শুরুটা হোক একটা কল্পনা দিয়েই। ধরা যাক বৃটেন ও আমেরিকা ইসলামের প্রধান শক্তিধর দুটি রাষ্ট্র। ইসলাম নিয়ে চর্চা-গবেষণা ও অনুশীলন এ দুটি রাষ্ট্রের ন্যায় আর কোথাও হয় না। পৃথিবী একাট্টা হয়েছে বৃটেন ও আমেরিকার বিরোধিতায়। মুসলমানদের প্রধান শক্তিধর এ দুটি রাষ্ট্রের বিনাশ সাধনে। বিশ্বে বসবাসরত আর সকল মুসলমানের প্রার্থনা তখন কী হবে?…হে আল্লাহ! মুসলমানদের প্রধান দুটি দেশ বৃটেন ও আমেরিকাকে তুমি রক্ষা কর। আর সকল শক্তির উপর এ দুুটি রাষ্ট্রকে তুমি বিজয় দান কর। এ রাষ্ট্র দুটির উপর তোমার বিশেষ রহমত নাযিল কর’- ইত্যাদি অসংখ্য আবেগমাখা প্রার্থনাবাক্য।

কল্পনাটা এ ধারায় আরো বিস্তৃত করা যেত। এখানেই ক্ষ্যাান্ত দিলাম ধৈর্যচ্যুতির আশংকায়। কারণ বাস্তব অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তবে ইসলামের উম্মাহকেন্দ্রিক চেতনাটা কেউ যদি স্পর্শ করে থাকেন, তাহলে তার নিকট কল্পনার এই থিমটা আদৌ অসম্ভব কিছু মনে হবে না। বরং তিনি তার চিন্তা-চেতনা স্বপ্ন ও কল্পনা এমন একটা সম্ভাবনাকে সামনে নিয়েই রচনা করবেন। এমন একটা সম্ভাবনাকে সামনে নিয়েই ইসলামের উজ্জ্বল ভবিষ্যত নির্মাণে প্রয়াসী হবেন।
উম্মাহকেন্দ্রিক চেতনাকে আরো স্পষ্ট করার জন্য কয়েকটি বিষয়কে সামনে নিয়ে আসতে চাই।

এক.

সত্য-সুন্দর-কল্যাণ ও সফলতা কারো একার সম্পদ নয়। নয় কোন গোষ্ঠী বা জাতির একক অধিকার। জাতি, গোষ্ঠী, রং-বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই অধিকার রাখেন এই সত্য, সুন্দর, কল্যাণ ও সফলতার ধারক হওয়ার। সত্য ও কল্যাণকে নিজ আদর্শরূপে গ্রহণ করার। ‘ইসলাম’ যেহেতু এই সত্য, সুন্দর , কল্যাণ ও সফলতার ধারক তাই এই ইসলামকে জানা, বুঝা এবং তাকে ধারণ করার অধিকার পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের। ‘ইসলাম’ কোন গোষ্ঠী বা জাতির একক সম্পদ নয়। নয় কোন রাষ্ট্র বা অঞ্চলের একক সম্পত্তি। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই মালিক এ সম্পত্তির। যারা বুঝে পান নি নিজেদের অধিকার, যারা বুঝে পেয়েছেন তাদের উচিৎ ঐ বঞ্চিত ব্যক্তি, জাতি ও গোষ্ঠীকে তাদের পাওনাটুকু বুঝিয়ে দেওয়া। পৌঁছে দেওয়া তাদেরই আমানত তাদের কাছে ।

দুই.

হযরত রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানবে, অনুসরণ করবে, তাঁর আদর্শকে বুকে ধারণ করবে এবং তাকে সবচে বেশি ভালোবাসবে কারা? কমন একটি উত্তর হলো যারা তাঁর উম্মত। আর এ উম্মত বলতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বুঝিয়ে থাকি আমরা যারা মুসলমান। অথচ প্রকৃত বিচার্যে ‘উম্মত’ শব্দটা আমাদের অধিকাংশের ব্যাবহারের মতো এতটা সংকীর্ণ গ-ীতে আবদ্ধ নয়। বরং হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান-ইহুদীসহ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই শেষ নবীর উম্মত। এ কারণেই পৃথিবীর প্রতিটা জাতি ও রাষ্ট্র এবং প্রতিটি মানুষের নিকট ওহীসূত্রে প্রাপ্ত সত্যকে তুলে ধরার জন্য ছিল তাঁর এতো আকুলতা। পথহারা প্রতিটি মানবের জন্যই তাঁর এতো অস্থিরতা ও ব্যাকুলতা। এ সূত্রেই তাঁর আগমন-পরবর্তী পৃথিবীর সকল মানুষই তার উম্মত। এ উম্মত দু ভাগে বিভক্ত-

-উম্মতে ইজাবাত। অর্থাৎ যারা নিজেদের প্রাপ্য সত্য বুঝে নিয়ে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছে।

-উম্মতে দাওয়াত। যারা নিজেদের সত্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত। সাড়া দিতে পারে নি তাঁর ডাকে। ফলে সত্যাবলম্বীদের পক্ষ থেকে প্রকৃত সত্যের আহ্বান যাদের পাওনা।

তিন.

রাসূলুল্লাহ সা. এ ধরণীপীঠে প্রথম যখন রাসূল হলেন তখন এ বিপুলা পৃথিবীর একটি মানুষও তাঁর অনুসারী ছিল না। তিনি পারতেন দশটি মানুষকে তাঁর অনুসারী বানিয়ে বাকি পৃথিবীটাকে তাঁর প্রতিপক্ষ ভাবতে। পারতেন নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল বা গোত্রকে অনুসারী করে বাকি দুনিয়াটাকে তাঁর বিপক্ষে দাঁড় করাতে। কিন্তু না, তিনি ভাবলেন- মানুষের যে দৌলত আমি নিয়ে এসেছি পৃথিবীর মানুষকে যে কোন মূল্যে শুধু এ কথাটুকু যদি বুঝিয়ে দিতে পারি যে, তাঁর পাওনাটুকুই আমি তাকে বুঝিয়ে দিতে এসেছি তাহলে তারা এ সত্য গ্রহণ না করে পারবে না। মূলত এ কারণে তায়েফবাসীর পক্ষ থেকে চরমভাবে নিগৃহীত হওয়ার পরও তাদের ধ্বংস কামনা তিনি করতে পারেন নি।

ইসলাম বিরোধিতায় মক্কার কুরাইশ কাফেরদের চেয়ে বড় উপমা আর কাউকে দিয়ে হয়তো পেশ করা হয় না। অথচ রাসূল সা. সর্বপ্রথম সেখানেই আলোর দীপটা জ্বালানোর চেষ্টা করলেন। প্রাণপন প্রচেষ্টা । যারা সর্বান্তকরণে তাঁর বিরোধিতায় লিপ্ত হলো তিনি সর্বান্তকরণে তাদেরকে প্রদীপ্ত আলোয় পরিণত করতে সচেষ্ট হলেন। ফলে প্রথম প্রথম সংখ্যাবিচারে খুব বেশি না হলেও যে কয়েকটা আলোক-প্রদীপ জ্বলে উঠল, তার ঔজ্জ্বল্যেই হয়তো আজকের চৌদ্দশত বছরের পৃথিবী এতো উজ্জ্বল।

এ বিচারেই প্রথম দিকের কল্পনাটা এক পরাবাস্তব সত্য। যে জায়গা ও স্থানটিতে ইসলামের প্রবল বিরোধিতা প্রত্যক্ষ হয়, ইসলামের অপার সম্ভাবনা সেখানেই জেগে ওঠে। প্রতিপক্ষ ও প্রতিকূল অবস্থা যেখানে তীব্র হয় ইতিহাসের কিছু স্বর্ণমানব সেখানেই জ্বলে ওঠে। যদি উম্মাহর বৈশ্বিক চেতনাটাকে শাণিত করে সেখানে আত্মনিয়োগ করা যায়।

এবার আসা যাক পৃথিবীর বস্তুগত কিছু সত্যের দিকে যা আমরা চাই বা না চাই পৃথিবীমূলে তা প্রতিষ্ঠিত।

একজন মানুষ যদি দৈহিক গঠনে শক্ত-সমর্থ হয় তাহলে মুসলমান হলেও যেমন সে এই দৈহিক গঠনের অধিকারী মুসলমান না হয়ে অন্য ধর্মের হলেও সে একই দৈহিক গঠনের অধিকারী। এটা একটা বস্তুগত ‘সত্য’। একজন মানুষ যদি তীক্ষè মেধাবী হয় তাহলে সে মুসলমান হলেও যেমন সে মেধাবী, মুসলমান না হয়ে অন্য ধর্মের হলেও সে ঐ একই মেধার অধিকারী। অর্থাৎ এটাও একটা বস্তুগত ‘সত্য’. মোটকথা, মানুষ জন্মগতভাবে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ও গুণ নিয়ে জন্ম নেয় যা তার ধর্মাদর্শভেদে কোন পার্থক্য হয় না। হ্যাঁ, ধর্মাদর্শের কারণে বেশির চে বেশি খানিকটা প্রভাবিত হতে পারে। বস্তুগত সত্যটা আমাদের পছন্দ হোক বা না হোক আমরা মানতে বাধ্য। এটা যে এ যুগেই আমাদেরকে মানতে হবে ব্যাপারটা আদৌ এমন নয়, বরং ব্যাাপারটা সব যুগেই সবার জন্য সমানভাবে সত্য।

এ সত্য মানতে গিয়ে অনেকেই শতধাছিন্ন মরু আরবের বিচ্ছিন্ন কিছু জনগোষ্ঠী কর্তৃক ইসলামের পতাকা নিয়ে বিশ্বজয়ের বিশ্লেষণে এ বিষয়টাকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন যে, পূর্ব থেকেই আরবরা দুর্ধর্ষ একটা জাতি ছিল। তাদের শৌর্যবীর্যের একটা খ্যাতি ছিল অনেক আগ থেকেই। অভাব যা ছিল তাহলো একক নেতৃত্ব আর বিশ্বকে পথ দেখানোর মতো মহান কোন আদর্শ। তাদের সে জাতিগত বৈশিষ্ট্য যখন ইসলামের প্রদীপ্ত আলোয় প্রতিভাত হলো তখন পৃথিবীর তাবৎ পরাশক্তিগুলো একে এেেক তাদের সামনে নতি স্বীকারে বাধ্য হলো।
বস্তুগত এ সত্যটা যদি মেনে নেয়া হয় এবং উম্মাহর বৈশ্বিক চেতনাটাকে সামনে নিয়ে বিষয়টাকে যদি ভাবা যায় তাহলে পৃথিবীর কৃতিত্ব ও কর্তৃত্ব আজ যাদের হাতে তাদেরকে পৃথিবীর প্রতিটি জাতি, গোষ্ঠী ও শক্তিকে এমনকি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকেও প্রতিপক্ষ মনে হওয়ার পরিবর্তে এক একটি সম্ভাবনা বলে মনে হবে। এবং সে সম্ভাবনাকে ঈমানের প্রদীপ্ত আলোয় উদ্ভাসিত করে মানবজাতির সর্বোচ্চ কল্যাণে নিয়োজিত করার সর্বোচ্চ একটা তাগিদ প্রতিটি মুমিনের অন্তরে অনুভূত হবে। মূলত এটিই বৈশ্বিক উম্মাহ চেতনা। এভাবে ভাবতে পারলে পথিবীতে কাজের ময়দানটা অনেক বিস্তৃত হয়ে যায়। বিরোধিতার জায়গাটা অনেক ছোট হয়ে আসে। জগতটা অনেক বেশি ইতিবাচক মনে হয়। শুধু বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতার সুযোগ আর থাকে না।

বর্তমান দুনিয়াটাকে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ নামে অভিহিত করা হয়। অর্থাৎ পৃথিবীটা সত্যিকারে একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। একটি গ্রামে পরষ্পর প্রতিবেশী হিসাবে বাস করলে একজন অপরজনের সুখ-দুঃখ, চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণে যেমন প্রভাবিত হয় তেমনি প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমান পৃথিবীর দূর থেকে দূরাঞ্চলের ঘটনাবলীও আজ আমাদেরকে প্রভাবিত করে। ভৌগলিক দূরত্ব আর সীমারেখা মুছে দিয়ে সুখ-দুঃখ সমবেদনায় প্রতিনিয়তই আমরা শরীক হই। বিনিময় করে থাকি পরষ্পরের ভাব ও ভাবনাগুলো। তাই হাতের মুঠোয় চলে আসা পৃথিবীটাতে বৈশ্বিক উম্মাহর চেতনাটা বর্তমানকালে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যময়।

যদি বলি একটি গ্রামে কয়টি রাষ্ট্র চলতে পারে? হাস্যকর একটি প্রশ্ন। একটি গ্রামে একটি রাষ্ট্রই চলে কী করে? কেন চলতে পারে না- উত্তর খুব সহজ। খুব ছোট একটি ভূখ-ে রাষ্ট্রীয় যে স্ব^াতন্ত্র্যগুলো থাকতে হয় সে স্বাতন্ত্র্যগুলো দাঁড় করানো খুবই কঠিন। চিন্তা-চেতনা, আইন-আদালত, সমর ও অর্থনীতি যে কোন বিচারেই হোক। হ্যাঁ, বর্তমান বিশ্বটা প্রযুক্তির হাত ধরে গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হওয়ার দিকে যতই ধাবমান, বিশ্বব্যাপী একমুখী একটা স্বতন্ত্র অবস্থান দাঁড় করানোর দিকে ততই আমরা অগ্রসরমান। শত ভিন্নতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র, ভৌগলিক পার্থক্য, ভাষা ও ধর্মগত বিভেদ সত্ত্বেও ঐক্যের একমুখী একটা রাস্তা, কিংবা এই প্লাটফর্মে দাঁড়ানোর একটি বিশ্বমঞ্চ এরই মধ্য দিয়ে আমরা নির্মাণ করেছি এবং করছি। যে মানুষের মৌলিক-মানবিক অধিকারগুলোর মতো সার্বজনীন বিষয়গুলোকে ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা হচেছ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাদ্য ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে ঐক্যের সূত্র হিসাবে নেওয়া হচ্ছে।

অথচ বিশ্বজনীন এ ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মূলমঞ্চ অনেক পূর্ব থেকেই মুসলমানদের ‘উম্মাহ চেতনা’য় বিদ্যমান। আজ যখন সে চেতনাকে শাণিত করার প্রয়োজন প্রকট হয়ে উঠছে, সময় ও প্রযুক্তি যখন তা অনিবার্য করে দিচ্ছে এবং বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের এ মঞ্চ মানুষ নানারূপে তা প্রতিষ্ঠা করে ক্রমান্বয়ে তাকে পরিণত করতে উন্মুখ, তখন এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের নিস্পৃহ ভাব কিংবা ঔদাসিন্যতা সময়ের দানব ফেরাউনদেরকেই তা দখল করতে প্রলুব্ধ করবে। উন্মুখ হবে শোষণ ও জুলুমের নিত্য-নতুন দ্বার। রক্তাক্ত হবে একের পর এক পৃথিবীর জনপদ। ভূলণ্ঠিত হবে মানুষ ও মানবতা। এবং সবচে বড় অভিযোগটা দাঁড়াবে এই, চৌদ্দশত বছর পূর্বে ইসলাম এসেছিল অবশ্যই বিশ্বমুক্তির বার্তা হয়ে। কিন্তু চৌদ্দশত বছর পর এই পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ইসলামের সে মুক্তিসনদ কতটা কার্যকর?


Author: মুহা. ইনায়েতুল্লাহ

Source: Natun Dak

Leave a comment

%d bloggers like this: