ইংরেজি ষোল শতকে আরববিশ্ব ওসমানি খেলাফতের অধীনে চলে যায়। ওসমানিদের আগে এ অঞ্চলে মামলুক ও সাফাবী বংশের রাজত্ব ছিলো। মিসর, শাম, হেজায ও ইয়েমেন শাসন করতো মামলুকরা। ইরাকে ছিলো সাফাবীদের ক্ষমতা। আবার মরক্কো ও লিবিয়ার কিছু অংশে ছিলো স্পেনের উপনিবেশ।

ওসমানিরা ষোল শতকের গোড়ার দিকে আরবের বিভিন্ন অঞ্চল একের পর এক জয় করতে থাকে। সেটা ছিলো সুলতান প্রথম সেলিমের আমল। প্রায় পুরো আরববিশ্বই তখন চলে যায় ওসমানিদের হাতে

উসমানী সাম্রাজ্য

ওসমানিদের এই বিজয়ের ফলে বিভক্ত আরববিশ্ব আবার একক শাসনের অধীনে আসে। ওসমানি আমলে আরববিশ্ব কিছু কিছু বিষয়ে খুব ভালো সময় পার করেছে। ওসমানি সুলতানরা আরবজাতিকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। প্রতিজন নাগরিককে তার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার দিয়েছে। ওসমানিরা অনারব; কিন্তু আরব মুসলমানদের কখনও মনে হয়নি, আমাদেরকে শাসন করছে এক ভিনজাতি। শুধু আরব কেন, পুরো মুসলিম বিশ্বেই মানুষ ওসমানিদের আপন করে নিয়েছিলো। তাদেরকে মুসলিম জাহানের বৈধ খলিফা মনে করতো।

ওসমানিরা সুন্নি আকিদায় বিশ্বাসী ছিলো। সুন্নি আকিদা প্রসারে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সাফাবীদের আমলে ইরাকে শিয়া মতবাদ ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিলো। নাজাফ, কারবালা, কাজিমিয়া ইত্যাদি তীর্থস্থান কেন্দ্র করে শিয়ারা পুরো ইরাকজুড়ে তৎপর হয়ে ওঠেছিলো। ওসমানিরা সুপরিকল্পিতভাবে আবার সেখানে সুন্নি মতবাদের প্রসার ঘটায়। দ্বীনি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে। শিয়াদের বিভিন্ন মাজার থেকে মুসলমানদের দৃষ্টি ফেরানোর জন্য আবু হানিফা রহ., আব্দুল কাদের জিলানি রহ. সহ ইরাকে আরও যাদের কবর রয়েছে তাদের মাজার যিয়ারতের সুব্যবস্থা করে।

ওসমানিদের সংস্কার ছিলো বহুমুখী। সংস্কার চলে তাসাওউফচর্চায়ও। বে-শরা পীর-মুরিদির জায়গায় শরিয়তসম্মত আত্মশুদ্ধিমূলক তাসাওউফধারার প্রসার ঘটায়। বিশুদ্ধ ইলমচর্চার নিমিত্তে মুসলিম জাহানের আনাচে কানাচে মানসম্মত মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে। তাই ওসমানি আমলে অনেক বড় বড় আলেমের জন্ম হয়েছে। ফেকাহর দিক থেকে ওসমানিরা হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে। সরকারি বিচার-আদালত হানাফি ফেকাহ অনুযায়ী চলতো। অবশ্য বিভিন্ন এলাকায় অন্যান্য মাজহাবের স্থানীয় আদালতও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো।

খেলাফতের প্রথমযুগের মতো ওসমানিরাও পৃথিবীর দিকে দিকে ইসলামের বিজয়-ঝাণ্ডা নিয়ে অগ্রসর হয়। ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়ার তিন দিকেই তারা মুসলিম বিশ্বের আয়তন সম্প্রসারিত করে। এই দুর্দান্ত বিজয়কীর্তির কারণে মুসলমানরা ওসমানিদের যথেষ্ট সমীহ করা শুরু করেছিলো।

ওসমানি আমলে আরববিশ্ব বারোটি প্রদেশে বিভক্ত ছিলো। সেগুলো হলো, হেজায, বৈরুত, ইয়েমেন, বসরা, বাগদাদ, মুসেল, হলব, দামেস্ক, আলজেরিয়া, ত্রিপোলি, তিউনিসিয়া ও মিসর। এই পুরো সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিলো ইস্তাম্বুল। প্রত্যেক প্রদেশের গভর্নরকে কে বলা হতো পাশা। ওসমানিরা বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যের প্রতিও লক্ষ্য রেখেছে।

কোনো এলাকায় ঐতিহ্যবাহী কোনো শাসক পরিবার থাকলে সেখানে তাদেরকেই ক্ষমতায় রেখেছে। গভর্নরের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাদেশিক রাজধানী ও আরব শহরে শরিফ নিয়োগ দেয়া হতো। শরিফ হলেন রাসুল সা. এর বংশধর; বেশিরভাগই এরা হতেন আরব পরিবার। শরিফদের প্রধান কাজ ছিলো শাসক ও জনগণের মধ্যে মধ্যস্থতা করা। মক্কার শরিফ ওসমানি আমলে প্রভূত সম্মান ও সুবিধা ভোগ করতেন। খেলাফতের প্রধানমন্ত্রী আর মক্কার শরিফকে সমান মর্যাদা দেয়া হতো।

গভর্নরদেরকে নবায়নযোগ্য এক বছর মেয়াদের জন্য নিয়োগ দেয়া হতো। মেয়াদ অল্প হওয়ার কারণে গভর্নররা দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নমূলক প্রকল্পে হাত না দিয়ে কত বেশি কর ও অন্যান্য সরকারি আয় উসুল করা যায় সেদিকেই মনোযোগী হতেন। কারণ, তাতে পরের মেয়াদে নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তো। এসব অর্থ রাজধানীতে পাঠানো হতো।

গভর্নররা নিজেদের বার্ষিক বেতনও এই আয় থেকে গ্রহণ করতেন। অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে খেলাফতের প্রতি অনুগত রাখা, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাজার পর্যবেক্ষণ করা ইত্যাদি দায়িত্বও তাদের উপর ন্যস্ত থাকতো। তবে সুলতান অনেক সময়ই এক বছরের আগেই গভর্নর বদলি করে ফেলতেন। এমনও হয়েছে, এক মাস না যেতেই গভর্নর পরিবর্তন হয়েছে।

ওসমানিরা শরয়ি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলো। সুলতান প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতেন; যাকে শাইখুল ইসলাম বলা হতো। শাইখুল ইসলামের প্রতিনিধি হিসেবে সকল প্রদেশে স্থানীয় কাজি নিয়োগ পেতেন। তাদেরকে বলা হতো ‘মোনলা’ (মোল্লা)।

আবার ফতোয়া দেয়ার জন্য শহরভিত্তিক মুফতিও দেয়া হতো। পুরো সা¤্রাজ্যে মোট সাতাশজন কাজির (মোল্লা) সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁরা নির্দিষ্ট কোনো জাতির হতেন না। কেউ আরব, কেউ তুর্কি, কেউ কুর্দি- সবধরণেরই হতেন। তবে তাঁরা সবাই হতেন হানাফি মাজহাবের অনুসারী। ওসমানি আমলে হানাফি মাজহাবই ছিলো সরকারি মাজহাব।

জনগণের সুযোগ-সুবিধার দিকে ওসমানিরা কম মনোযোগ দেয়নি। ইসলামি মূল্যবোধেও তারা সচেতন ছিলো। সামরিক শক্তিতেও ছিলো অপরাজেয়। তবু একসময় ভেঙ্গে গিয়েছিলো ওসমানি সাম্রাজ্য। আরবরা খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো। এক সময়ের প্রতাপশালী ওসমানিরা যুদ্ধে পশ্চিমাদের কাছে পরাজিত হতে লাগলো। কেন? তারও রয়েছে অনেক কারণ!


Author: নাঈম আবু বকর

Source: Natun Dak

Leave a comment

%d bloggers like this: