অনেক ভার্সিটিও। দুই বছর যাবৎ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও। কারণ, মাদরাসার ছাত্ররা ইংরেজি ও বাংলা পড়ে ১০০ নম্বর করে। আর স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা পড়ে ২০০ নম্বর করে। তাই মাদরাসার ছাত্ররা ঢাবিতে ৮টি সাবজেক্টে ভর্তি হতে পারবে না। এর মধ্যে বাংলা সাহিত্য ও ইরেজি সাহিত্য অন্যতম। একসময় মাদরাসার ছাত্ররা আন্দোলনে নেমে আসে। বাংলা ও ইংরেজি সাবজেক্টে নম্বর স্কুল ও কলেজের সমান করার জন্য। বর্তমানে সেটা সমান করা হয়েছে।

এবার আসি উপরের চারটি ঘটনা উল্লেখের কারণে। প্রিয় পাঠক একটু ধৈর্য ধরে সঙ্গেই থাকুন। প্রথম ঘটনায় দেখি মুসলমানদের শিক্ষার জন্য ইংরেজরা একটা প্রতিষ্ঠান করে। এই প্রতিষ্ঠান করার উদ্দেশ্যও ছিল মুসলিমদের সন্তানরা যেন সরকারি কাজে যোগদান করতে পারে। কিন্তু অন্তর্নিহিত কারণ ছিল দারুল উলুমের বিকল্প তৈরি করা। কিন্তু যখন দেখল যে তাদের দিন ফুরিয়ে আসছে! তখন কিন্তু এই শিক্ষা ব্যবস্থার দেহে বিষ ঢুকিয়ে দিলো। ওল্ড-স্কিম আর নিউ-স্কিমের আদলে। একসময় সরকারি অনুদানের মূলা ঝুলিয়ে প্রায় বিলুপ্ত করেছে ওল্ড-স্কিম মাদরাসাগুলোকে। প্রায় ৪৫ বছর পর ১৯৫৭ সালে নিউ-স্কিম নামক অনেক মাদরাসাকে স্কুল-কলেজে রূপান্তর করা হয়। যখন নিউ-স্কিমকে স্কুল কলেজে রূপান্তর করা হয় তখন কিন্তু দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মুসলিমদের দেশ ছিল এটা। লক্ষ্যণীয় হচ্ছে বর্তমানের চেয়ে তখনকার আলেম-উলামগণ আরো বেশি তেজস্বী ছিলেন। আরো বেশি প্রভাবশালী ছিলেন। কিন্তু মাদরাসাগুলোর স্কুলে বদলে যাওয়া ঠেকাতে পারেননি।
এবার আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদরাসা ছাত্রদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে চাতুর্যের আশ্রয় নিল, তখন মামালার রায় গিয়েছে মাদরাসা ছাত্রদের পক্ষে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মানেনি হাই কোর্টের সেই রায়। কেন মানেনি আদালতের রায়? কারণ এই নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ প্রকাশযোগ্য নয়। তাই ঠুনকো কারণকে সামনে আনা হয়েছে। যাতে আবারও আরেকটা নিউ-স্কিম ট্রাজেডি তৈরি করা যায়। ছাত্রদের আন্দোলনে কী হয়েছে! বাংলা ও ইংরেজিতে একশ একশ দুইশ নম্বর বেড়েছে। কমেছে কোথায়? নিশ্চয়ই ইলমে ওহী বুঝতে সহায়ক সাবজেক্টে। আবার নতুন করে এসেছে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’।

তাহলে! আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে আলিয়া মাদরাসায় এখন কোন আলেম তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। আর যারা হবে তারা নিজেদের জ্ঞান-স্বল্পতায় সহজ টার্গেট হবে আহলে হদীস, আহলে কুরআন, বেদাতি পীর আর কাদিয়ানিদের। দেশে বাড়বে ফেতনা আর ফেরকা। অপরদিকে দেখা গেছে আলিয়া মাদরাসার অধিকাংশ মেধাবী ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পাশ করার পর, মাদরাসা-শিক্ষক হয়ে কখনই ফিরেনি। যারাও ফিরেছে তাদের খুব কম সংখ্যকই তা’লিম তরবিয়তের প্রতি মনযোগি থেকেছে। স্বপ্ন ভঙ্গের দহনে তারা সবসময় ব্যক্তি উৎকর্ষের ধান্ধায় থেকেছে।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। দাখিল পাশ করা প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী গত দশ বছরে আমার প্রাইভেটের ছাত্র ছিল। তাদের শতকরা ৮০ জনই আরবী না জানার কারণে কলেজমুখী হয়েছে। আর আলিম পাশ করে ভার্সিটিমুখি বা নিদেনপক্ষে ন্যাশনাল ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে শতভাগ। এরা কেউই মাদরাসায় শিক্ষকতা করতে আসেনি। ফলে বর্তমানে সর্বজন পরিচিত কয়েকটি মাদরাসা ছাড়া যোগ্য আলেম শিক্ষক প্রায় বিশ পার্সেন্টের নীচে। এখানে ব্যক্তিগত পরিচয়সূত্রে জানা কয়েকটি জেলা, নিজ থানা ও নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আলোকে পরিসংখ্যানটি পেশ করা হয়েছে।

অপর দিকে নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি-দলপ্রীতি তো আছেই। সরকারের নানান শর্ত পূরণ করতে ঘুষ আর মিথ্যার আশ্রয় তো এখন প্রায় সিদ্ধ। যার ফলে আলিয়া মাদরাসার রুহানিয়্যাত এখন শূণ্যের কোটায়। সবচে’ অবাক হবার বিষয় হলো যেসব আলিয়া মাদরাসায় মহল্লার মসজিদ নেই, সেইসব মাদরাসার মসজিদের দুর্দশা দেখলে বে-নামাজিও আহত হবে।
এতকথা বা ভূমিকার কারণ একটাই। কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি নিলে আমাদের জন্য কী রকম পরিণতি নেমে আসতে পারে তার একটা ধারণা দেওয়া। একজন বন্ধুর সাথে বিতর্ক করতে গিয়ে তিনি একসময় বললেন ‘স্বীকৃতি আমাদরে জন্য আত্মঘাতি হবে’।

আমার এই দীর্ঘ সূচনাকথনে অনেকেই হয়তো ধারণা করছেন আমি স্বীকৃতির বিপক্ষের লোক। কিন্তু না! আমিও চাই আমাদের কওমি সনদের স্বীকৃতি। কিন্তু কীভাবে? সেই পথটা জানা নেই। জানি কেবলই সমস্যার কথা। আর সেই সমস্যার কথা শংকার কথা বলে বেড়াই কারণ; বড়দের কাছ থেকে যদি আসে সমাধান!
আমি আহত হই যখন দেখি আমার বাবা, চাচা, ভাই- একজন মুহাদ্দিস, মুফতি অথবা আলেমে দ্বীন কিন্তু সরকারের পরিসংখ্যানে তিনি মাত্রই একজন অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ। আমি ক্ষুব্ধ হই যখন দেখি একজন মানুষ ইবারত পড়তে পারে না; অথচ সেই লোকটা মুহাদ্দিস টাইটেল নিয়ে বসে আছে। অথচ তাকে পড়ানোর যোগ্যতা রাখা আমার উস্তাদ একটা মাদরাসায় লেগে আছেন। যেখানে মাসের পর মাস বকেয়া থাকে বেতন। অথচ তিনি ছাত্র তৈরি করছেন অগণিত। আর সেই সার্টিফিকেটধারি তৈরি করছেন একজন কামলা; যে কিনা আলিম পাশ করেই ছুটবে সরকারের চাকর হতে। আমি অবাক হই যখন একটা সার্টিফিকেটের জন্য যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আমার কোন ভাই তার উপযোগী জায়গায় খেদমত করতে পারেন না। অপর দিকে জীবনের দীর্ঘ একটা সময় শিক্ষায় কাটিয়ে আমাকে রাষ্ট্রের ভাষায় পশ্চাদপদ একটা জনগোষ্ঠী হয়ে থাকতে হচ্ছে। এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হতে পারে না।

কারো কারো মত অবশ্য আমার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা বলেন-‘আমি জানি’ এটা অন্য কেউ বলতে হবে এই প্রথায় আমি বিশ্বাসী নই। কেউ একজন এসে বা একটা কাগজে লিখে বললো যে, আপনি হাদীস জানেন। সেটা কোনভাবেই স্বীকৃতি হতে পারে না।’ সেসব ভাই বা জ্ঞানীদের প্রতি শতভাগ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আমি আপনাদের মত এতটা সাহসী বা আত্মবিশ্বাসী নই। আমি চাই রাষ্ট্র আমাকে মূল্যায়ন করুক। আবার আমাকে নিয়ে সুদূরপ্রসারি কোন ষড়যন্ত্রও না করুক।

এবার আসি কওমির সেই ভাইদের কথায়। যারা কওমির পাশাপাশি আলিয়া মাদরাসায় সার্টিফিকেট নিয়েছেন এবং ভার্সিটিতে পড়েছেন। কতজন কওমিতে ফিরে এসেছেন? আমরা এই চিত্রটা খুব সহজেই পাবো। যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ইসলামী শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক, মিডিয়া হাউজ ইত্যাদি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকাই। এই প্রসঙ্গে অনেকেই প্রশ্ন করেন। কওমি কি সবাইকে জায়গা দিতে পারবে? আমার প্রশ্ন এখানে নয়। স্বীকৃতির আগেই যেহেতু আমরা সুযোগ পেলে ফিরে আসি না। তাহলে স্বীকৃতির পর যখন আমার জন্য উন্মুক্ত হবে সারা দেশ! তখন কতটা ফিরবো? এক্ষেত্রে একদিন আমাদের জীবনের চেয়ে প্রিয় কওমি মাদরাসাগুলো কি মেধাবী শিক্ষক শূণ্যতায় ধুকবে না!
উত্তরটা হতে পারে এমন যে আমরা তো স্বীকৃতি নিচ্ছি আমাদের মতো করেই। কথা আছে এখানেও; ‘খলের হয় না ছলের অভাব’।

একবার যখন তাদের ফাঁদে পা দিবো তখন আর ফিরে আসতে পারবো না। যেমন পারেনি অতীতের কেউ। আবার ঊন্মুক্ত এই পৃথিবীতে কাউকে আটকে রাখাও সম্ভব নয়। সুতরাং যখন আমরা সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করবো কিন্তু সুযোগ পাবো না। তখন আমরাই নিজেদের সুযোগের জন্য আন্দোলন করবো। একসময় আদায় করে নেবো। কিন্তু সেসময় আমরা কেউ আজকের এই দৃঢ়তার কথা মনে রাখবো না। যেমন রাখেননি নিউ-স্কিমের কর্ণধাররা।

বর্তমানে আমরা দেখতে পাই অনেকেই কওমি মাদরাসার কালেকশন নিয়ে নাক সিটকান। অনেক কওমি ভাইদেরও দেখি তাতে সুর মেলান। আচ্ছা, যখন রাষ্ট্র বলবে যে, তোমরা এমপিও নাও। তখন কতজন পাবো যারা সেই ১৯২২ সালের ১৯টি মাদরাসার কর্তৃপক্ষের মতো দৃঢ়তা দেখাবে?

সরকার প্রসঙ্গ :

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের কিছু আগে বা পরে হাসিনাপুত্র জয় বলেছিলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কওমি মাদরাসার ছাত্র ৩৫%।

কিছুদিন আগে বলেছেন ’৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশে প্রতি তিনজন স্কুল শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন মাদরাসার ছাত্র বেড়েছে। তাই তিনি মাদরাসায় ছাত্র কমানোর আন্দোলন শুরু করেছেন।

সরকার এবার ক্ষমতায় এসে কওমি মাদরাসার স্বার্থবিরোধী যে কয়টা কাজ করেছে তার মধ্যে ভয়াবহতম হলো সমাপনি আর জেডিসি ও জেএসসি পরীক্ষা। কিন্তু কীভাবে? এবার দেখুন জয়ের বক্তব্য। প্রথমটা হলো সেনাবাহিনীর মত স্পর্শকাতর একটা জায়গা নিয়ে মিথ্যাচার। দ্বিতীয়টা হলো ছাত্র কমানো। কিন্তু সেই আন্দোলনের একটা হলো উল্লেখিত পাবলিক পরীক্ষাগুলো। দেখুন আমারা যারা কওমিতে পড়ি তাদের অনেকেই শিক্ষাজীবনের প্রায় মাঝামাঝি গিয়ে উপলব্ধি করি একটা সার্টিফিকেট দরকার। অথবা কখনও কোন উস্তাদের পরামর্শে আমরা দাখিল পরীক্ষা দিতাম। এরপর নানা পথে যেতাম।

সেটা বন্ধ করার জন্যই এত আয়োজন! কারণটা হলো; সমাপনি দিতে হয় ১০-১১ বছর বয়সে। আর জেডিসি বা জেএসসি দিতে হয় ১২-১৩ বছর বয়সে। এখন, একজন কওমীর ছাত্র যখন বুঝতে পারে তার দাখিল বা এসএসসি দিয়ে একটা সার্টিফিকেট নেওয়া দরকার ততক্ষণে তার বয়স হয়ে যাবে ১৬/১৭।
অপরদিকে আছে জন্ম নিবন্ধন। বয়স কমানোর কোন সুযোগ নাই। ফলে তার পক্ষে ১৫/১৬ অথবা ১৭ বছর বয়সে সমাপণি দেওয়ার কোন সুযোগ নাই। এরপরও যদি কেউ দিতে চায় তাহলে বাকি সনদ অর্জন করার পর সরকারি চাকরি পাওয়া অসম্ভব। কেননা ততোদিনে তার সরকারি চাকরির বয়সের সীমা শেষ হয়ে যাবে।

এখন এই সরকার যখন আমাদের সব শর্ত মেনে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে তখন, এতে যে কোন ফাঁদ নেই; তা হলফ করে বলা যাচ্ছে না। অপরদিকে অন্য সরকার দিলে ওরা আবার ক্ষমতায় এসে এটাতে হস্তক্ষেপ করবে না এই নিশ্চয়তা কোথায়? সবমিলিয়ে কওমী সনদের স্বীকৃতি এখন উম্মাহর আলেমদের জন্য একটা কঠিন সিদ্ধান্তের বিষয়। আর সেই কঠিন সিদ্ধান্তটা যেন ভালভাবে নিতে না পাওে সেই ব্যবস্থাও এই সরকার করে দিয়েছে। নিজেদের মধ্যে ভাঙ্গণ সৃষ্টি করে। ক’দিন যাবৎ শুনছি বেফাক বাদে বাকি এগারটা বোর্ড স্বীকৃতি নেবে। এটা হবে আমাদের জন্য চরম আত্মঘাতি। যেখানে সারাদেশে আলিয়া মাদরাসার জন্য একটা বোর্ড সেখানে আমাদের সূচনাতেই লাগে এগারটা! দীর্ঘ ইখতিলাফের সূচনা হবে এই স্বীকৃতি নিয়ে।

কিন্তু! আসছে জেনারেশন আমাদের ভুলের মাশুল যদি গুণে, তাহলে ওরা ক্ষমা করবে না আমাদের। একটা জাতির সুখ-শান্তির হক কেড়ে নেওয়ার জন্য ক্ষমা করবেন না পরওয়ার দিগারও। সেদিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয় যেদিন আমরা ইজতেহাদি ভুল বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করবো; কিন্তু কেউ আমাদের কথা শুনবে না। তীব্র ঘৃণায় এড়িয়ে যাবে উম্মতের রাহবার প্রিয় সেই মানুষদেরকে। স্বীকৃতি যদি আমাদের নিতেই হয় তবে তা ঐক্যের ভিত্তিতেই নেব। আর যদি না নেই সেই সিদ্ধান্তটাও যেনো ইজমার ভিত্তিতেই হয়। তাহলে হয়তো উত্তরণের পথটা রুদ্ধ হয়ে যাবে না।


লেখক: সাইফ সিরাজ

রাজনগর মাও. বাড়ি
২৫.১১.২০১৩

Leave a comment

%d bloggers like this: