Categories
History

আরব বিশ্ব ও আজকের আরব


শাঁ শাঁ করে ছুটছে গাড়ি। পিচঢালা সুপ্রশস্ত সড়ক ঝকঝকে তকতকে। দুপাশে কাঁচ-আবৃত বাহারি দালানকোঠা। কী তার স্থাপত্য কারুকাজ! ভবনের নীচে বড় বড় দোকান, সুপার মার্কেট। আধুনিক শৈল্পিক লিপিতে সাইনবোর্ডে লেখা নাম। মাঝখানের আইল্যান্ডে খেজুর গাছ।

একটু পর পর আইল্যান্ডকে বেশ চওড়া করে স্থাপিত মিনি পার্ক। পার্কে বিপুল ব্যয়ে জন্মানো সবুজ ঘাস, শিশুদের বিনোদনের জন্য ছোট ছোট রাইড। গাড়ি ছুটছে। প্রায়ই চোখে পড়ছে মনোরম নির্মাণশৈলীর আলীশান মসজিদ। কোথাও কোথাও মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে ফ্লাইওভার।

হঠাৎ চারপাশ বন্ধ। এ কি কাণ্ড! না, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আসলে গাড়িটি ঢুকে পড়েছে পাহাড় কেটে তৈরি কোনো সুড়ঙ্গপথে। সুড়ঙ্গ পেরিয়ে গাড়ি ছুটছে।

দেখতে দেখতে লোকালয়, দালানকোঠা, শপিংমল সব উধাও। এখন দু’পাশে খোলা প্রান্তর। লতাগুল্মহীন, রুক্ষ। দূরে দেখা যায় পাথুরে পাহাড়ের সারি।

নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, গাড়িটি চলছে কোনো আরব দেশের সড়ক ধরে। উন্নত আরব শহরগুলোর দৃশ্য সব জায়গায় কাছাকাছি এমনই।

গত শতকে আমূল বদলে গেছে আরব ভূখণ্ডের মানচিত্র। সাথে সাথে বদলেছে আরো অনেক কিছু। অঢেল অর্থবিত্ত হয়েছে। কোথাও কালো সোনা অভিহিত জ্বালানি তেল, কোথাও পর্যটনের হাত ধরে কাড়ি কাড়ি বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে।

ইয়েমেন, সোমালিয়ার মতো কয়েকটি অনুন্নত দেশ ছাড়া বাকি সবগুলো আরব রাষ্ট্রই হয়েছে সমৃদ্ধ। ইসলামি ইতিহাসের কিতাবাদিতে যে আরব ও আরব ভূখণ্ডের পরিচয় দেখা যায় তার সাথে এখনকার আরবের রয়েছে বিশাল তফাৎ।

একটা সময় ছিলো যখন উটের পিঠে চড়ে একজন মুসাফির সুদূর দামেস্ক থেকে মক্কায় চলে আসতেন। ইয়েমেন থেকে একজন ব্যবসায়ী চলে যেতে পারতেন সে-ই মরক্কো।

দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকাজুড়ে অবস্থিত পুরো আরব ভূখণ্ড ছিলো অভিন্ন। আরবও ছিলো অভিন্ন জাতি। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি সবই অভিন্ন। ইসলাম ও ইসলামি সমাজব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনো মতবাদ তারা চিনতো না। এখন সে অখণ্ড অঞ্চল টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।

ঈমানে শক্তিমান, আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান, স্বাধীনচেতা, অতিথিপরায়ণ, পরোপকারী, সরল অনাড়ম্বর জীবনে অভ্যস্ত যে আরবের বর্ণনা আমরা পাই আজকের আরব তেমন নেই। বেশিদিন আগের কথা নয়, আরব ভূখণ্ডে তখন ছিলো বৃটিশ ও ফরাসিদের রাজত্ব। সা¤্রাজ্যবাদীরা একসময় চলে গেলেও সবকিছু তছনছ করে দিয়ে গেছে। ছোট ছোট বহু রাষ্ট্র গড়ে ওঠেছে।

দুঃখজনক হলেও নিরঙ্কুশ ইসলামি চেতনার জায়গায় স্থান নিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের মতো বিভিন্ন মানবরচিত মতবাদ। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে আরবরা এখন জীবন যাপনে পশ্চিমাদেরকে আদর্শ গণ্য করছে। হারিয়ে গেছে তাদের বিশুদ্ধ লালিত্যপূর্ণ ভাষা। তাদের সামনে আপনি বিশুদ্ধ আরবি বললে তারা অবাক হয়ে চেয়ে থাকবে।

কখনোবা হাততালি দিয়ে বলবে, ‘আরাবিয়াতুকা ফসীহা’ অর্থাৎ তোমার আরবি বিশুদ্ধ। ব্যাস, এই পর্যন্তই। আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে তারা নিজেরা যে আলাপ শুরু করবে তার একবর্ণও আপনি বুঝবেন না।

শুধু যে উচ্চারণ বদলেছে- তাই নয়, বেশিরভাগ আরব শুদ্ধ করে আরবি লিখতেও জানে না। বিশ্বাস করবেন না, এমন আরব দেখেছি, যে ‘তুমি’র আরবি প্রতিশব্দ ‘আনতা’র মতো বহুল ব্যবহৃত শব্দটি লিখতেও ভুল করে। শেষ বর্ণ ‘তা’ এর পর একটি আলিফ বাড়িয়ে দেয়।

তার অর্থ এই নয়, আরবরা একেবারেই শেষ। এই আরবের ভেতর নিশ্চয়ই স্বর্ণযুগের আরব ঘুমিয়ে আছে। একসময় হয়তো আবার তারা জেগে ওঠবে। আরবরাই পারে আবার বিশ্ব নেতৃত্বের আসন বদলে দিতে। এই পশ্চাদপদতার যুগেও আরবরা আতিথেয়তা ও পরোপকারের মতো অনেক চারিত্রিক গুণে সম্মানিত। আমলে অনীহা থাকলেও তাদের ঈমান-আকীদা এখনও যথেষ্ট উন্নত।

বর্তমান আরবের সবচেয়ে বড় সমস্যা, চেতনার দৈন্যদশা। জীবনের ভোগ-বিলাস ছাড়া তাদের মাথায় অন্যকিছু তেমন ঢোকে না।

মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে বেশিরভাগ আরব শাসক পশ্চিমাদের তাবেদারি করে যাচ্ছেন। নিজ দেশের অঢেল সম্পদ তারা নগণ্য মূল্যে বিদেশি প্রভুদের চরণতলে বিলিয়ে দিচ্ছেন। অবকাঠামো নির্মাণ থেকে নিয়ে প্রযুক্তিগত কারিগরি সবক্ষেত্রেই তারা মোটা অংকের পারিশ্রমিক দিয়ে পশ্চিমা প্রকৌশলীদের আমন্ত্রণ জানান। চুক্তি করেন বিদেশি কোম্পানির সাথে।

মওকা পেয়ে পশ্চিমা দেশগুলো নানা অপ্রয়োজনীয় পণ্য, পুরনো প্রযুক্তির সামরিক অস্ত্রসম্ভার চড়া মূল্যে বিক্রি করছে তাদের কাছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে উৎপাদিত নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রীরও এক বড় বাজার আরব বিশ্ব।

উম্মাহর ভালোমন্দ নিয়ে ভাবার সময় নেই আরবদের। এক ও অভিন্ন উম্মাহ-চেতনার পরিবর্তে এখন তাদের মগজে ঢুকেছে ‘আমরা আরব’ এই ভাবনা। একজন অনারব এশীয় বা আফ্রিকান মুসলমানকে কখনোই তারা পুরোপুরি আপন করে নেয় না।

আরব জাতীয়তাবাদের জের ধরে ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আরব লীগ। সবকটি আরব রাষ্ট্রই এর সদস্য, যার মোট সংখ্যা ২২। ১. সৌদি আরব ২. মিসর ৩. ইরাক ৪. সিরিয়া ৫. জর্দান ৬. লেবানন ৭. কুয়েত ৮. কাতার ৯. বাহরাইন ১০. সংযুক্ত আরব আমিরাত ১১. মরক্কো ১২. আলজেরিয়া ১৩. লিবিয়া ১৪. ফিলিস্তিন ১৫. তিউনিসিয়া ১৬. সুদান ১৭. ওমান ১৮. ইয়েমেন ১৯. মৌরিতানিয়া ২০. জিবুতি ২১. সোমালিয়া ২২. কমোরোজ

আরব বিশ্বে বসবাসকারী আরবের সংখ্যা ২০৯ মিলিয়নেরও বেশি।
আরব দেশগুলো প্রধানত লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরের আশেপাশে অবস্থিত। আরব বিশ্ব ইতোমধ্যে অনেক ষড়যন্ত্র, কাড়াকাড়ি ও অন্যায় আধিপত্য সহ্য করেছে। ওসমানি খেলাফতের পতনযুগ থেকে বারবার সা¤্রাজ্যবাদের লোলুপ থাবা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আরব ভূখণ্ডকে ওলট-পালট করেছে।

আরব বিশ্বের ইতিহাসে একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছে সেসব কাহিনী। সে ইতিহাসে অনেক ঘোরপাক, অনেক চড়াই-উৎরাই। বড় জটিল সে ইতিহাস।


Author- নাঈম আবু বকর

Source- Natun Dak

Leave a Reply