Categories
Bangla Contents

সমাজের চাওয়া বনাম যোগ্য আলেম হয়ে ওঠা

একটা সমাজ হিসেবে আমরা এখনো সুস্থির নই। স্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারি নি। ভুল চিন্তা, অপুষ্ট ভাবনা, উপার্জনমুখী শিক্ষা আমাদেরকে বহুধাবিভক্ত করে রেখেছে। তারচে’ ভয়ংকর ব্যাপার নিজের চিন্তাকেই যথোপযুক্ত মনে করা এবং যে কোনো উপায়ে অন্যের ওপর তা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা- আমাদের সমাজে যা প্রবলভাবে বিদ্যমান। মৌলিক ও একমুখী শিক্ষার অনুপস্থিতি, দ্বীনি শিক্ষার অপূর্ণতা এই সমস্যার মূল কারণ। হুজুগে পথচলার খেয়ালি মানসিকতা তো আছেই। ফলে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ একসাথে বসবাস, চলা-ফেরা, দেখা-সাক্ষাতের সুবাদে সামাজিক বা জাতিগত যে সংহতি গড়ে উঠার কথা, আমাদের এখানে তা হয়নি। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক দুয়েকটা বিষয়ে স্বাভাবিক এক ধরনের মিল ছাড়া আমাদের সমাজের চিন্তাগত একক কোনো ভিত্তি নেই। ভাষা-পোশাক-গায়ের রং- বাহ্যিক এই সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো সুস্থির একটা সমাজগঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে মাত্র, শেকড় নয় কখনো।

উপলব্ধি, বোধ-বিশ্বাস ও সচেতনতামূলক ঐক্যই একটা জাতির ভিত্তি গড়ে দেয়। শেকড় মজবুত করে। আমাদের তা নেই। হাজার বছরের ঐতিহ্যের গর্বে বুক ভরানোর পাশাপাশি এই লজ্জাজনক বাস্তবতাও আমাদেরকে মানতে হবে। আর এইসব না থাকা এবং ভেতরগত বিরোধ ও নেতিবাচক চিন্তার প্রাবল্যে ধর্মীয় বিশ্বাস বা রাজনৈতিক চেতনার দুয়েকটা মিলও তেমন কোনো ফায়দা বয়ে আনে না। ভেতরে প্রবল অস্বস্তি গোপন করে লোক দেখানো একরকম সৌজন্য মেনে সমাজটা এগুচ্ছে। রুগ্ন, ক্ষয়িষ্ণু এবং অশেষ বিব্রতকর হলেও এই বাস্তবতা অনিবার্য- খুব সহজে এর কবল থেকে আমাদের মুক্তি নেই। আজ যেমন নয়, নিকট ভবিষ্যতেও সম্ভাবনা বলা যায় প্রায় শূন্যের কোঠায়।

ভূমিকাটা একটু নেতিবাচক হয়ে গেলো। উপায় নেই- বাস্তবতা লুকিয়ে তো সামনে চলা যায় না। সমাজের যারা ডাক্তার, রোগির শরীরের অস্তস্তিকর সব গোপনিয়তা স্বীকার করেই তো তাকে নিজের কাজটুকু করতে হয়। আর এই সমাজে যারা আলেম হবে, ভুল ভাবনা আর অপুষ্ট চিন্তার মাতব্বর শ্রেণীর লোকদের হৃদয়রোগের যারা চিকিৎসা করবে- সমাজের তিক্ত বাস্তবতাটা জেনেই তাকে পথচলা শুরু করতে হবে। সামনে বাড়তে হবে। আস্থা ও দৃঢ়তা নিয়ে প্রস্তুত হতে হবে।

গোটা দেশে আলেম সমাজ নিয়ে নেতিবাচক চিন্তার ছড়াছড়ি। শহর হোক বা গ্রাম, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, স্বধর্মীয় বা ভিন্ন ধর্মের- সমাজের প্রতিটা স্তরে আলেম সমাজ নিয়ে প্রবল ঘৃণা, করুণা ও রিউমার ছড়ানো। এসব নেতবিাচক হালাত জেনে ও মেনে তাদেরই সেবায় একজন আলেমকে জীবনব্যয় করতে হয়। ঈমানের পথে দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ওরাসাতের দায় নিতে হয়। জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত, কাজের প্রতিটা ধাপ, চিন্তা ও দায়বোধের প্রতিটা বাঁক তার জন্য অজ¯্র চ্যালেঞ্জ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একজন আলেমের তাই কোনো ছুটি বা বিরতি নেই, নির্দিষ্ট কোনো মাইলফলক তার গতিরোধক হতে পারে না। তাকে তাই গড়ে উঠতে হয় সবার সাথে মেশার ভাবনা, সবরকম মানসিকতাকে মোকাবেলা করার সবর ও সাহস এবং হরদম ছুটে চলার অদম্য ¯œায়বিক সক্ষমতা নিয়ে। কে কী বললো, কে কী ভাবলো, কে কীভাবে সাড়া দিলো বা প্রত্যাখ্যান করলো তারচে বড় কথা তাকে লেগে থাকতে হয়, জুড়ে নিতে হয়, চলা ও চালিয়ে নেয়া অব্যাহত রাখতে হয়। এই পরীক্ষায় যে যতোটা নিবিষ্ট, এই রেসে যে যতোটা দমের অধিকারী, এই প্রতিযোগিতায় যে যতোটা মনোযোগী- তার কাজের ও সাফল্যের চার্টও ততোটাই উজ্জ্বল। তাও যদি তা মকবুল হয় আল্লাহর দরবারে।

আমাদের সমাজের বড় অংশটাই যে ইসলামে অভ্যস্ত তা ফাজায়েলের, মাসায়েলের উপস্থিািত বড় কম। আল।লাহর প্রতি বিশ্বাসে তাদের কোনো খাদ নেই, রাসূলের ভালোবাসায় তারা জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত, সাহাবা ও আকাবিরের মালফুজাত তাদের চোখে সহজেই পানি নিয়ে আসে। তবে তারাই আবার অপ্রস্তুত হন নামাজের আহ্বানে, জাকাতের হিসেবে, সুদ-ঘুষের প্রতিরোধে। ইসলাম ঠিক রেখেও কাজে, জীবনযাপনে, আয়-উপার্জনে সীমাহীন স্বাধীনতার অসম্ভব সুযোগ তারা নিতে ও পেতে চান। তাই কামনা করেন এমন আলেম যারা তাদের চিন্তায় সহমত হবেন, কাজে সমর্থক হবেন; যদি নাও হন বিরোধ বা প্রতিবাদ অন্তত করবেন না।

এই সমাজে এমন মানসিকতার লোকদের নিয়ে কাজ করার যে চ্যালেঞ্জ, যেমন দূরদর্শিতা ও সক্ষমতা থাকা দরকার, দেশের ৯৫ ভাগ আলেমেরই তা নেই বা ঘাটতিটা প্রবল। সবর ও সাহস নিয়ে এগুনোর বদলে তারা বরং হাঁটেন এড়িয়ে চলার বা সমালোচনার পথে। নিজের ইলম ও আমলের, জানা ও মানার ব্যাপারে একপ্রকার আত্মতুষ্টি তাদের ভাবনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তারাও অভিমানী হন, মুখ ঘুরিয়ে রাখেন। চোখের আড়াল হতে দেন। কখনো কখনো কিংবা কেউ কেউ তো অযোগ্যতা ঢাকতে এমন কোনো কৌশল নেই যা অবলম্বন করেন না। দিনে দিনে তাই সমস্যা বাড়ে, দূরত্ব সীমা ছাড়ায়। নতুন নামে, নতুন সুর ও আবহে একের পর এক ফেতনা সমাজজুড়ে ডালপালা ছড়াতে শুরু করে। এভাবে সহজ বিষয়কে কঠিন হতে দিয়ে অক্ষমতার আরজি নিয়ে আমরা আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদী হই।

দ্বীনের দায়, ভ্রাতৃত্বের দরদ আর বৃহত্তর উম্মাহর স্বার্থ বিবেচনায় এই লোকগুলোর মাঝেই কেউ যখন দাঁড়াবে- তাকে অবশ্যই পরিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে। প্রচুর ইলম আর স্মার্ট আচরণের অধিকারী হতে হবে। সীমাহীন সবর ও দূরদৃষ্টি রাখতে হবে। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীন মানুষের ভাবনা ও মনের খবর রাখতে হবে। সবার সাথে মেশার, ব্যক্তিত্ব ঠিক রেখে কথা বলার যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। তবেই সম্ভব একজন মুসলিম হিসেবে, দুনিয়ায় আল্লাহর খলিফা হিসেবে, নবীর ওয়ারিস হিসেবে নিজের দায়িত্ব ঠিকঠাকভাবে পালন করা। নয়তো লাভের বদলে ক্ষতি, ঐক্যের বদলে বিভেদ, ইলমের বদলে জাহালত, সুন্নাহর বদলে বিদআত গ্রাস করতে থাকা উম্মাহকে পুরোপুরি ছেয়ে নেবে। মুক্তির কোনো উপায় তখন থাকবে না। জবাবদিহিতারও কোনো সুযোগ আর পাওয়া যাবে না।

Leave a Reply