আমি শুধু সত্যকে জানতে চাইছিলাম

ইসলাম গ্রহণের পূর্বে অধিকাংশ জাপানীর মতো আমিও কোনো ধর্মের অনুসারী ছিলাম না। ফ্রান্সে আমি ফরাসি সাহিত্যের ওপরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর লেখাপড়ার জন্যে এসেছিলাম। আমার প্রিয় লেখক ও চিন্তাবিদ ছিলেন সার্তে, নিতশে ও কামাস। এদের সবার চিন্তাধারাই নাস্তিকতা-ভিত্তিক।

ধর্মহীন ও নাস্তিকতা প্রভাবিত হওয়া সত্বেও ধর্মের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিলো। আমার অভ্যন্তরীণ কোনো প্রয়োজন নয়, শুধুমাত্র জানার আগ্রহই আমাকে ধর্ম সম্পর্কে উৎসাহী করে তোলে। মৃত্যুর পর আমার কী হবে, তা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা ছিলো না বরং কীভাবে জীবন কাটাবো, এটাই ছিলো আমার আগ্রহের বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে আমার মনে হচ্ছিলো—আমি আমার সময় নষ্ট করে চলেছি, যা করার তা কিছুই করছি না। স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকা বা না থাকা আমার কাছে সমান ছিলো। আমি শুধু সত্যকে জানতে চাইছিলাম।

যদি স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকে তাহলে তার সাথে জীবন যাপন করবো, আর যদি স্রষ্টার অস্তিত্ব খুঁজে না পাই তাহলে নাস্তিকতার জীবন বেছে নেব; এটাই আমার উদ্দেশ্য।

ধর্ম সম্পর্কে পড়াশোনা

ইসলাম ছাড়া অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে আমি পড়াশোনা করতে থাকি। ইসলাম ধর্মকে আমি ধর্তব্যের মধ্যে আনিনি। আমি কখনো চিন্তা করিনি, এটা পড়াশোনার যোগ্য কোনো ধর্ম। আমার বদ্ধমূল ধারণা ছিলো যে, ইসলাম হলো মূর্খ ও সাধারণ মানুষদের এক ধরনের মূর্তি পুজোর ধর্ম।

আমি কিছুদিন খ্রিষ্টানদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করি। আমি তাদের সাথে বাইবেল অধ্যয়ন করতাম। বেশ কিছুদিন গত হবার পর আমি স্রষ্টার অস্তিত্বের বাস্তবতা বুঝতে পারলাম। কিন্তু আমি এক নতুন সমস্যার মধ্যে পড়ে গেলাম। আমি কিছুতেই আমার অন্তরে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছিলাম না, যদিও আমি নিশ্চিত ছিলাম যে স্রষ্টা আছে। আমি গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু বৃথা চেষ্টা। আমি স্রষ্টার অনুপস্থিতিই অনুভব করতে লাগলাম।

হিজরতের-গল্প

তখন আমি বৌদ্ধ ধর্ম অধ্যয়ন করতে শুরু করলাম। আশা করছিলাম এ ধর্মের অনুশাসন পালন এবং যোগাভাসের মাধ্যমে আমি স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারবো। খ্রিষ্টান ধর্মের মতো বৌদ্ধ ধর্মেও আমি অনেক কিছু খুঁজে পেলাম, যা সত্য ও সঠিক বলে মনে হলো। কিন্তু অনেক বিষয় আমি বুঝতে ও গ্রহণ করতে পারলাম না।

আমার ধারণা ছিলো, স্রষ্টা যদি থাকেন তাহলে তিনি হবেন সকল মানুষের জন্যে এবং সত্য ধর্ম অবশ্যই সবার জন্যে সহজ ও বোধগম্য হবে।

আমি বুঝতে পারলাম না, স্রষ্টাকে পেতে হলে কেন মানুষের স্বাভাবিক জীবন পরিত্যাগ করতে হবে।

আমি এক অসহায় অবস্থায় পতিত হলাম। স্রষ্টার সন্ধানে আমার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা কোনো সমাধানে আসতে পারলো না। এমতবস্থায় আমি একজন আলজেরীয় মুসলিম মহিলার সাথে পরিচিত হলাম। তিনি ফ্রান্সেই জন্মেছেন, সেখানেই বড়ো হয়েছেন। তিনি নামাজ পড়তেও জানতেন না। তার জীবনযাত্রা ছিলো একজন সত্যিকার মুসলিমের জীবন যাত্রা থেকে অনেক দূরে। কিন্তু স্রষ্টার প্রতি তার বিশ্বাস ছিলো খুবই দৃঢ়। তার জ্ঞানহীন বিশ্বাস আমাকে বিরক্ত ও উত্তেজিত করে তোলে। আমি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে অধ্যয়ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। শুরুতেই আমি পবিত্র কোরআনের এক কপি ফরাসি অনুবাদ কিনে আনি। কিন্তু আমি ২ পৃষ্ঠাও পড়তে পারলাম না, কারণ আমার কাছে তা অদ্ভুত মনে হচ্ছিলো।

ধর্মপালনাকারী মুসলিমদের সাথে প্রথম পরিচয়

ফ্রান্স- France

আমি একা একা ইসলাম বুঝার চেষ্টা ছেড়ে দিলাম এবং প্যারিসের মসজিদে গেলাম, আশা করছিলাম সেখানে আমি কাউকে পাবো যিনি আমাকে সাহায্য করবেন। সেদিন ছিলো রবিবার এবং মসজিদে মহিলাদের একটি আলোচনা চলছিলো। উপস্থিত বোনেরা আমাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানালেন। আমার জীবনে এই প্রথম আমি ধর্মপালনাকারী মুসলিমদের সাথে পরিচিত হলাম।

আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম যে, নিজেকে তাদের মধ্যে অনেক সহজ ও আপন বলে অনুভব করতে লাগলাম। অথচ খ্রিষ্টান বান্ধবীদের মধ্যে নিজেকে সর্বদায় আগন্তুক ও দূরাগত বলে অনুভব করতাম।

আমি প্রত্যেক রবিবার তাদের আলোচনায় উপস্থিত হতে লাগলাম। সাথে সাথে মুসলিম বোনদের দেওয়া বই পত্রও পড়তে লাগলাম। এসকল আলোচনার প্রতিটি মুহূর্ত এবং তাদের দেওয়া বই এর প্রতিটি পৃষ্ঠা আমার কাছে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশের মতো মনে হতে লাগলো।

আমার কাছে মনে হচ্ছিলো, আমি সত্যের সন্ধান পেয়ে গেছি। সচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো,

সেজদারত অবস্থায় আমি স্রষ্টাকে আমার অত্যন্ত কাছের অনুভব করতাম। 

হিজাব ও পর্দা নিয়ে লড়াই

দুবছর আগে যখন আমি ফ্রান্সে, তখন মুসলিম স্কুলছাত্রীদের উড়না না স্কার্ফ দিয়ে মাথা ঢাকা নিয়ে ফরাসীদের বিতর্ক তুঙ্গে। অধিকাংশ ফরাসীদের ধারণা ছিলো, ছাত্রীদের মাথা ঢাকার অনুমতি দেওয়া সরকারি স্কুলগুলোকে ধর্ম নিরপেক্ষ রাখা চিন্তার বিরোধী। আমি তখনও ইসলাম গ্রহণ করিনি। তবে আমার বুঝতে খুব কষ্ট হোতো, স্কার্ফ রাখার মতো সামান্য একটি বিষয় নিয়ে ফরাসীরা এত অস্থির কেন।

দৃশ্যত মনে হচ্ছিল যে, ফ্রান্সের জনগণ তাদের ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা, বৃহৎ শহরগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা, পাশাপাশি আরব দেশগুলো থেকে আসা বহিরাগতদের ব্যাপারে উত্তেজিত ও স্নায়ু পীড়িত হয়ে পড়েছিলো। ফলে তারা তাদের শহরগুলোতে ও স্কুলগুলোতে ইসলামি পোশাক দেখতে চাইছিলো না।

অপরদিকে আরব ও মুসলিম দেশগুলোতে মেয়েদের মধ্যে, বিশেষ করে যুবতীদের মধ্যে ইসলামি হিজাব বা পর্দার দিকে ফিরে আসার জোয়ার এসেছে। অনেক আরব বা মুসলিম এবং অধিকাংশ পাশ্চাত্য জনগণের কাছে এটা ছিলো কল্পনাতীত।

কারণ তাদের ধারণা ছিলো যে, পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রসারের সাথে সাথে পর্দার বিলুপ্তি ঘটবে।

ইসলামি পোশাক ও পর্দা ব্যবহারের আগ্রহ ইসলামি পুনর্জাগরণের একটা অংশ। এর মাধ্যমে আরব ও মুসলিম জনগোষ্ঠীসমূহ তাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট; অর্থনৈতিক ও ঔপনিবেশিক আধিপত্যের মাধ্যমে যে গৌরব বিনষ্ট ও পদদলিত করার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করা হচ্ছে।

জাপানী জনগণের দৃষ্টিতে মুসলমানদের পুরোপুরি ইসলাম পালন একধরণের পাশ্চাত্য বিরোধিতা ও প্রাচীনকে আকড়ে ধরে রাখার মানসিকতা, যা অনেক আগে জাপানীদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলো। সেই সময়ে তারা পাশ্চাত্য সভ্যতার সংস্পর্শে আসে এবং পাশ্চাত্য জীবনযাত্রা ও পোশাক পরিচ্ছেদের বিরোধিতা করে।

মানুষ সাধারণত ভালো মন্দ বিবেচনা না করেই যে-কোনো নতুন বা অপরিচিত বিষয়ের বিরোধিতা করে থাকে।

কেউ কেউ মনে করেন যে, হিজাব বা পর্দা হচ্ছে মেয়েদের নিপীড়নের একটি প্রতীক। তারা মনে করেন যে, সকল মহিলা পর্দা মেনে চলেন বা চলতে আগ্রহী তারা মূলত প্রচলিত প্রথার দাসত্ব করেন। তাদের বিশ্বাস এ সকল মহিলাদের যদি তাদের ন্যাক্কারজনক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করা যায় এবং তাদের মধ্যে নারীমুক্তি আন্দোলন ও স্বাধীন চিন্তার আহ্বান সঞ্চারিত করা যায়, তাহলে তারা পর্দা পরিত্যাগ করবে।

এ ধরণের উদ্ভট ও বাজে চিন্তা তারাই করেন, ইসলাম সম্পর্কে যাদের ধারণা খুবই সীমিত। ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্ম বিরোধী চেতনা তাদের মন-মগজকে এমনভাবে গ্রাস করে নিয়েছে যে, তারা ইসলামের সর্বজনীনতা ও সর্বকালীনতা বুঝতে একেবারেই অক্ষম। আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্বের সর্বত্র অগণিত অমুসলিম মহিলা ইসলাম গ্রহণ করছে, যাদের মধ্যে আমিও আছি। এর দ্বারা আমরা ইসলামের সর্বজনীনতা বুঝতে পেরেছি।

হিজাব বা ইসলামী পর্দার মূলকথা

এতে কোনো সন্দেহ নাই যে, ইসলামি হিজাব বা পর্দা অমুসলিমদের জন্যে একটি অদ্ভুত বা বিস্ময়কর ব্যাপার। পর্দা শুধু নারীর মাথার চুলই ঢেকে রাখে না, উপরন্তু আরও এমন কিছু আবৃত করে রাখে যেখানে তাদের প্রবেশাধিকার নেই। আর এজন্যেই তারা খুব অস্বস্তি বোধ করেন। বস্তুত পর্দার অভ্যন্তরে কী আছে, বাইরে থেকে তারা তা মোটেও অনুধাবন করতে পারেন না।

প্যারিসে অবস্থানকালে ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আমি হিজাব বা পর্দা মেনে চলতাম। আমি একটা স্কার্ফ দিয়ে মাথা ঢেকে নিতাম। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে একই রঙ এর স্কার্ফ ব্যবহার করতাম। অনেকেই এটাকে একটা নতুন ফ্যাশন ভাবতো। বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থানকালে আমি কালো বোরখায় আমার সমস্ত দেহ আবৃত করে রাখি, এমনকি আমার মুখমণ্ডল ও চোখও।

যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে পারব কি-না অথবা পর্দা করতে পারবো কি-না, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবিনি। আসলে নিজেকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করতে চাইনি; কারণ আমার ভয় হতো, হয়তো উত্তর হবে না-সূচক এবং তাতে আমার ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত বিঘ্নিত হবে। 

প্যারিসে মসজিদে যাওয়ার আগ মুহূর্তে আমি এমন এক জগতে বাস করেছি, যার সাথে ইসলামের সামান্যতমও সম্পর্ক ছিলো না। সালাত, পর্দা কিছুই আমি চিনতাম না।

আমার জন্যে একথা কল্পনা করাও কষ্টকর ছিলো যে, আমি সালাত আদায় করছি বা পর্দা মেনে চলছি।

তবে ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা আমার এত গভীর ও প্রবল ছিলো যে, ইসলাম গ্রহণের পরে আমার কী হবে তা নিয়ে আমি ভাবিনি। বস্তুত আমার ইসলাম গ্রহণ ছিলো আল্লাহর অলৌকিক দান। আল্লাহু আকবার!

নতুন অনুভব

ইসলামি পোশাক বা হিজাবে আমি নিজেকে নতুনভাবে অনুভব করতে লাগলাম। আমি অনুভব করতে সক্ষম হলাম যে, আমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়েছি। আমি সংরক্ষিত হয়েছি। আমি এও অনুভব করতে লাগলাম যে, আল্লাহ আমার সঙ্গে রয়েছেন। আমি বিদেশিনী হিসেবে অনেক সময় লোকের দৃষ্টির সামনে নিজেকে বিব্রতবোধ করতাম। হিজাব ব্যবহারের ফলে এই অবস্থা কেটে গেলো। পর্দা আমাকে এই ধরণের অভদ্র দৃষ্টি থেকে রক্ষা করলো। পর্দার মাধ্যমে আমি আনন্দ ও গৌরব অনুভব করতে লাগলাম। 

কারণ পর্দা শুধু আল্লাহর প্রতি আমার আনুগত্যের প্রতীকই নয়, উপরন্তু তা মুসলিম নারীদের মাঝে আন্তরিকতার বাঁধন। পর্দার মাধ্যমে আমরা ইসলাম পালনকারী মহিলারা একে অপরকে চিনতে পারি এবং আন্তরিকতা অনুভব করি। সর্বোপরি পর্দা আমার চারপাশের সবাইকে মনে করিয়ে দেয় আল্লাহর কথা।

আর আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ আমার সাথে রয়েছেন। পর্দা আমাকে বলে দেয়—সতর্ক হও! একজন মুসলিম নারী হিসেবে যোগ্য কর্ম করো। একজন পুলিশ যেমন ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় তার দায়িত্ব সম্পর্কে অধিক সচেতন থাকে, তেমনি পর্দার মধ্যে আমি মুসলিম হিসেবে নিজেকে বেশি করে অনুভব করতে লাগলাম। আমি যখনই মসজিদে যেতাম, তখনই হিজাব ব্যবহার করতাম। এটা ছিলো সম্পূর্ণ আমার ঐচ্ছিক ব্যাপার, কেউই আমাকে পর্দা করতে চাপ দেয়নি।

আমার জন্য বড় পরীক্ষা

islam and muslim in japan

আমি ইসলাম গ্রহণের দুই সপ্তাহ পর আমার এক বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্যে জাপান যাই। সেখানে যাওয়ার পর আমি ফ্রান্সে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিই। কারণ ইসলাম গ্রহণের পর ফরাসী সাহিত্যের প্রতি আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। উপরন্তু আরবি ভাষা শেখার প্রতি আমি আগ্রহ অনুভব করতে লাগলাম।

মুসলিম পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা জাপানের ছোট্ট একটি শহরে একাকী বসবাস করা আমার জন্যে অনেক বড়ো ধরণের পরীক্ষা ছিলো। তবে এ একাকিত্ব আমার মধ্যে মুসলমানিত্বের অনুভূতি অত্যন্ত প্রখর করে তোলে।

কায়রোর পথে যাত্রা

ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জন্যে শরীর দেখানো পোশাক পরা নিষিদ্ধ। কাজেই আমার আগের মিনিস্কার্ট, হাফহাতা ব্লাউজ ইত্যাদি অনেক পোশাকই আমাকে পরিত্যাগ করতে হলো। এছাড়া পাশ্চাত্য ফ্যাশন ইসলামি হিজাব বা পর্দার পরিপন্থী। এজন্যে আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, নিজের পোশাক নিজেই তৈরি করবো। পোশাক তৈরিতে অভিজ্ঞ আমার এক বান্ধবীর সহায়তায় দু সপ্তাহের মধ্যে আমার জন্যে একটি পোশাক তৈরি করে ফেললাম। পোশাকটি ছিলো অনেকটা পাকিস্তানি সেলোয়ার কামিজের মতো।

জাপানে ফেরার পর ছমাস এভাবে কেটে গেলো। কোনো মুসলিম দেশে গিয়ে আরবি ভাষা ও ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করার আগ্রহ আমার মধ্যে খুবই প্রবল হয়ে উঠলো। এ আগ্রহ বাস্তবায়িত করতে সচেষ্ট হলাম। অবশেষে মিশরের রাজধানী কায়রোতে পাড়ি জমালাম।

কায়রোতে কেবল একজন ব্যক্তিকেই আমি চিনতাম। তবে আমার এই মেজবানের পরিবারের কেউই ইংরেজি জানতো না। আমি একেবারেই পাথারে পড়ে গেলাম। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যে-মহিলা আমাকে হাত ধরে বসার জন্যে ভিতরে নিয়ে গেলেন, তিনি কালো কাপড়ে (বোরখায়) তার মুখ ও হাতসহ মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীর ঢেকে রেখেছিলেন। এই কালো কাপড় এখন আমার সুপরিচিত এবং বর্তমানে রিয়াদে অবস্থানকালে আমি নিজেও এই পোশাক ব্যাবহার করি। কিন্তু কায়রোতে পৌঁছে আমি এটি দেখে খুবই আশ্চর্য হই।

ফ্রান্সে থাকতে একদিন আমি মুসলমানদের একটা বড়ো ধরণের কনফারেন্সে উপস্থিত হয়েছিলাম এবং সেখানেই আমি সর্বপ্রথম এই মুখ ঢাকা কালো পোশাক দেখতে পেয়েছিলাম। রঙ-বেরঙের স্কার্ফ ও পোশাক পরা মেয়েদের মাঝে তার পোশাক খুবই বেমানান লাগছিলো। আমি ভাবছিলাম—এই মহিলা মূলত আরব ঐতিহ্য ও আচরণের অন্ধ অনুকরণের ফলেই এই ধরণের পোশাক পড়েছে। ইসলামের সঠিক শিক্ষা তিনি জানতে পারেননি।

ইসলাম সম্পর্কে তখনও আমি বিশেষ কিছু জনাতাম না। আমার ধারণা ছিলো—মুখ ঢেকে রাখা একটি আরবীয় অভ্যাস ও আচরণ। ইসলামের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কায়রোর ওই মহিলাটিকে দেখেও আমার অনুরূপ চিন্তাই মনে এসেছিলো। আমার মনে হয়েছিলো—

পুরুষদের সাথে সকল প্রকার সংযোগ এড়িয়ে চলার যে প্রবণতা এই মহিলার মধ্যে রয়েছে, তা অস্বাভাবিক।

কালো পোশাক পরা বোন আমাকে জানালো যে, আমার নিজের তৈরি পোশাকটি বাইরে বেরোনোর জন্যে উপযোগী নয়। আমি তার কথা মেনে নিতে পারিনি। কারণ আমার বিশ্বাস ছিলো, একজন মুসলিম নারীর পোশাকের যে বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার, তার সবই আমার ওই পোশাকে ছিলো। তবুও আমি ওই মিশরীয় বোনের মতো ম্যাক্সি ধরণের একটা কালো রঙের কাপড় কিনলাম। উপরন্তু একটি কালো খিমার অর্থাৎ বড়ো ধরণের শরীর জড়ানো চাদরের মতো উড়না কিনলাম, যা দিয়ে আমার শরীরে উপরিভাগ, মাথা ও দুই বাহু আবৃত করে নিলাম।

আমি আমার মুখ ঢাকতেও রাজি ছিলাম, কারণ তাতে বাইরের ধুলো থেকে রক্ষা পাওয়া যেতো। কিন্তু বোনটি জানালেন—শুধুমাত্র ধুলো থেকে বাঁচার জন্যে মুখ ঢাকা নিষ্প্রয়োজন। তিনি নিজে মুখ ঢেকে রাখতেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তা ঢেকে রাখা আবশ্যক। 

মুখ ঢেকে রাখা যে-সকল বোনের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো, কায়রোতে তাদের সংখ্যা ছিলো খুবই কম। কায়রোর অনেক মানুষ কালো খিমার দেখলেই বিরক্ত বা বিব্রত হয়ে উঠতেন। পাশ্চাত্যের ধাঁচে জীবনযাপকারী সাধারণ মিশরীয় যুবকেরা এই সকল খিমারে ঢাকা নারীদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। এদেরকে তারা ভগ্নী বলে সম্বোধন করতেন।

রাস্তাঘাটে বা বাসে উঠলে সাধারণ মানুষেরা এদেরকে বিশেষ সম্মান দিতেন ও ভদ্রতা দেখাতেন। এ-সকল মহিলা রাস্তাঘাটে একে অপরকে দেখলে সালাম বিনিময় করতেন, তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো পরিচয় না থাকলেও।

ইসলাম গ্রহণের আগে

ইসলাম গ্রহণের আগে আমি স্কার্ট এর চেয়ে প্যান্ট বেশি পছন্দ করতাম। কায়রোয় এসে লম্বা ঢিলেঢালা কালো পোশাক পরতে শুরু করলাম। এ পোশাক পরে নিজেকে অনেক ভদ্র ও সম্মানিত বলে মনে হতো। মনে হতো আমি একজন রাজকন্যা।

তাছাড়া এ পোশাকে আমি বেশ আরামবোধ করতাম, যা প্যান্ট পরে কখনও অনুভব করিনি। খিমার বা উড়না পরা বোনদেরকে সত্যিই অপূর্ব সুন্দর দেখাতো। তাদের চেহারায় এক ধরণের পবিত্রতা ও সাধুতা ফুটে উঠতো। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক মুসলিম নারী বা পুরুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে তাঁর নির্দেশাবলী পালন করে এবং সেজন্যে নিজের জীবন উৎসর্গ করে। আমি ওই সব মানুষের মানসিকতা মোটেও বুঝতে পারি না,

যারা ক্যাথলিক সিস্টারদের ঘোমটা দেখে কিছুই বলেন না, অথচ মুসলিম নারীদের ঘোমটা বা পর্দার সমালোচনায় তারা পঞ্চমুখ। কারণ এটা নাকি নিপীড়ন ও সন্ত্রাসের প্রতীক!

আমার মিশরীয় বোন আমাকে বলেন যে, আমি যেন জাপানে ফিরে গিয়েও এ পোশাক ব্যবহার করি। এতে আমি অসম্মতি জানাই। আমার ধারণা ছিলো—আমি যদি এ ধরণের পোশাক ব্যবহার করে জাপানের রাস্তায় বেরোই, তাহলে মানুষ আমাকে অভদ্র ও অস্বাভাবিক মনে করবে। পোশাকের কারণে তারা আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। আমার কোনো কথাই তারা শুনবে না। আমার বাহির দেখেই তারা ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করবে। আমার মিশরীয় বোনকে আমি এই যুক্তিই দেখিয়েছিলাম। 

কিন্তু দুমাসের মধ্যে আমি আমার নতুন পোশাককে ভালোবেসে ফেললাম। তখন ভাবতে লাগলাম যে, আমি জাপানে গিয়েও এই পোশাকই পরবো। এ উদ্দেশ্যে জাপানে ফেরার কদিন আগে হালকা রঙের ওই জাতীয় কিছু পোশাক এবং কিছু সাদা খিমার তৈরি করলাম। আমার ধারণা ছিলো কালোর চেয়ে এগুলো বেশি গ্রহনযোগ্য হবে জাপানীদের দৃষ্টিতে। আমার সাদা খিমারের ব্যাপারে জাপানীদের প্রতিক্রিয়া ছিলো আমার ধারণার চেয়ে অনেক ভালো।

মুলত আমি কোনো রকম প্রত্যাখ্যান বা উপহাসের মুখোমুখি হইনি। মনে হচ্ছিলো জাপানীরা আমার পোশাক দেখে—আমি কোন ধর্মাবলম্বী তা না বুঝলেও—আমার ধর্মানুরাগ বুঝে নিয়েছিলো। 

কালো পোশাকের মিশ্র অভিজ্ঞতা

একবার আমি শুনলাম, আমার পিছনে এক মেয়ে তার বান্ধবীকে আস্তে আস্তে বলছে, ‘দেখ একজন বৌদ্ধ ধর্ম-যাজিকা’। একবার ট্রেনে যেতে আমার পাশে বসলেন এক মাঝ বয়সী ভদ্রলোক। কেন আমি এমন অদ্ভুত ফ্যাশনের পোশাক পরেছি, তিনি তা জানতে চাইলেন। আমি তাকে বললাম, ‘আমি একজন মুসলিম। ইসলাম ধর্মে মেয়েদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন তাদের দেহ ও সৌন্দর্য আবৃত রাখে। কারণ তাদের অনাবৃত দেহসুষমা ও সৌন্দর্য পুরুষদেরকে আকর্ষিত করে তুলতে পারে। অনেক পুরুষের জন্যে এ ধরণের আকর্ষণ প্রতিরোধ করা কষ্টকর। তাই নারীদের উচিৎ নয় দেহ ও সৌন্দর্য প্রদর্শন করে তাদেরকে বিরক্ত করা বা সমস্যায় ফেলা।’

মনে হলো আমার ব্যাখ্যায় তিনি অনেক প্রভাবিত হলেন। ভদ্রলোক সম্ভবত আজকালকার মেয়েদের উত্তেজক ফ্যাশন মেনে নিতে পারছিলেন না। তার নামার সময় হয়েছিলো। তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে নেমে গেলেন এবং বললেন—তার একান্ত ইচ্ছা ছিলো ইসলাম সম্পর্কে আরও কিছু জানার কিন্তু সময়ের অভাবে পারলেন না।

আমার আব্বার দুঃখ

গরমকালে রৌদ্রতপ্ত দিনেও আমি পুরো শরীর ঢাকা লম্বা পোশাক ও খিমার পরে বাইরে যেতাম। এতে আমার আব্বা দুঃখ পেতেন। ভাবতেন আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমি দেখলাম রৌদ্রের মধ্যে আমার এ পোশাক খুবই উপযোগী। কারণ এতে মাথা, গলা ও ঘাড় সরাসরি রোদের তাপ থেকে রক্ষা পেতো। উপরন্তু আমার বোনেরা যখন হাফপ্যান্ট পরে চলাফেরা করতো, তখন ওদের সাদা উরু দেখে আমি অস্বস্তি বোধ করতাম।

অনেক মহিলা এমন পোশাক পরেন, যাতে তাদের বুক ও নিতম্বের আকৃতি পরিষ্কার ফুটে উঠে। ইসলাম গ্রহণের আগেও আমি এ ধরণের পোশাক দেখলে অসস্তিবোধ করতাম। আমার মনে হতো—এমন কিছু অঙ্গ প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা ঢেকে রাখা উচিৎ। বের করা উচিৎ নয়।

একজন মেয়ের মনে যদি এ সকল পোশাকে এ ধরণের অস্বস্তি এনে দেয়, তাহলে একজন পুরুষ এ পোশাক পরা মেয়েদের দেখলে কীভাবে প্রভাবিত হবেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

আজ থেকে ৫০ বছর আগে

আপনারা হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, শরীরের স্বাভাবিক আকৃতি ও প্রকৃতি ঢেকে রাখার দরকার কী?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আসুন একটু ভেবে দেখি। আজ থেকে ৫০ বছর আগে জাপানে মেয়েদের জন্যে সুইমিং স্যুট পরে সুইমিংপুলে সাতারকাটা অশ্লীলতা ও অন্যায় বলে মনে করা হতো।

অথচ আজকাল আমরা বিকিনি পরে সাতার কাটতেও কোনো লজ্জাবোধ করি না। তবে যদি কোনো মহিলা জাপানের কোথাও শরীরের ঊর্ধ্বভাগ সম্পূর্ণ অনাবৃত রেখে সাতার কাটেন, তাহলে লোকে তাকে নির্লজ্জ বলবে।

আবার দক্ষিণ ফ্রান্সের সমুদ্র সৈকতে যান, দেখতে পাবেন সেখানে সকল বয়সের অসংখ্য নারী শরীরের ঊর্ধ্বভাগ সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে টপ্লেস হয়ে রৌদ্রস্নান করছে। আর একটু এগিয়ে আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে যান, অসংখ্য নগ্নবাদীদেরকে সেখানকার সৈকতে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে রৌদ্রস্নান করতে দেখবেন। যদি একটু পিছিয়ে যান, তাহলে দেখতে পাবেন মধ্যযুগে একজন বৃটিশ নাইট তার প্রিয়তমার জুতোর দৃশ্যতে প্রকম্পিত হয়ে উঠতেন।

এ থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, নারীদেহের গোপন অংশ বা ঢেকে রাখার মতো অংশ কী, সে ব্যাপারে আমাদের মানসিকতা পরিবর্তনশীল।

আমার প্রশ্ন

এখানে আমার প্রশ্ন—আপনি কি একজন নগ্নবাদী? আপনি কি সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে চলাফেরা করেন?

যদি আপনি নগ্নবাদী হন তাহলে বলুন, যদি কোনো নগ্নবাদী আপনাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কেন আপনি আপনার বুক ও নিতম্ব ঢেকে রাখেন, অথচ মুখ ও হাতের ন্যায় বুক ও নিতম্বও তো শরীরের স্বাভাবিক অংশ।’ তাহলে আপনি কী বলবেন?

আপনি এই প্রশ্নের উত্তরে যা বলবেন, আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমি ঠিক সেকথাই বলবো। আপনি যেমন শরীরের স্বাভাবিক অংশ হওয়া সত্ত্বেও বুক ও নিতম্বকে গোপনীয় অঙ্গ বলে মনে করেন, আমরা মুসলিম নারীরা মুখমণ্ডল ও হাত ছাড়া সমস্ত শরীরকে গোপনীয় অঙ্গ বলে মনে করি। কারণ মহান স্রষ্টা আল্লাহ এভাবেই আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। 

আর এ জন্যেই আমরা মাহরাম ছাড়া অন্যান্য পুরুষের থেকে মুখ ও হাত ব্যতীত সম্পূর্ণ শরীর আবৃত রাখি। আপনি যদি কোনো কিছু লুকিয়ে রাখেন, তাহলে তার মূল্য বেড়ে যাবে। নারীর শরীর আবৃত রাখলে তার আকর্ষণ বেড়ে যায়। এমনকি অন্য নারীর চোখেও তা আকর্ষণীয় হয়ে যায়।

পর্দানশীল নারীদের কাঁধ ও গলা অপূর্ব সুন্দর দেখায়। কারণ তা সাধারণত আবৃত থাকে।

যখন কোনো মানুষ লজ্জার অনুভূতি হারিয়ে নগ্ন হয়ে রাস্তায় চলাফেরা করেন, প্রকাশ্য জনসমক্ষে প্রস্রাব, পায়খানা ও প্রেম করতে থাকেন, তখন তিনি পশুর সমান হয়ে যান। তাকে আর কোনোভাবেই পশু থেকে পৃথক করা যায় না। আমার ধারণা লজ্জার অনুভূতি থেকেই মানব সভ্যতা শুরু। 

কী হওয়ার কথা কী হচ্ছে

অনেক জাপানী মহিলা শুধু ঘর থেকেই বেরোনোর সময়ই মেকাপ করেন ও সাজগোজ করেন। ঘরে তাদেরকে কেমন দেখাচ্ছে, তা নিয়ে মাথা ঘামান না। অথচ ইসলামের বিধান হলো, একজন স্ত্রী বিশেষভাবে তার স্বামীর জন্যে নিজেকে সুন্দরী ও আকর্ষণীয় করে রাখতে সচেষ্ট হবেন। অনুরূপভাবে একজন স্বামী তার স্ত্রীর মনোরঞ্জনের জন্যে নিজেকে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তুলতে সচেষ্ট হবেন। উপরন্তু লজ্জার অনুভূতি এদের সম্পর্ককে আরও আনন্দময় ও মনোরম করে তোলে।

আপনারা হয়তো বলবেন পুরুষদের উত্তেজিত না করার জন্যে আমাদের মুখ হাত ছাড়া বাকী পুরো শরীর ঢেকে রাখাটা বাড়াবড়ি এবং অতি সতর্কতা। 

একজন পুরুষ কি শুধুমাত্র যৌন আগ্রহ নিয়েই নারীর দিকে তাকান? একথা ঠিক যে সব পুরুষই প্রথমেই যৌন আগ্রহ নিয়ে নারীর দিকে তাকান না। তবে নারীকে দেখার পর তার পোশাক ও আচরণ থেকে পুরুষের মনে যে আগ্রহ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তা প্রতিরোধ করা তার জন্যে খুবই কষ্টকর। এ ধরণের আবেগ নিয়ন্ত্রণে পুরুষরা বিশেষভাবে দুর্বল।

বর্তমান বিশ্বে আলোচিত ধর্ষণ ও যৌন অত্যাচারের পরিমাণ দেখলেই আমরা একথা বুঝতে পারবো।

কেবলমাত্র পুরুষদের প্রতি মানবিক আবেদন জানিয়ে এবং তাদেরকে আত্মনিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়ে, আমরা ধর্ষণ ও অত্যাচার সমস্যার সমাধান আশা করতে পারি না। পর্দা ছাড়া এগুলো প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই।

একজন পুরুষ, নারীর পরিধেয় মিনি-স্কার্টের অর্থ এরূপ মনে করতে পারেন—‘তুমি চাইলে আমাকে পেতে পারো’। অপরদিকে ইসলামি হিজাব পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়—‘আমি তোমার জন্যে নিষিদ্ধ’।

সৌদি আরবে

কায়রো থেকে জাপানে গিয়ে আমি তিন মাস সেখানে ছিলাম। এরপর আমি আমার স্বামীর সাথে সৌদি আরবে চলে আসি। শুনেছিলাম যে সৌদি আরবে সব মেয়েকে মুখ ঢাকতে হয়, তাই মুখ ঢাকার জন্যে ছোট একটি কালো কাপড় বা নিকাব আমার সাথে এনেছিলাম।

রিয়াদে পৌঁছে দেখলাম এখানে সব মহিলারা মুখ ঢাকেন না। অবশ্যি বিদেশি অমুসলিম মহিলারা শুধু দায়সারাভাবে একটা কালো গাউন পিঠের ওপর ফেলে রাখেন। মুখ মাথা কিছুই ঢাকেন না। বিদেশি মুসলিম মহিলারা অনেকেই মুখ খোলা রাখেন। সৌদি মহিলারা সবাই মুখ সহ আপাদমস্তক ঢেকে চলাফেরা করেন। 

রিয়াদে এসে প্রথমবার বাইরে বেরোনোর সময় আমি নিকাব দিয়ে আমার মুখ ঢেকে নিই। বেশ ভালো লাগলো। আসলে অভ্যস্ত হয়ে গেলে এতে কোনো অসুবিধা বোধ হয় না।

বরং আমার মনে হতে লাগলো যে, আমি বিশেষ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছি।

কোনো মূল্যবান শিল্প চুরি করে নিয়ে গোপন স্থানে রেখে দিলে যেমন আনন্দ পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি আনন্দ অনুভব করছিলাম আমি। অনুভব করছিলাম—আমার এমন একটা মূল্যবান সম্পদ রয়েছে, যা দেখার অনুমতি সবার নেই।

মানুষের ভাবনার রকমফের

রিয়াদের রাস্তায় একজন মোটাসোটা পুরুষ এবং তার সাথে সর্বাঙ্গ কালো বোরকায় আবৃত একজন মহিলাকে দেখে কোনো বিদেশি হয়তো ভাবেন যে, এই দম্পতির মধ্যে রয়েছে অত্যাচার ও নিপীড়নের সম্পর্ক। মহিলাটি অত্যাচারিত এবং তার স্বামীর দাসীতে পরিণত হয়েছেন।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বোরকা পড়া এই সব মহিলাদের অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এরা নিজেদেরকে চাকর-বাকরের প্রহরাধীন সম্রাজ্ঞীর মতো মনে করেন। 

রিয়াদের প্রথম কমাস আমি আমার নিকাব দিয়ে শুধু চোখের নিচের অংশটুকু ঢাকতাম। চোখ ও কপাল খোলা থাকতো। শীতের পোশাক বানাতে গিয়ে আমি একটা চোখঢাকা নিকাব বানিয়ে নিলাম। এবার আমার সাজ পুরো হলো। আমার শান্তি ও তৃপ্তি পূর্ণতা পেলো। এখন আমি ভিড়ের মধ্যে অস্বস্তিবোধ করি না।

যখন চোখ খুলা রাখতাম, তখন মাঝেমধ্যে হটাৎ করে কোনো পুরুষের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলে বিব্রতবোধ করতাম। কালো সানগ্লাসের মতো চোখ ঢাকা নিকাবের ফলে অপরিচিত পুরুষের অনাহূত চোখাচোখি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এ

কজন মুসলিম মহিলা তার নিজের মর্যাদা রক্ষার জন্যে নিজেকে আবৃত করে রাখেন। অনাত্নীয় পুরুষের দৃষ্টির অধীনস্ত হতে তিনি রাজি নন। তিনি চান না তাদের উপভোগের সামগ্রী হতে।

পাশ্চাত্য ও পাশ্চাত্যপন্থী যে-সকল মহিলা তাদের শরীরকে পুরুষের সামনে উপভোগের সামগ্রী হিসেবে তুলে ধরেন, তাদের প্রতি একজন মুসলিম নারী করুণা বোধ করেন। 

বাইরে থেকে হিজাব বা পর্দা দেখে এর ভিতরে কী আছে, তা আদৌ বুঝা সম্ভব নয়। বাইরে থেকে পর্দা ও পর্দাশীনদের পর্যবেক্ষণ করা, আর পর্দার মধ্যে জীবন কাটান—দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। দুটো বিষয়ের মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে, মূলত সেখানে আছে ইসলামকে বোঝার গ্যাপ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ইসলাম একটি জেলখানা, এখানে কোনো স্বাধীনতা নেই। কিন্তু আমরা যারা এর মধ্যে অবস্থান করছি—আমরা এত শান্তি, আনন্দ ও স্বাধীনতা অনুভব করছি যা ইসলাম গ্রহণের আগে কখনোই করিনি। 

পাশ্চাত্যের তথাকথিত স্বাধীনতা

পাশ্চাত্যের তথাকথিত স্বাধীনতা পায়ে ঠেলে আমরা ইসলামকে বেছে নিয়েছি। একথা যদি সত্য হতো যে, ইসলাম মেয়েদের নিপীড়ন করেছে এবং তাদের অধিকার খর্ব করেছে, তাহলে ইউরোপ আমেরিকা, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের অগণিত মেয়ে কেন তাদের সকল স্বাধীনতা ও স্বাধিকার পায়ে ঠেলে ইসলাম গ্রহণ করছে? আশা করি সবাই বিষয়টি ভেবে দেখবেন। 

ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ, ঘৃণা বা ভ্রান্ত পূর্বধারণার কারণে যদি কেউ অন্ধ না হন, তাহলে তিনি অবশ্যই দেখবেন—একজন পর্দানশীল মহিলা কী অপূর্ব সুন্দর। তার মধ্যে ফুটে উঠেছে স্বর্গীয় সৌন্দর্য ও সতীত্বের আভা। আত্মনির্ভরতা ও আত্মমর্যাদায় উদ্ভাসিত তার চেহারা। অত্যাচারের বা নিপীড়নের সামান্যতম কোনো চিহ্নও আপনি তার চেহারায় পাবেন না। এটা জ্বলন্ত সত্য।

কিন্তু তারপরও অনেকে তা দেখতে পান না। কেন? সম্ভবত তারা ওই ধরণের মানুষ, যারা আল্লাহর নিদর্শন দেখেও, জেনেও অস্বীকার করেন। প্র

চলিত প্রথার দাসত্ব, বিদ্বেষ, ভ্রান্তধারণা ও স্বার্থের অন্বেষণ যাদেরকে অন্ধ করে ফেলেছে। ইসলামের সত্যকে অস্বীকার করার এছাড়া আর কী কারণ থাকতে পারে?


(ইসলামে পর্দা- ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর। পৃষ্ঠা : ২৫-৩৭) 


খাওলা নিকীতা একজন নওমুসলিমা। খাওলা জাপানী নাগরিক। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে নাস্তিক ছিলেন। বর্তমানে তিনি তার স্বামীর সাথে সৌদির রিয়াদে অবস্থান করছেন। ২৫ অক্টোবর ১৯৯৩ ইং তিনি সৌদির আল-কাসীম প্রদেশের বুরাইদা শহরের ইসলামি দাওয়াহ কেন্দ্রের মহিলা বিভাগে আসেন।এবং ‘ইসলাম ও পর্দা’ সম্পর্কে স্বরচিত এই প্রবন্ধটি মুসলিম বোনদের পড়ে শুনান।

Leave a comment